বিশেষ

বাংলাদেশের গিটারম্যানঃ ইব্রাহীম আহমেদ কমল

কমল নিয়ন আলোয় neonaloy

বাংলাদেশের কোন ব্যান্ডসঙ্গীতপ্রেমীকে যদি বলা হয় বাংলাদেশের সেরা কয়েকজন গিটারিস্টের নাম বলতে, তাদের সবারই লিস্টের একদম উপরের দিকে একজনের নাম অবশ্যই পাওয়া যাবে, সেটি হচ্ছে “ইব্রাহীম আহমেদ কমল”

হ্যাঁ, আমি “গিটারম্যান কমল” এর কথাই বলছি।

কমল নিয়ন আলোয় neonaloy

গিটারম্যান ইব্রাহীম আহমেদ কমল

সেই ১৯৮৪ সালে আজকের ওয়ারফেইজ ব্যান্ড দিয়ে ব্যান্ড মিউজিক ক্যারিয়ারে গিটারিস্ট এবং কম্পোজার হিসেবে যাত্রা শুরু করেন এই কিংবদন্তী। সেই থেকে আজ পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করে ভালো মিউজিক সৃষ্টি করে শ্রোতা এবং ভক্তদের দিয়ে যাচ্ছে্ন।

এই কিংবদন্তীর কাজ এবং প্রতিভা দেখে বাংলাদেশেরই আরেকজন কিংবদন্তী আইয়ুব বাচ্চু বলেছেন-

“He is the best. He should always be in the top.”

ওয়ারফেজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য এই কিংবদন্তী প্রথমদিকে ব্যান্ডে বেজ গিটার বাজাতেন। তখন ড্রামসে ছিলেন হেলাল, মীর এবং নাইমুল লিড ও রিদম গিটার প্লে করতেন, আর বাপ্পি ভোকাল ছিলেন। বাপ্পি, মীর এবং নাইমুল ব্যাক্তিগত কারণে ব্যান্ড ছাড়ার পর বাবনা করীম আসেন বেজিস্ট হিসেবে এবং কমল ব্যান্ডে লিড গিটারের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন। ১৯৮৬ সালে শেখ মনিরুল আলম টিপু আসেন ড্রামসে এবং সাথে রাশেদ ভোকালে আসার পর ব্যান্ডটি মোটামুটি দৃঢ়তা লাভ করে।

কমল নিয়ন আলোয় neonaloy

সেকালের ওয়ারফেইজ

৯০ দশকের দিকে বাংলাদেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি’র অবস্থা এমন ছিলো যে তখন মানুষ পপ, ক্লাসিক, লোকসঙ্গীত ছাড়া তেমন কিছু শুনতো না। হাতে গোনা কিছু মানুষ রক শুনতেন, কিন্তু সংখ্যায় তারা ছিলেন অনেক কম। বিদেশি রক ব্যান্ড হলে তো আর সেই সংখ্যাটাও পাওয়া যেতো না। এমনকি মিউজিসিয়ানরাও প্রচলিত কিছু জনরার বাইরে মিউজিক করার কথা ভাবতেও পারতেন না।

কিন্তু, সেই ১৯৯১ সালে ওয়ারফেজের সেলফ টাইটেল্ড এলবামের মাধ্যমে সেই মিউজিক সীনে হাই পিচের ভোকাল, পরাক্রমশালী সলো, ডিস্টর্শন গিটারের ফাস্ট প্লেয়িং, ব্লাড পাম্পিং ড্রাম বিটস কি জিনিস বুঝিয়ে দিয়েছে তখনকার শ্রোতাদের।

সেই থেকে বাংলাদেশে হার্ড রক এবং হেভী মেটাল মিউজিকের যাত্রা।

এভাবেই এই ব্যান্ডটি অবাক ভালোবাসা (১৯৯৪), জীবনধারা (১৯৯৭), অসামাজিক (১৯৯৮), আলো (২০০১), মহারাজ (২০০৬) এবং সত্য (২০১২) নামক কিছু এলবাম সহ আরো কিছু সিঙ্গেল রিলিজ করে আজকের দিনে এখনকার সময়ের অন্যতম লিডিং ব্যান্ড হিসেবে আছে এই দেশের।

নতুন মিউজিসিয়ানদের ব্যান্ড মিউজিকের প্রতি আগ্রহী করতে ওয়ারফেজ অনেক অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। আর্টসেল তাদের মধ্য অন্যতম একটা ব্যান্ড।

প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য হলেও কমল পুরো সময় ওয়ারফেজে ছিলেন না। মাঝে ২০০৬ সালে তিনি বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ড “অর্থহীন” এ যোগদান করেন। এ সময় বেইজবাবা সুমন, শিশির, রাফা’র লাইনআপ নিয়ে অর্থহীন রিলিজ করে তাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্টুডিও অ্যালবামগুলোর মধ্যে অন্যতম- অসমাপ্ত ১ এবং ২। সেই সাথে এ সময় ব্যান্ডটি রিলিজ দেয় আরো কিছু সিঙ্গেলস। সেই সাথে অর্থহীন, ওয়ারফেজ এবং হাবিব ওয়াহিদ মিলে “সমর্পণ” নামে একটি মিক্সড অ্যালবাম রিলিজ দেন যাতে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছিল বাংলাদেশের লোকসঙ্গীতের কিংবদন্তি লালন সাঁই এবং বাউলসম্রাট শাহ আব্দুল করিমের সৃষ্টিকর্মকে। ২০০৭ সালে কমল ওয়ারফেজের সাথে আবারও কাজ করা শুরু করেন এবং ২০১৪ সালে তিনি অফিসিয়ালি অর্থহীন থেকে বিদায় নেন।

কমল নিয়ন আলোয় neonaloy

কমলের অর্থহীনে থাকাকালীন সময়কার একটি ছবি (রাফা-কমল-শিশির)

বেজবাবা সুমন কমলকে নিয়ে বলেছিলেন,

“আমি খুবই গর্বিত গিটারিস্ট/মিউজিসিয়ান কমল ভাইয়ের সাথে বাজাতে পেরে। তিনি বাংলাদেশের অন্যতম একজন অনুপ্রেরণামূলক, ব্যাতিক্রমী, অভূতপূর্ব মিউজিসিয়ান। আমার অনেক ভক্ত আমাকে জিজ্ঞেস করে যে আমি কার থেকে বেজ বাজানো শিখেছি, আমি প্রায় একাই শিখেছি বেজ বাজানো। কিন্তু আমাকে যদি জিজ্ঞেস করো আমার অনুপ্রেরণা কে ছিলো? আমি অবশ্যই বলবো কমল ভাই। আপনারা চিন্তাও করতে পারবেন না কমল ভাই কতো ভালো বেজ বাজায়। আমি সবসময় তাকে ওয়ারফেজের আগের দিনগুলোতে এবং এইসেস (গেস্ট গিটারিস্ট) এ বাজাতে দেখতে ভালোবাসতাম।”

কমল নিয়ন আলোয় neonaloy

বেজ গিটার হাতে কমল

গত বছরের শেষদিকে নিউজ রিপোর্টগুলোতে খবর আসে যে শারীরিক অসুস্থতার কারণে কমল মিউজিক থেকে অবসর নিবেন।

তিনি বলেন, “আমি স্টেজে এবং রেকর্ডিংগুলোতে সক্রিয় সেই ৮০’র দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে। এজন্য ফিট থাকা লাগে। হেভী মেটালের কারণে শারীরিক ইনজুরি ২০১০ থেকে আমাকে ভোগাচ্ছে এবং আজ পর্যন্ত সাথে আছে। একজন এ্যাথলেট যথাযথ প্রতিষেধক, ফিজিওথেরাপী এবং বিশ্রাম নিয়ে ঠিক হতে পারে; কিন্তু আমার জীবনে বিশ্রাম বলতে কিছু নেই। আমার ডাক্তারের উপদেশ হচ্ছে বিশ্রাম নিয়ে ধীরে ধীরে আরোগ্য লাভ করা, নাহয় সামনে এর পরিণতিতে ভোগা।”

ওয়ারফেজ নিয়ে তিনি বলেন,

“আমি স্টেজে বাজানো থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবসরে যাচ্ছি। আমি এখন আর স্টেজের অঙ্গীকার রাখতে পারছি না। আপনাদের ধন্যবাদ এতো বছর ধরে আমাকে সমর্থন করার জন্য। আমি আপনাদের প্রত্যেকের কাছেই অনেক কৃতজ্ঞ যাদের সাথে আমার কর্মক্ষেত্রে দেখা করার এবং অন্তত এক মিনিট সময় নিয়ে কথা বলার সৌভাগ্য হয়েছে।“

তার বর্তমান ব্যান্ড “ওয়ারফেজ” এ তিনি নিজের বদলে “সৌমেন দাস” কে দিয়ে গেছেন ওয়ারফেজে যাকে তিনি নিজে বেছে নিয়েছেন তার বদলী হিসেবে তার ব্যান্ডে।

কমল এই নিয়ে আরো বলেন যে

“ওয়ারফেইজ অবিরত থেকে চলবে এবং আমি একটা উপায় বের করবো যাতে আমাদের মিউজিকাল লিগ্যাসি বজায় রাখতে পারি সাথে আমার কাজের সম্পর্কগুলোও কিন্তু এখন না”

যদিও ব্যান্ডের ড্রামার এবং ব্যান্ড লিডার “শেখ মনিরুল আলম টিপু” কমলের এই অবসরকে “সাময়িক বিরতি” বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি আরো বলেন যে,

“আমি মনে করছি এটা অস্থায়ী পশ্চাদপসরণ। কমল আমাদের কনসার্টগুলোতে শারীরিকভাবে উপস্থিত না থাকতে পারলেও তিনি সবসময় ওয়ারফেইজের সাথে জড়িত থাকবেন।”

যদিও তার অবসরের পরেও কিছু কিছু জায়গায় তাকে বাজাতে দেখা গেছে স্টেজে ওয়ারফেজের সাথে।

কমল নিয়ন আলোয় neonaloy

বাংলাদেশের “গিটারম্যান”!

আজ হোক, কাল হোক, সব মিউজিসিয়ানকেই একসময় মিউজিক থেকে অবসর নেওয়া লাগে। কে কতোদিন ইন্ডাস্ট্রিতে ছিলেন, তার চেয়ে কে কতোটা অবদান রেখেছেন মিউজিকে- সেটাই বেশী ফোকাসে পড়ে সবসময়। কমল ত্রিশ বছরের বেশী সময় ধরে মিউজিক করছেন এবং এছাড়াও তিনি যসব অবদান রেখে গিয়েছেন বাংলাদেশ মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে তা অতুলনীয়। তাকে নিয়ে দেশের দুটো বিখ্যাত রক ব্যান্ড “অর্থহীন” এবং “ওয়ারফেজ” তাদের সর্বকালের সেরা কিছু এলবাম রিলিজ করে। একটা কথা আছে যে, সময়ের স্রোতে একসময় মানুষ হারিয়ে যায়। সময়ের স্রোতে তিনি হারিয়ে গেলেও তার কাজ তাকে হারাতে দেবে না মোটেও, গিটারম্যান ইব্রাহীম আহমেদ কমল বেঁচে থাকবে শ্রোতাদের হৃদয়ে যুগ যুগ ধরে এবং তার কাজ অনুপ্রেরণা যোগাবে সামনের দিনের ভবিষ্যৎ মিউজিসিয়ানস এবং গিটারিস্টদের।

Most Popular

To Top