বিশেষ

বিশেষ দিবস, এবং আমাদের দায়সারা “সোশ্যাল মিডিয়া আদিখ্যেতা”

আন্তর্জাতিক মা দিবস এবং আন্তর্জাতিক বাবা দিবস, এই দুটো দিবসে পুরো পৃথিবীজুড়ে মানুষদের দেখা যায় মা-বাবার সাথে ছবি আপলোড করে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে।

আমি অন্য দেশের কথা বলবো না যেহেতু সেখানের নিয়ম এবং সংস্কৃতি একদমই আলাদা আমাদের দেশের থেকে। পশ্চিমা বিশ্বে সাধারণত আঠারো (১৮) বছর বয়সের পর সন্তানরা বাবা-মা এর থেকে আলাদা থাকতে চলে যায় আলাদা বাসা নিয়ে যেখানে এই দেশে সেই বয়সে সাধারণত এইচএসসি দেয়। এছাড়াও আরো অনেক কিছুতে অমিল আছে আমাদের দেশের সংস্কৃতির সাথে তাই সেই প্রসঙ্গ নিয়ে আমি কিছু বলবো না।

আমার কথা হচ্ছে এই একদিনই কেন? এই একদিনই এতো লোক দেখানো ভালোবাসার কি দরকার যেখানে আমরা সিংহভাগই অন্য যেকোন সাধারণ দিনে কখনো মা-বাবাকে জিজ্ঞেসও করি না “কেমন আছো মা/বাবা? খেয়ে বা ঔষধ নিয়েছো? আসো একটু গল্প করি।”

আমরা নিজের জামা কাপড় ধোয়া বা নিজের সব কাজ নিজে করার কথা বাদ দিলাম, আমরা অনেকে আছি যারা বাসায় ফিল্টারের থেকে পানি বোতলে ভরা থেকে শুরু করে বাসায় কলিংবেল বাজলে দেখে দরজা খোলার মতো ছোট ছোট কাজগুলো অনেকেই করি না, মা-বাবা বা অন্য কেউ করে।

অনেক সময় বুঝে না বুঝে রাগ দেখাই, খারাপ ব্যবহার করি তাদের সাথে। কিছুসময় পরে এখনকার সময়ের সবচেয়ে বাধাবুলি শব্দ  “sorry” ইচ্ছে করলে বলি, না বললে নাই। কয়েকদিন পর আবার সব ঠিক হয়ে যায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যেখানে আমাদের সাথে তারা অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও কোন ত্রুটি করলেই সেটার জের ধরে পারলে কয়েকদিন পর পর একই কথা শুনাই তাদের। এতো কিছুর পরও তারা মুখ বুঝে সব সহ্য করে যায়, আমাদেরকে তাদের বাসাতেই রাখে তাদের সাথে, ভরপুর খাবার খেতে দেয় তিনবেলা বাজার করে এনে রেঁধে রেঁধে।

এই এতোকিছুর প্রতিদান এই একদিনে একটা ছবি আবেগী একটা ক্যাপশন দিয়ে আপলোড দিলেই সব মাসুল হয়ে যায়?

তার উপর আমাদের চারপাশে অনেকেই আছে যাদের মাঅথবা বাবা কিংবা দুজনের কেউই আর তাদের সাথে নেই, পরকালে চলে গেছেন তাদের ইহকালে রেখে।

যখন তারা বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে দেখে তাদের বন্ধু-বান্ধব ছবির ক্যাপশন বাদ, তাদের নিজ নিজ বাবা বা মায়ের সাথে ছবি তুলে আপলোড দিচ্ছে, তাদের কেমন বা কতোটা খারাপ লাগে সেটা কখনো ভেবে দেখেছেন?

বিধাতার অশেষ কৃপায় সেটা আমি এখনো নিজে অনুভব করিনি কিন্তু ইংরেজীতে একটা শব্দ আছে “EMPATHY” বাংলায় যাকে বলে “সহমর্মিতা”, সেটা দিয়ে যদি আপনি এই পুরো জিনিসটা তার জায়গার থেকে ভেবে দেখেন তাহলে নিজেকে অনেক অসহায় লাগে একদম।

মনে হয়ে নিজের পায়ের নিচে কোন মাটি নেই, কখনো নিজের পায়ের সাথেই পা বেঁধে আছাড় খেয়ে পড়লে কেউ ধরার কথা বাদ, পড়ার পর টেনে উঠানোরও কেউ নেই।

আপনার মা-বাবাকে যদি বলতে চান “মা/বাবা তোমায় অনেক ভালোবাসি” কিংবা “ধন্যবাদ তোমাদের আমাকে একদম ছোটবেলার থেকে পেলে আমাদের সব মৌলিক চাহিদা চাইবার আগে দিয়ে এতো বড় করার জন্য” বা এরকম কোন কথা, এটার জন্য কোন দিন লাগবে না বা থাকা উচিৎ না।

এটা যেকোন দিন যেকোন সময় বলা যায় তাদের।

আমি আমার ব্যক্তিগত জীবন থেকে বললে বলবো যে আমি ছোটবেলার থেকেই যখন যেটা ভালো লাগে, তখন সেটার উপর একদম উপরে-দুমড়ে পড়ে লেগে থেকেছি, সেটার সাথে সম্পর্কিত সবকিছু জানতে বা সংগ্রহ করতে অনেক বেশী ভালো লাগতো।

এমনই একটা জিনিস ছিলো বাংলাদেশে ২০০২ সালে আমি ক্লাস ওয়ানে পড়াকালীন সময়ে বের হওয়া জনপ্রিয় এনিমে সিরিজ “পোকেমন”। রবি থেকে শুক্রবার প্রতিটাদিন বিকাল ৫.৩০ থেকে ৬.০০টা পযন্ত বসে বসে সেটা একদম মনোযোগ সহকারে দেখতাম যে সেখানের প্রধান চরিত্র “এশ কেচাম” কি করে এবং কিভাবে তার পোকেমন মাস্টার হওয়ার ভ্রমণপথ কোনদিকে মোড় নেয় সেটা দেখতে।

শুধু দেখেই সন্তুষ্ট ছিলাম না, যেহেতু ক্লাস ওয়ানে পড়তাম কেবল স্কুল ব্যাগ থেকে শুরু করে ফ্লাস্ক, পেন্সিল বক্স, রাবার ,স্কেল, শার্পনার, পেন্সিল সব পোকেমনেরই কেনা হয়েছে আমার। বাদ যেতো না জামা কাপড়ও। কোন দোকানের পাশ দিয়ে গেলাম এবং পোকেমন সম্পর্কিত কিছু দেখলাম যেটা আমার সংগ্রহে নেই সেটা কেনা লাগবেই আমার। কখনো কিনে দিতো, কখনো বকা ঝকা দিয়ে বাসায় নিয়ে আসতো আর মন খারাপ করে বসে থাকতাম কয়েকদিন সেটার জন্য যদিও বেশিরভাগ জিনিসই পেয়েছি।

ঠিক সে সেময় একতা জিনিস খুব প্রচলিত ছিলো সেটা হলো “পোকেমন কার্ড”। এই পোকেমন কার্ডের জন্য যে কি করতাম। একটা প্যাকেটের সাইজ অনুসারে ১৫ থেকে শুরু করে ৪০০ পযন্ত কার্ডও থাকতো সংখ্যায়। সেসবের দামও সেই সময়ে ১৫টাকা থেকে শুরু করে ১০০০ টাকায় গড়াতো প্যাকেটের দাম। তো যেটা বলছিলাম,  কিন্ডারগার্টেনে যেসব ক্লাস টেস্ট/মাসিক বা সাপ্তাহিক পরীক্ষা সব হতো, সেসকল পরীক্ষার প্রস্তুতি এমনই হোক, পরীক্ষার হলে  ঢুকার আগে আম্মু-আব্বুর সাথে চুক্তি করতাম যে যদি এই পরীক্ষার ১০ এ ৮/৯ এর বেশী পাই, আমাকে ওই স্টেশনারীর অমুক পোকেমনের ছবিওয়ালা প্যাকেটটা (বিভিন্ন প্যাকেটে বিভিন্ন পোকেমন এর ছবি থাকতো আর সেভাবে সেসবের ভেতরে একটা নির্দিষ্ট সেটের কার্ড থাকতো) কিনে দিতে হবে।

যদিইও বেশিরভাগ সময়ই মাসিক পরীক্ষার পর একটা করে ১৫ টাকার প্যাকেটই কিনেছিলাম কিন্তু সেই ২০০২ সালে ১৫ টাকা খুব কম একটা পরিমাণ ছিলো না এবং আমার সেই সময়ের পরীক্ষায় রেজাল্ট ভালো করার পিছনে ফার্স্ট সেকেন্ড হবো ক্লাসে এমন কোন উদ্দেশ্য কাজ করতো নাহ, যেটা কাজ করতো তা হলো ফার্স্ট বা সেকেন্ড যে হবার হোক, আমি এই পরীক্ষায় ভালো মার্ক তুলবো যাতে আমাকে আম্মু/আব্বু ওই ছবিওয়ালা কার্ডের প্যাকেটটা কিনে দেয়।

এভাবে যে কতো পোকেমন কার্ড কিনেছি, হারিয়েছি, কিনেছি তার হিসেব নেই। কিন্তু এখনও আমার কাছে সেই কালেকশনটা আচ্ছে আর সেখানে কার্ডের পরিমানও নেহায়েত কম না।

আমার সেই পোকেমন কার্ড কালেকশনের বর্তমান অবস্থা।

এবং এই পোকেমন ক্রেজ আমার মধ্য মোটামুটি ক্লাস সিক্স পযন্ত কাজ করেছে। আমি এখন যখন চিন্তা করি তখন মনে হয় কি বোকার মতো বায়নাতাই না করেছিলাম।  বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্তারা তখনকার সময়ে ৫ টাকা বাঁচানোর জন্য রোদ/বৃষ্টির তোয়াক্কা না করে হয়তো ২-৩ কিলো রাস্তা অনায়াসে হেঁটে পার করতো এবং যেহেতু  আমরাও মধ্যবিত্ত ছিলাম, আমার বাবাও হয়তো এই কাজটা করেছে কিন্তু তখন আমার দিকে তাকিয়ে বেশিরভাগ সময়ই এসবে আমাকে কখনো মানা করেনি, সেই বাচ্চা মানুষটার মন ভাঙ্গার মতো সাহস তার হয়নি।

আমি আমার বাবা-মায়ের কাছে এই জন্য সবচেয়ে বেশী কৃতজ্ঞ। অন্যনা সবকিছুর জন্যও আমি একই ভাবে অনেক বেশী পরিমাণের কৃতজ্ঞ তাদের কাছে কিন্তু এই জিনিসটার জন্য একটু বেশিই কৃতজ্ঞ।

আমরা আমাদের বাবা-মা কে যতোটাই ভালোবাসি না কেন বা কৃতজ্ঞ হই না কেন, সেটা কখনোই যথেষ্ট হবে না।

বাবা-মা ছাড়া এই পৃথিবীর কেউ কারো আপন নয় একজন মানুষের সেটা ১৯৮৮ সালের জাপানিজ টু-ডি সিনেমা “গ্রেভ অফ দ্যা ফায়ারফ্লাইস” অনেক সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছে। একটা টু-ডি এনিমেশন মুভি একটা বাস্তব প্লট এতো সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছে সেই ১৯৮৮ সালেই যেটা এখনকার অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দিয়েও অনেক সিনেমা ফুটিয়ে তুলতে পারবে না।

“গ্রেভ অফ দ্যা ফায়ারফ্লাইস” সিনেমার পোষ্টার।

কেউ না দেখে থাকলে এটা দেখা তাদের জন্য আবশ্যক বাবা-মা এর কদর বোঝার জন্য।

এখনকার সময় বাদ দিয়ে ইতিহাসের দিকে তাকালেও দেখা যাবে যে নিজ সহোদর ভাইবোনের মধ্য সম্পত্তি-টাকা বা স্বার্থের লোভের কারনে অনেক কলহ-বিবাদ লেগেছে ইতিহাসে এবং সেটা অনেক সময় খুব বাজে দিকে মোড় নেয় কিন্তু এই পৃথিবীতে একমাত্র বাবা-মায়ের সাথেই স্বার্থের কোনপ্রকার লেনদেন নেই।

বাবার স্নেহ (ক্রেডিটঃ- নাফি সামি ফটোগ্রাফী)

মায়ের মমতা (ক্রেডিটঃ- নাফি সামি ফটোগ্রাফী)

নিজেরা না খেয়ে,পড়ে, আমাদের সব চাহিদা পূরণ করেছে এবং কোনপ্রকার অভাব টের না পাওয়ার জন্য সর্বস্ব করে গিয়েছে সবসময়।

তাই এই একটা ছবি আবেগী এবং হার্ট ইমোটিকন ভর্তি  ক্যাপশন দিয়ে কোন সামাজিক মাধ্যমে আপলোড করা মোটেও যুক্তিসম্মত কিছু না বলে আমি মনে করি।

এর চেয়ে তাদের কাছে গিয়ে, ১০-১৫ মিনিট তারা কেমন আছে জিজ্ঞেস করে তাদের সাথে সুখ দুঃখের গল্পও করেন, সেটা বেশী ভালো লাগবে তাদের।

তারা এই মুহূর্তে কাছে না থাকলে তাদের ফোন করে ১০-১৫ মিনিট খোঁজখবর নিয়ে কথা বলেন, তারা আপনার সেই ২০-৩০ টাকার ফোনের বিলের বিনিময়ে যেই খুশিটা হবে সেটা আপনি তাদের অনেকসময় ২০০০-৩০০০ টাকার গিফট কিনে দিয়েও খুশি করতে পারবেন না আর যাদের বা-মা ইহকালে আর নেই, যে যার ধর্ম অনুসারে তাদের জন্য প্রার্থনা করুন বিধাতার কাছে, আপনি নিজেও শান্তি পাবেন এবং তারাও খুবই খুশি হবে আপনি তাদের স্বরণ করেছেন দেখে এটা নিশ্চিত একদম।

পরিশেষে এটাই বলবো যে এই পৃথিবীতে যার মা-বাবা এখনো উভয়ই আছে, তার মতো ভাগ্যবান মানুষ খুবই কম আছে এই পৃথিবীতে।

আমাদের সবাইকে বিধাতা হতে দেয়া এই অমূল্য সম্পদের যথাযথ খেয়াল এবং যত্ন নেয়া উচিৎ হারানোর পর কোনপ্রকার কান্নাকাটি বা হাহাকার করে লাভ নেই।

একটা বাংলা প্রবাদ আছে, “দাঁত থাকতে দাঁতের কদর করা উচিৎ”!

Most Popular

To Top