নিসর্গ

কাশ্মীরঃ মর্ত্যলোক ছেড়ে স্বর্গলোকে কাটিয়ে দেয়া কয়েকটি দিন (পর্ব-২)

কাশ্মীরঃ মর্ত্যলোক ছেড়ে স্বর্গলোকে কাটিয়ে দেয়া কয়েকটি দিন পর্ব-২

কাশ্মীরঃ মর্ত্যলোক ছেড়ে স্বর্গলোকে কাটিয়ে দেয়া কয়েকটি দিন (পর্ব-১)

“আগার ফিরদাউস বা রয় ঈ জামিন আস্ত, হামিন আস্ত ইউ হামিন আস্ত ইউ হামিন আস্ত” অর্থাৎ পৃথিবীতে যদি স্বর্গ থেকে থাকে তবে তা এখানেই, এখানেই, এখানেই: মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর ।

সারারাত দিল্লির ট্রাঞ্জিটে কাতর আমরা যখন শ্রীনগর এয়ারপোর্টে নামলাম, হঠাৎ এক ঝলক তাজা সতেজ হাওয়া আমাদের চোখ মুখে কোমল পরশ মাখিয়ে দিয়ে গেল আর সাথে সাথেই কোথায় যেন হারিয়ে গেল সকল ক্লান্তি আমাদের। সেই সাথে ভোরের হাড় কাঁপানো শীতও জানান দিয়ে গেল তার তীব্রতার। দিল্লী এয়ারপোর্টেই সবাই হ্যান্ড ব্যাগে করে সোয়েটার নিয়েছিলাম তাই নেমেই চটপট পরে ফেললাম আমরা। বের হতেই আমাদের ড্রাইভার কে দেখলাম আমার হাজবেন্ড এর নেম প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দশ জন সদস্য তাই চৌদ্দ সিটের টেম্পু ট্রাভেলার (বড় মাইক্রো বাস টাইপের) আমাদের জন্য দিয়েছিল তারা। এয়ারপোর্ট থেকে বের হতেই শ্রীনগরের শান্ত সৌম্য রুপের সাথে পরিচয় হল আমাদের আর সেই সাথে সেই রুপের সাথে সম্পুর্ণ বিপরীতমুখী আরেকটি রুপ ও চোখে পরল আর তা হল কিছুদুর পর পর আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র সজ্জিত ইন্ডিয়ান আর্মি সতর্ক অবস্থায় টহলরত। সব দোকান পাট, অফিস আদালত বন্ধ দেখছিলাম। ড্রাইভার বলল শ্রীনগরে স্ট্রাইক চলছে। আগামী দুইদিন চলবে এটা। শুনে আমাদের মাথায় হাত, বলে কি সে? আমাদের শুকনো মুখ দেখে সে আশ্বস্ত করল স্ট্রাইকে ট্যুরিস্ট স্পটগুলোর উপর কোন প্রভাব পরেনা , বরং এতে লাভ একটাই তা হল জ্যাম বিহীন রাস্তা। যাক আশ্বস্ত হয়ে হোটেলে পৌছলাম আমরা। আমাদের হোটেল ছিল শ্রীনগরের একদম প্রাণ কেন্দ্র লাল চক-এ। ট্যুর প্ল্যান অনুযায়ী আজকের দিনটা আমাদের শ্রীনগরের জন্য বরাদ্দ। ভেবেছিলাম সারারাত রাত জেগে আজ বের হওয়া কঠিন হয়ে যাবে আমাদের, বিশেষ করে টিমের ৫ বছর আর আট বছর দুজন বেবির জন্য তো অনেক কস্টের হয়েযাবে কিন্তু কিসের কি? শ্রীনগরের তাজা হাওয়া তার যাদুকরী আছর শুরু করে দিয়েছে যে আমাদের উপর। আটটায় হোটেলে প্রবেশ করে গোসল করে ফ্রেস হয়ে ব্রেকফাস্ট করে রেডি হয়ে যখন বেড়িয়ে পরলাম শ্রীনগর দর্শনে তখন ঘড়ির কাটা দশটা ছুঁই ছুঁই। আমরা যাদের নিয়ে চিন্তা করছি সেই খুচরা পয়সারা দেখি আরো বেশি স্মার্ট। ক্লান্তির কোন ছাপ তো দুরের কথা জামা জুতা পরে আমাদের চেয়ে তিনগুন উৎসাহে তারা গটগট করে হেটে যেতে লাগল আমাদের সামনে।

শ্রীনগর হল কাশ্মীরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী। ১৫৮৬ থেকে ১৭৫১ পর্যন্ত এখানে মুঘল শাসন কায়েম ছিল। শুভ্র তুষার ঢাকা পর্বতমালা, বিস্তীর্ন মখমলি সবুজে ছাওয়া পাহাড়ী উপত্যকা, কাকচক্ষু, শান্ত, সুনীল জলের ডাল লেকে ঘেরা স্রষ্টা্র অপুর্ব সৃষ্টি এই কশ্মীর। এর মনোলোভা রুপে বুদ হয়ে সৌখীন মুঘল সম্রাট রা এখানে অসম্ভব সুন্দর কিছু বাগান করে গিয়েছেন। যেমন, নিশাত বাগ, শালিমার বাগ, চশমে শাহী, পরি মহল ইত্যাদি। একসাথে সেগুলোকে মুঘল গার্ডেন বলা হয়। শ্রীনগরের ট্যুরিস্ট এ্যাট্রাকশনের মধ্যে এগুলো অন্যতম।

শ্রীনগর, কাশ্মীর

এছাড়া রয়েছে, ডাল লেকে শিকারা ভ্রমন, হযরর বাল মসজীদ, বোট্যানিক্যাল গার্ডেন এবং ইন্দিরা গান্ধী টিউলিপ গার্ডেন যা সারা বছরের মধ্যে শুধুমাত্র মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত তার রুপের পসরা সাজিয়ে বসে। আমাদের এপ্রিলে যাওয়ার উদ্দেশ্য যেহেতু এই টিউলিপ তাই শ্রীনগর দর্শনে প্রথমেই আমরা টিউলিপ বাগানেই গেলাম। বাগানে প্রবেশ করেই মনে হল এ যেন এক অন্য জগতে চলে এলাম আমরা। ঠিক যেন সৃষ্টিকর্তার সুনিপুন যত্নে আঁকা ক্যানভাস। পেছনে নীলাভ পাহাড়ের পটভুমি আর তার সামনে বিস্তীর্ণ রঙ এর মেলা। এ বলছে আমায় দেখ, ও বলছে আমায়। কোন রঙ ছেড়ে কোন রঙ দেখি। এ যেন নয়নের প্রশান্তি, মনের প্রশান্তি এবং অবশ্যই সেই সাথে আত্মার। এখানে বেশ কিছু সময় কাটিয়ে বের হলাম , এবার উদ্দেশ্য মুঘল গার্ডেন চশমে শাহী। অসম্ভব সুন্দর , ফুল, পাহাড়, ঝর্না সম্বলিত এই দৃস্টিনন্দন বাগানটি মুঘল সম্রাট শাহজাহান তার পুত্র দারা শিকো কে উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন। সেখানে কিছু সময় কাটিয়ে আরেক মুঘল গার্ডেন নিশাত বাগ। মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম আরেকটি নিদর্শন এই বাগানটি। এখানেই কাশ্মীরের ট্র্যাডিশনাল সাজে সেজে ওদের প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার দিয়ে ছবি তুলে দাত কেলিয়ে বের হয়ে এলাম। যদিও পরবর্তীতে সেই ছবিগুলি হাতে পেয়ে সেই বিকশিত দন্ত আপনা আপনি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কারণ অধিক কালারের ব্যাবহারে সেই ছবিগুলিতে নিজেকে আশির দশকের বাংলা ছবির নায়িকা বলে ভ্রম হচ্ছিল। এই ক্ষেত্রে পরামর্শ হল ওদের কাছে ১০০ রুপি নিয়ে শুধু ড্রেস নিন, অযথা ওদের দ্বারা ছবি তুলাতে যাবেন না। আমাদের ছয়টি ছবি তুলে ওয়াশ করে দিতে তারা ৭০০ রুপি নিয়েছিল। আমাদের নিজেদের ক্যামেরার ছবি ওদের চেয়ে হাজার গুনে ভাল এসেছে। যাই হোক, এরপর ডেস্টিনেশন শালিমার বাগ।

শালিমার বাগ, কাশ্মীর

এই বাগানের ভেতরে আর ঢুকলাম না। সম্রাট জাহাঙ্গীর তার প্রিয় সহধর্মিনী নুর জাহানের জন্য এটি বানিয়েছিলেন। বাহির থেকে উকি ঝুকি মেরে চলে গেলাম লাঞ্চ করতে । লাঞ্চ করে দেখি তখনও মাথার উপর গনগনে সুর্য্য। এই রোদে ডাল লেকে শিকারা ভ্রমন ভাল লাগবেনা। তাই অতি চালাক ড্রাইভার আমাদের নিয়ে গেল শপিং এ। সামনের দিনগুলিতে স্ট্রাইকের কারণে দোকান খোলা নাও পেতে পারি এই আশংকা দেখিয়ে সে আমাদের যাবতীয় এক্সপেন্সিভ দোকানে নিয়ে গেল আর আমরাও এই মনে হয় শেষ সুযোগ এমন ভেবে তিনগুণ দাম দিয়ে হরেক রকম বাদাম আর নাট কিনলাম প্রাণ ভরে। যদিও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় বেশ ভালই বুঝতে পারছি যে এখানে ওর শেয়ার আছে বলেই সে আমাদের নিয়ে গেছে এবং দাম বেশি দিয়েই কিনছি কিন্তু স্ট্রাইক এর কোন ভরসা নেই এই ভেবে আমরা কিনে ফেললাম বেশ পরিমাণে নাটস আর স্পাইস। পরবর্তীতে যে জিনিস এখানে ৪০০ টাকা কেজি কিনেছি তা লাল চকে ১৮০ টাকায় দেখে হার্টফেইল হবার দশা আমাদের। এর পর শালের দোকান এবং এখানে দাম অনেক বেশি বলে( যাওয়ার আগে ত স্টাডি করে জিনিসের দাম ও দেখেছি) খুব বেশি না কিনে কিছু শাল আর কাশ্মীরি কাজের টু পিস কিনে একটু অপরাহ্নের দিকে ডাল লেকে পৌছলাম। এবার আমার সেই বহুল প্রতিক্ষিত শিকারা ভ্রমন। এখানে বলে রাখা ভাল, কাশ্মীরের প্রতিটি জায়গায় এত বেশি দামাদামী করতে হয় যা প্রায় বিরক্তির পর্যায়ে পরে এবং কখনো কখনো তা অসহ্য হয়ে দাঁড়ায়। এ ব্যাপারে পরে বিশদ বলব । যথারীতি শিকারাওয়ালাদের সাথে চরম বার্গেইনিং করে এক ঘন্টার জন্য প্রতিটি শিকারা ৫০০ রুপিতে নির্ধারিত হল। এবার বিলাসী এই তরিতে গা এলানোর পালা। নিজেকে নুরজাহান না হলেও নিদেনপক্ষে সম্রাটদের কোন এক বংশধর বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু সেখানে যে একটু নিজেদের মত সময় কাটাব উপায় নেই। আরেক নৌকায় টুকিটাকি জিনিসের পসরা নিয়ে দোকানী হাজির। নাছোড়বান্দা দোকানী ছাড়বেই না। অবশেষে তার হাত থেকে নিস্তার পেতে এক জোড়া কাশ্মীরি ঝুমকা আর একজোড়া নুপুর কিনলাম সাড়ে তিনশ রুপি দিয়ে। এই ক্ষেত্রে পরামর্শ হল ভুলেও দাম বলতে যাবেন না। একবার দাম বলেছেন তো মরেছেন। যতই কনভিন্স করার চেস্টা করুক আপনি নিজেদের নিয়ে ব্যাস্ত থাকুন অথবা উদাস হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকুন। ডাল লেকের মাঝখানে চমৎকার এক জায়গায় কিছুক্ষন নেমে ঘুরে ফিরে ছবি তুলে আবার শিকারায় ফিরে আসা। এক ঘন্টার কম সময়ই লাগে। আপনাকে বলবে অনেক গুলো পয়েন্ট এ নিয়ে যাবে তারা তারপর বাস্তবে যখন সেসব পয়েন্ট এর নমুনা দেখবেন হাসি পাবে। আসলে ডাল লেকে কোন পয়েন্ট এর দরকার নেই, শিকারায় করে লেকের পানিতে বিলাসী বিহারের যে আবেশ তা সত্যিই অমুল্য। লেকের কাক চক্ষু পানি , দূর পাহাড় থেকে বেসে আসা মৃদুমন্দ হাওয়া যা নির্মলতা আর সতেজতার বার্তা নিয়ে ছুয়ে যাচ্ছিল আমাদের কপোল, আর মনের মধ্যে তো বেজেই যাচ্ছে সেই কিশোরী বেলার মুগ্ধতার গান “দিওয়ানা হুয়া বাদল… ”যা কখনো কখনো মন থেকে উঁকি দিয়ে ঠোঁট ও স্পর্শ করে যাচ্ছিল আমার। ভাষার আর সাধ্য কি এ মুগ্ধতা ফুটিয়ে তোলে?

পশ্চিমাকাশে সুর্য্য ঢলে পরেছে, এবার ঘরে ফেরার পালা। আমাদের ড্রাইভার সেই ভোর পাঁচ টা থেকে ডিউটি করছে তাই টায়ার্ড হয়ে পরেছে। যদিও আমাদের নাচুনী বুড়িদের উৎসাহে ভাটা পরেনি এক কণাও কিন্তু ড্রাইভারের কারণে সন্ধ্যার পর পর ই হোটেলে ফিরতে বাধ্য হলাম। এর মাঝে একটি গুরুত্বপুর্ণ ট্যুরিস্ট স্পট পরি মহল বাদ পরে গেল আমাদের। অতি চালাক ড্রাইভার পরে নিয়ে যাবে বলে আর সময় করে উঠতে পারল না কারণ তার সবচেয়ে বেশি আগ্রহ আমাদের শপিং করানো তে । যাই হোক পরে এজেন্সিকে কমপ্লেইন করে ড্রাইভার চেঞ্জ করেছিলাম আমরা। অতঃপর হোটেলে ফিরে ফ্রেস হতেই বুঝলাম কি পরিমাণ টায়ার্ড আমরা। তাই আর বেশি কেরদানি না দেখিয়ে চুপচাপ ডিনার করে চটপট শুয়ে পরলাম। কাল আবার খুব ভোরে উঠতে হবে কারণ আগামীকাল ডেস্টিনেশন সোনমার্গ। জীবনে প্রথম বরফ দেখব আমরা। আগামীকাল ঘটতে যাওয়া অজানা এ্যডভেঞ্চারের রোমাঞ্চকর কল্পনায় বুদ হয়ে গা এলিয়ে দিলাম বিছানায় আর সাথে সাথেই ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেলাম আমরা।

(চলবে)

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top