ফ্লাডলাইট

মান বাঁচানোর সিরিজ, চোখ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে!

বাংলাদেশ আফগানিস্তান সিরিজ নিয়ন আলোয় neon aloy

উত্তরখান্ডের রাজধানী দেহরাদুনে আগামীকাল থেকে শুরু হতে যাওয়া ৩ ম্যাচের টি-টুয়েন্টি সিরিজে বাংলাদেশ মাঠে নামবে দুটি টার্গেট সামনে রেখে। প্রথমত, মান রক্ষার লড়াই আর দ্বিতীয়ত ২০২০ সালের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে সরাসরি অংশ নেয়ার নিশ্চয়তা।

শুনতে যেমনই লাগুক সিরিজ শুরুর আগে সব দিক থেকেই এগিয়ে আছে আফগানিস্তান। বাংলাদেশ অধিনায়ক সাকিব আল হাসান এবং সিনিয়র প্লেয়ার মুশফিকুর রহিম দুইজনই বলেছেন এই কথা। যদিও আফগানিস্তান “ফেভারিট” তবুও মাত্র এক বছর আগে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া একটি দেশের বিপক্ষে সিরিজ হারলে বাংলাদেশকে যথেষ্ঠ লজ্জা পেতে হবে, সেটা মাথায় রেখেই বলেছি এটি বাংলাদেশের মান বাঁচানোর অথবা রক্ষার সিরিজ।

বাংলাদেশ আফগানিস্তান সিরিজ নিয়ন আলোয় neon aloy

আর পরবর্তী টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের বিষয়টা মাথায় রেখেই বিসিবি ওয়ানডে সিরিজের বদলে টি-টুয়েন্টি সিরিজ খেলার প্রস্তাব দেয় আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ডকে যেখানে ওয়ানডে সিরিজ খেলাটা তুলনামূলক সহজ ছিলো। কিভাবে?

টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার ডেড লাইন হচ্ছে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮। এই সময়ের ভেতর বাংলাদেশকে অবশ্যই প্রথম দশ দলের ভেতর থাকতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ র‍্যাংকিং-এর ১০ নাম্বার পজিশনে আর আফগানিস্তান ৮ নাম্বার পজিশনে আছে।

যদি বাংলাদেশ ৩-০ ব্যবধানে সিরিজ জিতে যায় তাহলে ৮ নাম্বার পজিশনে চলে আসবে। বাংলাদেশের এর পরের টি-টুয়েন্টি এসাইনমেন্ট ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের ৩ ম্যাচের সিরিজ এবং ফিরতি সফতে ক্যারিবিয়ানরা বাংলাদেশ সফরে আসলে ২ ম্যাচের সিরিজ। বাংলাদেশ যদি আফগানিস্তানের সাথে সিরিজ জয় এবং ক্যারিবিয়ানদের সাথে অন্তত একটি বা দুটি ম্যাচ জিততে পারে তাহলে কাটাকাটি করে অন্তত দশ নাম্বারেই থাকার সম্ভবনা থাকবে।

আর যদি এই সিরিজ না হতো এবং ক্যারিবিয়ানদের সাথেও সিরিজ হারতো বাংলাদেশ তাহলে নেমে যেতে পারতো দশ নাম্বারের নীচে। মাথায় রাখতে হবে জুলাইতে আয়ারল্যান্ড-স্কটল্যান্ড-নেদারল্যান্ডসের ট্রাই নেশন সিরিজ আছে। সেখান থেকে জয়ী দল উঠে আসতে পারে দশ নাম্বার পজিশনে।

সুতরাং অনেকটা বাধ্য হয়েই বাংলাদেশ টি-টুয়েন্টি সিরিজ খেলার ঝুঁকি নিয়েছে।

সিরিজ হেরে গেলে অবশ্য সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে, খেলতে হতে পারে বাছাইপর্ব!

টি-টুয়েন্টির বাংলাদেশ এমনই, হিসাবে রাখতে হয় আফগানিস্তান, আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড এবং নেদারল্যান্ডসকেও!

বাংলাদেশ আফগানিস্তান সিরিজ নিয়ন আলোয় neon aloy

বলার অপেক্ষা রাখেনা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ আফগানিস্তানের স্পিনারদের সামলানো। টি-টুয়েন্টির এক নাম্বার বোলার রশিদ খান এবং নতুন বিষ্ময় মুজিব উর রহমানের সাথে থাকবে অভিজ্ঞ মোহাম্মদ নবী। অর্থাৎ মোটামুটি ৮-১২ ওভার কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের। বাকি ওভারগুলাতে খেলতে হবে হাত খুলে, যেটাতে আমরা খুব একটা পারদর্শী না।

রশিদ খান এবং মুজিব, এমন দুইজন বোলার যাদের আফগান অধিনায়ক স্তানিকজাই ১-২০ ওভারের ভেতর যেকোন সময় বোলিং করাতে পারেন। পাওয়ার প্লে, ডেথ ওভার, মিডিল ওভার যেকোন স্টেজে রশিদ, মুজিবরা চ্যালেঞ্জ জানাবে টাইগারদের। আর শুরুতেই যদি উইকেট হারায় বাংলাদেশ তাহলে খুব কঠিন হয়ে যাবে বড় রান করা।

এরই ভেতর গতকাল শুরুটা ভালো হয়নি, আফগানিস্তান “এ” দলের কাছে হারতে হয়েছে ৮ উইকেটে। ব্যাটসম্যানরা রান করেছিলো মাত্র ১৪৫। কিন্তু সিরিজে জিততে হলে অবশ্যই ১৭৫+ রান করতে হবে অন্তত।

বাংলাদেশের জন্য অনুপ্রেরণা হবে নিদাহাস ট্রফির ফাইনাল। আর বাংলাদেশ একমাত্র যেই দিক থেকে এগিয়ে সেটা হচ্ছে অভিজ্ঞতা। আফগানিস্তান তাদের বেশিরভাগ ম্যাচ খেলেছে সহযোগী দেশসমূহের সাথে আর বাংলাদেশ বড় দলগুলার সাথে। সিনিয়র প্লেয়ারদের অভিজ্ঞতাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি।

তামিম ইকবাল যদি অন্তত ১০-১৩ ওভার পর্যন্ত টিকে থাকে তাহলে বড় রান হবে, তবে তার ওপেনিং পার্টনার যেই হোক তাকে দ্রুত রান তুলতে হবে। মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ আর মুশফিক নিদাহাসে ভালো করেছিলো, তাই তাদের উপর ভরসা রাখা যায়। ডেথ ওভারে উইকেটে রিয়াদ বা সাব্বির থাকলে রান হবে আশাকরি। আমি আরিফুলকে একাদশে দেখতে চাইবো।

বাংলাদেশ আফগানিস্তান সিরিজ নিয়ন আলোয় neon aloy

আফগানিস্তানের ব্যাটসম্যানরা শারীরিক দিক থেকে বেশ শক্তিশালী, বিগ হিট নিতে পারে। আর বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব চলাকালীন তাদের লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যানদের বিগ হ্যান্ডে খেলতে দেখেছিলাম। আইপিএলে রশিদ খানের ব্যাটিং নিশ্চয় মনে আছে! বাছাইপর্বে আফগান পেসাররাও দারুন বল করেছিলো।

নিদাহাস ট্রফির পর বাংলাদেশ লম্বা সময় খেলার বাইরে ছিলো এটা একটা বড় সমস্যা হতে পারে। খেলার ভেতর ছিলেন অধিনায়ক সাকিব। আইপিএলে বোলিং বলা চলে ভালো হয়েছিলো কিন্তু ব্যাটিং ছিলো হতাশাজনক। লম্বা ইনিংস খেলতে পারছিলেন না, বেশিরভাগ বলে মিডিলিং হয়নি, বিগ হিট বলতে শ্লগ সুইপ আর ডাউন দা উইকেটে যাওয়া। আর এই দুটি শটই কুয়ালিটি স্পিনারদের বিপক্ষে “বিপদজনক অপশন”। লেগ স্পিনের বিপক্ষেও সাকিবের দূর্বলতা চোখে পড়েছে। সাকিব যদি আবার ৩ নাম্বার পজিশনে ফিরে তাহলে অবশ্যই বড় ইনিংস প্রত্যাশা করবে দল তার কাছে।

মুস্তাফিজের না থাকাটা বড় রকমের ধাক্কা। অবশ্য অনেকে বলবেন কিভাবে? এটা ঠিক বিশ্বের বেশিরভাগ ব্যাটসম্যানের জন্য মুস্তাফিজের একমাত্র অস্ত্র “কাটার” এখন আর কোন সমস্যা না কিন্তু যেসব ব্যাটসম্যান আগে ফিজকে খেলেনি তাদের জন্য এখনো ফিজের কাটার এক রহস্য। নিদাহাস ট্রফির ফাইনালে ভিজয় শংকরের অসহায় অবস্থা নিশ্চয় ভুলে যাননি? আফগানিস্তানের ব্যাটসম্যানদের জন্য ফিজ কিন্তু অচেনাই ছিলো। এই সুযোগটা নিতে পারতাম আমরা, কিন্তু কপাল খারাপ। ফিটনেস নিয়ে ফিজকে অনেক কাজ করতে হবে।

আরো পড়ুন “আফগানিস্তানঃ রাইফেল-বুলেট ছেড়ে ব্যাট-বলের যুদ্ধে নামা মানুষগুলো…”

বাংলাদেশ ঠিক কিভাবে বোলিং কম্বিনেশন সাজাবে সেটা উইকেট দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দেহরাদুনের উইকেট যথেষ্ঠ “হার্ড”, ভৌগলিক কারনেই সেটা। কলকাতা, হায়দেরাবাদ বা বেঙ্গালুরুর মত না এখানকার আবহাওয়া। অনেকটাই আফগানিস্তানের মত, রুক্ষ, শুষ্ক, পাহাড়ি অঞ্চল যেখানে দিনের তাপমাত্রা প্রায় প্রতিদিন ৩৬° সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আবার সন্ধ্যার পর বাতাসের বেগ বেড়ে যাচ্ছে, ঝড় হচ্ছে, হুট করে বৃষ্টি হচ্ছে।

যেহেতু তাপমাত্রা এতো বেশি সুতরাং উইকেট হবে শুকনা, ফাঁটল থাকবে। আর উইকেট যত ড্রাই হয় স্পিন তত ভালো ধরে। আবার যদি হুটহাট বৃষ্টি নামে তাহলে সন্ধ্যার পরের বাতাস আর ময়েশ্চার মিলে সুইং পাবে পেসাররা। যেহেতু Altitude বেশি সুতরাং সুইং থাকবেই। আর দ্রুত টায়ার্ড হবে আমাদের ক্রিকেটাররা। আবার এই বাতাসে দেহরাদুনের ৭৫ মিটার বাউন্ডারি স্পিনের বিপক্ষে যেয়ে খেলা কঠিন হবে। বাতাসের বিপক্ষে শ্লগ সুইপ তাই “সুইসাইডাল ডিসিশন” হবে।

এই উইকেটে সবচেয়ে বড় ভয় রশিদ। হাত থেকে যদি বল রিড না করা যায় তাহলে বল উইকেটে পিচ করার পর রশিদের অতিরিক্ত স্পিডের সাথে টার্ন এবং বাউন্স মিলে ব্যাটসম্যানের জন্য প্রচন্ড কঠিন সেই বল খেলা। কাজেই রশিদের বল পিক করা লাগবে হাতে থাকা অবস্থাতেই।

দেহরাদুনের বাউন্স কাজে লাগাতে পারবে কি রুবেল, রাজু, রাহী, রনিরা? রুবেলের উপর ভরসা রাখা ছাড়া উপায় নাই, পেস বিভাগে অভিজ্ঞতার অভাব। তবে নতুনদের জন্য সুযোগ দুহাত ভরে নেয়ার।

স্পিনারদের ভেতর সাকিব, অপু ভরসা, আফগানিস্তানের যেহেতু বেশিরভাগ ডানহাতি ব্যাটসম্যান। মিরাজ আমার কাছে মূলত টেস্ট বোলার, টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটের জন্য রিস্কি অপশন, ফ্লাইট দিয়ে পিটুনি খাওয়ার অতীত অভিজ্ঞতা আছে মিরাজের।

বাংলাদেশ আফগানিস্তান সিরিজ নিয়ন আলোয় neon aloy

উত্তরখান্ডের একমাত্র আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম দেহরাদুনের এই স্টেডিয়াম, যেটা আফগানিস্তানের দ্বিতীয় হোমগ্রাউন্ড। এই অঞ্চলের মানুষ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের স্বাদ পেতে যাচ্ছে আফগানিস্তানের কারনে, সেই সৌজন্যতাবোধ থেকে মাঠে হোম ক্রাউডের সাপোর্ট আফগানিস্তান পাবে বলে মনেহয়, তাছাড়া দেহরাদুন হোক আর কলকাতা, ভারতের দর্শকরা বাংলাদেশকে সাপোর্ট করবে বলে বিশ্বাস হয়না।

আরেকটা জিনিস নিয়ে চিন্তা হচ্ছে, টেস্ট ক্রিকেটে দুইজন এবং ওয়ানডে ক্রিকেটে অন্তত একজন নিরপেক্ষ আম্পায়ার থাকার নিয়ম থাকলেও টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটে দুইজন লোকার আম্পায়ার রাখা যায়, সুতরাং মাঠে দুইজন আফগানিস্তানের আম্পায়ার থাকবে। আর আফগান আম্পায়াদের ব্যাপক অভিজ্ঞতার অভাব। এর আগে আয়ারল্যান্ড, জিম্বাবুয়ের সাথে সিরিজে আফগান আম্পায়ারদের অনেক ভুল সিদ্ধান্ত দিতে দেখেছি। ক্রিটিক্যাল মুহুর্তে তারা নিজেরাই নার্ভাস হয়ে যায়! সুতরাং কিছুটা চিন্তা থাকছেই আম্পায়ারিং নিয়ে। কি যে হয়?

অসম্ভব সুন্দর এবং অত্যাধুনিক একটি স্টেডিয়াম, দারুন ফার্স্ট আউটফিল্ড আর চমৎকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা, লাল-সাদা চেয়ারে অনেকটা ইউরোপিয়ান ধাঁচের ছোঁয়া গ্যালারীতে। আগামীকাল যার আন্তর্জাতিক অভিষেক হচ্ছে।

এই সুন্দর স্টেডিয়াম আরো অনেক সুন্দর লাগবে যদি বাংলাদেশ সিরিজ জিততে পারে। তবে উল্টা ঘটনাও ঘটতে পারে।

একটা প্রেডিকশন করলাম, সিরিজ যেই জিতুক না কেন ফলাফল ২-১ হবে, ক্লিন সুইপ হবেনা। আর প্রচন্ড কঠিন এক সিরিজ হতে যাচ্ছে। লড়াই হবে উজ্জীবিত আফগানিস্তানের স্পিনারদের বিপক্ষে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার! সেই লড়াইয়ে যেকোন দলই জয়ী হতে পারে।

এটা ক্রিকেটের হিসাব, মন কি কখনো আর এসব হিসাব মেনেছে? তাই মনে মনে চাই বাংলাদেশ যেন ৩-০ ব্যবধানে সিরিজ জিতে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার রাস্তায় অনেকটাই এগিয়ে যায়!!

Most Popular

To Top