ফ্লাডলাইট

আফগানিস্তানঃ রাইফেল-বুলেট ছেড়ে ব্যাট-বলের যুদ্ধে নামা মানুষগুলো…

আফগানিস্তান নিয়ন আলোয় neon aloy

যে দেশে শিশুর জন্মই হয় শরণার্থী শিবিরে, যে দেশের শিশুরা বেড়ে ওঠে রিভালবার আর পেট্রোল বোমা নিয়ে খেলতে খেলতে, যে দেশে শিশুরা শৈশবে স্কুলে না গিয়ে যায় যুদ্ধের ট্রেনিং করতে, যে দেশে যুবকের যৌবন কালটা কেটে যায় যুদ্ধের ময়দানে মাতৃভূমির জন্য লড়াই করে, যে দেশে বৃদ্ধরা মৃত্যুবরণ করে একটা স্বাধীন দেশের জন্য বুকভরা হাহাকার নিয়ে- তেমন একটা দেশে ক্রিকেট খেলা একটা নিতান্তই বিলাসীতা ছাড়া আর কিছুই না।

তবুও যোদ্ধারাও তো মানুষ, তাদেরও তো ইচ্ছে করে একটুখানি সৌখিনতায় গা ভাসাতে, তাদেরও তো ইচ্ছে করে জীবনটাকে একটুখানি উপভোগ করতে। জীবনটাকে উপভোগ করতে চাওয়া কোন অপরাধ নয়, বরং এটা তাদের অধিকার। তাই হয়তো মোহাম্মাদ নবী, রহমত শাহ, আজগর স্ট্যানিকজাইরা শরণার্থী শিশিরে থেকেও জীবনের মানে খুঁজতে চেয়েছিলেন ক্রিকেটের মধ্যে। স্বজন হারানোর আর্তনাদ, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ধ্বংসলীলা ভূলে থাকতেই হয়তো মোহাম্মদ শেহজাদ, রশিদ খান, শাপুর জাদরানরা ডুব দিয়েছিলেন ক্রিকেট নামক এক বিশালত্বের সাগরে।

আফগানিস্তানের ক্রিকেট এতদূর আসার পেছনের গল্পে কোন রূপকথা নেই, আছে নিষ্ঠুর বাস্তবতায় ভরা বিষাদমাখা এক উপাখ্যান।

“ফাদার অব আফগান ক্রিকেট” খ্যাত আফগানদের প্রথম ক্রিকেট কোচ তাজ মালুকের হাত ধরে ১৯৯৫ সালে আফগানিস্তানে ক্রিকেট বোর্ড গঠন করা হয়। ২০০১ আইসিসির সহযোগী দেশের সদস্যপদ লাভ করে আফগানিস্তান। সে বছরই আফগান দল পাকিস্তান সফর করে বিভিন্ন প্রাদেশিক দল গুলোর সাথে সিরিজ খেলে। এরপর ২০০৩ সালে এসিসি’র সদস্যপদ লাভ করে আফগানরা। এরপর ২০০৪ সালে আফগানিস্তান অংশ নেয় এসিসি ট্রফিতে। সেখানে বাহরাইনকে হারিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম জয় তুলে নেয় তারা। ২০০৬ সালে মুম্বাইয়ে মাইক গ্যাটিংয়ের এমসিসি দলকে হারিয়ে দেয় আফগানিস্তান। সে বছরই ইংল্যান্ড সফরে কাউন্টি দলগুলোর দ্বিতীয় একাদশের বিপক্ষে ৭ ম্যাচে ৬ জয় পায় আফগানিস্তান। ২০০৭ সালে, এসিসি ট্রফিতে অংশ নেওয়ার তিন বছরের মাথায় সেই টুর্নামেন্টে শিরোপা জিতে নেয় আফগানরা। এরপর শুধু এগিয়ে যাওয়ার পালা।

২০০৮ সালে আইসিসি চ্যাম্পিয়নশিপ, ডিভিশন ফাইভ থেকে শুরু হয় স্বপ্ন যাত্রা। জার্সিকে হারিয়ে ডিভিশন ফাইভ, তানজানিয়াকে হারিয়ে ডিভিশন ফোর জয় করে তারা। পরের বছরে ডিভিশন থ্রি জিতে বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অবশ্য প্রথম অভিযানে সুবিধা করতে পারেনি তারা। তবে বাছাইপর্বের ও ডিভিশনগুলোতে তাদের পারফরম্যান্স এতটাই ভালো ছিল যে, আফগানিস্তানকে ওয়ানডে স্ট্যাটাস প্রদান করে আইসিসি। ওয়ানডে বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব পার হতে না পারলেও ২০১০ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব পার করে ফেলে আফগানিস্তান।

একই বছর আইসিসির সহযোগী সদস্যদের নিয়ে আয়োজিত প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট প্রতিযোগিতা আইসিসি ইন্টারন্যাশনাল কাপ জয় করে আফগানিস্তান। ফাইনালে তারা হারায় স্কটল্যান্ডকে। একই বছর আরও এশিয়ান গেমসে প্রথমবারের মতো অন্তর্ভুক্ত ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় রৌপ্যপদক জয় করে তারা। সেমিফাইনালে আফগানিস্তানের কাছে ২২ রানে হেরে যায় পাকিস্তান অনূর্ধ্ব-২৩ দল। ফাইনালে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২৩ দলের কাছে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়েই পরাজয় মেনেছিল আফগানরা।

এরপর ২০১২ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ, ২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপ,২০১৬ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করে তারা এবং সবগুলো টুর্নামেন্টেই তাদের পারর্ফমেন্স ছিল আশাজাগানিয়া। তাছাড়া তাদের যুবদল এশিয়া কাপ ও বিশ্বকাপে নজরকাড়া পারফর্মেন্স করে সকলের মন জয় করে নেয়। সবশেষে আসে এই বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব। এখানে টানা তিন ম্যাচ হেরে বিশ্বকাপের পথ থেকে ছিটকেই পড়েছিল। কিন্তু এই দলটি তো ভাঙতে জানে না। সেখান থেকেই তাই ফিরে আসে তারা। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে সুপার সিক্সে নিজেদের অবস্থান করে নেয়। বাছাইপর্ব পার করে ফেলে আয়ারল্যান্ডকে হারিয়ে। আর ওয়েস্ট ইন্ডিজকে আরো একবার হারিয়ে জিতে নেয় ট্রফিটাই।

আফগানগানদের ক্রিকেট অগ্রসরের গল্প হয়তো কিছুক্ষেত্রে রূপকথাকেও হার মানাবে। মাত্র কয়েকবছর আগেও যারা ক্রিকেটের সবচেয়ে নিচু স্তরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতো, সময়ের ব্যাবধানে আজ তারা টেস্ট ক্রিকেটের কুলীন পরিবারের সদস্য।আইসিসির সহযোগী দেশগুলো টেস্ট ক্রিকেটের জন্য কতটা প্রস্তুত সেটার পরীক্ষা হয় মূলত ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপে। এ টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়ে আফগানরা তাদের সামর্থ্যের জানান দিয়েছিলেন। আর তারই স্বীকৃতি স্বরূপ এ বছরই আফগানিস্তানকে টেস্ট স্ট্যাটাস প্রদান করে আইসিসি।

ইতিহাসের ১২তম দেশ হিসেবে আফগানিস্তানের আন্তর্জাতিক টেস্ট অভিষেক হতে যাচ্ছে আগামী ১৪ই জুন ভারতের বিপক্ষে ভারতের মাটিতে। টেস্টের জন্য ইতোমধ্যে উভয় দেশই দল ঘোষণা করেছে। রশিদ খান, মজিবুর রহমানের মত বিস্ময় জাগানিয়া স্পিনাররা যে দলে আছেন, সে দলটি যে প্রতিপক্ষের জন্য সহজ হবেনা এটা অনুমান করাই যায়।

সবে তো স্বপ্নের পথে যাত্রা শুরু স্বপ্নের পিছনে ছুটতে ছুটতে একদিন হয়তো বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটাই ছুঁয়ে ফেলবে শরণার্থী শিবির থেকে উঠে আসা অদম্য যোদ্ধারা। বিশ্বক্রিকেটে নতুুন পরাশক্তি হতে যাওয়া আফগানদের জন্য রইলো নিরন্তর শুভ কামনা।

লেখকঃ হাবিব আল শাকিল

আরো পড়ুনঃ কেমন ছিল ষাটের দশকের আফগানিস্তান? (ফটো কম্পাইলেশন)

Most Popular

To Top