নাগরিক কথা

বিষে ভরা ফুটবল!

ব্রাজিল আর্জেন্টিনা পতাকা নিয়ন আলোয় neonaloy

আমার আম্মা ক্রিকেট-ফুটবলের কিছুই বুঝেন না। তিনি বুঝেন লুডু, মাংস চোর, দাঁড়িয়াবান্ধা। আমার এখনো মনে পড়ে, গ্রামে গেলেই আমার মা কোমরে কাপড় গুঁজতে গুঁজতে চিচি করতে করতে বাড়ির উঠানে নেমে পড়তেন মাংস চুরি করতে! (আধুনিক পোলাপান যারা মাংস চোর খেলা কি জানো না তারা সকাল সকাল ঘুমের তনে উইঠা এক গ্লাস দুধ খায়া অংক করতে বসবা এরপর বিজ্ঞান বইয়ে সামান্য হাত দিবা তারপর ধর্ম শিক্ষা পড়বা! আমার বিশ্বাস এরপরেও মাংস চোর খেলা কি তোমরা জানতে পারবা না! ওই খেলা কি জানতে হইলে তোমারে খালি পায়ে গ্রামের মাটি পারাইতে হবে।) যাইহোক, ফুটবল-ক্রিকেট না বুঝলেও আমার আম্মা জার্সির রং দেখে দল সাপোর্ট করেন। খেলার দুই দলের মধ্যে যাদের জার্সি দেখতে বেশি সুন্দর, আম্মা থাকেন সেই দলের সাপোর্টে!

এর মধ্যে কোন এক বিচিত্র কারণে আমার মা হলুদ জার্সি দেখতে পারেন না। এই জন্যে ক্রিকেটে তিনি অস্ট্রেলিয়া আর ফুটবলে *** সাপোর্ট করেন না! থাক, দলের নাম বললাম না, নাম বললে চাকুরি থাকবে না! তুমি আবার ব্রাজিল মারাও কেন??

আম্মারে বললাম, আম্মা হলুদে কি সমস্যা? আম্মা বলল, “হলুদে কি সমস্যা মানে?! হলুদ কোন রং হইলো নাকি?? হলুদ জার্সি গায়ে মাডে দৌড়ায় এগুলারে দেখতে কেমন লাগে? জণ্ডিস মার্কা রং, মনে হয় কত্তুডি জণ্ডিসের রুগী দৌড়াইতেছে মাডে!” এরপর আরো এমন কিছু কথা আম্মা হলুদ নিয়া বলছে যা লেখার যোগ্য না, তাই আম্মার সাথে আর কথা বাড়ালাম না!

আমার ছোট ভাই সবার বারান্দায় পতাকা দেখে নিজেও পতাকা কিনবে বলে আম্মার কাছে কান্নাকাটি শুরু করেছে! আম্মা বলল কোনটা নিবি? ভাই তখনো ঠিক মত দলের নাম উচ্চারণ করতে পারতো না, তাই বলল, আম্মা ওই যে মাঝখানে সূর্য আর নীল ওইটা কিনবো। আম্মা তারে পরীক্ষা করার জন্য বলল, কেন হলুদটা নে! ভাই বলল, না না নীলটা দাও। আমার ছোট ভাই তখনো প্রস্রাব করার সময় নিজের প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলতো, সে-ও নিজের দল বেছে নিয়েছে পতাকার রং দেখে! আর এইভাবেই কিন্তু জন্ম হয় ভক্তের।

এখনকার আমরা যারা ফুটবল নিয়ে বেশি হৈচৈ করি, তাদের কেউ কিন্তু পেলে-ম্যারাডোনা কারো খেলা দেখি নাই। কিন্তু বেশিরভাগই ওনাদের নাম বেচে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সাপোর্ট করি, কিংবা কেউ কেউ পতাকার রং আর দাদার বাপে সাপোর্ট করতো তাই বংশের ধারা রক্ষা করার জন্যেও বিভিন্ন দল সাপোর্ট করি! তবে হ্যাঁ, ফুটবল ভক্তরা যে ফুটবল বুঝে, ফুটবল ভালোবেসেও দল করে না- তা কিন্তু না!

আমার ছোট ভাই অবশ্য এখন মেসি’র বিরাট ভক্ত। মেসি’র জীবন নিয়ে সে সারাদিন গবেষণা করে। কিছুদিন আগে মেসি যখন বিয়ে করলো, ভাই আম্মাকে জিজ্ঞেস করলো, “আম্মা, মেসি এখন বিয়ে করছেতো বাচ্চা আসলো কেমনে?” আম্মা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকায়া বলল, আগে কাবিন করা ছিল! আমার পরিবারের লোকজনের মাথায় সামান্য সমস্যা আছে, দয়া করে ইগনোর করেন।

যাইহোক, খেলায় দর্শক বিভিন্ন দল সাপোর্ট করবে সেটাই স্বাভাবিক। পতাকার রং দেখে হোক, কিংবা দল বুঝেই হোক- সাপোর্ট করবেই। প্রতিপক্ষকে শত্রু মনে করবে- সেটাও স্বাভাবিক। কিন্তু এই শত্রুতা হওয়া উচিত মধুর শত্রুতা। এই সাপোর্টের মাঝে রাজনীতি, ধর্ম বা দেশের ভৌগোলিক অবস্থান টেনে আনার মানে কি? একজনকে দেখলাম লিখছে আর্জেন্টিনায় বেশি মুসলিম বাস করে, তাই আর্জেন্টিনা করা উচিৎ! আরেক জন লিখছে ব্রাজিলে পতিতা বেশি, তাই ব্রাজিল হারাম টিম! আর্জেন্টিনা সাপোর্ট করি বলে ব্রাজিল খেলা পারে না, পেলে ম্যারাডোনাকে মদ খাইয়ে তার জীবন নষ্ট করেছে!! আবার আরেকজন লিখেছে কিভাবে আর্জেন্টিনা ব্রাজিলের পানিতে মাদক মিশিয়ে ব্রাজিলকে হারিয়েছিল! এগুলা কেমন কথা আমি বুঝি না। এদের দেখলে মনে হয়, সত্যি সত্যি সৃষ্টিকর্তা কিছু মানুষের মাথায় বিষ্ঠা ভরে পাঠিয়েছেন।

মেসি’র ভক্ত যখন নেইমারের একটা অসাধারণ গোল দেখে বলবে, “বাহ, ছেলেটাতো দারুণ খেলে!”, কিংবা নেইমারের ভক্ত যখন মেসি’র দশজনকে কাটিয়ে করা গোল দেখে বলবে “ওমা, পোলাডা করছে কি! কি খেলাডাই না খেলে পোলাডা!!” – তখনই কিন্তু খেলায় মজা আসবে, ফুটবল কিন্তু তখনই সার্থক হবে।

ফুটবল নিয়ে দল ভাগাভাগি করেন, আর যা-ই করেন না কেন, দয়া করে এর মাঝে ধর্ম-রাজনীতি এনে দুগর্ন্ধ ছড়াবেন না। কারণ বিশ্বকাপ শেষে সেই দুর্গন্ধে আমাদেরকেই বাস করতে হবে। ব্রাজিল সাপোর্ট করা আপনার বন্ধু রাজু সাওপালো কিংবা আর্জেন্টিনা করা আপনি অমিত তেভেজ কিন্তু বিশ্বকাপ শেষে একে অপরের বন্ধু- এইটা মাথায় রাখবেন।

জয়হোক ফুটবলের!!

*তবে হ্যাঁ, এই কথা কিন্তু ঠিক যে ফুটবল আর্জেন্টিনাই খেলে, বাকিরাতো খালি মাঠে দৌঁড়ায়!

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top