ফ্লাডলাইট

রিয়াল মাদ্রিদ ও লিভারপুলঃ এক মোড়কে এবারের সেরা দুই দলের অভিযান!

উয়েফা চাম্পিয়ন্সলীগঃ কে হবে এবারের সেরাদের সেরা...

রোড টু কিয়েভ

উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ। ইউরোপের সেরাদের সেরা কে- সেটিই নির্ধারণ করে এই টুর্নামেন্ট। ২৬শে মে দিবাগত রাত ১২ঃ৪৫ মিনিটে ইউক্রেনের এনএসসি ওলিম্পিয়াসকি স্টেডিয়ামে (কিয়েভ) হতে যাচ্ছে ২০১৮ চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ফাইনাল ম্যাচ। এটি উয়েফা কর্তৃক আয়োজিত টুর্নামেন্টের ৬৩তম সিজন এবং ২৬তম সিজন লীগটিকে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ নামকরণের পর।

উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ

ফাইনালে খেলছে “লস ব্লাঙ্কোস” নামে খ্যাত স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ এবং ফিনিক্সের মত ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা “অল রেডস” লিভারপুল। লড়াইটি শুধু ক্লাব দু’টির মধ্যেই হচ্ছে না। এটি নির্ধারণ করে দিবে কে হতে যাচ্ছে ইউরোপের সেরা কোচ, কোন প্লেয়ার হতে যাচ্ছে বিশ্বের সেরা, কোন ক্লাব হতে যাচ্ছে ইউরোপের সর্বেসর্বা। এবার দেখে নেওয়া যাক ফাইনালের পথে দু’দলের যাত্রা।

রিয়াল মাদ্রিদ বনাম লিভারপুল

মাদ্রিদের ফাইনাল যাত্রা

জিদানের রিয়াল মাদ্রিদের জন্য এবারের চ্যাম্পিয়ন্স লীগটি ছিল চড়াই-উৎরাই এ ভরপুর। গ্রুপ এইচে শুরুটা মোটেও ভালো হয়নি গর দুইবারের চ্যাম্পিয়ন রিয়ালের। প্রথম ম্যাচে অ্যাপোয়েলকে ৩-০ এবং পরের ম্যাচে বরুশিয়া ডর্টমুন্ডকে তাদের মাঠে ১-৩ গোলের ব্যবধানে হারালেও নিজেদের মাঠে টটেনহামের সাথে ১-১ গোলে ড্র চিন্তায় ফেলে দেয় তাদের। চিন্তার রেখাটি আরও দীর্ঘ হয় যখন ফিরতি ম্যাচে টটেনহামের মাঠে ৩-১ গোলে হেরে বসে তারা। তবে জিদানের দল যে দমে যাওয়ার পাত্র ছিল না তা তারা বুঝিয়ে দিতে সময় নেয়নি। অ্যাপোয়েলের মাঠে তাদেরকে ০-৬ গোলে উড়িয়ে দেয় এবং নিজেদের মাঠে ডর্টমুন্ড কে ৩-২ এ হারিয়ে পরের রাউন্ডের টিকেট পাকাপোক্ত করে তারা। তবে তা গ্রুপ রানার্সআপ হয়ে। গ্রুপ রানার্স আপ হওয়ায় সামনে যে আরও কঠিন পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে তা আর বলার অপেক্ষা ছিল না।

রাউন্ড অফ সিক্সটিনে প্রতিপক্ষ হিসেবে পড়ে এমেরি’র পিএসজি। তবে নেইমারবিহীন পিএসজি তেমন সুবিধা করতে পারেনি। বলতে গেলে ভাগ্য হয়তো সহায়ই ছিল রিয়ালের। প্রথম লীগে ৩-১ এ এবং ফিরতি লীগে ২-১ এ হারিয়ে কোয়ার্টার নিশ্চিত করে রিয়াল।

যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ গতবারের রানার্সআপ জুভেন্তাস। ফুটবল ফ্যানদের মনে ছিল জমজমাট এক লড়াই দেখার অপেক্ষা। তবে ট্যাকটিস মাস্টার জিদান হয়তো ছক কষেই রেখেছিলেন। তুরিনে জুভেন্তাসের মাঠেই তাদের ৩-০ তে উড়িয়ে দেয় জিদানের দল। তবে ফিরতি লেগে জুভেন্তাস মাদ্রিদ শিবিরে ঝড়ই তুলে দেয়। তবে রোনাল্দোর পেনাল্টির সুবাদে নিজেদের মাঠে ৩-১ এ হেরেও ৪-৩ এগ্রিগেটে সেমি ফাইনালের টিকিট কাটে লস ব্লাঙ্কোসরা।

এবারের চ্যাম্পিয়ন্স লীগের সর্বোচ্চ ৫ গোলদাতাঃ

সেমিফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ২০১৬’র ফাইনালিস্ট বায়ার্ন মিউনিখ। প্রথম লেগে বায়ার্নের মাঠে ১-২ ব্যবধানে জিতলেও নিজেদের মাঠে ঘাম ঝড়াতে হয় রিয়ালকে। ২-২ গোলে শেষ হয় ম্যাচটি। ৪-৩ অ্যাগ্রিগেটে প্রথম দল হিসেবে টানা তৃতীয়বার ফাইনালে পা দেয় রিয়াল। তবে এ ক্ষেত্রে একটি কথা না বললেই নয়। সেমিফাইনালের দুই লেগ মিলিয়ে দুই দলের ব্যবধান গরে দিয়েছে মূলত গোলরক্ষকদের পারফর্ম্যান্স। একদিকে মাদ্রিদের শেষ প্রহরী কেইলর নাভাস একাই রুখে দিয়েছেন রবেন-রিবেরী-মুলারের-জেমস-রদ্রিগেজদের তোপ; আর অন্যদিকে বায়ার্নের নিয়মিত গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়্যারের ইনজুরিতে একাদশে থাকা সভেন উলরিখের শিশুতোষ ভুলে দুই ম্যাচে হজম করা দুইটি গোলই তাদের সব আশায় পানি ঢেলে দিয়েছে।

সেমিফাইনালের প্রথম লেগে উলরিখের “ব্রেইন ফেড”:

লিভারপুলের ফাইনাল যাত্রা

এইবার চ্যাম্পিয়ন্স লীগে সবচেয়ে “অপ্রত্যাশিত” দল হিসেবে ফাইনাল খেলছে লিভারপুল। খেলবেই বা না কেন! তাদের আক্রমণভাগের তিন খেলোয়াড় যেন ত্রিশূলের তিন ফলা! এই মৌসুমের ইউরোপের সবচেয়ে দূর্ধর্ষ এটাক ট্রিও’র উপর ভর করেই যেন লিভারপুল এত অপ্রতিরোধ্য।

লিভারপুলের চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ক্যাম্পেইন শুরু হয় সেভিয়ার সাথে ২-২ গোলে ড্র দিয়ে। পরের ম্যাচেও স্পার্টাক মস্কো’র সাথে ১-১ গোলে ড্র করে ঘরে ফিরে তারা। মনে হচ্ছিল তরী ডুবল বলে। তবে এরপর থেকে শুরু হল সালাহ-মানে-ফিরমিনো যাদু। মারিবরের ঘরে গিয়ে ০-৭ গোলে তাদের মাঠেই হারায়, অ্যানফিল্ডে ফিরতি লেগে জিতে ৩-০ গোলে। সেভিয়ার মাঠে তাদের সাথে ৩-৩ গোলে ড্র করে এবং মস্কোকে ৭-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে গ্রুপ চাম্পিয়ন হয়ে পরের রাউন্ডে যায় তারা।

রাউন্ড অফ ১৬-এ পোর্তো যেন কোন বাধাই সৃষ্টি করতে পারেনি লিভারপুলের সামনে। প্রথম লেগে ০-৫ গোলে উড়িয়ে দিলেও ফিরতি লীগে ০-০ গোলে ড্র করে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কাটে অল-রেডস। কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষ হিসেবে পায় ইংলিশ চাম্পিয়ন ম্যানচেস্টার সিটিকে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগে যেখানে তাদের সাথে হিমশিম খাচ্ছিল লিভারপুল, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগে সেখানেদেখা যায় তাদের একেবারেই ভিন্ন রুপ। ১ম লেগে সিটি’কে ৩-০ তে উড়িয়ে দিয়ে এবং ২য় লেগে ২-১ এ হারিয়ে সেমিফাইনালে পৌঁছে যায় তারা।

সেমিফাইনালে লিভারপুলের প্রতিপক্ষ আরেক সারপ্রাইজ প্যাকেজ রোমা। যারা এসেছিল চ্যাম্পিয়নস লীগের হট ফেভারিট দাবিদার বার্সেলোনাকে হারিয়ে “অঘটন” ঘটিয়ে। এমতাবস্থায় দুই আন্ডারডগের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়েরই ইঙ্গিত দিচ্ছিল ম্যাচটি। ১ম লেগ ৫-২ গোলে জিতে যায় লিভারপুল, ফলে মনে হচ্ছিল ফিরতি লেগ খেলাটা হবে আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। কিন্তু পরের ম্যাচে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় রোমা। তবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই এ ২-৪ এ হেরেও গা বাঁচিয়ে ফাইনালে পৌঁছে যায় লিভারপুল।

বিগত রেকর্ড

রিয়ালের শেষ ৫ ম্যাচঃ
বার্সা ২-২ রিয়াল
রিয়াল ২-২ বায়ার্ন
রিয়াল ২-১ লিগনাস
বায়ার্ন ১-২ রিয়াল
রিয়াল ১-১ বিলবাও

লিভারপুলের শেষ ৫ ম্যাচ
চেলসি ১-০ লিভারপুল
রোমা ৪-২ লিভারপুল
লিভারপুল ০-০ স্টোক
লিভারপুল ৫-২ রোমা
ওয়েস্টব্রম ২-২ লিভারপুল

রিয়াল মাদ্রিদ-লিভারপুল হেড টু হেড
৪-১১-২০১৪ঃ রিয়াল ১-০ লিভারপুল
২২-১০-২০১৪ঃ লিভারপুল ০-৩ রিয়াল
১০-০৩-২০০৯ঃ লিভারপুল ৪-০ রিয়াল
২৫-০২-২০০৯ঃ রিয়াল ০-১ লিভারপুল

এছাড়া শেষ ৭ উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ফাইনালে শুধুমাত্র একটিতে হেরেছে রিয়াল, তাও আবার এই লিভারপুলের বিপক্ষেই! সেক্ষেত্রে আশা করতেই পারে ক্লপের দল।

তবে ক্লপের ফাইনাল ভাগ্য খুব একটা সুবিধার নয়। তার কোচিং এর অধীনে শেষ ৬ ফাইনালে দল জয় পেয়েছে মাত্র ১টিতে। এত সব সমীকরণ মাদ্রিদের দিকে ইঙ্গিত করলেও লিভারপুল যে অঘটন ঘটাতে প্রস্তুত তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

স্টার ম্যান

রিয়ালে আছে বর্তমান ব্যালন ডি ওর জয়ী প্লেয়ার। লিভারপুলে হয়ত আছে পরের টি! (যদিও বিশ্বকাপ ফুটবল বড় ভূমিকা রাখবে)। রোনালদো চ্যাম্পিয়ন্স লীগের সবসময়ের সেরা গোলদাতা (১২০) এবং ৪ বারের ট্রফি বিজয়ী। ক্লাবের হয়ে যার এই সিজনে গেল সংখ্যা ৪২।

তবে মো সালাহ এই মৌসুমে আছেন দূর্দান্ত ফর্মে। সিজনে তার গোল সংখ্যা ৪০+। ফর্মও দারুণ। যদি কিয়েভে রোনালদোকে ছাপিয়ে যেতে পারেন, তবে পরের ব্যালন হয়ত তার পকেটেই ঢুকবে।

যতসব কথাবার্তা

চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ফাইনাল কড়া নাড়ছে। শুরু হয়েছে কথার যুদ্ধ।

মিররকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারের সময় সালাহকে নিয়ে চিন্তিত কিনা এই প্রশ্নের উত্তরে রিয়াল ক্যাপ্টেন রামোস বলেন-

“আমার ক্যারিয়ার জুড়ে আমি অনেক ফরোয়ার্ডের মুখোমুখি হয়েছি। যারা সর্বকালের সেরা বলেও আখ্যায়িত… সম্মান? হ্যাঁ, (সালাহ’র প্রতি) সেটা আছে। তবে ভয়ের কোন জায়গা নেই।”

এদিকে বেইন স্পোর্টসকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে সালাহ বলেন-

“এটি শুধু রোনালদো আর সালাহ’র মধ্যকার ফাইনাল হতে যাচ্ছে না। আমি একটি বড় ক্লাবের হয়ে খেলছি, যেখানে অনেক ভালো প্লেয়ার আছে। ফাইনালে কোয়ালিফাই করতে পুরো টিম একসাথে খেলেছে। আমি একা এটি কখনও করতে পারতাম না।”

ইউসিএল; ইউরোপের সবচেয়ে বড় ট্রফি। ইউরোপের যেকোন ক্লাবের জন্য সবচেয়ে সম্মাজনক অর্জন। রিয়াল আছে টানা তৃতীয়বারের সন্ধানে। আর লিভারপুল ট্রফি খড়া কাটানোর আশায়। এখন অপেক্ষা ২৭ শে মে ১২.৪৫ এর। নজর কিয়েভের ফাইনাল ম্যাচের দিকে।

Most Popular

To Top