টুকিটাকি

আমরাও সম্ভবত বাংলাদেশকে এত ভালবাসি না যতটা ভালবেসেছেন এই ভিনদেশী!

মিনা ফ্লাইভম টড নিয়ন আলোয় neon aloy

আপনি-আমি আমাদের বাংলাদেশকে নিয়ে যতই অভিযোগ করি না কেন, সারাবিশ্বে বাঙালি পরিচিত তার অতিথি আপ্যায়ন, বন্ধুত্বসুলভ আচরণ আর সহজসরলতার গুণে। একজন আগুন্তকের সাথে কথা বলতে শুরু করলে একান্ত সুখ-দুঃখের সব কথাও বলে ফেলে আপন মনে করে, এমনকি নিজের বেতনটা বলতেও দ্বিধা করে না। কত দেশ থেকে মানুষ আসে এই সহজ সরল মানুষগুলোর দেশটিকে দেখতে। কিন্তু কজনই বা সঠিকভাবে অনুভব করতে পেরেছে এই মানুষগুলোকে?

মিনা ফ্লাইভম টড ড্যানিশ রেড ক্রস সংস্থার একজন অ্যাক্টিভিটি লিডার হিসেবে বাংলাদেশে এসেছিলেন তার অফিসিয়াল কাজে। গেল ২৫ মে তিনি এই দেশ ত্যাগ করবার আগে বাংলাদেশকে নিয়ে তার চমৎকার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে যান তার ফেসবুক প্রোফাইলে। ভালবাসার স্বীকৃতি দিলে সে ভালবাসা ফেরত পাওয়া যায় বহুগুণে। মিনা ফ্লাইভম টডও তা পেয়েছেন সারা বাংলাদেশের মানুষের কাছে। তার পোস্টটি এখন পর্যন্ত ৮,৬০০ জনেরও বেশি পছন্দ করেছেন, শেয়ার করেছেন ১,৫০০ এরও বেশি মানুষ!

তার কথাগুলোই বাংলায় অনুবাদ করে তুলে ধরা হলো এখানে। ভাষাগত প্রাঞ্জলতার প্রয়োজনে ২-১টি শব্দ আক্ষরিক অনুবাদ থেকে সরে এসে থাকতে পারে।

“আমি সত্যি কৃতজ্ঞ বাংলাদেশী সেসকল বন্ধু, পরিবার, শিক্ষার্থী, সহকর্মী আর আমার সাথে দেখা হওয়া বাংলার প্রিয় সব ভাই, বোন, মামা, চাচীদের কাছে যারা আমাকে চমৎকার কিছু মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন। আমি আজ এই দেশ থেকে চলে যাচ্ছি, কিন্তু মনে হচ্ছে যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য ছিলাম আমি এখানে। আমি যখন এই কয়দিনের স্মৃতিগুলোর দিকে তাকাই মনে হয় যেন যুগ যুগ ধরে ছিলাম আমি আপনাদের মাঝে। সত্যিই আমি কৃতজ্ঞ আপনাদের কাছে এইসব চমৎকার অনুভূতির স্মৃতি উপহার দেওয়ার জন্য।

বাংলাদেশ আমার দেখা সবচেয়ে “পাগলাটে” দেশ। এখানে চরম দারিদ্র্য আর প্রাচুর্য, সততা আর দুর্নীতি এবং দূষণ আর প্রাণখোলা বাতাস যেন বন্ধুর মত পাশাপাশি চলছে। এসব জিনিস আমাকে বিশ্বাস করিয়েছে যে বাংলাদেশ একটা “রংধনুর দেশ”। কারন এই দেশের মানুষের মাঝে সবধরনের রঙ আছে। প্রত্যেকদিনই আমি এমন অনেক আশাবাদী মানুষের সাথে পরিচিত হয়েছি যাদের কিছুই নেই। এমন অনেক মানুষের সাথেই দেখা হয়েছে যারা ঐতিহ্য আর মূল্যবোধকে অনেক গুরুত্বের সাথে নেন, আবার এমন অনেক মানুষ আছে যারা এগুলো একেবারেই মানেন না। আরও কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি যাদের মধ্যে কেউ কেউ পরিবর্তনের জন্য লড়ে যাচ্ছেন, আবার কেউ ভাবছেন পরিবর্তনের সময় হারিয়ে গেছে। কেউ আছেন অধিক শিক্ষিত, আবার এমন অনেকে আছেন যারা জীবনে একবারের জন্যেও বই খুলে দেখেননি। আমি এমন সব পুরুষদের সঙ্গে চলেছি যাদের কেউ কেউ মনে করেন নারী-পুরুষ সমান, আবার কেউ মনে করেন নারী শুধুই একটি বস্তু। আমি এমন অনেক মেয়েদের সাথে পরিচিত হয়েছি যাদের স্বপ্ন একটা ভাল জায়গায় বিয়ে হবার, নিজের পরিবার দাঁড়া করানোর এবং সেই পরিবারের সাথে সময় কাটানোর। আবার অনেক নারীকে দেখেছি যাদের লক্ষ্য সমাজের একেবারে উপরের অবস্থানগুলোতে যাওয়ার, নিজেদের নতুন ব্যবসা শুরু করার, বিশ্ব ভ্রমণে বের হওয়ার। জীবনের এতো অস্থিরতা-বৈষম্য-বৈপরীত্যের মাঝেও একটা জিনিস আপনি এই দেশের সবার কাছে পাবেন, সেটা হলো অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ এবং অতিথিপরায়ণ মানসিকতা। আর এই জিনিসটা আপনাকে বাধ্য করবে এই দেশ এবং এই দেশের মানুষদের ভালবেসে ফেলতে।

এখানকার মানুষজন গল্প করতে করতেই সারাদিনে ১০ কাপ চা খেয়ে ফেলে! আমি তাদের গল্প আর আড্ডার গভীরতা অবাক হয়ে অনুভব করেছি। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সমুদ্রসৈকত এই দেশে থাকা সত্ত্বেও শহরের বেশিরভাগ মানুষ সাঁতার জানে না! এত ছোট-ছোট জায়গার মধ্যে নাপিতের দোকান খুলে বসা যায় এটা দেখে আমি বেশ মজা পেয়েছি। বাংলাদেশের ফল ও সবজি আমি মিস করব যেগুলো পৃথিবীতে আছে বলেই আমি জানতাম না! এবং অবশ্যই মিস করবো চামচ ছাড়া হাত দিয়ে খাওয়া। এমনকি দিনের তিন বেলা ভাত খাওয়া, কিংবা এই দেশের বৃষ্টি।

আমার মতে শহরে ঘুরে বেড়ানোর জন্য রিকশা নেওয়া সবচেয়ে ভালো। এখানে আরও একটি মজার বিষয় হল- যখন বাংলাদেশীরা শুনবে তুমি ড্যানিশ, তখন এখানকার মানুষ তোমাকে গর্বের সঙ্গে ড্যানিশ কনডেন্সড মিল্কের কৌটা দেখিয়ে দিবে। আর আপনার নাম যদি হয় মিনা, তাহলেই বুঝতে পারবেনা এরা মিনা কার্টুন কতটা পছন্দ করে! পুরুষদের কমলা রঙের চুল, দাড়ি আর প্রত্যেক বাসার ব্যালকনি থেকে ঝুলানো রংবেরং-এর জামাকাপড় সত্যি এক অসাধারণ দৃশ্য। আপনি বিশ্বাস করেন আর নাই করেন আমি অনুভব করতে পারছি , পরবর্তী সময়ে আমি টিভি অন করে “সুলতান সুলেমানের” মতো টিভি সিরিজের আরেকটা পর্বও দেখতে পারবো না!

‌সবশেষে আমি বলতে চাই, আমি এদেশের সমস্যাগুলো সম্পর্কে জানি। চরম দারিদ্র, অত্যধিক জনসংখ্যা, দুর্নীতি, অপচয়, এবং বৈষম্যর মতো বিষয়গুলো তারা এখনো মোকাবেলা করে যাচ্ছে। কিন্তু এদেশে আপনি যেদিকে তাকাবেন, দেখবেন কতটা শক্তিশালী এদেশের মানুষের বোধ, প্রগতিশীল চিন্তা এবং চমৎকার তাদের উদ্যোগ।

এবং আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি যদি আপনারা এই আত্মবিশ্বাস ধরে রাখেন তবে পরিবর্তন আসবেই ধাপে ধাপে। আমি খুব শীঘ্রই ফিরে আসবো আপনাদের দেশে, আপনাদের সফলতার সাথে থাকতে।

এটি একটি খুব ক্ষুদ্র অভিব্যক্তি ছিলো বাংলাদেশ নিয়ে। বাংলাদেশকে নিয়ে কিছু শব্দের মাধ্যমে বহিঃপ্রকাশ সম্ভব নয়, এ আমার হৃদয়ের একটি কোনায় বাসা বেঁধে নিয়েছে। তাই আবারো আন্তরিক ধন্যবাদ আমাকে মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য, যার স্মৃতি আমার সাথে থাকবে চির জীবন। আপনাদের সকলের জন্য রইলো অনেক প্রীতি আর ভালোবাসা।”

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top