ফ্লাডলাইট

“বিস্ময় বালক” মুশফিকের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১৩ বছর

"বিস্ময় বালক" মুশফিকের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১৩ বছর

২০০৫ সালের মে মাস, প্রথম বার ইংল্যান্ড সফরে যাবে বাংলাদেশ। প্রথম টেস্ট আইকনিক ক্রিকেট গ্রাউন্ড “লর্ডসে”। লর্ডসে খেলার উত্তেজনা আর কঠিন ইংলিশ কন্ডিশন এই দুই মিলিয়ে নতুন অভিজ্ঞতার সামনে টাইগাররা।

সফর নিয়ে “উত্তেজনা” আরো কিছুদিন আগেই শুরু হয়েছিলো অবশ্য, নির্বাচকরা অনেকটা হতবাক করে দিয়ে স্কোয়াডে রেখেছে ১৬ বছরের এক কিশোরকে। এমনিতে তার ব্যাটিং টেকনিক বেশ প্রশংসা কুঁড়িয়েছে বিকেএসপিতে, কিন্তু তবুও কঠিন সেই সফরে ১৬ বছরের এক “বাচ্চা” ক্রিকেটার নেয়ার দৃশ্যত কোন যুক্তি ছিলোনা বটে।

১৬ বছরের সেই কিশোর নিজ এলাকা বগুড়ায় মিতু নামেই পরিচিত। চারিদিকে কানকথা রটে গেল, “বগুড়ার ছেলে” তাই “বিশেষ একজন” অনুরোধ করেছেন তাকে দলে নিতে! কথাটা বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছিলো কারণ দেশে বেশ কয়েকজন সিনিয়র উইকেট-কিপার থাকার পরেও অভিজ্ঞ এবং বিশ্বস্ত কিপার খালেদ মাসুদের “আন্ডারস্টাডি” হিসেবে একেবারেই অনভিজ্ঞ মিতুকে দলে নেয়ায়।

মে মাসের ইংল্যান্ড, বাতাসে বড় বড় সুইং, তামাম দুনিয়ার বাঘা বাঘা সব ব্যাটসম্যান এখানে এসে বিড়াল বনে যায় সেখানে এই বাচ্চা ছেলে কি করবে?

কি করেছিলো তার বিবরণ দিয়েছে ক্রিকেটের বাইবেলখ্যাত “Wisden”, লেট সুইং আর আনইভেন বাউন্সের বিপক্ষে মিতুর ব্যাটিং নিয়ে লিখেছে, “consistently playing late and straight.”

“সোজা ব্যাটে খেলো” ওই বয়সের যেকোন ক্রিকেটারকে হয়তো এটাই বলে থাকে তার কোচেরা। মিতু মানে আমাদের মুশফিক সেই বেসিক কাজটাই করেছিলেন সেসময়।

টেস্ট একাদশে থাকার সম্ভাবনা ছিলোনা তবে সুযোগ হয়েছিলো প্রথম শ্রেনীর দুটি প্রস্তুতি ম্যাচে কিছু প্রমাণ করার। সাসেক্সের ৫৪৯ রানের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ অল আউট হয় মাত্র ১২৭ রানে, ছয় নাম্বারে নামা মুশফিক দলের পক্ষে তৃতীয় সর্বোচ্চ ১৮ রান করেন ৭১ বল খেলে। উইকেটে টিকে ছিলেন ১৪১ মিনিট।

দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশ করে ১৯৬ রান, দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ৬৩ রান করেন ১৬ বছরের মুশফিকুর রহিম। প্রায় দুই ঘন্টা ব্যাট করে ৯৮ বলে দশ চার আর এক ছক্কায় সাজানো ইনিংস দিয়ে সক্ষম হন ইংলিশ মিডিয়ার প্রশংসা কুড়াতে যারা কিনা সহজে কারো প্রশংসা করেনা!

দ্বিতীয় প্রস্তুতি ম্যাচে মুশফিক এমন কিছু করেছিলেন যার ফলে ইংলিশ মিডিয়া তার নাম দেয় বিস্ময় বালক বা Wonder Boy. নর্দাম্পটনশায়ার ৬ উইকেটে ২৩০ রান তুলে তিন দিনের ম্যাচে সাসেক্সের মতো জয় তুলে নিতে চেয়েছিলো ইনিংস ঘোষনা করে। বাংলাদেশ যথারীতি ১০৫/৫। কিন্তু উইকেটে ছিলেন মুশফিকুর রহিম, আট নাম্বার ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ রফিক (৫৮ রান)-এর সাথে ৮৭ রানের জুটি গড়ে তুলেন। ৩০৯/৭ রানে বাংলাদেশ যখন ইনিংস ঘোষনা করে তখন ম্যাচে ড্র মেনে নিয়েছে প্রতিপক্ষ। আর ১৬৭ বলে ১১৫* রানের ম্যাজিকাল ইনিংস খেলে ম্যাচের মধ্যমণি ১৬ বছরের কিশোর মুশফিকুর রহিম। ইনিংসে ১৫ চার আর ১ ছয়।

প্রায় দেড়শ বছরের পুরানো ইংলিশ প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেট ইতিহাসে ইংল্যান্ডের মাটিতে সবচেয়ে কম বয়সে ফার্স্ট ক্লাস সেঞ্চুরি করা ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম। এই রেকর্ড অখ্যাত এখনো।

২৬ মে, ২০০৫, লর্ডস, লন্ডন, ইংল্যান্ড। বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যান হিসেবে টেস্ট অভিষেক হয় মুশফিকুর রহিমের। যার ইংল্যান্ড সফর হবার কথা শুধুই শিক্ষাসফর সেই মুশফিকের অভিষেক লর্ডসে। বিস্ময় বালকের ক্যারিয়ারে এটাই মনেহয় সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিলো!

আজ থেকে ১৩ বছর আগে আজকের এই দিনে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় “মিস্টার ডিপেন্ডেবল” মুশফিকুর রহিমের। টেকনিক্যালি দেশের সবচেয়ে সাউন্ড ব্যাটসম্যান মুশফিক কোন সন্দেহ নেই, বাংলাদেশের সেরা টেস্ট ব্যাটসম্যান। স্পিনের বিপক্ষেও দেশের সেরা ব্যাটসম্যান এই মুশফিকুর রহিম। বিদেশের মাটিতে এমন বিস্ময়কর আগমন হয়েছিলো বলেই কিনা মুশফিকের “ওভারসীজ” রেকর্ড গর্ব করার মতোই। অধিনায়ক-উইকেটরক্ষক হিসেবে বিদেশের মাটিতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সেঞ্চুরির মালিক মুশফিকুর রহিম। মুশফিকের ৪ টি সেঞ্চুরির পর আর কারো দুইটি সেঞ্চুরিও নেই। এডাম গিলক্রিস্ট, টাটেন্ডা টাইবু, এন্ডি ফ্লাওয়ার, শেরওয়েলেদের বিদেশের মাটিতে অধিনায়ক-উইকেটরক্ষক হিসেবে রয়েছে একটি করে সেঞ্চুরি। তালিকায় নেই কুমার সাঙ্গাকারার নাম। অধিনায়ক-উইকেটরক্ষক হিসেবে সবচেয়ে বেশি ৫ টি সেঞ্চুরি এম এস ধোনীর, তবে তার সবকয়টি সেঞ্চুরি ভারতের মাটিতে।

এমনিতে আনলাকি হিসেবে “১৩” এর দূর্নাম থাকলেও ১৩-তম বছরের শুরুর প্রেক্ষাপট মুশফিকের জন্য বেশ দারুণ। এই বছর টি-টুয়েন্টি ফরম্যাটে করেছেন তিনটি ফিফটি। অথচ এই ফরম্যাটেই তার পরিসংখ্যান সবচেয়ে দূর্বল ছিলো।

১৩-তম বছরে মুশফিকের জন্য অনেক অনেক শুভকামনা। আশাকরি আরো অন্তত সাত-আট বছর বাংলাদেশ জাতীয় দলকে সার্ভিস দিবেন তিনি এবং পরিসংখ্যান বিচারে দেশের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে, বাংলাদেশী লিজেন্ড হিসেবেই মানুষ তাকে মনে রাখবে। যেতে হবে আরো অনেকদূর মুশি!

Most Popular

To Top