নাগরিক কথা

পিরিয়ড নিয়ে লুকোছাপা কেন?

Menstrual Hygiene neonaloy নিয়ন আলোয়

২৮ মে, ২০১৮, সোমবার, রমজান মাসের ১২ তারিখ। খুবই সাধারণ একটি দিন সবার জন্য, কিন্তু একই সাথে এটি একটি বিশেষ দিবসও। আজকে “Menstrual Hygiene Day”। পিরিয়ডের ব্যাপারে মেয়েদের, ও পাশাপাশি জনসাধারণকে এর প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন ও স্বাস্থ্যসচেতন করে তোলার লক্ষ্যেই এই দিবসটি পালন করা হয়।

বর্তমান যুগে আমরা জ্ঞান-বিজ্ঞানে অনেক এগিয়ে থাকলেও পিরিয়ড বা মাসিক বিষয়টিকে এখনো অনেকে ট্যাবু হিসেবে ভাবে। এই কারণে প্রতিবছর বহু মেয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থেকে নানারকম রোগ-ব্যাধি’র শিকার হয়। আর এগুলোর ব্যাপারে সবাইকে সচেতন করে তোলাই Menstrual Hygiene Day এর মুখ্য উদ্দেশ্য।

Menstrual Hygiene Day-কে সংক্ষেপে MHD, MH Day বা Menstrual Health Day নামেও ডাকা হয়। ২৮ তারিখ হিসেবে একে ঠিক করা হয়েছে কারণ পিরিয়ড এর সময়চক্র প্রতি ২৮ দিন পর পর হয়। জার্মানী ভিত্তিক এনজিও WASH United ২০১৪ সালে সর্বপ্রথম এই উদ্যোগ গ্রহণ করে বিশ্বব্যাপী নারী ও মেয়েদের সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে।

Menstrual Hygiene neonaloy নিয়ন আলোয়

নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে পিরিয়ডের সময়ে মেয়েদের স্যানিটেশন ব্যবস্থা প্রায়সময়ই খারাপ থাকে। তাছাড়া ভাল স্যানিটেশন ব্যবস্থা সবজায়গায় সহজলভ্য নয়। এর পাশাপাশি সামাজিক ব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে বাধা তৈরী করে। পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা অবশ্যই সকল বয়সী নারী ও মেয়েদের জন্য সুবিধাজনক হবে আর MH Day সে লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে।

কিন্তু MH day এর পাশাপাশি সামাজিক অবস্থানের পরিবর্তন ও সহযোগীতার প্রয়োজন মেয়েদের জন্য পর্যাপ্ত স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করতে হলে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি মাসে পিরিয়ডের সময় মেয়েদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ রাখতে হয়। MH Day সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ অন্যান্য মিডিয়াতে পিরিয়ড ও এ সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য একটি উপলক্ষ তৈরি করে। এই দিনটিতে বিশ্বব্যাপী, জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে পিরিয়ড ও এর সচেতনতার পক্ষে সক্রিয়ভাবে সমর্থন জানানোর সুযোগ করে দেয়।

এই দিবসের মূল পর্যালোচনা হল পিরিয়ডের সময়ে মেয়েদের পর্যাপ্ত পরিষ্কার কাপড় অথবা স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করা যাতে করে পিরিয়ডের সময়কার রক্তের ব্যবস্থা করা যায় ও সময়ে সময়ে স্যানিটেশন সামগ্রী পরিবর্তন করার মত ব্যবস্থাও যেন থাকে। এর পাশাপাশি পিরিয়ডের সময়ে শরীর ধোয়ার জন্য সাবান ও পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে কাজ করাও এই দিবসের অন্যতম লক্ষ্য। পিরিয়ডের সময়ে ব্যবহৃত কাপড় বা স্যানিটারি সামগ্রী ও যাতে সঠিক ভাবে বর্জ্য হিসেবে নিষ্কাশন করা যায় সেই ব্যবস্থা নিশ্চিতের লক্ষ্যে কাজ করার কথাও এই দিবসের কার্যসুচীতে উল্লেখ আছে।

তবে সব মিলিয়ে এই দিবসের উদ্দেশ্য হল জনসাধারণের মাঝ থেকে পিরিয়ডের ব্যাপারে ট্যাবু দূর করা। পিরিয়ডের সময়ে মেয়েরা যেই সকল চ্যালেঞ্জের মাঝে দিয়ে যায় তার ব্যাপারে অবগত করা, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য ইতিবাচক ও উদ্ভাবনী সমাধানগুলো তুলে ধরা, ক্রমবর্ধমান ও বৈশ্বিক আন্দোলনের এই পথে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে মেয়ে এবং নারী অধিকারকে স্বীকার এবং সমর্থন করা, সোশ্যাল মিডিয়াসহ সকল মিডিয়াতে এ ব্যাপারে সচেতনতা তৈরির উপলক্ষ তৈরি করা।

Menstrual Hygiene neonaloy নিয়ন আলোয়

বর্তমানে Menstrual Health Management (MHM) এর ৪১০টি অফিসিয়াল পার্টনার রয়েছে। এই ৪১০ পার্টনারের মধ্যে Plan International, SNV, Water for People, Women in Europe for a Common Future ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

MHM এর এই দিবস শুরুর পেছনের কাহিনীর দিকে এখন নজর দেওয়া যাক। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এখনো এই পিরিয়ডের ব্যাপারটি একটি নিষিদ্ধ কিংবা লজ্জার বিষয় হিসেবে দেখা হয়। এমনকি অনেক দেশে পিরিয়ডকে রোগ হিসেবেও মনে করা হয়। অনেক দেশে পিরিয়ডের সময় মেয়েদেরকে রান্নাঘরে যেতে দেওয়া হয় না, বাড়ি থেকে আলাদা একটা ঘরে রাখা হয়। পর্যাপ্ত স্যানিটেশন সুযোগ পায় না মেয়েরা এ সময়। কিছু কিছু সমাজে মেয়েদেরকে সাধারণ শরীর পরিষ্কার করার সুযোগও দেওয়া হয় না, অনেক জায়গায় মেয়েদের টয়লেটও ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না “অপবিত্র” করে ফেলার ভয়ে। এসব কারণে অনেক দেশেই পিরিয়ডের ব্যাপারে মেয়েদের কোন পরিষ্কার ধারণা থাকে না। ফলে পিরিয়ডের সময়ে তারা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকার ফলে নানা ধরনের রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়।

২০১৪ সালে ভারতে একটি গবেষণা চালানো হয় এই বিষয়ে। গবেষণায় অংশগ্রহণ করা মহিলাদের মাঝে প্রায় ৪২% নারীর স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যাপারে কোন ধারণা নেই। এছাড়াও তাদের পিরিয়ড কেন হয়, বা কোথা থেকে এসেছে- সেই বিষয়েও কোন ধারণা নেই তাদের। প্রথমবার পিরিয়ডের সময়ে তারা প্রত্যেকেই আতংকে ছিল।

২০১৮ সালের এই সময়েও প্রতি ৩ জন নারীর ১ জনের টয়লেট সুবিধা নেই। অনেক দেশেই পিরিয়ড সুবিধার ব্যাপারগুলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পানি অধিদপ্তরসহ নানা অধিদপ্তর এড়িয়ে গিয়েছে। এই ব্যাপারে এখনো মানুষের মাঝে স্পষ্ট ধারণা নেই। অস্বাস্থ্যকর ব্যবস্থায় থাকার ফলে অনেক মেয়েই প্রজনন সমস্যায় ভোগে প্রতিবছর। আফ্রিকার অনেক অঞ্চলে প্রতি মাসে মেয়েদের প্রায় ৫ দিন স্কুল বন্ধ দিতে হয় কারণ তাদের পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নাই। পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা না থাকার কারণে অনেক মেয়েই পরবর্তীতে স্কুল ছেড়ে দেয়। এছাড়াও পিরিয়ড পরবর্তী বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য অনেক স্কুলেই ব্যবস্থা থাকে না। নিরাপদভাবে বর্জ্য নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকাও একটা সমস্যা।

২০১২ সালে জনস্বাস্থ্যের সাথে জড়িত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলো MHM এর উপর থাকা নিরবতা ভাঙতে শুরু করে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তৃণমূল সংগঠক, সামাজিক উদ্যোক্তা এবং জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর সাথে বিশ্বব্যাপী এই বিষয়ে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে শুরু করে। ২০১৩ সালের মে মাসে WASH United সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্যাম্পেইন শুরু করে। ক্যাম্পেইনের জন্য টুইটারে তারা “May #MENSTRAVAGANZA” হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করা শুরু করে পিরিয়ড সংক্রান্ত সচেতনতা তৈরি করতে।

সচেতনতার পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা ও উন্নয়নের লক্ষ্যেও প্রচারনা চালানো হয়। এই প্রচারনার ফলে একটা পজিটিভ ফিডব্যাক পাওয়া যায় ও পিরিয়ডের জন্য একটি বিশ্বব্যাপী সচেতনতা দিবস স্থির করার সিদ্ধান্ত হয়। ২০১৪ সালের ২৮মে তে সারা পৃথিবীর অনেক মানুষ প্রথমবারের মতো সমাবেশ, প্রদর্শনী, চলচ্চিত্রের স্ক্রীনিং, ওয়ার্কশপ এবং বক্তৃতা দিয়ে পিরিয়ড স্বাস্থ্যবিধি দিবস উদযাপন করেন।

প্রথম Menstrual Health Day-তে ১৪৫টি সংগঠন এর পার্টনার ছিলো। ২০১৫ সালে Water Aid এর তত্ত্বাবধায়নে সোশ্যাল মিডিয়াতে #IfMenHadPeriods হ্যাশট্যাগ প্রচারনা চালানো হয়।

এছাড়াও ৩৩টি দেশে MHD উপলক্ষে ১২৭টি ইভেন্টের আয়োজন করা হয়। ২০১৮ সালে Menstrual Health Day উপলক্ষে আফ্রিকার ঘানা’তে Accra Metropolitan District Assembly শহুরে দরিদ্র স্কুলগুলোতে পিরিয়ড হেলথ প্রোগ্রাম আয়োজন করে। ৭০০’র বেশি মেয়ে এই প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেন এবং প্রত্যেকে একটি করে স্যানিটারি প্যাডের প্যাকেট পায়।

Menstrual Health Day এর সাথে আমরাও একদিন আশা করতে পারি যে পুরো পৃথিবীতে পিরিয়ড সংক্রান্ত সকল ট্যাবু দূর হয়ে যাবে ও সকল মেয়েদের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর পরিবেশের সৃষ্টি হবে।

Most Popular

To Top