নাগরিক কথা

যৌতুক, বিয়ে, এবং কন্যা সন্তান

যৌতুক, বিয়ে, এবং কন্যা সন্তান

ভারত এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি। টিভিতে ভারতীয় অনুষ্ঠান দেখলে অথবা বলিউড এর সিনেমা দেখলে মনে হয়, এরা না জানি উন্নতির কত উচ্চ শিখরে উঠে গেছে! এদেশের রাস্তার টোকাইরা পর্যন্ত সেই রকম স্মার্ট। মুম্বাই এর ভিখারিরাও শুনেছি ইংরেজিতে ভিক্ষা করে! মুম্বাইএর বস্তি গুলোতে মানুষের পেটে ভাত না থাকলেও তাদের অনেকের ছুপড়ি ঘরের উপর ডিস টিভি জল জল করে, টিভি না দেখলে এদের পেটের খাবার হজম হয় না, রাতের ঘুমে আরাম হয় না।  

তারা পড়াশোনায় বড় হওয়া এবং কাপড় চোপড় সংক্ষিপ্ত করায় মনে হয় আর কিছু দিন পর ইউরোপ আমেরিকাকেও ছাড়িয়ে যাবে। এদেশের বড় বড় শহরের তরুণ তরুণীরা অত্যন্ত চৌকস, রাস্তা ঘাটে তাদের চলা ফেরাতেই তাদের বুদ্ধিমত্তা এবং স্মার্টনেসের আঁচ পাওয়া যায়। দিল্লিতে মেট্রো রেলে ঘন্টার পর ঘন্টা চেপে যখন যখন এক যায়গা থেকে অন্য জায়গায় গিয়েছি, তখন আমি মন দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে এই দেশের ছেলে-মেয়ে গুলোকে দেখতাম। বিশ্ববিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীদের কথা বার্তা শুনলেই বোঝা যেত, তাদের সাথে কথায় পেরে ওঠা দায় হবে। তাদের ভাবে ভঙ্গিমায় মনে হত, তারা বোধ হয় বিশ্ব জয় করে ফেলেছে।

সাত সকালে দেখেছি অনেক দুরের পথ থেকে এয়ারহোস্টেসের কাপড় পড়া মেয়েটি একা একা ছোট একটা পুল ম্যান নিয়ে মেট্রো রেলে করে দিল্লির প্রায় এক মাথা থেকে অন্য মাথার এয়ারপোরটে যাচ্ছে খুব সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। তাদের সবার ভেতর থেকে আত্মবিশ্বাস যেন ছিটকে ছিটকে বের হয়।

এদেশের মানুষের মাঝে একটি ব্যাপার খুব প্রবল, তা হল দেশাত্ববোধ। তবে এক্ষেত্রে দেশাত্ববোধে মনে হয় কিছুটা অহমিকা মিশে গেছে। কারণ তারা নিজেদের এত বেশি শ্রেষ্ঠ ভাবে যে তা মাঝে মধ্যে দৃষ্টি কটু লাগে!

কিন্তু এই সব চাকচিক্য ও আধুনিকতার খোলস পয়সার একটি মাত্র পিঠ! এই সোনালী পয়সার ওপিঠও আছে। পয়সার অপর পিঠে আছে, গ্লানিময় অসুস্থ এক অধ্যায়। গা শিউরে ওঠার মত ভয়ঙ্কর সব ঘটনা। আপাতদৃষ্টিতে দিয়ে এখানে মেয়েদের যত নিরাপদ মনে হয়, এবং সম-অধিকার প্রাপ্ত মনে হয়, মূল চিত্র কিন্তু একদম ৩৬০ ডিগ্রি বিপরীত!

এই স্মার্ট আধুনিক তরুনিরা যখন তখন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের স্বীকার হয়, কখনো বা ছেলে বন্ধুর হাতে, কখনো বা চলন্ত বাসে, কখনো প্রতিবেশি আবার কখনো হয়তো কোন নিকটাত্মীয়ের হাতে। এখানে মেয়েদের কোন নিরাপত্তা নেই। ভারতে কিছু কিছু শহর তাও মোটামোটি নিরাপদ, যেমন কোচিন, কলকাতা ইত্যাদি। কিন্তু বেশির ভাগ যায়গার অবস্থা ভয়াবহ। সবচেয়ে ভয়াবহ হল রাজধানী দিল্লির অবস্থা।

২০১২ এর শেষের দিকে ছেলে বন্ধুর সামনে চলন্ত বাসে এক তরুনির মর্মান্তিক গা শিউরে উঠার মত লাঞ্চিত হবার ঘটনা তো সবাই জানে। সেই সময় আমরা ভারতেই ছিলাম। তখন এই ঘটনা চারদিকে তোলপাড় করে ফেলেছিল, ঘৃণার আগুনে জ্বলে উঠেছিল সবাই।

এর কিছু দিন আগে এক ভারতীয় অফিসারের স্ত্রী আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, মেয়েরা যেমন খুশি তেমন কাপড় পড়লে সমস্যা কি, এক সময় ছেলেদের দেখতে দেখতে চোখ সয়ে যাবে।  এই ঘটনার পর তাকে বলতে ইচ্ছা করছে, দিল্লির মেয়েরা তো যেমন খুশি কাপড় বহুদিন ধরেই পড়ে, তবে কেন তোমাদের ছেলেদের চোখে এখনো তা সয়ে গেল না। কেন ভারতে মেয়েদের লাঞ্চিত হবার হার এত বেশি?

তখন বহু প্রতিবাদ, তর্জন গর্জন হয়েছে, প্রচূর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, কিন্তু অবস্থার কোন উন্নতি হয় নি। মেয়েদের নিরাপত্তা এক চিলতেও বাড়েনি। সরকারকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে এই একই রকম কাহিনী ভারতের বিভিন্ন স্থানে ঘটে চলছে প্রতিনিয়ত। কোন পদক্ষেপেই তেমন কোন কাজ হচ্ছে না। আমি বলব না আমাদের দেশের মেয়েরা অনেক উচ্চ মর্যাদা পাচ্ছে, কিন্তু প্রতিবেশি ভারতের চেয়ে আমাদের অবস্থা অনেকাংশে ভাল।

এতো গেল মেয়েদের নিগৃহীত হবার গল্পের একটি মাত্র অধ্যায়। এই কষ্ট তো শুধু সেই মেয়েদের জন্য যারা ভ্রূণ হত্যার করাল আঘাত থেকে বেঁচে যায়, এই কষ্ট শুধু সেই কণ্যাদের যারা কিনা শত প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে, পরিবারের সবার মুখ অন্ধকার করে পৃথিবীর আলো দেখে। শৈশব থেকে নিগৃহীত হতে হতে বড় হয় এরা। শহরের খুব অল্প একটি জনগোষ্ঠিতে হয়ত মেয়ে শিশুকে সম অধিকার দেয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে তা ভারতের শত কোটি জনসংখ্যার মাঝে শতকরা হার হিসাবে দেখালে নাম মাত্র হবে।

এই দেশে মেয়ে ভ্রূণ হত্যার হার অচিন্তনীয় মাত্রায় বেশি। জাহেলিয়াত যুগ চলছে এখানে। পিস টিভিতে একদিন বলছিল, রাজস্থানে একবার রাস্তায় বিলবোর্ড দেয়া হয়েছিল মেয়ে ভ্রূণ হত্যার বিজ্ঞাপন হিসাবে। বলা হয়েছিল, পাঁচ হাজার টাকা খরচ করুন আর পাঁচ লাখ টাকা বাঁচান। অর্থাৎ অল্প পয়সা খরচ করে মেয়ে ভ্রূণটি জন্মের আগেই মেরে ফেলুন, তা নাহলে পরে তাকে লাখ লাখ টাকা যৌতুক দিয়ে বিয়ে দিতে হবে!

মেয়ে ভ্রূণ মেরে ফেলতে ফেলতে এখন ভারতে এমন গ্রামও আছে, যেখানে ছেলেরা বিয়ে করার জন্য কোন মেয়ে পাচ্ছে না। এমন অনেক যায়গা আছে যেখানে একাধিক সহোদরের জন্য স্ত্রী হিসাবে একটি মেয়েকে কিনে নিয়ে আসা হয়। এ যেন হিন্দু পুরাণের দ্রৌপদি গল্পের বাস্তব সংস্করণ!

এখানে অজস্র অজস্র মহিলা আছে ,পরিবারের চাপে জোর পূর্বক গর্ভপাতের স্বীকার হয়। কেউ একবার এর স্বীকার হয়, আবার কেউ বারবার। কারণ আল্ট্রাসোনগ্রাম করে যখন ঘরের লোকরা জেনে ফেলে যে, তার গর্ভের সন্তানটি মেয়ে, তখন সেই মেয়ে শিশুকে দুনিয়াতে আনার ঝামেলায় তারা যেতে চায় না। যদিও এই দেশে জন্মের আগে লিংগ নির্ণায়ক পরীক্ষা করা নিষেধ। তাও কে শোনে কার কথা, কে মানে কার বাধা।

ভারতে আমি শিক্ষিত পরিবারেও শুনেছি, মেয়ে সন্তান মেরে ফেলে, অথবা যদি জন্ম নিয়েই ফেলে, তখন মা ও কন্যা শিশু উভয়কে নানান ভাবে অত্যাচার করে। তবে এর একেবারেই যে ব্যাতিক্রম নেই তা নয়, যেমন আমি তো আগেই লিখেছিলাম শ্বেতা ও ভিকে দম্পতির কথা। ভিকের পরিবার থেকে বার বার জানতে চাচ্ছিল, শ্বেতার অনাগত সন্তানটি ছেলে না কি মেয়ে, কারণ তারা ছেলে সন্তানের আকাঙ্ক্ষায় অস্থির ছিল। যদিও দম্পতিটির এ ব্যাপারে কোন মাথা ব্যাথা ছিল না। তাদের কাছে ছেলে মেয়ে উভয়ই সমান। যদিও পরে দেশে ফেরত আসার পর জেনেছি তাদের পুত্রসন্তান হয়েছে। এই খবরে ভিকের পরিবার নিশ্চয় অবশেষে আশ্বস্ত হয়েছে।

বাংলাদেশেও মেয়ে সন্তান হলে সবাই যে খুশি হয় তা নয়, কিন্তু মেয়ে সন্তান না হবার জন্য এতটা সহিংসতা, একেবারে খুনোখুনির পর্যায়ে চলে যাওয়ার মত নিষ্ঠুরতা ওদের মত ব্যাপক হারে আমাদের মাঝে আছে এ আমি বিশ্বাস করি না।   

যৌতুকের মত কুপ্রথা এই মেয়ে সন্তানদের মৃত্যুর পেছনে সিংহ ভাগ দায়ী। কারণ যদি মেয়ে শিশু জন্ম নেয়, দেখা যায়, সেই মেয়ে বড় হলে তার বিয়ে দেবার সময় মা- বাবার সারা জীবনের সঞ্চয় চলে যায়। ধার দেনা করে অস্থির হতে হয়। আর ছেলে সন্তান হলে তো জ্যাকপট! “কোন বানেগা ক্রোড়পতি” র মত ছেলের বিয়ে দিয়েই বাবা মা লাখপতি, কোটিপতি হয়ে যেতে পারে।

এখানে ছেলের বিয়েতে খরচ তেমন না করলেও চলে, কারণ মেয়ের বাড়ী, মেয়েকে আপাদমস্তক সাজিয়ে গুছিয়ে শ্বশুর বাড়ি পাঠায়। কেরালায় মেয়ের বিয়েতে কি পরিমান সোনা দেয়, তা কল্পনার বাইরে। বাংলাদেশে ভরি হিসাবে সোনা দেয়। আর এখানে কেজি হিসাবে সোনা দেয়!

দক্ষিণ ভারতে Muthut Finance Group নামি দামি বড় কোম্পানি। এই কোম্পানির মালিক তার মেয়ের বিয়েতে ৫ কেজি সোনা দিয়েছে! সোনার ভারে মেয়ের শরীর ঢেকে যায় এমন অবস্থা। এ তো গেল অতি বড় লোকদের কথা। সাধারণ মধ্যবিত্ত ভারতীয়রাও যৌতুক দেয়ার বেলায় পিছিয়ে নেই। আমাদের প্রতিবেশি, সাফিরের স্পন্সর অফিসার অল্পবয়সি একজন লেফটেন্যান্ট। তার বোনের বিয়েতে তাদের পরিবার থেকে দেড় কেজি সোনার গয়না দিয়েছে। কেজি দরে সোনা যারা বোঝে না, তাদের জন্য বলছি, ১ কেজি সোনা মানে প্রায় ১৪০ ভরি!!

Muthut Finance Group এর কণ্যার বিয়ের ছবি

আবার এই অফিসার নিজে যখন বিয়ে করেছে, তখন কিন্তু স্ত্রীর জন্য মাত্র তিন খানা শাড়ি আর মঙ্গল সুত্র কিনেছে ব্যাস! যদিও তারা স্বামী স্ত্রী পারিবারিক জীবনে খুব সুখি। কেরালার কালচারই এমন। এদের নাহয় প্রেমের বিয়ে। কিন্তু যেসব বিয়েতে যৌতুক ঠিকমত দেয়া হয় না, বিয়ের পর শ্বশুর বাড়ির নির্মম নির্যাতনের স্বীকার হয় মেয়েটি। আর যৌতুক না দিলে প্রভূত অঞ্চলে মেয়েদের বিয়েই হয় না!

তাই ভারতীয়দের দেখা যায়, সারাজীবন পয়সা জমায় আর সোনা জমায়, তারপর এই সঞ্চয় দিয়ে মেয়ের বিয়ে দেয়। এজন্য যারা এত ঝামেলায় যেতে চায় না, তারা মনে করে তার চেয়ে মেয়ে সন্তান মেরে ফেলাই যুক্তি যুক্ত কাজ। এই ভাবে যদি চলতে থাকে, তাহলে আগামী একশ বছর পর এই দেশের জনসংখ্যায় নারীর সংখ্যা আতঙ্কজনক হারে কমে যাবে। এখন তো ভারতের কিছু কিছু যায়গার মানুষ বিয়ের জন্য মেয়ে পাচ্ছে না, তখন তো গোটা ভারতের অবস্থা হবে তথৈবচ!!

ভারতে জনগন কে সচেতন করার জন্য বহু পদক্ষেপ গ্রহন করা হচ্ছে। হাতে গোনা কিছু মানুষের হয়তো বোধদয় হচ্ছে। যেমন আমার আরেক প্রতিবেশী মিস্টার ও মিসেস গৌতম কুমারের বিয়ের কথাটাই বলি। গৌতমের বাবা অনেক বড় মনের মানুষ, উনি ছেলের বিয়ের সময় এক পয়সাও যৌতুক নেন নি। ভারতে উনার মত উদাহারন বিরল। তিনি তার পুত্র বধুকে অত্যন্ত স্নেহ করেন, আর গৌতমের স্ত্রী তার শশুরের কথা বলতে গেলেই দেখা যায়, শশুরের প্রতি সম্মানে আর শ্রদ্ধায় তার চোখের কোনে অশ্রু চিক চিক করে। অনেক বেশী নির্মম আর নিষ্ঠুর কাহিনী শুনতে শুনতে এরকম একটি ছোট কিন্তু সুন্দর ঘটনা, চৈত্রের তীব্র খরতাপে এক পশলা বৃষ্টির মত সুখের অনুভূতি জাগায়। মনে হয় নাহ, এই দেশে এখনো আশা আছে। আল্লাহ্‌ যেন এদের হেদায়েত দেন।

পুনশ্চঃ উপরের কাহিনীগুলো আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছরের আগের ঘটনা। ভারতে এখনো নারী সংক্রান্ত বিষয়ে তেমন কোন উন্নতি হয় নি। সেই সময় আমাদের দেশের অবস্থা এতটা খারাপ ছিল না। নারীরা তখন এতটা অনিরাপদ ছিলনা মাতৃভূমি বাংলাদেশে! কিন্তু আজ, অত্যন্ত দুঃখের সাথে, বুক ভরা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে স্বীকার করতে হচ্ছে, আমাদের দেশ অন্যান্য ক্ষেত্রে যতটা উন্নতির দিকে এগোচ্ছে, নারীদের নিরাপত্তার অভাবও যেন উত্তরোত্তর ততটা অবনতির দিকে যাচ্ছে!!

এখন আমাদের নারীরাও আর নিরাপদ নেই, আড়াই বছরের শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধা পর্যন্ত কেউ আজ নিরাপদ নয়। প্রতিবেশী থেকে শুরু করে বন্ধু… কেউ আর বিশ্বস্থ নেই!! আল্লাহ্‌ যেন আমাদেরও হেদায়েত দেন।

Most Popular

To Top