নাগরিক কথা

বিশ্বকাপ ২০১৯ এবং বাংলাদেশের সম্ভাবনা

বিশ্বকাপ ২০১৯ বাংলাদেশ নিয়ন আলোয় neonaloy

বিশ্বকাপ, শুধু স্বর্ণে মোড়ানো ট্রফি নয় এটি। বিশ্বকাপ একটা স্বপ্নের নাম। প্রতিটি জাতির স্বপ্ন। হোক সেটা ক্রিকেট কিংবা ফুটবল ওই ট্রফিটার প্রতি সবারই একটা নজর থাকে। ফুটবলের সোনালী কাপ টার দিকে নজর দেবার মত আস্পর্ধা আমাদের এখনো হয়ে উঠে নি, তবে ক্রিকেটের ক্ষেত্রে আমরা এখন একটু আস্পর্ধা দেখাতেই পারি। এতে দোষের কিছু নেই বৈকি।

দুই দশক আগে যখন পাড়ার গলিতে একটা কাঠের টুকরো হাতে নিয়ে ব্যাটিং করতে নেমে গিয়েছিলাম তখনই একটা স্বপ্ন ভ্রূণ আকারে হৃদয়ে গেঁথে গিয়েছিল। তখনকার সময়ে রফিক ভাইয়ের একটা ছয় দেখতে পারা ছিল ধূমকেতু দেখার মত আনন্দের, আশরাফুল, নাফিসদের একেকটা সেঞ্চুরি কিংবা মাশরাফির বিধ্বংসী কিছু স্পেলের গল্পগুলো টং এর দোকানগুলোতে চলত মাসের পর মাস। জিম্বাবুয়ে আর কেনিয়ার সাথে ম্যাচ জিতলেই সারা দেশে বয়ে যেত ঈদের আনন্দ। যে দেশের মানুষেরা এত অল্পতেই খুশিতে আত্মহারা হয়ে যেত তাদের কাছ থেকে তখন বিশ্বকাপের স্বপ্ন দেখাটা বিলাসিতাই বটে। ২০০৩ এর ওয়ার্ল্ড কাপ ঘাটালে অন্তত সেটারই প্রতিবিম্ব দেখা যায়। ’৯৯ এর ওয়ার্ল্ড কাপে গর্ডন গ্রিনিজের হাত ধরে বিশ্বকাপ জয়ের যে স্বপ্নটার ভ্রূণ জন্ম নিয়েছিল সেটা অবশেষে ভূমিস্ট হয় ডেভ হোয়াট্মোরের হাত ধরে, কার্ডিফ কাব্যের মাধ্যমে।

পরবর্তী কয়েক বছরে বাংলাদেশের ক্রিকেট জন্ম দেয় সাকিব, তামিম আর মুশফিকদের মত দেশ সেরা কিছু যোদ্ধাদের। গ্রীক যোদ্ধা অ্যাকিলিসের মত আমাদের প্রত্যেকটি যোদ্ধাও তাদের জন্ম লগ্নেই বিশ্ববাসীকে তাদের অস্তিত্ব জানান দিয়েছিলেন, ’০৭ এর ওয়ার্ল্ড কাপে পরাশক্তি ভারত আর দক্ষিণ আফ্রিকা বধের মাধ্যমে। মাশরাফি আশরাফুল ক্যামিও, সাথে এই ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে বাশার ভাই কি সহজেই না ম্যাচগুলো জিতে নিয়েছিলেন।

১৭ বছরের বাচ্চা একটা ছেলে জহির খানকে ডাউন দ্যা উইকেটে এসে ছয় মেরে বল স্টেডিয়ামের দ্বিতীয় তলায় পাঠিয়ে দিচ্ছে, সাথে চমৎকার সব কাভার ড্রাইভ আর স্কয়ার কাট। সাকিব মুশফিকের এতো সুন্দর দায়িত্বশীল ইনিংস খেলে ম্যাচ জিতিয়ে আনা। ভাবা যায়? তখনকার প্রেক্ষিতে অন্তত ভাবা যায় না। এজন্যই হয়ত আমাদের জিতে যাওয়া ম্যাচগুলোকে এখনও অনেক ক্রিকেটবোদ্ধা আপসেট বলে আখ্যা দেন। যদিও আমি এই জয়গুলোকে আপসেট বলতে নারাজ। প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হয়ত পেয়েছি, কিন্তু যা পেয়েছি নিজেদের যোগ্যতায় পেয়েছি। এই ওয়ার্ল্ড কাপে আমরা বিশ্ববাসীর সামনে সাকিব, তামিম আর মুশফিকদের মত যোদ্ধাদের ইন্ট্রোডিউসড করেছি, সাথে ছিল মাশরাফি, আশরাফুল, রফিক আর রাজ্জাকদের মত গুটি কয়েক ম্যাচ উইনার। এত সুন্দর একটা কম্বো যেই টিমে থাকে সেই টিম দুই একটা বড় ম্যাচ জিতলে কি খুব বেশিই অস্বাভাবিক দেখাবে? অবশ্য যেখানে ইন্ডিয়া পাকিস্তানের মত পরাশক্তিরা সেবার শুধু গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল, সেখানে র‍্যঙ্কিং এর নয় এ থাকা দলটি সম্মানের সাথে সুপার এইট খেলছে। এটা দেখে ক্রিকেটের উপরের মহলের ভ্রূ কোঁচকানোরই কথা।

পরের অধ্যায়টা আমাদের মিনোজ থেকে ভাল টিম হয়ে উঠার। সবগুলো টিমই তখন আমাদের সম্মান দেখানো শুরু করে। এসময় ট্রয় নগরীর যুবরাজ হেক্টারের মত আমাদের টিমে আবির্ভাব হয় এমন এক নায়কের যে তার ক্যারিয়ারের অনেক বড় একটা সময় কাটিয়েছেন সাকিব, তামিম আর মুশফিক নামক অ্যাকিলিসদের ছত্রছায়ায়। তিনি মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। মাশরাফির ইনজুরিতে অধিনায়কত্বের ভার গিয়ে পরে সাকিবের উপর। সাকিবের নেতৃত্বেই আমরা তখন নিউজিল্যান্ড আর তৎকালীন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে বাংলাওয়াশ করি। জেমি সিডন্সের তত্ত্বাবধানে ’১১ বিশ্বকাপের জন্য ভালই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, আবার বাধ সাধল মাশরাফির ইনজুরি। দেশের মাটিতে ম্যাশ এর মত একটা চ্যাম্পিয়ন প্লেয়ারের বিশ্বকাপ খেলতে না পারার আক্ষেপটা আমরা খেলার মধ্যেও টের পেলাম। ফলাফল গ্রুপ পর্ব থেকে বাংলাদেশের বিদায়। সেই ৫৮ আর ৭৮ রানের দুঃস্বপ্ন দুটি তো এখনো অনেকের মনে গেঁথে আছে।

২০১১-২০১৪ এই সময়টাকে বাংলাদেশের জন্য অনেকটা দুঃসময়ই বলা যায়। সাকিবের অধিনায়কত্ব হারানো, জেমি সিডন্সের বিদায়, মাশরাফির ইনজুরি আর আশরাফুলের ফিক্সিং কেলেঙ্কারি সবকিছু মিলিয়ে একদম হযবরল অবস্থা বাংলাদেশ টিমের। জিম্বাবুয়ে আর আফগানিস্তানের সাথেও ম্যাচ হারছিলাম তখন। পরিসংখ্যান ঘাটালেও দুঃসময়েরই প্রমাণ মিলে। এসময় আমরা ১১ টি দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলেছি যার মধ্যে ৮ টি সিরিজই আমরা পরাজিত হয়েছি আর একটা সিরিজ ড্র হয়। হেরে যাওয়া ৮ টি সিরিজের মধ্যে আবার ২ টি সিরিজ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। স্টুয়ার্ট ল এর তত্ত্বাবধানে ’১২ এর এশিয়া কাপের ফাইনালে যাওয়া ছাড়া আর তেমন কোন ভাল উপলক্ষ নেই সময়ে। বড়ই অধারাবাহিক তখন বাংলাদেশ দল। বাইরে থেকে দেখেও টিমটাকে ভাঙ্গাচুরা মনে হচ্ছিলো।

ঠিক এমন সময়ই বিসিবি চমৎকার কিছু ডিসিশান নেয় যা বাংলাদেশ টিমকে আপাদমস্তক বদলে দেয়। মাশরাফিকে পুনরায় অধিনায়কত্ব দেয়া এবং হাতুরাসিং ও হিথ স্ট্রিক কে কোচ হিসেবে নিয়োগ দেয়া ছিল বিসিবির যুগান্তকারী কিছু সিদ্ধান্ত যার ফল আমরা এখনো ভোগ করছি।

এর পরের গল্পটা আমাদের বড় টিম হয়ে উঠার। গল্পের শুরুটা হয় ’১৫ বিশ্বকাপে। রিয়াদের ব্যাক টু ব্যাক সেঞ্চুরি, রুবেলের করা সেই ৪৯ তম ওভার, ম্যাচ জেতার পর মাশরাফির মাটিতে লুটিয়ে পরা আর সতীর্থদেরও তাকে ঘিরে জয় উল্লাস করার দৃশ্য মনে পড়লে চোখের কোণে এক বিন্দু জলের আবির্ভাব হয়। “দ্যা বাংলাদেশ টাইগার্স হ্যাভ নকড দ্যা ইংলিশ লায়ন্স আউট অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড কাপ” অ্যান্ডারসনকে বোল্ড করার পর কমেন্ট্রি বক্স থেকে ভেসে আসা এই শব্দগুলো মনে করলে এখনো শরীরের লোম দাড়িয়ে যায়। টুর্নামেন্টের অন্যতম শিরোপা প্রত্যাশী ইংল্যান্ডকে হারিয়েই সেদিন আমরা কোয়াটার ফাইনাল নিশ্চিত করি। দুর্ভাগ্যক্রমে কোয়াটার ফাইনালে আমাদের প্রতিপক্ষ ছিল ভারত যারা মাঠের পারফরমেন্স এবং কূটনীতি দুই উপায়েই ম্যাচ জিততে জানে। সেদিনের খেলায় কি হয়েছিল সেটা পুরো বিশ্ববাসীই দেখেছে। আফসোস নেই সেদিন আমরা টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছিলাম বলে। আফসোস শুধু একটাই, ক্রিকেট খেলাটা সেদিন হেরে গিয়েছিলো। ফেয়ারলি খেলা হলে বাংলাদেশর সেই বিশ্বকাপ কোথায় গিয়ে থামতো সেটা কেবল সৃষ্টিকর্তাই জানেন।

যাকগে সেসব বাজে কথা। বিশ্বকাপে আমাদের সর্বোচ্চ অর্জন নিয়েই তারপর আমরা দেশে ফিরে আসলাম। দেশে ফিরে যেন আমরা আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলাম। একটানা ৬ টি দ্বিপাক্ষিক সিরিজ জিতলাম আমরা। ১৬ বছর ধরে যে পাকিস্তানের সাথে একটা ম্যাচও জিততে পারি নি, তাদেরকেই সেবার বাংলাওয়াশ করে দিলাম। ১৬ টি বছর পর বুকের অগ্নি জ্বালা নিভলো। এরপর এক এক করে বাঘের মরণ কামড় গিয়ে পরল ইন্ডিয়া, সাউথ আফ্রিকা আর আফগানিস্তানের উপর, একটুর জন্য সেবার রক্ষা পেয়ে গেল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বংশধরেরা।

বাংলাদেশ টিম তাদের সোনালী যুগ পার করছিল তখন। ঈশ্বরের থেকে উপঢৌকন হিসেবে পেয়েছিলাম মুস্তাফিজকে যার কাটারে বাঘা বাঘা ব্যাটসম্যানরা তখন দিশেহারা। প্রথমবারের মত আমরা র‍্যাঙ্কিং এর ৬ এ উঠলাম; পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা আর ইন্ডিজকে পিছনে ফেলে। প্রায় ১১ বছর পর অর্জন করলাম চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি খেলার যোগ্যতা এবং সেখানেই বাজিমাত। বিশ্বকে তাক লাগিয়ে ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিকের নেতৃত্বে আমরা সেমিফাইনাল খেললাম।

এরপরের সময়টা আমাদের হোঁচট খাওয়ার।

সাউথ আফ্রিকায় যাচ্ছেতাই পারফরমেন্স, বাংলাদেশকে বড় দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার অন্যতম কাণ্ডারি হাতুরাসিং এর পদত্যাগ, ইনজুরি থেকে ফেরা মুস্তাফিজের নিজেকে হারিয়ে খোঁজা, দেশের মাটিতে ট্রাই ন্যাশন সিরিজ হাতছাড়া করা; সবকিছুই যেন একসাথে ঘন কালো মেঘের মত হানা দেয় আমাদের স্বপ্নের টিমের উপর।

এই লেখাটা যখন লিখছি তখন বিসিবি হন্যে হয়ে আমাদের জন্য ভাল একটি কোচ খুঁজছেন। কয়েক মাস অতিবাহিত হয়ে গেল হাতুরুর বিদায়ের, তবুও একটা মানানসই কোচ পাচ্ছি না আমরা। পাবই বা কিভাবে? হাতুরাসিং কোচ হিসেবে যে বেঞ্চমার্ক তৈরি করে গিয়েছেন সেটাকে কি অন্য কোন কোচ আদৌ উৎরাতে পারবেন? হয়ত পারবেন। এই আশা আমাদের করতে হবে।
সেদিন অফিসের কলিগদের সাথে এক আড্ডায় ’১৯ বিশ্বকাপ নিয়ে আলাপ হচ্ছিলো। আড্ডার একপর্যায়ে আমি বললাম-
– এই ওয়ার্ল্ড কাপটাই আমাদের জন্য শেষ সুযোগ ভাল কিছু করে দেখানোর।
– “ভাল কিছু” বলতে কি বুঝাতে চাইছেন?
– এখন “ভাল কিছু” মানে একটাই। বিশ্বকাপ।

কথাটা শুনে প্রায় সবার চেহারাতেই এক রকমের হীনতা, তাচ্ছিল্য আর অবজ্ঞা ফুটে উঠল। অথচ বছর তিনেক আগেও এটা বিশ্বাস করতে আমাদের এতটা কস্ট হত না। কি হল আমাদের হঠাৎ করে?

এক হোঁচটেই আমাদের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরেছে, হয়ত প্লেয়ারদেরও একই অবস্থা। কিন্তু আত্মবিশ্বাসের চিড়কে সিমেন্টের ঢালাই দিয়ে মেরামত করার দায়িত্ব কিন্তু একা প্লেয়ারদের কিংবা বিসিবির না, আমাদেরও সমান দায়িত্ব আছে এখানে।
এজন্যই আজকে লিখতে বসা।

শুধু মুখে বললেই তো হল না আমরা শিরোপা প্রত্যাশী। আমরা কেন শিরোপা প্রত্যাশী সেটা একটু দেখা যাক।

এই মুহূর্তে যদি কাউকে জিজ্ঞাসা করা হয় ’১৯ বিশ্বকাপে কাদের সুযোগ বেশি। তবে বেশির ভাগেরই ভোট পরবে ইন্ডিয়া, নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড কিংবা সাউথ আফ্রিকার পক্ষে। অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপ ইতিহাস হাতড়ালে তাদের পক্ষেও ভোট নেহায়েত কম হবে না। আচ্ছা এই টপ টিম গুলোর কি আছে যা আমাদের নেই? আমার তো বরঞ্চ মনে হয় আমাদের এমন অনেক কিছু আছে যা এই টপ টিমগুলোর নেই।

যেকোনো বিশ্বকাপ জেতার জন্য একটা টিমের সবার আগে যা লাগবে সেটা হল অভিজ্ঞ প্লেয়ার। বিশ্বকাপ জেতা মানে শুধু গুটি কয়েক ম্যাচ জেতা না, শত সহস্র স্নায়ু যুদ্ধও উৎরাতে হয় সোনালী কাপটা কে নিজেদের করে পাবার জন্য। এই স্নায়ু যুদ্ধে জয়ী হবার জন্যই প্রতিটা টিমে অন্তত ৪-৫ টি অভিজ্ঞ প্লেয়ার দরকার। অন্তত ইতিহাস আমাদের তাই বলে।

১৯৯৬ এর বিশ্বকাপ জয়ী শ্রীলংকা টিমের একাদশে ছিলেন গুরুসিংহে(১১ বছর), অরবিন্দ ডি সিল্ভা(১২ বছর), রানাতুঙ্গা(১৪ বছর), তিল্কারাত্নে(১০ বছর) এবং মাহানামার(১০ বছর) মত ৫ জন প্লেয়ার যারা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে খেলেছেন।

১৯৯৯ এর বিশ্বকাপ জয়ী অস্ট্রেলিয়া টিমে ছিলেন মার্ক ওয়াহ(১১ বছর), স্টিভ ওয়াহ(১৪ বছর) ও টম মুডি(১২ বছর)।

২০০৩ এর ওয়ার্ল্ড টিমে অস্ট্রেলিয়া স্কোয়াডে ছিলেন- হেইডেন(১০ বছর), ডেমিয়েন মারটিন(১১ বছর), ম্যাক গ্রা(১০ বছর) এবং বেভান(৯ বছর)।

২০০৭ এর বিশ্বকাপের অস্ট্রেলিয়া টিমের মত ভয়াবহ টিম আমি আমার জীবদ্দশায় দেখিনি। তাদের অভিজ্ঞ প্লেয়ারের লিস্টটা দেখলেই বোঝা যাবে তারা কেন সেবার অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন ছিল। স্কোয়াডে ছিলেন- গিল্ক্রিস্ট(১১ বছর), হেইডেন(১৪ বছর), পন্টিং(১২ বছর), ব্রাড হগ(১১ বছর), ম্যাক গ্রা(১৪ বছর) এবং সায়মন্ডস(৯ বছর)।

২০১১ এর বিশ্বকাপ ছিল টেন্ডুলকার কে ট্রফি হাতে বিদায় দেবার ওয়ার্ল্ড কাপ। স্কোয়াডে ছিলেন- ভিরেন্দার সেহয়াগ(১২ বছর), টেন্ডুলকার(২২ বছর), যুবরাজ সিং(১১ বছর), হরভজন(১৩ বছর) এবং জহির খান(১১ বছর)

২০১৫ বিশ্বকাপে আবার অস্ট্রেলিয়ার জয়জয়কার। ফাইনালের একাদশে ছিলেন মাইকেল ক্লার্ক(১২ বছর), শেন ওয়াটসন(১৩ বছর), মিচেল জনসন(১০ বছর) এবং কিপার ব্রাড হেডিন(১৪ বছর)।

বোঝাই যাচ্ছে বিশ্বকাপ জেতার অন্যতম মূলমন্ত্রই হচ্ছে স্কোয়াডে অভিজ্ঞ এবং একই সাথে পারফর্মার কিছু প্লেয়ার রাখা। এখন দেখি ২০১৯ বিশ্বকাপে শিরোপা প্রত্যাশী টিমগুলোর মধ্যে কার ঝুলিতে অভিজ্ঞ প্লেয়ারের ছড়াছড়ি থাকবে।
ইন্ডিয়া টিমে রেগুলার একাদশে থাকা প্লেয়ারদের মধ্যে কেবল মহেন্দ্র সিং ধনি(১৫ বছর), কোহলি(১১ বছর) এবং রোহিত শর্মাই(১২ বছর) আছেন যারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে খেলছেন। যুক্তির স্বার্থে রবীন্দ্র জাদেজাকেও(১০ বছর) ধরতে পারেন যদিও তিনি জুলাই,২০১৭ এর পর আর কোন ওয়ানডে ম্যাচ খেলেননি, ওয়ার্ল্ড কাপের স্কোয়াডেও থাকবেন কিনা সন্দেহ ব্যাপক।

সাউথ আফ্রিকা যদিও চোকার টিম, তবে শিরোপা প্রত্যাশী বলতে কোন বাধা নেই। তাদের টিমে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে খেলা প্লেয়ার আছে ৪ জন। ডি ভিলিয়ারস(১৫ বছর), হাশিম আমলা(১৫ বছর), ডুমিনি(১৫ বছর) এবং মরকেল(১২ বছর)। প্রতিবারের মত এবারো তারা শক্তিশালী টিমই বানাচ্ছে।

নিউজিল্যান্ড, ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে ভদ্র টিম। গতবার একটুর জন্য শিরোপা ছোঁয়া হয় নি তাদের। এবার নিশ্চয়ই তারা গতবরের ভুল শুধরাতে চাইবে কেননা তাদের টিমে আছে গাপ্টিল(১০ বছর), রস টেইলর(১৩ বছর), উইলিয়ামসন(৯ বছর) এবং টিম সাউদির(১১ বছর) মত অভিজ্ঞ কিছু প্লেয়ার।

শিরোপার দৌড়ে থাকা আরেক ঘোড়া ইংল্যান্ড। তারুণ্য নির্ভর টিমে মরগান(১৩ বছর) এবং প্লাংকেট(১৪ বছর) ছাড়া আর তেমন কোন অভিজ্ঞ প্লেয়ার নেই।

সবচেয়ে অবাক করা টিম এবারের অস্ট্রেলিয়া। এক ডেভিড ওয়ার্নার(১০) টিমের একমাত্র রেগুলার প্লেয়ার যে কিনা ১০ বছর ধরে ক্রিকেট খেলছে। বল টেম্পারিং কেলেঙ্কারিতে তার খেলার ভবিষ্যৎও আবার অনিশ্চিত। আমার জন্মের পর অস্ট্রেলিয়া টিমের এমন দুরাবস্থা কখনও দেখি নি।

এবার আমাদের টিমের অভিজ্ঞতার হিসাবটা চুকানো যাক।

বিশ্বকাপ ‘১৯ এ আমাদের টিমে ৭ জন এমন প্লেয়ার থাকবে যারা ১০ বছরের বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছেন। কি, বিশ্বাস হচ্ছে না? আসুন, হিসেব দেই।

ক্যাপ্টেন মাশরাফি(১৮ বছর), মুশফিক(১৪ বছর), সাকিব আল হাসান(১৩ বছর), তামিম(১২ বছর), মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ(১২ বছর), রুবেল(১০ বছর) এবং ইম্রুল কায়েস(১১ বছর)। এই সাত জনের মধ্যে ৬ জনই রেগুলার পারফর্মার। বোঝাই যাচ্ছে অভিজ্ঞতার বিচারে বাংলাদেশ অন্যান্য টপ টিমগুলো থেকে ঢের এগিয়ে। এই একটি কারণে অন্য সবগুলো টিমের ঈর্ষার কারণও হয়েছি আমরা।

যেখানে অন্য টিমগুলোতে ৩-৪ জনের বেশি অভিজ্ঞ প্লেয়ার হারিকেন দিয়েও খুঁজে পাওয়া যায় না, সেখানে আমরা তাদের চেয়ে দিগুণ সংখ্যক অভিজ্ঞতা নিয়ে মাঠে নামবো। তারচেয়েও বড় কথা আমাদের এই বুড়ো ঘোড়াগুলোই আমাদের টিমের টপ পারফর্মার।

তাহলে নিজেদের শিরোপা প্রত্যাশী ভাবতে আমাদের এতো অনীহা কেন?
এখন একটি কঠিন বাস্তবতা বলব।

শুধুমাত্র অভিজ্ঞতা দিয়েই বিশ্বকাপ জেতা যায় না। অভিজ্ঞতা কেবল ম্যাচ জয়ের একটি প্রভাবক মাত্র। অভিজ্ঞতার পাশাপাশি পারফর্মেন্সও দরকার। পারফর্মেন্স মাঝে মধ্যে অভিজ্ঞতাকেও ছাপিয়ে যায়। তাই একটু পারফর্মেন্সের আলোচনায় আসা যাক।
২০১৫ সালে আমরা টপ পারফর্মার ছিলাম, অপ্রতিরোধ্য ছিলাম। সেই একই টিম ২০১৮ এ এসে দর্শকদের কপালে ভাজ ফেলছে। এমন না টিম এই ৩ বছরে আকাশ পাতাল চেঞ্জ হয়ে গিয়েছে, একই একাদশ আছে এখনো। বরঞ্চ জুনিয়রদের অভিজ্ঞতা আরও বেড়েছে। যেখানে আমাদের পারফর্মেন্সের গ্রাফ আরও উপরে উঠার কথা সেখানে গ্রাফটা যেন একটু নিম্নমুখী। গলদটা কোথায় হচ্ছে আমাদের?

গলদটা হচ্ছে আমাদের ২,৩,৭,১০ আর ১১ নম্বর পজিশনে। মানে ৩ টি ব্যাটিং আর ২ টি বোলিং পজিশনেই আমাদের সমস্যা চলছে বিগত কয়েক বছর ধরে। যদিও বিগত সিরিজে সাকিবের ৩ নম্বরে আবির্ভাব এবং অসাধারণ পারফর্মেন্স এই পজিশনের সমস্যাকে অনেকাংশে দূর করেছে, এমনটা আশা করাই যায়।

বাকি রইল তাহলে ২,৭,১০ এবং ১১ নম্বরের সমস্যা।

ব্যাটিং এর এই ২ আর ৭ নম্বর পজিশনে ব্যাট করেন সৌম্য আর সাব্বির। আর বোলিং এর ২ টি পজিশন হচ্ছে তাসকিন আর মুস্তাফিজের। একটু পরিসংখ্যান ঘটালেই দেখা যায় ’১৫ সালে এই ছেলেগুলোই তাদের ক্যারিয়ারের সেরা সময় পার করছিলেন। ফলাফল টানা ৬ টি সিরিজ জয়। সাউথ আফ্রিকাকে প্রায় একা হাতেই পরাজিত করেছিলেন আমাদের সৌম্য। ভয়ডরহীন শটগুলো মনে পরলে এখনো চোখ দুটি জুড়িয়ে যায়। আর মুস্তাফিজের কল্যাণেই তো লেখা হয়েছিল ভারত বধের কাব্য। তাসকিন তো এতটাই ভয়ঙ্কর ছিল যে টি২০ ওয়ার্ল্ড কাপে দাদা বাবুদের সাথে খেলার আগেই তাকে বোলিং অ্যাকশনের দোহাই দিয়ে ব্যান করা হয়। ’১৫ ওয়ার্ল্ড কাপেও তাসকিনই ছিলেন বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি উইকেট শিকারি বোলার। আর সাব্বিরকে নিয়ে বেশি এক্সপেরিমেন্ট করতে গিয়ে দিনশেষে তাকেই বিপাকে ফেলেছি। সাব্বির এমন একটা প্লেয়ার যে কিনা ইনিংসের শেষের দিকে ব্যাট করতে নেমে ১০ বলে ২৫-৩০ রানে একটা ছোটখাটো টর্নেডো ইনিংস খেলে টিমের রানটা ৩২০-৩৩০ এ নিয়ে যাবে। কিন্তু তাকে আমরা দীর্ঘ একটা সময় ধরে খেলিয়েছি ৩ নাম্বার পজিশনে, তার খেলার ধরন চেঞ্জ করিয়েছি। এখন আবার তাকে ৭ এ ট্রাই করছি। ফলাফল অফফর্ম। অবশ্য এখানে সাব্বিরের নিজের উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপনও কম দায়ী নয়।

সৌম্যের অফ ফর্মের সুযোগে ২ নম্বর পজিশনটাকে ইম্রুল, বিজয় আর লিটনরা নিজেদের করে নিতে চাইলেও কেউই সুবিধা করতে পারে নি। তাই সৌম্যের পূর্ব রেকর্ড আর লিটনের বর্তমান ঘরোয়া রেকর্ড ও খেলার স্টাইলের কথা চিন্তা করে নির্বাচকরা হয়ত এই দুজনকেই তামিমের পার্টনার হিসেবে আসন্ন ওয়ার্ল্ড কাপের জন্য প্রস্তুত করবেন।

আমার নিজের কাছেও তামিমের পার্টনার হিসেবে ইম্রুল কিংবা বিজয়ের চেয়ে সৌম্যই সবসময় এগিয়ে থাকে। কেননা ইম্রুল বা বিজয় যেদিন ক্লিক করবে সেদিন দলের রানটা ২৭০-২৮০ তে পৌঁছাবে কিন্তু সৌম্য যেদিন ক্লিক করবে সেদিন দলের রান ৩২০ টপকাবে। আর আধুনিক ফ্ল্যাট ট্র্যাক ক্রিকেটে ৩২০ এর নিচে রান করে জেতাটা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপারই বটে।

বাকি তিনটা পজিশনেই এদের বিকল্প কোন প্লেয়ার আপাত দৃষ্টিতে চোখে পরছে না। অনেকেই হয়ত তাসকিনের বিকল্প হিসেবে আবু হায়দার রনি কিংবা রাহির কথা বলবে। কিন্তু ওয়ার্ল্ড কাপের আগে হঠাৎ করে নতুন কোন বোলারকে টিমে আনা দুঃসাহসিক পদক্ষেপই হবে। তাছাড়া তাসকিন নিজেও চেষ্টা করছে আবার পুরনো ফর্মে ফেরার, নাকল ডেলিভারি আয়ত্ত করে প্রিমিয়ার লিগেও বেশ কয়েকটি উইকেট নিজের ঝুলিতে পুড়েছেন। অধিকন্তু তাসকিনের ৫ বছরের অভিজ্ঞতা এবং গত ওয়ার্ল্ড কাপের পারফর্মেন্সও বিবেচ্য।

আরেকটি আশার কথা হচ্ছে মুস্তাফিজ আবার ধীরে ধীরে তার আগের ফর্মে ফিরছে। খুব খারাপ একটা ইনজুরির পর ফিজের আবার নিজেকে ফিরে পাওয়ার সময়টা যে একটু দীর্ঘ হবে সেটা অনুমেয় ছিল।

২০১৫ তে যখন ফিজের অভিষেক হয় পাকিস্তানের সাথে টি২০ দিয়ে তখন তার বলের গতি ছিল ঘণ্টায় ১২০-১২৫ কি.মি.। আমি ভেবেছিলাম আমরা হয়ত আরেকটি সৈয়দ রাসেল পেতে যাচ্ছি। কিন্তু পরবর্তী ২ মাস হিথ স্ট্রিক শুধু ফিজের বলের পেস বাড়ানোর জন্যই কাজ করলেন। তিনি হয়ত জানতেন এই ছেলেটার বলের পেস বাড়াতে পারলে তার কাটারগুলো পড়তে পারা শুধু দুর্বোধ্যই হবে না, প্রায় অসম্ভবই হবে। এবং হলও তাই। ইন্ডিয়া সিরিজে মুস্তাফিজ ফিরলেন ১৩৫-১৪০ কি.মি/ঘণ্টার কাটার নিয়ে। ফলাফল ইন্ডিয়ার সাথে বাংলাদেশের সিরিজ জয়।

এখনও মুস্তাফিজকে একই কাজ করতে হবে আগের সেই ভয়ঙ্কর ফিজে পরিণত হবার জন্য- বলের গতি ১৪০ এ নিতে হবে। গতি বাড়ানোর কাজ হয়ত তিনি এরই মধ্যে শুরুও করে দিয়েছেন।

একবার শুধু ভাবুন একটা বোলারের কাছে ১৪০ কি.মি/ঘন্টার সিমিং ডেলিভারি আছে, ১৩৫ কি.মি/ঘণ্টার দ্রুত গতির কাটার আছে আবার ১২০ কি.মি/ঘণ্টার স্লোয়ার কাটার আছে। কি ভয়ংকর হতে পারে সেই বোলারটা! সেই বোলারটার জন্য রইল শুভকামনা।

আমাদের পারফর্মেন্সের গ্রাফ নিম্নমুখী হবার আরেকটি কারণ হচ্ছে কোচ। হাতুরাসিংহের পদত্যাগের কয়েকমাস হয়ে গেলেও তার উত্তরসূরি আমরা এখনো পাই নি।

আমি ব্যাক্তিগতভাবে মনে করি একটা চ্যাম্পিয়ন টিমের দুটি পজিশনে সবসময় গাটসওয়ালা মানুষ থাকা প্রয়োজন। একজন টিমের অধিনায়ক, অপরজন টিমের কোচ। আমাদের এখন শুধু ভাল স্ট্রাটেজিক কোচ দিলেই পোষাবে না, গাটসওয়ালা কোচ লাগবে আমাদের টিমে। এমন কোচ লাগবে যে কিনা সাকিবের মত নাম্বার ওয়ান চ্যাম্পিয়ন প্লেয়ারের মুখের উপর কথা বলতে পারবে, তার ভুল ধরিয়ে দিতে পারবে, তামিমের মত দেশসেরা ব্যাটসম্যানকে মুখের উপর বলতে পারবে- “হয় ফিটনেসের উন্নতি কর, নইলে টিমের বাইরে যাও।“

আমাদের শিরোপা প্রত্যাশী হবার আরেকটি বড় কারণ পঞ্চপাণ্ডব।

মূলত আমাদের পঞ্চপাণ্ডবের কন্সিস্ট্যান্ট ভাবে অসাধারণ পারফর্মেন্সই আমাদের বাধ্য করেছে ট্রফি জয়ের আস্পর্ধা দেখানোর।

তামিম ইকবালের মত দেশসেরা ব্যাটসম্যান আমাদের ইনিংস ওপেন করেন। শুধু দেশসেরা বললে তার পারফর্মেন্সের অপমানই করা হয়। এই মুহূর্তে বিশ্বের সেরা তিন ওপেনারের মধ্যে যে তামিম ইকবাল একজন সেটা নিঃসংকোচেই বলা যায়। একজন তামিম ইকবাল যে কতটা ভয়ংকর হতে পারেন সেটা আমরা ’০৭ এর ওয়ার্ল্ড কাপ থেকেই দেখে আসছি। দিনকে দিন যেন আরও পরিণত আর ভয়ংকর হয়ে উঠছেন এই টাইগার ওপেনার। বছর তিনেক আগেও যাকে আমাদের কিছু প্লাস্টিক দর্শক “ডানো বয়” আর “ম্যাগি ম্যান” বলে ডাকতো, তারাই এখন গ্যালারীতে “তামিম তামিম” বলে গলা ফাটায়।
ইনিই আমাদের তামিম ইকবাল, একজন চ্যাম্পিয়ন।

সাকিব আল হাসানের মত নাম্বার ওয়ান অলরাউন্ডার আছে লাইন আপে। উনি এমন একজন প্লেয়ার যাকে শুধু তার ব্যাটিং কিংবা শুধু বোলিং এর জন্যই টিমে নেওয়া যায়। তাই টিমে সাকিব থাকা মানে ১২ জন নিয়ে মাঠে নামা। বাংলাদেশের মত দেশে আমরা এমন একজনকে পেয়েছি যিনি কিনা বিশ্বের সবগুলো টপ টিমে খেলার যোগ্যতা রাখেন। বর্তমান ক্রিকেট বিশ্বে এমন আরেকটি প্লেয়ার খুঁজে পাওয়া শুধু দুষ্করই নয়, অসম্ভবও বটে। এজন্যই হয়ত কোন এক ক্রিকেট লিজেন্ড একবার বলেছিলেন- সাকিবের মত প্লেয়াররা প্রতি ৫০-৬০ বছরে একবার জন্মান।
ইনিই আমাদের সাকিব আল হাসান, একজন চ্যাম্পিয়ন।

মাশরাফি বিন মুর্তজা, দেশ সেরা ক্যাপ্টেন। ক্রিকেটে যদি ডেডিকেশনের একটা র‍্যাঙ্কিং থাকতো তাহলে এই লোকটা তার ক্যারিয়ারের ১৭ বছরের পুরোটা সময়ই এই র‍্যাঙ্কিং এর শীর্ষে থাকতেন। এতবার ছুরি কাঁচির নিচে দিয়ে যাবার পরেও তিনি এখনো খেলে যাচ্ছেন এবং এখনো তিনি দলের অন্যতম সেরা পারফর্মার। ইনজুরির কারণে নিজের বোলিং অস্ত্রগুলোকে অনেকটাই লিমিটেডের মধ্যে এনে এখনো তিনি যা করে দেখাচ্ছেন, সেটা আমাদের টিমের ২০-২২ বছরের তরুণ তুর্কিরাও করতে পারছে না। এই বুড়ো বয়সেও প্রিমিয়ার লিগে রেকর্ড গড়ে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হচ্ছেন, দলকে চ্যাম্পিয়ন করছেন। মাশরাফি যেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের একটি পরশ পাথর, যেখানেই হাত দেন সেখানেই সোনা ফলান। ঘরোয়া টিম থেকে শুরু করে জাতীয় টিম। ’১৫ সালে তো তার হাত ধরেই আমাদের বড় টিম হয়ে উঠা।
ইনিই আমাদের মাশরাফি, একজন চ্যাম্পিয়ন।

মুশফিকুর রহিম, আমাদের ব্যাটিং অর্ডারে অন্যতম ভরসার প্রতীক। দলের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান। টিমের সাদামাটা একজন ব্যাটসম্যান থেকে শুধু পরিশ্রম আর অধ্যাবসায় দিয়েই যে টিমের সেরা একজন ব্যাটসম্যান হওয়া যায় সেটা মুশির থেকেই প্রথম দেখেছি। চাপের মুখে থেকে কত ম্যাচ যে তিনি বের করে এনেছেন তার হিসেব নেই। সত্যিকারের একজন ম্যাচ উইনার তিনি। আর প্রতিনিয়ত নতুন কিছু শেখার ইচ্ছা তাকে যেন আরও ভয়ঙ্কর করছে। এই তো কিছুদিন আগেও তার টি২০ দল থেকে বাদ পরার গুঞ্জন উঠেছিল। পরের সিরিজেই দলের সেরা ব্যাটসম্যান হয়ে সবাই কে জবাব দেন ব্যাট হাতে।
ইনিই আমাদের মুশফিক, একজন চ্যাম্পিয়ন।

মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ, আমাদের টিমের সেরা ফিনিসার, দলের বিপদের কাণ্ডারি। দল বিপদে পড়েছে আর মাহমুদুল্লাহ ব্যাট হাতে ঘুরে দাড়ায় নি এমনটা খুব কমই হয়েছে। ’১৫ বিশ্বকাপের আমাদের সাফল্যের অন্যতম হাতিয়ার ছিলেন এই মাহমুদুল্লাহ। যেখানে এর আগে বিশ্বকাপে আমাদের কোন সেঞ্চুরিই ছিল না, সেখানে মাহমুদুল্লাহ একাই ব্যাক টু ব্যাক সেঞ্চুরি করে বসেন। বলা হয়ে থাকে মাহমুদুল্লাহ নাকি আইসিসি ইলিমেন্ট। বলবে নাই বা কেন, তার ক্যারিয়ারের তিনটি সেঞ্চুরির সবগুলোই যে আইসিসি টুর্নামেন্টে। হাই ভোল্টেজ ম্যাচগুলোতে মাহমুদুল্লাহ সবসময়ই যেন টপ পারফর্মার বনে যান। দলের প্রয়োজনে টপ অর্ডার থেকে লোয়ার অর্ডারে শিফট হয়েছেন, ম্যাচ শেষ করে আসার অসাধারণ গুন রপ্ত করেছেন।
ইনিই মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ, একজন চ্যাম্পিয়ন।

রুবেল হোসেন, কিছু দিনের মধ্যেই হয়ত আমাদের ষষ্ঠ পাণ্ডবে পরিণত হবেন। মাশরাফির পরে হয়ত তিনিই আমাদের পেস বোলিং এর নেতৃত্ব দিবেন। ’১৯ ওয়ার্ল্ড কাপে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ১০ বছর পূর্ণ হবে। অনেকটা সময়ই পাড় করে ফেলেছেন ২২ গজে। অনেক ম্যাচ জয়ের নায়কও বনেছেন, হয়েছেন ক্যাপ্টেনের আস্থার প্রতীক। নিজেকে পরিচিত করেছেন দেশের সেরা ডেথ বোলার হিসেবে। কাইল মিলস কিংবা অ্যান্ডারসনের উইকেট নেবার পর সেই বুনো উল্লাস এখনো নিউরনে আলোড়ন ফেলে। এরাই তো চ্যাম্পিয়ন।

এতগুলো চ্যাম্পিয়ন প্লেয়ার একটা টিমে থাকার পরেও আমরা দর্শকরা বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের স্বপ্ন দেখতে নারাজ। আমরা যদি এভাবে আশাহত হয়ে পড়ি তাহলে আমাদের প্লেয়াররা কাদের জন্য মাঠ কাঁপাবে? তবে হ্যাঁ, আমাদের টিমে ছোট কিছু দুর্বলতা আছে যার জন্য হয়ত আমাদের দর্শকেরা কিছুটা আশাহত হয়ে পড়েছেন। কিন্তু আমাদের হাতে তো এখনও বছর খানেক সময় আছে নাকি? সঠিক পথে এগুলে এই এক বছরেই টিমটাকে আবার সেই সোনালী যুগের সরূপে নিয়ে যাওয়া যাবে। দুই দশক আগে বিশ্বকাপ জয়ের যেই স্বপ্নটা ভ্রূণ হয়ে হৃদয়ে বাসা বেঁধেছিল সেটা আজকে টগবগে যুবকের আকার ধারণ করেছে।

২০১১ এর ওয়ার্ল্ড কাপটা ইন্ডিয়া টিম শচিনকে উৎসর্গ করে খেলেছিল। আমাদের মাশরাফিরও এটা শেষ ওয়ার্ল্ড কাপ হতে যাচ্ছে। মাশরাফির মত কখনও হার না মানা একজন যোদ্ধা, যিনি তার জীবনের সতেরোটি বসন্ত পাড় করেছেন রণক্ষেত্রে। তাকে বড় কোন ট্রফি হাতে বিদায় না দিলে তার প্রতি অবিচারই করা হবে। আর সৃষ্টিকর্তা কখনও কারো প্রতি অবিচার করেন না। তাই, ’১৯ বিশ্বকাপটা আমরা আমাদের মাশরাফিকে উৎসর্গ করেই খেলতে চাই। মাশরাফিকে আবার লাল সবুজ পতাকা মাথায় বেঁধে পুরো মাঠে চক্কররত অবস্থায় দেখতে চাই।

তবে এবার হাতে স্ট্যাম্প থাকবে না, থাকবে রৌপ্য আর স্বর্ণ মিশ্রিত একটি ট্রফি। বিশ্বকাপ ট্রফি। ১৬ কোটি মানুষের স্বপ্নের ট্রফি।

Most Popular

To Top