ইতিহাস

ইউটুঃ ইতিহাসের কালজয়ী এক রক ব্যান্ড

ইউটু ব্যান্ড নিয়ন আলোয় neon aloy

সবকিছুর শুরুটা হয় ১৯৭৬ সালে আয়ারল্যান্ডের ডাব্লিনের মাউন্ট টেম্পল কমপ্রিহেন্সিভ স্কুলে যখন একটা ব্যান্ড গঠন করার জন্য ল্যারী মুলেন নোটিশবোর্ডে এডভারটাইজ পিন করেন “Musicians wanted”। এবং এতে সেই স্কুলের তিন শিক্ষার্থী বোনো, ডেভিড এবং এডাম সাড়া দেন। ল্যারীর বাসার রান্নাঘরে সমবেত হন তারা। সেখান থেকেই শুরু আজকের বিখ্যাত আইরিশ ব্যান্ড ইউটু (U2)। যেখানে বোনো ছিলেন লিড ভোকাল এবং রিদম গিটারে, ডেভিড হাওয়েল ইভান ছিলেন কিবোর্ড, লিড গিটার এবং ব্যাকিং ভোকালে, এডাম ক্লেইটন চেলো বেজ-এ আর ড্রামসে ছিলেন ল্যারি মুলেন। তাদের এই মিউজিক গ্রুপের নাম প্রথমে ছিল “ফিডব্যাক”। তাদের প্র্যাকটিস সেশনগুলো সীমিত ছিল ল্যারীর রান্নাঘরেই।

ইউটু ব্যান্ড নিয়ন আলোয় neon aloy

যখন নাম ছিল ফিডব্যাক

প্রায় দেড় বছর প্র্যাকটিসের পর ব্যান্ডের নাম পরিবর্তন করে “হাইপ” রাখা হয়। সবশেষে তাদের নাম ঠিক হল আজকে পুরো বিশ্ব তাদের যেই নামে চেনে, সেই নামে- ইউটু(U2)। তাদের প্রথমে প্ল্যান ছিলো পোস্ট পাঙ্ক মিউজিক করার কিন্তু তাদের মিউজিকের ধরণ সময়ের সাথে অনেক পরিবর্তিত হয়। বিবর্তনের মধ্য দিয়েও একটা জিনিস সবসময়ই রয়ে গিয়েছিলো তাদের সব গানে এবং তা হচ্ছে একটা জোরালো ভাব যেটার কৃতিত্ব সিংহভাগই বোনোর কণ্ঠের এবং বাকি কিছু হচ্ছে ডেভিডের অভূতপূর্ব গিটারের কাজের। তাদের বেশির ভাগ লিরিক্সই আধ্যাত্মিক চিত্রাবলী, ব্যাক্তিগত বা সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের।
ব্যান্ডের সবার কমন ইনফ্লুয়েন্স ছিলো “দ্যা হু”, ”দ্যা ক্ল্যাশ”, “টেলিভিশন”, “র্যামোনস”, “দ্যা বিটলস” সহ আরও অনেক ব্যান্ড। বোনোর ব্যাক্তিগত আইডল ছিলেন “ভ্যান মরিসন”।

ইউটু ব্যান্ড নিয়ন আলয় neon aloy

সেকালের ইউটু

ব্যান্ড শুরুর চার বছরের মাথায় তারা আইল্যান্ড রেকর্ডসের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। ইউটু’র প্রথম সিঙ্গেল “11 O’Clock Tick-Tock” ১৯৮০ সালের মে মাসে মুক্তি পায়। তার পাঁচ মাস পর তাদের প্রথম অ্যালবাম “দ্যা বয়” বাজারে আসে। সাথে রিলিজ হয় দ্বিতীয় সিঙ্গেল “আই উইল ফলো”। তাদের দ্বিতীয় অ্যালবাম “অক্টোবর” ১৯৮১ সালে আর পরবর্তী “ওয়ার” রিলিজ পায় ১৯৮৩ সালে। “ওয়ার” যুক্তরাজ্যের চার্টে সেই বছরের এক নাম্বার অ্যালবাম হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১২তম অবস্থান পায়।

তাদের “সানডে ব্লাডি সানডে” এবং “প্রাইড (ইন দ্যা নেম অফ লাভ)” সিঙ্গেলগুলো তাদের রাজনৈতিক এবং সামাজিক সচেতনতার পরিচয় বহন করে। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে তারা পুরো বিশ্বব্যাপী খ্যাতি লাভ করে তাদের লাইভ পারফর্মেন্সের জন্য। ১৯৮৭ সালে তারা তাদের পঞ্চম এবং অন্যতম সেরা অ্যালবাম “জসুয়া ট্রি” রিলিজ করে, যা তাদেরকে তাদের সেই সময়ের খ্যাতির চরম সীমায় নিয়ে যায়। “জসুয়া ট্রি” তাদের অন্যতম সমালোচনামূলক এবং বাণিজ্যিক সাফল্য ছিল। এই অ্যালবামেরই বিখ্যাত গান “উইথ অর উইথাউট ইউ (With or without you)” যেটা দিয়ে পুরো বিশ্ববাসী ইউটু-কে চেনে।

“See the stone set in your eyes,
See the thorn twist in your side,
I’ll wait for you.
Sleight of hand and twist of fate,
On a bed of nails she makes me wait,
And I wait, without you, With or without you”

এই কয়টা লাইন বললে শুধু এই বাংলাদেশে না, পৃথিবীর প্রায় যেকোন প্রান্তের রকপ্রেমী বলে দিতে পারবে শিল্পীর নাম। এই “জসুয়া ট্রি” ১৯৮৭ সালের গ্র্যামি এওয়ার্ডে “এলবাম অফ দ্যা ইয়ার” এবং “বেস্ট রক পারফর্মেন্স” টাইটেল পায়। এটি ছিল ব্যান্ডের প্রথম গ্র্যামি এওয়ার্ড জেতা। ২০০৭ সালে “জসুয়া ট্রি” রিলিজের ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে একটি রিমাস্টারড ভার্সন রিলিজ করে এবং তাদের বই “ইউটু বাই ইউটু (U2 by U2)” তে ভক্তদের জানানো হয় কিভাবে বেশির ভাগ গান এসেছে। এর আগে টাইম ম্যাগাজিনের কভারে স্থান পেয়েছিল “দ্যা বিটলস”, “দ্যা ব্যান্ড” এবং “দ্যা হু”। ইউটু চতুর্থ ব্যান্ড যারা এই খ্যাতি অর্জনের সুযোগ পেয়েছে।

ইউটু ব্যান্ড নিয়ন আলোয় neon aloy

ইউ-টু (একদম বাম দিক থেকে ল্যারী-এডাম-বোনো-ডেভিড)

সময়ের সাথে “র্যাটল এন্ড হাম”, “আকটাং বেবী”, “জুরোপা” সহ আরো বেশ কিছু অ্যাালবাম এবং সিঙ্গেল রিলিজ হয়। সব গুলোই শ্রোতা মহলে সমাদৃত হতে থাকে। তাদের এই পর্যন্ত সর্বশেষ অ্যালবাম “সংস অফ এক্সপেরিয়েস” ২০১৭ সালের ১ ডিসেম্বরে বাজারে আসে। তার আগে সেই অ্যালবামের একটা সিঙ্গেল “ইউর দ্যা বেস্ট থিং এবাউট মি” সেই বছর ৬ই সেপ্টেম্বর রিলিজ হয়।

ডিস্কোগ্রাফীঃ-

স্টুডিও অ্যালবাম-

  • বয়(১৯৮০)
  • অক্টোবর(১৯৮১)
  • ওয়ার(১৯৮৩)
  • দ্যা আনফরগেটেবল ফায়ার(১৯৮৪)
  • দ্যা জসুয়া ট্রি(১৯৮৭)
  • র্যাটল এন্ড হাম(১৯৮৮)
  • এক্টাং বেবী(১৯৯১)
  • জুরোপা(১৯৯৩)
  • পপ(১৯৯৭)
  • অল দ্যাট উই ক্যান্ট লিভ বিহাইন্ড(২০০০)
  • হাউ টু ডিসম্যান্টল এন এটোমিক বোম্ব(২০০৪)
  • নো লাইন অন দ্যা হোরাইজন(২০০৯)
  • সংগস অফ ইনোসেন্স(২০১৪)
  • সংস অফ এক্সপেরিয়েন্স(২০১৭)
ইউটু ব্যান্ড নিয়ন আলোয় neon aloy

ইউটু’র এলবামগুলোর প্রচ্ছদসমূহ

সিঙ্গেলসঃ-

  • ইউটু-৩(১৯৭৯)
  • এনাদার ডে(১৯৮০)
  • ইলেভেন ও ক্লক(১৯৮০)
  • এ ডে উইথাউট মি(১৯৮০)
  • আই উইল ফলো(১৯৮০)
  • ফায়ার(১৯৮১)
  • গ্লোরিয়া(১৯৮১)
  • এ সেলিব্রেশন(১৯৮২)
  • নিউ ইয়ারস ডে(১৯৮৩)
  • টু হার্টস বিট এজ ওয়ান(১৯৮৩)
  • প্রাইড[ইন দ্যা নেম অফ লাভ](১৯৮৪)
  • দ্যা আনফরগেটেবল ফায়ার(১৯৮৫)
  • উইথ অর উইথাউট ইউ(১৯৮৭)
  • আই স্টিল হ্যাভেন্ট ফাউন্ড হোয়াট আই এম লুকিং ফর(১৯৮৭)
  • হোয়ার দ্যা স্ট্রিটস হ্যাভ নো নেম(১৯৮৭)
  • ওয়ান ট্রি হিল(১৯৮৭)
  • ইন গডস কান্ট্রি(১৯৮৭)
  • ডিজায়ার(১৯৮৭)
  • এঞ্জেল অফ হারলেম(১৯৮৮)
  • হোয়েন লাভ কামস টু টাউন(১৯৮৯)
  • অল আই ওয়ান্ট ইজ ইউ(১৯৮৯)
  • দ্যা ফ্লাই(১৯৯১)
  • মিস্টিরিয়াস ওয়েইস(১৯৯১)
  • ওয়ান(১৯৯২)
  • ইভেন বেটার দ্যান দ্যা রিয়েল থিং(১৯৯২)
  • হুস গানা রাইড ইউর ওয়াইল্ড হর্সেস(১৯৯২)
  • নাম্ব(১৯৯৩)
  • লেমন(১৯৯৩)
  • স্টে(১৯৯৩)
  • হোল্ড মি(১৯৯৫)
  • ডিস্কোথেক(১৯৯৭)
  • স্টেয়ারিং এট দ্যা সান(১৯৯৭)
  • লাস্ট নাইট অন দ্যা আর্থ(১৯৯৭)
  • প্লিজ(১৯৯৭)
  • মোফো(১৯৯৭)
  • ইফ গড উইল সেন্ড হিস এঞ্জেলস(১৯৯৭)
  • দ্যা সুইটেস্ট থিং(১৯৯৮)
  • বিউটিফুল ডে(২০০০)
  • স্টাক ইন দ্যা মোমেন্ট ইউ ক্যান্ট গেট আউট অফ(২০০১)
  • এলেভেশন(২০০১)
  • ওয়াক অন(২০০১)
  • ইলেক্ট্রিকাল স্টোর্ম(২০০২)
  • ভারটিগো(২০০৪)
  • সামটাইমস ইউ ক্যান্ট মেইক ইট অন ইউর ওন(২০০৫)
  • সিটি অফ ব্লাইন্ডিং লাইটস(২০০৫)
  • অল বিকজ অফ ইউ(২০০৫)
  • অরিজিনাল অফ স্পিসিজ(২০০৬)
  • ওইন্ডো ইন দ্যা স্কাই(২০০৭)
  • গেট ডাউন টু ইউর বুটস(২০০৯)
  • ম্যাগনিফিসেন্ট(২০০৯)
  • অরডিনেরি লাভ(২০১৩)
  • ইনভিসিবল(২০১৪)
  • দ্যা মিরাকল(২০১৪)
  • এভ্রি ব্রেকিং ওয়েভ(২০১৪)
  • সং ফর সামওয়ান(২০১৫)
  • ইউর দ্যা বেস্ট থিং অ্যাবাউট মি(২০১৭)

পুরষ্কারঃ-

এওয়ার্ড জয় সংখ্যা
একাডেমী এওয়ার্ড  ১
ব্রিট এওয়ার্ড  ৭
এমটিভি ভিডিও মিউজিক এওয়ার্ড
গ্র্যামি এওয়ার্ড  ২২
আই হার্ট রেডিও মিউজিক এওয়ার্ড  ২
কিউ এওয়ার্ড  ১১
পোলস্টার এওয়ার্ড ১৩
জুনো এওয়ার্ড
বিলবোর্ড ট্যুরিং এওয়ার্ড  ৯
বিলবোর্ড মিউজিক এওয়ার্ড
আমেরিকান মিউজিক এওয়ার্ড
মিটিওর মিউজিক এওয়ার্ড ১৫
এনএমই এওয়ার্ড
লাস ভেগাস ফিল্ম ক্রিটিক এওয়ার্ড
গোল্ডেন গ্লোব এওয়ার্ড
পিপলস চয়েস এওয়ার্ড
ওয়ার্ল্ড মিউজিক এওয়ার্ড

মোট ১০৭টি পুরষ্কার।

কিছু ইউটু ফ্যাক্টঃ-

১. ২০০৫ সালে বোনোকে “পারসন অফ দ্যা ইয়ার” নির্বাচিত করে “টাইম ম্যাগাজিন”।  রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ  ২০০৭ সালে তাকে নাইটহুড উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেন।

২. ইউটুর অধিকাংশ লিরিক্সই বোনোর লেখা যা বেশিরভাগই রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা এদের সমগোত্রীয় থীমের উপর ফোকাস করে। ১৯৮১ সালে তাদের রিলিজ পাওয়া দ্বিতীয় এলবাম “অক্টোবর” এ খ্রীষ্ঠান ধর্মের আলিঙ্গন প্রকাশ করা হয় বিভিন্ন গানে। “গ্লোরিয়া” গানের লিরিক্সের একটা পার্ট দেখলেই বোঝা যায় সেটা।

“ Oh, Lord, if I had anything
Anything at all, I’d give it to you”

এমনকি বিভিন্ন সামাজিক এবং সংস্কারমূলক কর্মকান্ডের সাথে সবসময় নিজেকে জড়িত রেখেছেন বোনো মিউজিকের মাধ্যমে।

৩. বোনো নিজের সেলিব্রেটি ইমেজ মিউজিকের বাইরে বিশ্বের বিভিন্ন সমস্যার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মধ্য জনসচেতনতা তৈরীর কাজে ব্যবহার করেছেন। তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন ক্ষমতাশীলদের সাথে বিভিন্ন সময় দেখা করে সেসব নিয়ে কথা বলেছেন। “DATA” (ডাটা) নামক একটি সংগঠন তৈরী করেছেন যার পূর্ণনাম “Debt AIDS Trade Africa”। আফ্রিকার মানুষদের জন্য এইডস এবং দারিদ্রতার বিরুদ্ধে সংগঠনটি লড়াই করছে ২০০৪ সাল থেকে। আরেকটা ক্যাম্পেইন তৈরী করেছেন “Make Poverty History”। বিশ্বজুড়ে ১০০টির বেশি এনজিও এবং লক্ষাধিক মানুষজন ছাড়াও ব্র্যাড পিট, বেন অ্যাফ্লেকের মতো অনেক সেলিব্রেটিরও সমর্থন পেয়ে আসছে ক্যাম্পেইনটি।

ইউটু ব্যান্ড নিয়ন আলোয় neon aloy

বোনো

৪. ১৯৮৪ সালে মুক্তি পাওয়া অ্যালবাম “দ্যা আনফরগেটেবল ফায়ার” নামকরণ করা হয়েছে কিছু পেইন্টিং সিরিজের অনুকরণে যা হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে পারমানবিক হামলায় বেঁচে যাওয়া উত্তরসুরীদের আঁকা। অ্যালবামটি “মারটিন লুথার কিং” কে উৎসর্গ করা হয়।

৫. বোনোর নাম রাখা হয় “বোনোভোক্স” নামের একটা দোকান থেকে। যার অর্থ “সুন্দর কণ্ঠ”। দোকানটিতে শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের হিয়ারিং এইড বিক্রি হত। ডেভিড এর স্টেজ নেম “দ্যা এজ” নামটি বোনো দিয়েছেন তার চেহারা দেখে। বোনোর মতে ডেভিডের চেহারা খুব বেশী ধারালো।

৬. জেমস বন্ডের “গোল্ডেন আই” মুভির টাইটেল ট্র্যাকটি বোনোর লেখা। ক্লেইটন এবং মুলেন তাদের “মিস্টিরি গার্ল” অ্যালবামের গান “সি ইজ আ মিস্টিরি টু মি” একটু রিমিক্স করেন যা ১৯৯৬ সালে রিলিজ পাওয়া টম ক্রুজ অভিনীত “মিশন ইম্পসিবল” এর টাইটেল ট্র্যাক ছিল।

৭. ২০০৩ সালে বোনোর নাম শর্টলিস্টে মনোনীত করা হয় শান্তিতে নোবেল পুরষ্কারের জন্য।

একটি ব্যান্ড যে চাইলেই নিজেদের নাম ব্যবহার করে মিউজিকের বাইরে নিজেদের থেকেও বড় কিছু করতে পারে সেটা বোনো আর তার হাইস্কুলের ব্যান্ডমেটরা পুরো পৃথিবীকে দেখিয়ে দিয়েছেন। সময়ের স্রোতে বোনোরা এক সময়ে হারিয়ে গেলেও তাদের কাজ তাদেরকে আরো অনেকদিন বাঁচিয়ে রাখবে মানুষের হৃদয়ে।

আরো পড়ুনঃ একটি কনসার্ট মাটি করার জন্য সামান্য অব্যবস্থাপনাই যথেষ্ট

Most Popular

To Top