নাগরিক কথা

হে প্রজন্ম, তোমরা যখন মুমূর্ষু রোগীর পাশে দাঁড়ায়ে সেলফি আপলোড করো…

rta neonaloy নিয়ন আলোয়

সকাল সকাল হাসপাতালে ঢুকে ইমার্জেন্সি ডিউটির দায়িত্ব হাতে নিয়েই বিপদে পড়লাম। ইমার্জেন্সি রুমে শোরগোলের শব্দ শুনে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গিয়ে দেখি একজন অচেতন তরুণ রোগীকে কয়েকজন ধরাধরি করে এনে ইমার্জেন্সি বেডে শুইয়ে দিয়েছে। যে তরুণ ছেলেগুলো অজ্ঞান রোগীটিকে নিয়ে এসেছে, শোরগোলটা তারাই করছে।

পেশেন্টকে অ্যাসেস করলাম। Road traffic accident (RTA) এর রোগী। আমাদের দেশে RTA এর পেশেন্টের পরিমাণ যে কত বেশী, সেটা একমাত্র আমরা যারা হাসপাতালের ইমার্জেন্সি রুমে থাকি তারা টের পাই, পত্রিকায় সেটার ১০ ভাগের ১ ভাগও আসে না। নীরবে-নিভৃতে এদেশে প্রতিদিন RTA এর নামে একের পর এক লোককে স্রেফ হত্যা করা হচ্ছে। অবশ্য যে দেশের নীতিনির্ধারকরা বলেন যে গরু-ছাগল দেখে চিনতে পারলেই ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়া যেতে পারে, সেখানে এসব কথা বলা অর্থহীন।

যাই হোক, আঘাত বেশ মারাত্মক, পেশেন্ট শকে আছে, পালস্/বিপি-আনডিটেকটেবল, ইন্টারনাল ব্লিডিং হচ্ছে যদিও বাইরে থেকে দেখে সেটা বোঝার তেমন উপায় নেই। এ ধরণের রোগীর সামগ্রিক অবস্থা বোঝার জন্য আমরা GCS নামে একটি স্কেল ব্যবহার করি। GCS স্কেলে ১৫ তে ৫ এর মত দেয়া যায়, কোন সন্দেহ নেই রোগীর অবস্থা গুরুতর। পিউপিলের রেসপন্সও সুবিধার না, মস্তিষ্কের ভেতর রক্তক্ষরণ হবার সম্ভাবনা প্রবল।

মোবাইলের ক্যামেরার ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দে পেশেন্ট অ্যাসেসমেন্টের জগত থেকে বের হয়ে আসতে হলো। যে তরুণেরা রোগীটিকে নিয়ে এসেছে তারা ঐ আনকনশাস পেশেন্টের সাথে চেহারায় আনন্দের বিশেষ ভঙ্গিমা এনে একটার পর একটা ছবি তুলছে। এক ফাঁকে বোধ হয় ত্যাঁছড়া করে আমার ছবিও তুললো। এমন অবস্থায় মানুষের মাথায় ছবি তোলার চিন্তা আসে কি করে! “মানুষ এত লক্ষ বছর পৃথিবীতে হেঁটে কতটুকু এগোলে মানবতার পথে” -কে বলেছিলো কথাটা? মনে করতে পারলাম না….

যাই হোক, রোগীকে ইমার্জেন্সি ফ্লুয়িড দিতে হবে, নিজেই একতলা হতে দোতলায় ছুটে গেলাম স্যালাইনের ব্যাগ আনতে। যাবার আগে আল্ট্রামর্ডান তরুণদের একটা কাগজে I/V ক্যানুলা লিখে দিয়ে সেটা নিয়ে আসতে বললাম।

স্যালাইন নিয়ে নীচে এসে মিনিট কয়েক বসে রইলাম, ক্যানুলার কোন খবর নেই। বুঝলাম বিপ্লবী তরুণেরা ভেগেছে। আপনারা কি আশ্চর্য হয়েছেন? আমি কিন্তু হইনি, আমাদের চিকিৎসকদের কাছে এটা খুবই সাধারণ একটা ঘটনা।

তবে বিষয়টা হলো কি, সময় এখন ফেসবুক-টুইটারের, কিছুক্ষণের মাঝেই হয়তো ফেসবুকে সেই তরুণেরা বিপ্লবী স্ট্যাটাস প্রসব করবে-“হাসপাতালে জ্যান্ত রোগীকে নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু তাকে বিনা চিকিৎসায় ফেলে রেখেছিলো এই সেই কসাই ডাক্তার, শেয়ার করে সবাইকে জানিয়ে দিন….”

ক্যানুলা ম্যানেজ করলাম, স্যালাইনও চালু হলো, বেশ কিছুক্ষণ স্যালাইনের ব্যাগ চেপে ধরে রাখতে হলো যাতে Adequate ফ্লুয়িড রান করে। ব্লাড প্রেসার, পালস্- ডিটেকটেবল হলো। কিন্তু মাথার ভেতরে যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে সেটার চিকিৎসা তো এখানে সম্ভব না, ঢাকায় পাঠাতে হবে।অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভারকে ডাকলাম। উনি তেলের টাকা না দিলে ঢাকায় নিয়ে যেতে অপারগতা প্রকাশ করলেন। রোগীর সাথে তখন কোন কাকপক্ষীও নেই!

মেডিসিনের কনসালটেন্ট আপু দূর থেকে এসব দেখে বিষয়টা বোধ হয় কিছুটা আঁচ করতে পারলেন। আমার হাতে বেশ কিছু টাকা দিয়ে বললেনঃ “জামান, আপাতত আমার কাছে এত আছে। এটা নাও, রোগীর জন্য যতটুকু করা যায় করো”।

অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভারকে রোগীকে নিয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে গিয়ে ভর্তি করে আসতে বললাম। রিকোয়েস্ট করলাম, যাতায়াত বাবদ এরপর আর যতটুকু লাগে সেটা আমি পরে দিয়ে দেব। অ্যাম্বুলেন্স অচেতন রোগীকে নিয়ে সাইরেন বাজিয়ে ছুটে চললো….

রোগীকে বিদায় দিতে দিতে কখন যে হাসপাতালের বাইরে চলে এসেছি-সেটা আমার নজরে পড়ে নাই। মাথা নীচু করে দু’হাত পেছনে রেখে চিন্তামগ্ন হয়ে হাসপাতালে ঢুকছি। মনটা খারাপ হয়ে গেলো। জানি না, কোন মায়ের আদরের ধন এভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় রাস্তায় পড়ে ছিলো।Life is so unpredictable, In fact you never know what will happen in next few seconds….

আমার আর কিছু বলার নেই। তবে লেখা শেষ করার আগে এ প্রজন্মের তরুণদের, যুবকদের আমার কিছু বলার আছে। সেটা বলে বিদায় নিচ্ছিঃ

হে প্রজন্ম, তোমরা যখন মুমূর্ষু রোগীর পাশে দাঁড়ায়ে সেলফি খিঁচে সোশাল মিডিয়ায় মানবতার ঝড় তোলো, আমরা চিকিৎসকরা তখন মানবতা দেখাই রোগীর চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে গিয়ে। তোমরা যখন চিকিৎসকের মুন্ডুপাত করে শুধু হাসপাতালে রোগীকে নিয়ে এসে ক্রেডিট নাও, আমাদের তখন ঐ মৃতপ্রায় রোগীকে স্থিতিশীল করতে ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা হয়। সোশাল মিডিয়ায় আমাদের বিরুদ্ধে যে ঝড় তোমরা তোলো, সেটা আমাদের স্পর্শ করে। রোগীকে সুস্থ করার প্রয়াসে আমরা যে ঝড়ের মাঝ দিয়ে নিত্যদিন যাই-তা কিন্তু তোমাদের কখনো স্পর্শ করে না….

Most Popular

To Top