নাগরিক কথা

আমরা কি নির্বিচার হত্যাকান্ডের পথ তৈরি করছি?

ক্রসফায়ার জনমত নিয়ন আলোয় neon aloy

আপনি যদি কাউকে আজকে এক টাকা চুরি করা শিখান, দুইদিন পর সে লাখ টাকা চুরি করবে। তখন সে দায় কিন্তু আপনাকে নিতে হবে; আপনি বলতে পারবেন না, “আমি তো এক টাকা চুরি করা শিখিয়েছিলাম, লাখ টাকা চুরি করতে বলি নাই।”

আমরা যে কর্পোরেট দুনিয়ায় বাস করি সেখানে আমাদের মাথার খুলি অনেক শক্ত, স্বচক্ষে না দেখা বা স্বকর্ণে না শোনা ছাড়া অনেককিছুই আমাদের মস্তিষ্কে ঠিক আশ্রয় নেয় না। একরাম হত্যার অডিও ও তাঁর স্ত্রী-কন্যার কান্না শুনে আমাদের মনে হচ্ছে এটা অন্যায়! এর আগ পর্যন্ত অনেকে নীরবই ছিলেন। কিন্তু, একটা প্রশ্ন করতে হবে, এই অবস্থায় আমরা যে আসলাম তাতে আমাদের দায় কতটুকু?

খেয়াল করে দেখুন, কিছুদিন আগেও বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পক্ষে আমরা গলা ফাটিয়েছি, শুধুমাত্র নিজেদের মতাদর্শের মানুষ না হলেই হলো। বিএনপি’র (বা অন্যকোন দলের) কর্মী রিমান্ডে মারা গিয়েছে কিন্তু আমরা কোন প্রতিবাদ করি নাই। বরং, মৌন সমর্থনই ছিল। এমন ভূরি ভূরি উদাহরণ দেয়া যায়। ধর্ষককে যখন ক্রসফায়ার করা হয় তখনও একে সমর্থন দেয়ার মতো মানুষের অভাব ছিল না। আশেপাশের বন্ধু-বান্ধবদের অনেকেই সমর্থন দিয়েছেন, তাঁরা সকলেই ভুলে যান, যত বড় ক্রিমিনালই হোক, তাঁকে বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। ক্রসফায়ারের প্রতি আমাদের যে সমর্থন সেটা কোন পর্যায়ে আছে তার একটা সাম্প্রতিক নমুনা আমি দিচ্ছি।

একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের মতামত বিভাগে চোখ বুলাচ্ছিলাম। তখন কিছু লেখা চোখে পড়লো; সে সম্পর্কে কিছু বলা ফরজ মনে করছি। সাধারণত এইভাবে কাউকে উল্লেখ করে কিছু বলি না।

‘মাদক বিরোধী অভিযান যেন ইতিহাসের কলঙ্ক না হয়’ শিরোনামের লেখার শুরুতেই লেখক “লজিক্যাল ফ্যাসিবাদ” নামক শব্দদ্বয় ব্যবহার করে বলছেন, “একটি গরীব সদ্য স্বাধীন দেশের আর্থসামাজিক উন্নতির জন্য লজিক্যাল ফ্যাসিবাদের প্রয়োজন আছে।” যদিও এই শব্দযুগল দিয়ে তিনি কি বুঝাতে চাচ্ছেন তা আসলে পরিষ্কার না। তিনি র‍্যাবের ক্রসফায়ার নিয়ে লিখতে গিয়ে “সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর প্রতিবিপ্লবীদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার” উদাহরণ দিয়ে বলেছেন যে এতে “তথাকথিত মানবাধিকার” লঙ্ঘন হলেও উন্নয়ন ও অগ্রগতির স্বার্থে এসব করতে হয়। মাদকবিরোধী অভিযানে ক্রসফায়ারের সাথে “বিপ্লব-প্রতিবিপ্লব” এর প্রতি তুলনা থেকে তার উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবেই বুঝা যায়। বিনা বিচারে এইসব হত্যাকাণ্ড যে সকল আইন ও নীতির বাইরে এটার চেয়ে তার বড় দুঃখ হল আওয়ামীলীগের একজন একনিষ্ঠ কর্মী ভুলবশত মারা গিয়েছেন। তিনি মানছেন এই কোলাট্যারাল ড্যামেজ (মানে, একরামুল হক মারা যাওয়া) আসলে আমাদের জন্যে লাভজনক হবে না। সেটা তার মুখে শুনলেই আরও ভালো করে বুঝতে পারবেন তিনি আসলে কি বুঝাতে চাচ্ছেন, “সমাজের জঞ্জাল সরাতে যে উদ্যোগ নিতে হয় সেটি খুব শোভন নাও হতে পারে, কিন্তু জঞ্জালের ভেতর দুয়েকটি সোনার খণ্ড চলে গেলে আখেরে গৃহস্থেরই ক্ষতি।” সেই সাথে তিনি এরকম একটা অভিযান চেয়েছেন ‘দুর্নীতি রোধে’।

আরেকজন লেখক ‘যুদ্ধ এবার না হয় বাঁচার জন্য চলুক’ চমৎকার শিরোনামের একটা লেখা লিখেছেন। তিনিও মানেন বিচার পাওয়ার অধিকার সবার আছে, কিন্তু তার মতে, “বৃহৎ স্বার্থে অনেক কিছু হতে হয়”। তিনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই বলছেন যে ইয়াবা বন্ধ না হলে সর্বনাশ হবে দেশের, তাই লেখার ইতি টানছেন এই বলে যে, “যে যাই ভাবুক বা বলুক বন্দুকযুদ্ধ চলছে, চলুক। এতোদিন তো নানা কাজে চলেছে এই যুদ্ধ এবার না হয় বাঁচার জন্য চলুক, বন্দুক যুদ্ধ।” এই লেখক তার আরেক লেখায় (একেবারে সাম্প্রতিক) সরাসরি আরেকটা দাবি তুলছেন, “জীবনবিনাশী চালকদের জন্য কেনো এনকাউন্টার নয়?”

ঠিক একই ভাবে অন্য একজন লেখক দাবি তুলছেন, ‘মাদকের মতো দ্রব্যমূল্যের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা যায় না?’ সহজ কথা হচ্ছে, এই অভিযানের পক্ষে তার অবস্থান পরিষ্কার। সুলতান মির্জা নামক আরেক লেখকের প্রশ্ন হচ্ছে ‘মাদক ব্যবসায়ীদের জন্যে এত মায়াকান্না কেন?’ যারা এই অভিযানের সমালোচনা করছেন তাঁরা সকলেই, তার মতে, বিভিন্ন এনজিও ও মানবাধিকার সংস্থার সদস্য, যারা “মাদকে দেশ সয়লাব হলে সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরে …ঠিক তেমনই মাদক অপরাধীরা মারা গেলে সেটার বিরোধিতা” করে। তাই তার মত হচ্ছে, মাদক দমনে সরকার কোন পথে হাঁটবে সেই বিষয়টা সরকারের উপরে ছেড়ে দেওয়া উচিত।’ অবশ্য শক্তি প্রয়োগের পাশাপাশি তিনি সামাজিক আন্দোলনের কথাও বলছেন।

যে কয়টা লেখা চোখে পড়েছে তন্মধ্যে হাতেগোনা কয়টা উল্লেখ করলাম। তাদের কথা উল্লেখ করলাম শুধু এটা দেখাতে যে, আমরা কিভাবে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পক্ষে সম্মতি গড়ে তুলছি। তাঁরা সকলেই বিচার ছাড়া এই হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করেন, এবং আরও বিভিন্ন ইস্যুতে এমন অভিযানের প্রত্যাশা করেন। আর যিনি সমালোচনা করছেন তিনি শুধু একরাম হত্যাকাণ্ডের সমালোচনা করছেন, এবং ওবায়দুল কাদের সাহেবের মতো এই হত্যাকে ‘কোল্যাটারাল ড্যামেজ’ হিসেবেই দেখছেন।

তাঁরা কেন ক্রসফায়ারকে সমর্থন করছেন এটা বুঝি, বা বুঝার চেষ্টা করি। একদল ফ্যাসিবাদের সমর্থক, দল যেহেতু করছে, আমিও করবো এই ভাবনায় তাড়িত। এবং এখানে লজিক্যাল ফ্যাসিবাদের মতো সুন্দর সুন্দর শব্দ ব্যবহার করছেন। আরেকদল হচ্ছেন যারা প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার প্রতি হতাশ হয়েই এমন মত প্রকাশ করছেন। কিন্তু একটু চিন্তা করলেই বুঝা যায় আমরা আসলে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড দিয়ে আরও হত্যার পথ পরিষ্কার করছি। একজন একরামের কথা আমরা শুনতে পেরেছি। আরও কত একরাম মারা যাচ্ছে যাদের স্ত্রী-মা-কন্যা-পুত্রদের কান্না আমাদের কানে প্রবেশ করছে না। দেখুন, বিনা বিচারে যদি বদিও মারা যায় তবু আমি প্রতিবাদ করবো।

শুরুতেই দেয়া উদাহরণের মতোই বলি, কাদের সাহেবরা যে সাহস করে এসব বলেন বা করেন, তার দায় আমরা কোনভাবে এড়াতে পারি না। একটু অতীতে যান, দেখবেন কত বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে জায়েজীকরণ করেছি আমরা। যত বড় অপরাধী হোক তাকে বিচারের সম্মুখীন করতে হবে। আর না হলে সেটাও আরেকটা হত্যাকাণ্ড! সে আরেক অপরাধ!

[এডিটরস নোটঃ নাগরিক কথা সেকশনে প্রকাশিত এই লেখাটিতে লেখক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তার অভিমত প্রকাশ করেছেন। নিয়ন আলোয় শুধুমাত্র লেখকের মতপ্রকাশের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফরমের ভূমিকা পালন করেছে। কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির সম্মানহানি এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আপনার আশেপাশে ঘটে চলা কোন অসঙ্গতির কথা তুলে ধরতে চান সবার কাছে? আমাদের ইমেইল করুন neonaloymag@gmail.com অ্যাড্রেসে।]

Most Popular

To Top