ফ্লাডলাইট

সার্ক চারজাতি টুর্নামেন্টঃ যে টুর্নামেন্ট বাংলাদেশে ক্রিকেটকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলো

সার্ক চারজাতি টুর্নামেন্টঃ যে টুর্নামেন্ট বাংলাদেশে ক্রিকেটকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলো

১৯৯১ সালের এশিয়া কাপে ব্যর্থতার পর ক্রিকেটের মান উন্নয়নে নতুন কিছু করার উদ্যোগ নেয় বিসিবি। নব্বইের শুরুতেই দেশের প্লেয়ারদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সাথে অভ্যস্ত করার জন্য চালু হয় “সার্ক চারজাতি টুর্নামেন্ট”। এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল এবং এশিয়ার বাকি তিন দেশ এখানে বিরাট সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেয়। অতীতে বিভিন্ন দেশের সৌখিন দল, রাজ্যদল, অবসরপ্রাপ্ত ক্রিকেটারদের নিয়ে গড়া এমসিসি দল বাংলাদেশ সফরে আসলেও এই টুর্নামেন্টের উদ্দেশ্য ছিলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলছে বা কিছুদিনের ভেতর খেলবে এমন ক্রিকেটারদের সাথে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের খেলার সুযোগ করে দেয়া। এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ তাদের জাতীয় দল খেলাতো এবং ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা তাদের “এ” দল খেলাতো। দেশের ক্রিকেট উন্মাদোনাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিসিবির এই উদ্যোগ বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

সার্ক চারজাতি টুর্নামেন্টের প্রথম আসর বসে ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর মাসে। ভারত এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে শক্তিশালী দল ছিলো। উল্লেখযোগ্য প্লেয়ারদের ভেতর ছিলেন-
ভারতঃ ভিনোদ কাম্বলি, রাজেশ চৌহান, নভজিৎ সিং সিধু, মহিন্দর সিং, অজয় শর্মা এবং সৌরভ গাঙ্গুলী।
শ্রীলংকাঃ গ্রায়েম ল্যাবরয়, দুমিন্দা পেরেরা।
পাকিস্তানঃ বাসিত আলি, আমির হানিফ, সাঈদ আনোয়ার।

টুর্নামেন্ট শেষ হবার পরপরই কাম্বলি, রাজেশের টেস্ট অভিষেক হয়। সিধু টুর্নামেন্টে রান করে দলে ফেরেন আর টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ উইকেট নিয়ে ভারতের জাতীয় দলে ঢুকে যান অজয় শর্মা।

টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচেই একমাত্র জয় পায় বাংলাদেশ। শ্রীলংকার বিপক্ষে।
স্কোরঃ
শ্রীলংকা ৮৫ (সাইফুল ইসলাম ২৩/৩, জাহাঙ্গীর আলম ১৯/৩)
বাংলাদেশ ৮৭/৩ (নুরুল আবেদীন ৩৮*, মিনহাজুল আবেদীন ৩২)

টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রান করেন সিধু (২ ম্যাচে ১৩১) আর সর্বোচ্চ উইকেট নেন অজয় শর্মা (২ ম্যাচে ৮ উইকেট)

১৯৯৪ সালে সার্ক চারজাতি টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় আসর অনুষ্ঠিত হয়। মহিন্দর অমরনাথের অধীনে এই টুর্নামেন্টের ফাইনালে খেলে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ক্রিকেটে অনেক বড় ভূমিকা এই টুর্নামেন্টের। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকার “এ” দল বাংলাদেশের তুলনায় দূর্বল কোন অংশে ছিলোনা। ফাইনালে খেলাটা তাই প্লেয়ারদের ভেতর আরো বড় কিছু করার আত্মবিশ্বাস জন্ম দেয়। আর মানুষের মাঝে ক্রিকেট নিয়ে আগ্রহ তুঙ্গে চলে যায়। প্রতিটা ম্যাচেই গ্যালারী ভরা দর্শক হয়, বাংলাদেশের সব ম্যাচ ছাড়াও ভারত-পাকিস্তানের ম্যাচে প্রচুর দর্শক সমাগম ঘটে।

বেশ কয়েকজন তরুণ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার ছিলেন টুর্নামেন্টে। আরো কয়েকজন এই টুর্নামেন্ট দিয়েই উঠে আসেন। এই টুর্নামেন্টে অমরনাথ তরুণ কিছু বাংলাদেশী প্লেয়ার মাঠে নামান যারা পরে দেশের হয়ে বড় ক্রিকেটার হয়েছেন।

অধিনায়কঃ
আকরাম খান (বাংলাদেশ)
রমিজ রাজা (পাকিস্তান)
চান্দিকা হাথুরুসিংহে (শ্রীলংকা)
প্রভিন আম্রে (ভারত)

বাংলাদেশের জয় সমূহঃ
ম্যাচঃ বাংলাদেশ বনাম শ্রীলংকা
শ্রীলংকা ১৬৭ (হাথুরুসিংহে ৪৭, এনামুল হক মনি ২৯/২, আনিসুর রহমান ২৯/৪)
বাংলাদেশ ১৬৮/৫ (আতহার আলি খান ৩২, মিনহাজুল আবেদীন ৩০*)
ফলঃ বাংলাদেশ ৫ উইকেটে জয়ী

ম্যাচঃ বাংলাদেশ বনাম ভারত
বাংলাদেশ ১৭২ (আমিনুল ইসলাম বুলবুল ৬৪, ভেনকাটেশ প্রাসাদ ২৫/৩, প্রশান্ত ভাইদা ২৩/৩)
ভারত ১৭১ (রাহুল দ্রাবিড় ৩৩, রফিক ৩৫/৩, আনিসুর রহমান ২৮/৩)
ফলঃ বাংলাদেশ ১ রানে জয়ী

এছাড়া টুর্নামেন্টের প্রথমে ম্যাচে উইকেট কিপার জাহাঙ্গীর আলমের ভুলে পাকিস্তানের সাথে ১ উইকেটে হেরে যায় বাংলাদেশ। প্রথমে ব্যাট করে বাংলাদেশ এনামুল হক মনির ৪৩* রানে ১৬৭/৮ রান সংগ্রহ করে। জবাবে ৪৯.৫ ওভারে ম্যাচ টাই অবস্থায় ছিলো (১৬৭/৯), শেষ বলে উইকেট কিপার জাহাঙ্গীর আলমের হাত থেকে বল ছুটে গেলে বাই রান নিয়ে নেয় পাকিস্তান!

ফাইনালঃ গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচের ভেতর দুই ম্যাচে জিতে ফাইনালে ভারতের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। গ্রুপ পর্বে ১ রানে হারা ভারত ফাইনালে প্রথমে ব্যাট করে অধিনায়ক প্রভিন আম্রের ৮৮*, সৌরভ গাঙ্গুলীর ৩৯ আর রাহুল দ্রাবিড়ের ৩৭ রানে ২১৬/৬ রান করে। জবাবে অধিনায়ক আকরাম খানের ৬৬ রান ছাড়া আর কেউই রান করতে না পারলে বাংলাদেশ অল আউট হয় ১৬৪ রানে। ভারতের ভেনকাটেশ প্রাসাদ ১১ রানে ৪ উইকেট নেন।

ফাইনালে হারলেও এই ম্যাচ আর এই টুর্নামেন্ট বাংলাদেশে ক্রিকেটকে চূড়ান্ত পর্যায়ে জনপ্রিয় করে দেয় ফুটবলকে পেছনে ফেলে দিয়ে।

এই টুর্নামেন্টের মাধ্যমে আকরাম খানের অধিনায়ক হিসেবে অভিষেক হয়। জাতীয় দলে আসেন নাঈমুর রহমান দূর্জয়, আল শাহরিয়ার, মোহাম্মদ রফিক, আনিসুর রহমান (বর্তমানে আম্পায়ার) আর সজল চৌধুরীরা।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের ভেতর এই টুর্নামেন্টের মাধ্যমে উঠে আসেন রাহুল দ্রাবিড়, সৌরভ গাঙ্গুলী, রাসেল আরনল্ড, উপল চন্দনা, ভেনকাটেশ প্রসাদের মতো ক্রিকেটার।

টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রান করেন রাহুল দ্রাবিড় (৪ ম্যাচে ১৩০ রান, গড় ৩২.৫০, সেরা ৪৪)
আকরাম খান করেন ১২৯ রান (গড় ৩২.২৪, সেরা ৬৬)
সর্বোচ্চ উইকেট পান আনিসুর রহমান (৪ ম্যাচে ১১ উইকেট, সেরা ২৯/৪)
ভেনকাটেশ প্রসাদ পান ১০ উইকেট (সেরা ১১/৪)
সেরা অলরাউন্ডার হন শ্রীলংকার রাসেল আরনল্ড, তিন ম্যাচে ৯৭ রান আর ৬ উইকেট। দ্বিতীয় হন এনামুল হক মনি, চার ম্যাচে ৭৪ রান এবং ৫ উইকেট।

১৯৯৭ সালে সার্ক চারজাতি টুর্নামেন্টের শেষ আসর অনুষ্ঠিত হয়। এইবার বাংলাদেশের কোচ ছিলেন সাবেক ক্যারিবিয়ান লিজেন্ড গর্ডন গ্রিনীজ। টুর্নামেন্টে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা তিন দলই শক্তিশালী “এ” দল পাঠায়। বাংলাদেশ গ্রুপ পর্বের খেলায় তিন দলের সাথেই পরাজিত হয় তবে বাংলাদেশের ব্যাটিং তুলনামূলক ভালো হয় যার ফলাফল আইসিসি ট্রফিতে চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। ‘৯৭ সালের টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ পায় তরুণ সানোয়ার হোসেনকে।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের ভেতর যারা ছিলেনঃ
ভারতঃ অময় খুরাছিয়া, মানাভা প্রাসাদ, হারভিন্দর সিং, গগন খোদা, নোয়েল ডেভিড, ওয়াসিম জাফর, দেবাশীষ মোহন্ত, সাইরাজ বাহুতুলে।
পাকিস্তানঃ আসিফ মুজতবা, আকিব জাভেদ, আজহার মাহমুদ, বাসিত আলি, আখতার সরফরাজ, মোহাম্মদ জাহিদ, মোহাম্মদ ওয়াসিম, মুজাহিদ জামশেদ।
শ্রীলংকাঃ রুয়ান কালপাগে, নাভিদ নাওয়াজ, দুলিপ লিয়ানাগে।

টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের সংক্ষিপ্ত স্কোরঃ
ম্যাচঃ বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তান
বাংলাদেশ ১৮২/৯ (হাসিবুল হোসেন শান্ত ৪২*)
পাকিস্তান ১৮৬/৪ (আসিফ মুজতবা ৬৭)
ফলঃ পাকিস্তান ৬ উইকেটে জয়ী

ম্যাচঃ বাংলাদেশ বনাম ভারত
বাংলাদেশ ২৩৫/৭ (বুলবুল ৭৮, নান্নু ৫৩)
ভারত ২৩৬/৩ (শরৎ ৬৪*, গগন খোদা ৬৩)
ফলঃ ভারত ৭ উইকেটে জয়ী

ম্যাচঃ বাংলাদেশ বনাম শ্রীলংকা
বাংলাদেশ ২২০/৯ (সানোয়ার ৭৬, আকরাম ৫৪)
শ্রীলংকা ২২২/৫ (নাভেদ নওয়াজ ৮৮)
ফলঃ শ্রীলংকা ৫ উইকেটে জয়ী (তিন আসর মিলিয়ে শ্রীলংকার একমাত্র জয়)

১৯৯৭ সালে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি জয় এবং পরে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার ফলে সার্ক চারজাতি টুর্নামেন্ট বাতিল করা হয়। বাংলাদেশ সরাসরি এশিয়া কাপে খেলা শুরু করে আর এশিয়ার আরো দেশকে নিয়ে ইমার্জিং নেশনস এশিয়া কাপ শুরু করে এসিসি।
সার্ক চারজাতি টুর্নামেন্টের মাধ্যমেই বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে জনপ্রিয়তার দিক থেকে এক নাম্বার খেলায় পরিনত হয় বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলার জন্য প্রস্তুত হয়। এটা ছিলো বিসিবি এবং এসিসির অন্যতম সফল একটি প্রজেক্ট, যেটা বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস পাবার মাধ্যমে শেষ হয়। সার্ক চারজাতি টুর্নামেন্টের সব কয়টি ম্যাচ লিস্ট “এ” মর্যাদার।

Most Popular

To Top