নিসর্গ

কাশ্মীরঃ মর্ত্যলোক ছেড়ে স্বর্গলোকে কাটিয়ে দেয়া কয়েকটি দিন (পর্ব-১)

কাশ্মীরঃমর্ত্যলোক ছেড়ে স্বর্গলোকে কাটিয়ে দেয়া কয়েকটি দিন (পর্ব-১)

“তুম লোগ বাংলাদেশ ছে আয়ে হো? হামারা ফেভারিট ক্রিকেট টিম বাংলাদেশ। মাশরাফি, সাকিব আল হাসান, মাহমুদুল্লাহ হামারা ফেভারিট প্লেয়ার”

গৌড়বর্ণ, নায়কসুলভ চেহারার কাশ্মীরী যুবকটি যখন আমাদের দেশের পরিচয় পেয়ে এমন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিল তখন সত্যি গর্বে এবং ভালবাসায় বুক টা ভরে উঠেছিল আমাদের। বাংলাদেশি পরিচয় পেয়ে ভিনদেশি কারো চোখে এমন ভালবাসা সত্যিই এর আগে কোথাও দেখিনি। চমৎকৃত হলাম এবং কৃতজ্ঞ হলাম আমাদের ক্রিকেট টিমের প্রতি। সেই সাথে এই স্থানটির প্রতি আরো বেশি আবেগ আর ভালবাসায় ভেসে গেলাম আমরা। আর ভাসব নাই বা কেন? স্থানটি যে কাশ্মীর। এর মনোলোভা প্রকৃতি আর যাদুকরি সৌন্দর্য্যের মোহে আবেশিত হবেনা এমন পাষান কি আছে কোথাও?

যাক এবার আসল কথায় আসি। জুলাই-এ বালি থেকে ঘুরে আসার পর কয়েকমাস পর থেকেই আবার মাথায় ভ্রমণের পোকাটি কিলবিল করা শুরু করে দিল। আর এ হুজুগ একবার উঠলে তো নিস্তার নেই আমাদের। তাই আবার ঝাঁপিয়ে পড়লাম নতুন ডেস্টিনেশন খোঁজায়। কিশোরী বেলায় একবার “কশ্মীর কি কলি” মুভিটি দেখেছিলাম। শিকারায় শর্মিলী ঠাকুর আর শাম্মি কাপুরের “দিওয়ানা হুয়া বাদল” গানটার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম তখন। তারপর মিশন কাশ্মীরে প্রীতি জিনতার “চুপকে সে সুন”; উফফ কি যে সুন্দর! এমন একটি নৌকায় আয়েশি ভঙ্গিতে শুয়ে থেকে ডাল লেকের পানিতে গা-ই যদি না ভাসালাম তবে আর জীবনে করলাম কি? আর সেই সাথে দেখা লাগবে টিউলিপ, যা বছরে একমাসই ফোটে- এপ্রিলে।

কাশ্মীরে এপ্রিলে টিউলিপের সমারোহ

কাজেই কেউ যদি ভাবেন শুধুমাত্র কাশ্মীরের অপরুপ পাহাড় আর স্বর্গীয় সৌন্দর্য্যের কারণে আমি আমার নেক্সট ডেস্টিনেশন কাশ্মীর করেছি তবে সে ভুল ভাববে। আমার কাশ্মীরে যাবার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মুলত টিউলিপ দর্শন আর শিকারার প্রেমে পড়া যার পেছনে এই বলিউড নিবাসীদের যথেস্ট ভুমিকা রয়েছে।

আরো পড়ুনঃ পাইছি টুরিস্ট, কামাইয়া লই!

যাই হোক, লক্ষ্য ফিক্সড। এবারের মিশন কাশ্মীর। ট্রাভেল টাইম এপ্রিলে নির্ধারণ করে টিকিট কাটতে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। মোট ভ্রমন নয় রাত, দশ দিন। এর মধ্যে চার রাত কাশ্মীর, দুই রাত দিল্লি, তিন রাত কলকাতা। আমরা তো বরাবরই ট্রাভেল ডেটের বাড়াবাড়ি রকমের আগে এয়ার টিকিট কেটে বসে থাকি। এবারও তার ব্যতিক্রম হলনা। যাব এপ্রিলে, আর টিকিট কেটে বসে আছি জানুয়ারীতে এবং এ ক্ষেত্রে চরম রিস্কও নেই আমরা। কেন? কারণ টিকিট তো কাটি অফারে যেগুলোর কোন অবস্থাতেই ফেরত কিংবা পরিবর্তনযোগ্য নয়। কিন্তু আমরা কি তা ভয় পাই? যা থাকে কপালে।

ঢাকা থেকে কলকাতা, কলকাতা থেকে দিল্লী এবং দিল্লী থেকে শ্রীনগর। আঁতিপাতি করে খুঁজে সবচেয়ে ইফেক্টিভ ফ্লাইটগুলো খুঁজে বের করলাম যেন টাকা এবং সময় দুটোই সাশ্রয় হয় আমাদের। অতঃপর ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষ্যে দেয়া অফারে তিন মাস আগে থেকে টিকিট কেটে দিন গোনা শুরু আমাদের। সত্যি বলতে কি, আমরা এই সময়টা সবচেয়ে বেশি উপভোগ করি। ওখানে কি দেখব, কোথায় যাব, কিভাবে যাব, কি খাব, কি পরব এইসব প্ল্যান করতেই যত মজা আমাদের। সো, জোরেসোরে স্টাডি শুরু।

স্টাডি করে যা বুঝলাম কাশ্মীরে চার দিন কোন ট্রাভেল এজেন্সির হাতে নিজেদের তুলে দেয়াই আমাদের জন্য মঙ্গল। কারণ সময় অল্প কিন্তু দেখতে হবে অনেক কিছু। তাছাড়া আমাদের সাথে আরো দুই ফ্যামিলি আছে। বেবি সহ দশজনের টিম আমাদের। এত জন সদস্য নিয়ে ওখানে এ্যাডভেঞ্চার করা বুদ্ধিমানের কাজ হবেনা।

নেট ঘেঁটে মিনিমাম আট-দশটা ট্রাভেল এজেন্সি থেকে যাচাই-বাছাই করে একটি সিলেক্ট করলাম। শ্রীনগর এয়ারপোর্ট থেকে পিক করে চার দিন হোটেল এর ব্যবস্থা এবং সব জায়গা ঘুরিয়ে লাস্ট দিন আবার এয়ারপোর্ট ড্রপ, এই সার্ভিস দিবে তারা। অনলাইনেই সব ঠিকঠাক করে এবার স্টাডি ওয়েদার নিয়ে। বরফ দেখব, কাজেই ভারি কাপড় নিতে হবে? নো ওয়ে, গুগল আছে কি করতে? নেট ঘেটে যা বুঝলাম বরফ হলেও হাড় কাঁপানো শীত ওখানে নেই, তাই বস্তা টাইপের কাপড়ের দরকার পরবেনা। এদিকে আবার দিল্লী আর কলকাতায় সেইরকম গরম। এত বস্তা নিয়ে জাতী কি করিবে? অতএব, সমাধান উইন্ড ব্রেকার যা ওজনে হালকা এবং কালারফুল এবং যা আমাদের ফিটফাট লুক ধারণ করবে। আর ভেতরে সদরঘাট হিসেবে থাকবে বডি ওয়ার্মার আর উলের সোয়েটার। বরফে হাঁটার বুট তো ওখানেই ভাড়া করা যায়। সো বরফ আর ঠান্ডা নিয়ে চিন্তা শেষ। এখন শুধুই দিন গোনার পালা। এর মাঝে অবশ্য “দিওয়ানা হুয়া বাদল” গানটা মিনিমাম কয়েক লক্ষ্যবার দেখা হয়ে গেল।

অবশেষে দিবস ও রজনীর অপেক্ষার হল অবসান। ক্যালেন্ডার পাতা ঘুরতে ঘুরতে এপ্রিলের এগার তারিখে এসে স্থির হল। আমরাও দশ জন বিভিন্ন সাইজের সদস্য দ্বারা গঠিত টিম মহা সমারোহে এয়ারপোর্টে হাজির। সেদিন ছিল কোটা সংস্কার আন্দোলনের সেই ভয়াবহ পরিস্থিতির দিন। কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা সবাই সময়মত এয়ারপোর্টে পৌছতে সফল হলাম এবং অবশেষে সেদিন সন্ধ্যা ছয়টার দিকে আমাদের দশজন সদস্য নিয়ে জেট এয়ার ওয়েজের প্লেনটি উড়াল দিল কলকাতার আকাশে। কলকাতা পৌঁছে তিন ঘন্টা ট্রাঞ্জিটের পর আবার জেট এয়ারের আর একটি ফ্লাইট আমাদের নিয়ে দিল্লী পৌঁছল এবং দিল্লীতে সারা রাত প্রায় পাঁচ ঘন্টা ট্রাঞ্জিট পার করে ঘুমে ঢুলু ঢু্লু চোখে আমরা উঠে বসলাম গো এয়ারের ফ্লাইটে যা প্রায় দেড় ঘন্টা উড়ালের পর ভোর সাতটার দিকে আমাদের নিয়ে স্পর্শ করল শ্রীনগরের মাটি।

(চলবে)

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top