নাগরিক কথা

একরামুল হক, আপনার মৃত্যুর জন্যে আমরাই দায়ী

কিছুদিন আগে হঠাৎ করে দেখা গেলো শিশু ধর্ষণকারীরা ‘ক্রসফায়ারে’ মারা পড়ছে। সেসময় আমি একটা জরীপ চালাই ফেসবুকে। শিশু ধর্ষণকারীদের ক্রসফায়ারে মেরে ফেলা সমর্থন করেন কি না। ৭৯% মানুষ সমর্থন জানিয়েছিলো। ভোট দিয়েছিলো প্রায় চারশ’র মত মানুষ। স্যাম্পল সাইজ হিসেবে একদম কম না। এ থেকে গোটা দেশের মানুষের ভাবনার সূত্র পাওয়া যায় কিছুটা হলেও।

এখন এই যে ৭৯% মানুষ ক্রসফায়ার চাইছে, এরা কি সবাই অমানবিক? এরা নৃশংস? না। আমি নিজেও ক্রসফায়ারের খবরগুলোতে আনন্দিত হয়েছিলাম। শিশু ধর্ষণের চেয়ে নিকৃষ্ট কোন অপরাধের কথা আমি ভাবতে পারি না। কিন্তু এটি বেড়েই চলেছিলো। বিচার হচ্ছিলো না। বিচার চাইতে গিয়ে উলটো জীবননাশের হুমকি পেয়ে ক্ষোভে অপমানে আত্মাহুতি দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। গাজীপুরের এক অসহায় বাবা তার শিশুকন্যাকে নিয়ে ট্রেনের তলায় জীবন দিয়েছিলেন। এসব সওয়া যায় না।

মানুষ এসব দেখে, এসব শুনে, এসবের মধ্যে দিয়ে বাঁচতে পারে না। মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে, মানুষ মুক্তি চায়। যখন ধর্ষকরা একে একে মারা পড়তে লাগলো, আমি একটা ইউটোপিয়ার মধ্যে চলে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিলো বাংলাদেশে কোনো এক ডার্ক জাস্টিসের আগমন ঘটেছে, সিনেমায় যেমন দেখা যায়, সে সকল অন্যায়ের প্রতিশোধ নিবে। তখন আমি এবং আমার মত অনেকেই কেবল আশা করতো যে এতে শুধুমাত্র নিকৃষ্টতম অপরাধীরাই মারা পড়বে। বাস্তবে তা হয় নি। বাস্তবে তা হয় না। বাস্তব সিনেমা না। বাস্তব রূপকথা না।

আজ আমি জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ শকের সম্মুখীন হলাম। টেকনাফের কাউন্সেলর একরামের মৃত্যুর পূর্বে তার কন্যা এবং স্ত্রীর সাথে ফোনের কথাবার্তা শুনলাম। ফোনের এক প্রান্তে স্ত্রী এবং কন্যার আর্তনাদ এবং প্রার্থনা, আর ওদিকে গুলির শব্দ এবং গোলাগুলি। অসুস্থ বোধ করছি। আমার মনে হচ্ছে আমাকে সারাজীবন ধরে সেই আর্তনাদ, সেই হাহাকার তাড়িয়ে বেড়াবে।
আমরা এতসব সয়ে কীভাবে বেঁচে থাকবো?

আপনারা ইয়াবার গডফাদারদের সাথে বসে চা খান, শীর্ষ সন্ত্রাসীর সাজা মওকুফ করেন, ধর্ষণের বিচার চাইতে গেলে হুমকি দেন, বিচারের নথি বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকে, ধূলো জমে, Justice delayed is Justice denied প্রথায় আসামীরা হেসেখেলে বেড়ায়, আপনারা আমাদের ক্ষতে খানিক উপশম দিয়ে আরো প্রগাঢ় ক্ষত সৃষ্টি করেন, আর দুদিন পর পর ডিগ্রি, খেতাব, বাহবা ইমপোর্ট করেন বিদেশ থেকে, কথা বললে দেখান ধারা’র কাঁচকলা।

আমাদের খাবারে ফরমালিন, বাতাসে সীসা, আমাদের বুকে ক্ষত, আমরা কেন এ দেশে বেঁচে থাকবো? কী আশায়? মধ্য আয়ের দেশে থেকে ধনী হবার সুখস্বপ্নে? জিডিপির প্রবৃদ্ধি দেখে রাগমোচনের আনন্দে? রাস্তায় রাস্তায় উড়ালসেতুর উৎসবে? না কি কোন একদিন কেউ নোবেল পেয়ে গিয়ে আমাদের সব দুঃখ ঘোচাবে? আমরা ধনী হবো? আপনাদের ভাগ দিতে হবে না? লাভ কী? আমার সন্তানদের কাছ থেকে আমাকে কেড়ে নিয়ে গুলি করে মেরে ফেলবেন না, এ কথা বলে আশ্বস্ত করুন, তাহলেও তো রাতে ঠিকমত ঘুমোতে পারবো!

মৃত একরামুল হক, আপনাকে বলছি, আপনার স্ত্রী এবং কন্যাকে কিছু বলার মুখ নেই বলে আপনাকেই বলতে হচ্ছে; আপনার মৃত্যুর জন্যে আমরাই দায়ী। আপনার শরীরের রক্তে আমাদের হাত রঞ্জিত। আমাদের ক্ষমা করবেন না কি করবেন না তা জানা নেই, তাতে কিছু এসে যায় না আসলে। যে অভিশাপ আমাদের দিলেন, সেটা আমৃত্যু বয়ে যাওয়ার কষ্ট আমাদের মানবজন্মকে খারিজ করে দিয়েছে। হয়তো বা দেখা হবে খুব শিগগীরই, তখন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকবে, তখন ক্ষমা চেয়ে নেবো।

গেম অন।

লেখকঃ হাসান মাহবুব

Most Popular

To Top