গল্প-সল্প

সোফাসেট ।।ছোটগল্প।।

সোফা নিয়ন আলোয় neonaloy

কথা ছিল রুমু বাচ্চাকে চানখারপুলে মায়ের বাসায় রেখে ঢাকা মেডিকেলের ইমারজেন্সী গেটের সামনে দাঁড়াবে আর সাকিব অফিস থেকে ফেরার পথে রুমুকে তুলে নিয়ে যাবে। আজ তাদের সোফা কেনার কথা। গত একবছর প্রতিমাসে সোফার জন্য ২-১ হাজার করে টাকা জমানো হয়েছে। সব মিলিয়ে ১৬হাজার ৬৫০ টাকা হয়েছে। ১৭ হাজার ছিল। গত মাসে বাবুর দুধের টাকা কম পড়ায় ৩৫০ টাকা খরচ হয়ে গেছে।

রুমুকে সাকিব বিয়ের পর একটাই শাড়ি কিনে দিয়েছে। সাকিবের এক কলিগ নতুন শাড়ির ব্যবসা শুরু করেছিল। কয়দিন যেতে না যেতেই সে ব্যবসার অবস্থা বারোটা। সবাইকে শাড়ি ধরিয়ে দিলেন ঐ কলিগ। সাকিব রুমুর জন্য বেছে একটা নীল সাদা জামদানী নিয়ে এল দুই হাজার টাকা দিয়ে। রুমু আজকে সেটাই পড়েছে। গত ছয়মাসে বোধহয় এই প্রথম দুজনের একত্রে বের হওয়া।

৫টা বাজে। ৪টায় আসার কথা ছিল সাকিবের। রাগ লাগতে থাকে রুমুর। কি একটা পুরনো ফোন ব্যবহার করে, চার্জ থাকেনা। কই আছে কে জানে? কতক্ষন হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা যায়? দাঁড়ানোর কত জায়গা আছে, সাকিব সব অদ্ভুত জায়গা বেছে বের করে। বিয়ের পর প্রথম দাওয়াতে যাবে মামা শ্বশুরের বাড়ি। সাকিব অফিস থেকে ফিরতে দেরী হবে বলে রুমুকে বলল, শোন আমার অফিসের পাশে কাচা বাজার, ওখানে নাজমুল গরু ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থেকো। আজব ব্যাপার, নিজের বৌকে অফিসে নিয়ে যেতে নাকি তাঁর লজ্জা লাগে। কাঁচা মাংসের গন্ধে রুমুর সেদিন বমি-টমি হয়ে একাকার।

সাকিবের খুব শখ সোফা কেনার। ৪ বছরে অন্তত একশ বার সে বলেছে, “বুঝলা রুমু, মানুষজন আসলে বসার জায়গা দিতে পারিনা। খাটে বসতে দেয়া বিশাল যন্ত্রণা। চাদরে কুচি পড়ে যায়, ঠিক না?” এগুলো সবই রুমুকে রাজি করানোর বাহানা। এমনিতে দিনে তিন বার তাদের ঝগড়া হয় সাকিবের বিছানা এলোমেলো করা নিয়ে। আর সোফার বেলায় চাদরের কুচি নিয়ে সাকিবের দুশ্চিন্তা দেখে হাসি পায় রুমুর। তবু একমাসে বিয়ের দাওয়াত ক্যান্সেল করে, আরেক মাসে ঈদের শপিং কমিয়ে টাকা জমায় দুজনে।

সন্ধ্যা হয়ে এলো প্রায়। শীতের দিন। ধুম করে রাত নেমে পড়ে। রুমুর মেজাজ যখন চরম খারাপ তখন সাকিবকে দেখা গেল দ্রুত পায়ে হেঁটে আসতে। রুমুর ইচ্ছে হল বেশ ক’টা কথা শুনিয়ে দেবে সে। কাছে আসতেই সাকিব জোরে জোরে শ্বাস ফেলতে ফেলতে বলল, “সোফাটা আজ কিনেই ফেলব কি বল?”
সাকিবের উৎসাহভরা মুখ টা দেখে রুমু সব রাগ ভুলে হেসে ফেলল। মনে মনে বলল, “আহারে বেচারা, না জানি কত তাড়াহুড়ো করেছে সে, তবু নিশ্চয়ই কোন ঝামেলায় পড়ে আসতে পারেনি।”
হঠাৎ চোখে পড়ল সাকিবের হাতে বাজারের ব্যাগ।
রুমু বলল, এগুলা কি তোমার হাতে?
– “বাজার করলাম, দুইটা মুরগী আর তিন কেজি গরুর মাংস। এগুলা করতেই দেরী হয়ে গেল, আজ রাতে একটু বিরিয়ানি করবে?”
– “বাজার করেছ কেন এখন? এক জায়গায় যাচ্ছি এর মাঝে ব্যাগ নিয়ে ঘুরব?”
– “আসলে কলিগদের তো কখনও দাওয়াত দেয়া হয়না। আজ সোফা কিনব, তাই রাতে দাওয়াত দিলাম। ব্যাগ নিয়ে সমস্যা নেই। সামনে বজলুর দোকানে রেখে যাব। যাওয়ার সময় নিয়ে যাব।”
রুমু যথেষ্ট বিরক্ত হল। এখনো সোফা কেনাই হয়নি। আর বাসায় ফিরতে ফিরতে কয়টা বাজে তার নেই ঠিক। রাঁধবে কখন? একবার জিজ্ঞেস করলেও তো পারত সাকিব।

কথা না বাড়িয়ে রিকশা নিয়ে নিল রুমু। বজলুর দোকান হয়ে দুজন সোজা চলে গেল ফার্নিচার মার্কেটে। প্রথম দোকানটায় একটা সোফা খুব পছন্দ হল রুমুর। দাম তাদের বাজেটের তিন গুন। একটা দু’টা করে প্রায় পুরো মার্কেট চষে ফেলল; কিন্তু নেই, কোথাও তাদের সামর্থ্যের মধ্যে সোফা নেই। অথচ সেদিন পাশের ফ্ল্যাটের মিলি ভাবী বললেন ১৫ হাজার টাকায় সুন্দর এক সেট সোফা নিয়েছেন।

রাত ৯ টা বাজে। রুমু আর সাকিব বাসায় ফিরছে। সাকিবের চেহারা দেখে রুমুর কাঁদতে ইচ্ছে করছে। তবু সে গম্ভীর গলায় বলল, “তোমার সমস্যা কি? এমন মুখ ভার করে আছ কেন? আজ কিনতে পারিনি আরেকদিন আসব। আর কয়েকমাস টাকা জমিয়ে আসব। আমি না হয় চাদর টেনে ঠিক করে রাখব কয়েক দিন।” সাকিব হুম টাইপের একটা শব্দ করল।

রাদিবকে নিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে ১১ টা। কলিগদের আগেই জানিয়ে দিয়েছিল সাকিব যে আজ জরুরী কাজ আছে,দাওয়াত অন্য একদিন।

ক্লান্ত হয়ে বিছানায় শুয়েই ঘুমিয়ে গেল সাকিব। রাত দেড়টায় ঘুম ভাঙিয়ে টেবিলে নিয়ে গেল রুমু। সাকিবের প্রিয় বিরিয়ানি টেবিলে সাজানো। মুহুর্তেই চোখ চকচক করে উঠলো সাকিবের।

১৬৬৫০ টাকা পড়ে রইল আলমারির কোণে। সোফা রইল তালাবন্ধ দোকানে। শুধু মাঝরাতে এই দুইজনের মধ্যে কতশত অদ্ভুত আনন্দ বেদনা খেলা করল, কত অশান্ত মন ঢেউ পাড়ি দিয়ে তীর খুজে পেল, আর কত ভালোবাসা ওই চাদরের কুচিতে আটকে রইল তা শুধু বিধাতাই দেখলেন।

এই লেখকের অন্যান্যঃ দূর্নীতিবিহীন এক ইফতারি’র টেবিল

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top