ফ্লাডলাইট

এবি ডি ভিলিয়ার্স, ক্রিকেটের দুঃখী রাজপুত্রকে কে নিয়ে যত গুজব!

 এক রাজপুত্রের প্রস্থানের গল্প...

গতিদানব ডেল স্টেইন একবার বলেছিলেন,

“বছরে শুধু দুইটা দিন ম্যাচে বল করতে নামার আগে আমি আতঙ্কিত থাকি, আইপিএলে যেই দুই ম্যাচে আমাকে এবি’র বিরুদ্ধে বল করা লাগে”।

ডেল স্টেইনের এই ভয় পাওয়া কিন্তু অহেতুক নয়, কয়েক বছর আগেই আইপিএলেই স্টেইনের ১৪৫ কিমি/ঘন্টা গতিতে করা বল অনায়াসে ফাইন লেগ আর থার্ড ম্যানের উপর দিয়ে ছক্কা পিটিয়ে ওভারে ২৪ রান করে ম্যাচ নিজের করে নিলেন লোকটি।

মাইকেল ভন বলেছিলেন,

“ক্রিকেট জিনিয়াস বলতে যা বোঝায়, এবি হল এমন একজন”।

প্রোটিয়া অলরাউন্ডার এবি ডি ভিলিয়ার্স

হ্যাঁ, বলছিলাম প্রোটিয়াস প্রডিজি এবি ডি ভিলিয়ার্সের কথা, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে যে মানুষটা বিনোদন দিয়েছেন গোটা ক্রিকেট জগতকে। যে ধারাবাহিকতার মধ্যে ছিলেন, হয়তো মাতিয়ে রাখতে পারতেন আরও অনেকটা সময়, কিন্তু হঠাৎ করেই অভিমানী রাজপুত্রের মতো সকল প্রকার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে গুটিয়ে নিলেন নিজেকে। গত ২৩ই মে, ২০১৮-তে অবসরের ঘোষণা দিয়ে বসলেন, বললেন,

“বড্ড ক্লান্ত আমি। সত্যি বলছি, অনেক ক্লান্ত আমি। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি সরে দাঁড়ানোর। সাউথ আফ্রিকা ক্রিকেট বোর্ডকে ধন্যবাদ সবসময় আমার উপর ভরসা রাখায়। ধন্যবাদ জানাই ক্রিকেটপ্রেমীদেরকেও, সবসময় যারা সাপোর্ট করেছেন, ভালবেসে পাশেই ছিলেন”।

বিদায় এবি ডি ভিলিয়ার্স

পুরো নাম এবি ডি ভিলিয়ার্স, আব্রাহাম বেঞ্জামিন ডি ভিলিয়ার্স। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তার বাবার নামও ছিল আব্রাহাম বি ডি ভিলিয়ার্স। আর তাঁর নিজের ছেলের নাম আব্রাহাম। এবিডির জন্ম ১৯৮৪ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি সাউথ আফ্রিকার বেলাবেলাতে। এইজন্য জার্সি বেঁছে নিয়েছিলেন ১৭ নাম্বার (টেস্ট অভিষেকও হয়েছিলো ১৭ ডিসেম্বর)। ডাক্তার বাবা-মায়ের তিন সন্তানের সর্বকনিষ্ঠ এবি’রও স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হবেন। এমনকি সাইন্স প্রজেক্টের জন্য প্রয়াত নেলসন ম্যান্ডেলার কাছ থেকে জাতীয় পর্যায়েও প্রেস্টেজিয়াস মেডেল পেয়েছেন এবি। বাবা ডাক্তার বলেই ছেলেদের খেলাধুলায় উৎসাহ দিতেন। বাবার জন্যই খেলাধুলায় আগ্রহ বাড়ে তার।

অসংখ্য অর্জনের পাশাপাশি এই ক্রিকেট জিনিয়াসকে নিয়ে বাজারে প্রচলিত গুজবের পরিমাণও কম নয়! সময়ে অসময়ে নানা মুখরোচক মীথ প্রচলিত হয়েছে তার নামে, যা দিন দিন বেড়েছে চক্রবৃদ্ধি হারে। তবে সেই মীথগুলো নিয়ে কথা বলার আগে জানতে হবে তার সত্যিকারের অর্জনগুলো। কেননা যার অর্জনের পাল্লা এত ভারী, তাকে নিয়েই বিশ্বাসযোগ্যভাবে অমানবিক সব গুজব ছড়ানো সম্ভব যা কিনা মানুষ বছরের পর বছর বিশ্বাস করবে!

এবি ডি ভিলিয়ার্স, অর্জনের খাতাটা যার অবিশ্বাস্য রকম ভারী

২০০৩ সালে টাইটান্সদের হয়ে খেলা শুরু করেন এবি ডি ভিলিয়ার্স, এবং ২০০৪ সালে নর্দান আয়ারল্যান্ডের ক্লাবে বিদেশী খেলোয়াড়ের কোটায় খেলেন। ২০০৪ সালেই ইংল্যান্ডের সাথে টেস্ট সিরিজে জাতীয় দলে ডাক পান। অভিষেকেই নিজস্ব ব্যাটিং স্টাইল এবং ফিল্ডিং দিয়ে নজর কাড়েন সবার। ২০০৫ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধেই ওয়ানডে’তে অভিষেক হয়।

এবি ডি ভিলিয়ার্সের ঝুলিতেই আছে এক দিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে দ্রুততম হাফ সেঞ্চুরী (১৬ বলে), সেঞ্চুরী (৩১ বলে) এবং দেড়শত (৬৪ বলে) করার রেকর্ড, করেছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। তার ঝুলিতেই আছে দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে টেস্ট ক্রিকেটে দ্রুততম শতক এবং টি-টুয়েন্টিতে অর্ধশত করার রেকর্ড। আইসিসি ওডিআই প্লেয়ার অব দা ইয়ার জিতেছেন তিন বার (২০১০, ২০১৪, ২০১৫)।

শুধু দেশের জার্সি গায়ে নয়, লীগভিত্তিক ক্রিকেটেও এবি’র ব্যাটিং বোলারদের জন্য এক ত্রাসের নাম, দর্শকদের জন্য চোখের প্রশান্তি। তার খেলা শট ক্রিকেটের কোন বাঁধাধরা নিয়ম মানে না। স্টেইনের গতিময় বলের সামনে চতুর্দিকে সমান পারদর্শিতার সাথে ছক্কা হাঁকিয়ে উপাধি পেয়েছেন “মিস্টার ৩৬০”।

ব্যাট হাতে ওপেনিং থেকে শুরু করে ফিনিশার- সব স্থানেই সমান পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। রয়েল চ্যালেঞ্জার বাঙ্গালোরের হয়ে খেলেছেন অনবদ্য সব ইনিংস, এমনকি অনেকবার ছিনিয়ে নিয়েছেন মোস্ট পাওয়ার প্যাকড ইনিংস খেলার সম্মাননা। আছে পাঁচটি শততম রানের পার্টনারশিপ, দুইটি দুইশত রানের পার্টনারশিপ। ৪১৮ টা ম্যাচ খেলেছেন সাউথ আফ্রিকার হয়ে, ঝুলিতে আছে ৪৭টি আন্তর্জাতিক শতক ইনিংস। ব্যাটিং গড় টেস্ট এবং ওডিআইতে যথাক্রমে ৫০.৬৬ এবং ৫৩.৫০।

সেই সাথে উইকেটকিপিং গ্লাভস হাতেও ছিলেন সমান সফল। কিপিং-এ দেশের হয়ে স্ট্যাম্পিং করেছেন ১৭ বার, আর গ্লাভস সহ কিংবা গ্লাভস ছাড়াই লুফে নিয়েছেন ৪৬৩ টি ক্যাচ।

আর যেই ধারণাটি কাজ করে সাধারণত ক্রিকেটাঙ্গনে- একজন কীপার সাধারণত বোলিং করতে পারে না, সেই ধারণাও ভেঙ্গেছেন তিনি। ঝুলিতে আন্তর্জাতিক উইকেটও আছে। টেস্টে দুইটি এবং ওডিআইতে ৭টি, সব মিলিয়ে ৯টি আন্তর্জাতিক উইকেট শিকার করেছেন এবি ডি ভিলিয়ার্স।

এবি ডি ভিলিয়ার্সে মুগ্ধ হয়ে প্রজন্মের আরেক সেরা ব্যাটসম্যান বিরাট কোহলি বলেছিলেন,

“অনেক ব্যাটসম্যানকে অনুসরণ করা সম্ভব, অনেকের মতো খেলা সম্ভব কিন্তু এবি হওয়া সম্ভব নয়”।

ক্রিকেটের সুপারম্যানকে নিয়ে যত গুজব!

আগেই বলেছি, এবি ডি ভিলিয়ার্সকে নিয়ে বাজারে প্রচলিত গুজবের সংখ্যা কম নয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রাখার পর এরকম গুজব ছড়ানো সম্ভব নয় সার্বক্ষণিক মিডিয়া কভারেজে থাকার কারণে। তাই তার নামে প্রচলিত গুজবগুলো ডালপালা মেলেছে তার ক্রিকেট ক্যারিয়ার শুরুর আগের সময়টা নিয়ে।

আর সে গুজবগুলোই এবি ডি ভিলিয়ার্স সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন তার আত্মজীবনী “AB: The Autobiography” বইতে।

গুজব ১ঃ এবি ডি ভিলিয়ার্স দক্ষিণ আফ্রিকার অনূর্দ্ধ-১৯ ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়ন ছিলেন।
এবি’র বক্তব্যঃ “আমি স্কুলে কখনোই ব্যাডমিন্টন খেলিনি। যদ্দুর মনে পড়ে, জীবনে আমি একবারই ব্যাডমিন্টন খেলেছি, সেটা (জাতীয় দলে জায়গা পাওয়ার পরে) মার্ক বাউচার (সাবেক দক্ষিণ আফ্রিকান উইকেটরক্ষক) এর সাথে”।

গুজব ২ঃ এবি ডি ভিলিয়ার্স দক্ষিণ আফ্রিকার জুনিয়র হকি দলের হয়ে খেলেছেন অথবা খেলার জন্য শর্টলিস্টেড হয়েছিলেন।
এবি’র বক্তব্যঃ “হাই স্কুলে থাকতে এমি এক বছর হকি খেলেছি… কিন্তু কখনোই জাতীয় পর্যায়ের কোন দলের জন্য শর্টলিস্টেড হইনি, এমনকি ওই রকম ভাল খেলোয়াড়ও আমি ছিলাম না”।

গুজব ৩ঃ এবি ডি ভিলিয়ার্স দক্ষিণ আফ্রিকার জুনিয়র ফুটবল দলের জন্য শর্টলিস্টেড হয়েছিলেন।
এবি’র বক্তব্যঃ “আমি কখনোই ওভাবে ফুটবল খেলিনি। আমার ফুটবল খেলার দৌড় স্কুলে থাকতে টিফিন পিরিয়ডে বলে এলোমেলো লাথি দেওয়া আর জাতীয় দলের ওয়ার্ম আপ রুটিনে এক-আধটু খেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ”।

গুজব ৪ঃ এবি ডি ভিলিয়ার্স দক্ষিণ আফ্রিকার জুনিয়র রাগবি দলের অধিনায়ক ছিলেন।
এবি’র বক্তব্যঃ “আমি কখনোই দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে রাগবি খেলিনি, অধিনায়কত্ব তো অনেক দুরের কথা!”

গুজব ৫ঃ এবি ডি ভিলিয়ার্স সাঁতারে স্কুল পর্যায়ে ৬টি জাতীয় রেকর্ডের অধিকারী ছিলেন।
এবি’র বক্তব্যঃ “যতদুর মনে পড়ে, ওয়ামবাথ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় অনূর্দ্ধ-৯ পর্যায়ে ব্রেস্টস্ট্রোকে রেকর্ড করেছিলাম (শুধুমাত্র ওই স্কুলে)। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে কখনোই কোন রেকর্ড গড়িনি।”

গুজব ৬ঃ এবি ডি ভিলিয়ার্স জুনিয়র ডেভিস কাপ দলে জায়গা করে নিয়েছিলেন।
এবি’র বক্তব্যঃ “ছোটবেলায় আমি টেনিস খেলতে আসলেই অনেক পছন্দ করতাম। সময়-সময় জাতীয় পর্যায়েও বয়সভিত্তিক গ্রুপে ১ নাম্বার হয়েছি।”

এবি ডি ভিলিয়ার্স শেষ টেস্টটা খেলে ফেলেছেন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২০১৮ সালের ৩ই এপ্রিল, আর শেষ ওডিআই ভারতের বিপক্ষে ২০১৮ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি। বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্টে ডাক(শূন্য) রানে আউট হওয়ার আগে ৭৮ ইনিংসে করেছেন ২৯৫৮ রান, এর আগে কেউ এতো ইনিংস ডাকশূন্য থাকতে পারেননি, পারেনি ডাক বাদে এতো রানও করতে। অথচ ২০০৭ সালে বিশ্বকাপে চারবার শূন্য রানে আউট হয়ে সমালোচনার মুখে পড়েন। কিন্তু সে টুর্নামেন্টেই আবার ১৩০ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস খেলে নিজের জাত চিনিয়ে দেন।

তবে এত-এত প্রাপ্তির মাঝেও এবি ডি ভিলিয়ার্সের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের একমাত্র অপ্রাপ্তি বিশ্বমঞ্চে নিজের দেশ দক্ষিণ আফ্রিকাকে বড় কোন ট্রফি জিতাতে না পারা। তবে এটা মনেহয় বলাই যায়, তার মত কমপ্লিট একজন ক্রিকেটারের হাতে স্থান না পাওয়াটা সম্ভবত বিশ্বকাপের ট্রফিটারই অসম্পূর্ণতা। তাই ১৪ বছরের চোখ-ধাঁধানো ক্যারিয়ার শেষেও এবি একজন ট্র্যাজিক হিরো, দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটের দুখী রাজপুত্র।

হঠাৎ ডি ভিলিয়ার্সের অবসরের সিদ্ধান্তে একই সাথে হতবাক এবং বিষণ্ণ ক্রিকেটবোদ্ধারা। দেশের জার্সি গায়ে আর ডি ভিলিয়ার্সের ব্যাটিং তাণ্ডব দেখা হবে এজন্য হতাশ অনেক ক্রিকেটপ্রেমীই। আশার ব্যাপার হচ্ছে, দেশের জার্সি পরিহিত পরা ভিলিয়ার্সকে আর দেখা না গেলেও বিভিন্ন লীগে দেখা যাবে বলে নিশ্চিত করেছেন তিনি। তখন কিছুটা হলেও হয়তো দুধের স্বাদ ঘোলে মিটানো যাবে- এমন প্রত্যাশাই ভক্তদের।

Most Popular

To Top