গল্প-সল্প

দূর্নীতিবিহীন এক ইফতারি’র টেবিল

ইফতারি নিয়ন আলোয় neonaloy

সেই প্রাইমারী স্কুলের গন্ডি পার হবার পর থেকেই আন্ত:পরিবার ইফতার ডিস্ট্রিবিউশন কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। বাসায় ৫ জন মানুষ, ৭ প্লেট ইফতারি রেডি করতে হতো। একটা প্রতিবেশী প্লেট, একটা সুবিধা বঞ্চিত প্লেট আগে সাজিয়ে তারপর বাসার জন্য পাঁচটা প্লেট।

তো আমার আমলে ইফতারি ডিস্ট্রিবিউশন নিয়ে কোন দূর্নীতি হয় নাই। বেগুনী যদি ১১ পিস থাকত, ২ পিস করে পাঁচ প্লেটে দেয়ার পর যে ১ পিস থাকত সেটা স্বত্ব ত্যাগ সভায় উঠত; আম্মা-আব্বা সহজেই স্বত্ব ত্যাগ করত। আমরা তিনজন কেউই ছাড় দিতাম না, বেগুনী ভার্ণিয়ার স্কেলের সাহায্যে সমান তিন ভাগে ভাগ হতো।

পেঁয়াজুর বন্টন আরেকটু ডিফিকাল্ট, এটা তিন ভাগ করা যায় না। এটার বন্টন হতো সাইজের উপর। যে বেশী পাবে তার পেঁয়াজুগুলার সাইজ হবে ছোট ছোট।

আমার এত কঠিন কঠিন রুলসের কারণে আম্মা খুব চেষ্টা করত প্লেট সংখ্যার গুনিতকে নাস্তা বানাতে।

একদিন বাসায় ফুলকপির বড়া ভাজা হচ্ছে। বিকেল ৪ টা নাগাদ আমার ছোট ভাই রান্না ঘরে উঁকিঝুঁকি দিয়ে এসে আমাকে ধরল,
– “আপু ভালো আছিস?? তোর বান্ধবীরা ভাল আছে?”
– “কি সমস্যা তাড়াতাড়ি বল”
– “কি আবার সমস্যা? তুই আর পিয়া আপু যে ঝগড়া করছিলি মিটছে?”
– “এত খোঁজ নেয়ার দরকার নাই, কি লাগব?”
– “ফুলকপির বড়া”
– “ইফতার টাইম আসুক,এখন কি?”
– “শোন আপু, আমাকে বড় পিস দিস, আমি তোকে আমার এমপিথ্রি প্লেয়ারটা আজকে রাতে ধার দিমু”

চোখ চক চক করে উঠল আমার,কিন্তু কিচ্ছু করার নাই,নিজের মনকে বুঝ দিয়ে ওকে ঝাড়ি দিলাম, “যা ভাগ, লটারিতে (অপু-দশ-বিশ) যার ভাগে পড়ে সে বড়টা পাবে”।

সাড়ে চারটার দিকে ছোট বোন আসল।
– “আপু, ফুলকপির বড়া একটু বেশী দিস প্লিজ, আমার বেগুনী আর পেঁয়াজু লাগবেনা আজকে”।

বোনের জন্য খুব মায়া হল। বেচারি পড়ে ক্লাস ফোরে, তার ট্রেড করার মত বেগুনী, পেঁয়াজু ছাড়া তেমন কিছু নাই।
আমি হালকা ঝাড়ি দিলাম,
“যা দেখি কি করা যায়, দুইজন মিলা খালি ঘ্যান ঘ্যান।”
৫ টায় ইফাতারির টেবিলে গিয়া দেখলাম ফুলকপির বড়া আছে ৮ টা। স্বত্ব ত্যাগ সভার মাধ্যমে আম্মা আব্বা একটা করে আর আমরা ২টা পাইলাম। ছোট দুইটা তাও মন খারাপ করে রইল।

– “তোদের সমস্যা কি? দুইটা করে পাইছিস, তাও বড় বড়।”
আম্মা বলল,
– “কুমু আমারটা ওদের দুইজনকে ভাগ করে দে।”
– “না আম্মা, এটা সংযমের মাস, ওদের শিখতে দাও।”
– “তোর সমস্যা কি? আমারটা আমি দিমু। হিংসুইটা, ওদের দিমু দেইখা তোর লাগতেছে”

কথা যদিও সত্যি, তবু আমার অন্তরটা ফেটে গেল। বাহ, যার জন্য করি চুরি সেই বলে চোর। আমি সিদ্ধান্তে অনড় রইলাম।

আযানের পর পর হঠাৎ মনে হইল, রিয়াদ আর ইমু’র ছোলা মুড়ির ঢিবি প্রয়োজনের তুলনায় বড়।

আমি একটা হুংকার দিলাম, “রিয়াদ তোর ছোলা মুড়ির নিচে কি? ছোলা মুড়ি সরিয়ে দেখা”।
রিয়াদের ছোলা মুড়ির নিচ থেকে আর ইমু’র আপেলের পিছন থেকে আম্মার হাফ করা ফুলকপির বড়া উদ্ধার হলো।

আমার আমলে এত বড় দু:সাহস! ভাবলাম এখনি পদত্যাগ করে ইফতার বর্জন করব। তখনি দেখি টেবিলের নিচ দিয়ে একটা হাত খোঁচা দিচ্ছে। টেবিলের নিচ দিয়ে আব্বা তার ফুলকপির বড়ার অর্ধেক আমার হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে।
আমি চুপ হয়ে গেলাম।
আব্বা আস্তে আস্তে বললেন,
“তুমিও সংযম শিখো মা”।

বি:দ্র: তিন বছর হয়, এই বাসা থেকে চাকরি ছেড়ে অন্য বাসার (শ্বশুরগৃহ) চাকরি নিয়েছি। নতুন বাসার লোকজন অত্যন্ত ভদ্র।এরা যেভাবে দেই, সেভাবেই খায়। আমার ইফতার পানসে-পানসে লাগে। বিয়ের পর প্রথম রোজার মাসে একদিন ইফতার বেড়ে অন্য রুমে গিয়েছি, ফিরে এসে দেখি আমার ছেলের দুই কাকা ঝগড়া করছে, “তোর বেগুনী বড়, তোর শরবৎ বেশী, তোরে আপু বেশি দিছে কারণ তুই আপুর টাকা ভাংগাইয়া আনস!”

Most Popular

To Top