নাগরিক কথা

একজন বৃদ্ধ, এবং তার মরচে পড়া সাইকেল…

জাস্টিন ট্রুডো স্মৃতি নিয়ন আলোয় neonaloy

ক্যানাডার ক্যারিসমেটিক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো একটা আত্মজীবনীমূলক বই লিখেছেন। বইটার নাম ‘কমন গ্রাউন্ড’। এটা প্রকাশিত হয়েছিলো ২০১৪ সালে। এই বইটার দুটো পৃষ্ঠাতে সুদর্শন এই তরুণ প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশেরও স্মৃতিচারণ করেছেন।

নয়াদিল্লীতে কমনওয়েলথের শীর্ষ সম্মেলনের অংশ নিতে তাঁর বাবা পিয়েরে ট্রুডো গিয়েছিলেন। বাবার সফরসঙ্গী হিসাবে বারো বছরের বালক জাস্টিনও সেখানে ছিলো। ক্যানাডার আর্থিক সহযোগিতায় বাংলাদেশে একটা বাঁধ নির্মাণ হচ্ছিলো। নয়াদিল্লীতে যাবার পথে সেটাকে দেখে যাবার সিদ্ধান্ত ছিলো প্রধানমন্ত্রী পিয়েরে ট্রুডোর। এ কারণেই বাংলাদেশে যাওয়া হয় তাঁদের। সেই সফরের একটা দৃশ্যকে জাস্টিন ট্রুডো উল্লেখ করেছেন তাঁর বইতে। দৃশ্যটা অগুরুত্বপূর্ণ এবং ক্ষণিক, কিন্তু এর প্রভাব এবং তাৎপর্য তাঁর জীবনে পড়েছে ব্যাপকভাবে। ট্রুডোর বইয়ের সেই অংশটার বাংলা অনুবাদ করে দিলাম। অনুবাদটাকে মুক্ত অনুবাদ বলতে পারেন, লাইন বাই লাইন ভাবার্থ কেউ মিলাতে গেলে ব্যর্থ হবেন।

“বাংলাদেশে ক্যানাডিয়ান সাহায্যে একটা বাঁধ তৈরি হচ্ছিলো। সেটা পরিদর্শন করার জন্য ১৯৮৩ সালে নয়া দিল্লীতে কমনওয়েলথ শীর্ষ নেতাদের সম্মেলনে যাবার পথে বাবা আর আমি বাংলাদেশে যাত্রাবিরতি করি। ক্যানাডিয়ান ডেলিগে্টদের সাথে আমরা এয়ারপোর্ট থেকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ভিতর দিয়ে গাড়িবহর নিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের গাড়িবহর অসহায়ভাবে ঢাকার ভয়াবহ জ্যামে আটকা পড়ে যায়। আমি একটা সরকারী গাড়ির ব্যাকসিটে ছিলাম। গাড়িটা জ্যামে একেবারেই স্থবির হয়ে ছিলো। শুধু আমি একা নই, অন্য সব গাড়িও আটকা পড়ে ছিলো এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ এবং ব্যস্ত শহরে। আমাদের চারপাশের সবাইকে এবং সবকিছুকেই জ্যাম না ছাড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

আমি পাশের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। রাস্তার পাশে একজন বৃদ্ধ লোক তার সাইকেল নিয়ে রাস্তা পার হবার জন্য অপেক্ষা করছেন। জ্যাম ছাড়লেই তিনি রাস্তা পার হবেন। বৃদ্ধের মুখে অসংখ্য বলিরেখা। বিপর্যস্ত জীবনের কাছে হার মানার ক্লান্তি ফুটে উঠেছে তাঁর চেহারার মধ্যে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য এই বৃদ্ধের আর আমার যাত্রাপথ মিশে গিয়েছিলো। তাঁকে দেখে আমার ভিতরে অদ্ভুত একটা বেদনাবোধ তৈরি হলো। বুঝতে পারলাম এই বৃদ্ধের জীবন কাহিনি কোনো দিনই জানা হবে না আমার। তিনি কোথা থেকে এসেছেন, কোথায় যাচ্ছেন, তাঁর জীবন কেমন, কিছুই জানবো না আমি। তাঁর জীবনের নানা ঘটনা, স্বপ্ন এবং উদ্বেগ সব মিলে তিনি আমার মতোই বাস্তব এবং গুরুত্বপূর্ণ।

আকস্মিকভাবেই আমার উপলব্ধি ঘটলো, এই গ্রহের বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষের মধ্যে তিনি এবং আমি মাত্র দুইজনই। আমাদের প্রত্যেকেই একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসাবে বিবেচনা করার দাবি রাখে এবং আমাদের প্রত্যকেরই নিজস্ব একটা গল্প আছে বলার জন্য।

আমার ধারণা, বারো বছরের একজন বালকের জন্য এমন ভাবনার উদ্রেক অস্বাভাবিক কিছু না। কেউ কেউ অবশ্য এগুলোকে ভুলে যায় পরের মুহূর্তেই। কেউ কেউ আমার মত টের পায় যে পরের কয়েকটা মুহূর্তে তাদের জীবন সম্পর্কে যে দৃষ্টিভঙ্গি সেটাই পাল্টে গিয়েছে আমূল। আমার ক্ষেত্রে ঘটেছিলো এই দ্বিতীয়টা। বিশেষ সুবিধা ভোগ করা একজন বালক হিসাবে আমার সেই সফরযাত্রার সব সুখস্মৃতি এবং বাবার সাথে আমার আরো বহু অবিশ্বাস্য সব ভ্রমণ, এগুলোর মাঝে এই ঘটনা সংকীর্ণ কিন্তু গভীর ফাটল তৈরি করে ফেললো। সেই বৃদ্ধের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তাঁর মরচে পরা সাইকেলটি, যা থেকে তিনি নামতে বাধ্য হয়েছিলেন তা সেই ফাটলের ভিতরে গেঁথে গেলো। সেই দিনের পর থেকে আমি আমার জীবন এবং পরিস্থিতিকে আর আগের মতো করে দেখতে পারি না।”

Most Popular

To Top