ইতিহাস

তুতেনখামেন আর অভিশপ্ত এক হিটলিস্ট!

তুতেনখামেন নিয়ন আলোয় neon aloy

মিশর আর ফেরাওদের নিয়ে আগ্রহ তাবত দুনিয়ার। কাকাবাবুর মিশর হোক বা The MUMMY‘র মিশর, সবই পিরামিডের দেশ নিয়ে আমাদের আগ্রহ বাড়িয়েছে। সে আগ্রহের সাথে রহস্য যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন সময় মিশরের অভিশপ্ত মমির রুপকথায়। রহস্যময়ী ফেরাওদের মধ্যে তুতেনখামেন বিশ্বে নানান কারণে পরিচিত। মিডিয়ার কারণে হোক আর মানুষের আগ্রহের কারণেই হোক, যত দিন যাচ্ছে তত যেন ব্যাপারগুলো আরও ডালপালা মেলে কিংবদন্তিতে রুপ নিচ্ছে।

তুতেনখামেন নিয়ন আলোয় neon aloy

তুতেনখামেনের সমাধি আবিষ্কৃত হয় ১৯২২ সালের ২৬ নভেম্বর। অনেকেই মনে করে যখন তিন হাজার বছরের ঘুম থেকে ফেরাওকে জাগানো হল, তখন থেকেই রাজা তুত এক শক্তিশালী অভিষাপ বর্ষণ করে। যারা তার সংস্পর্শে আসবে সবার ক্ষেত্রেই এই অভিশাপ কোন না কোন ক্ষতি করবে। তাহলে চলুন দেখি কারা এখন পর্যন্ত তুতেনখামেনের এত কাছাকাছি আসার ভুল করেছেন।

১.জর্জ হার্বার্টঃ

তুতেনখামেন নিয়ন আলোয় neon aloy

জর্জ হার্বার্ট ছিলেন কার্নার্ভান নামক জায়গার পঞ্চম আর্ল (ব্রিটিশ উপাধি/পদবী)। মূলত তিনিই তুতেনখামেন এর সমাধি খোঁড়ার টাকা-পয়সা দিয়েছিলেন। স্বাভাবিক ভাবেই অভিশাপ পড়লে তার উপরেই আগে পড়া উচিৎ। তবে তার মৃত্যুর ধরণটা বেশ অদ্ভুত। তিনি যখন শেভ করতে যান, তখন মশায় কামড় দেয়া একটা জায়গা বেশ খানিকটা চিড়ে যায়। রেজারে থাকা জীবাণু দিয়ে সে জায়গাটা ইনফেক্টেড হয়। কয়েকদিন পরেই তিনি কায়রোর এক হোটেলে মারা যান। সমাধি খোঁড়ার প্রায় মাসখানেক পরে ঘটনাটি ঘটে বলে মিডিয়া এটাকে অভিশাপ বলে হইচই করতে থাকে। আর এখান থেকেই শুরু।

২.স্যার ব্রুস ইংহ্যামঃ

প্রত্নতত্ত্ববিদ হাওয়ার্ড কার্টার প্রথম তুতেনখামেন সমাধির আবিষ্কারক। সেখান থেকে উপহার হিসেবে ব্রুস ইঙ্গিহ্যামকে একটি পেপারওয়েট পাঠানো হয়। পেপারওয়েটটা ছিল মমি করা ব্রেসলেট পরা হাত, আর ব্রেসলেটে লেখা ছিল যে, ‘অভিশাপ তাকে যে আমার দেহকে সরিয়েছে’। অল্প কিছু দিন পরই ইঙ্গহ্যামের ঘরবাড়ি পুড়ে যায়, উপরি হিসেবে বাড়ি পূনর্নিমাণ কালে পুরো বাড়ি বন্যায় ভেসে যায়।

৩.জর্জ জে. গোল্ডঃ

জর্জ ছিলেন আমেরিকান ধনকুবের, পেশায় একজন রেলওয়ে কর্মকর্তা। ১৯২৩ সালে তুতেনখামেন এর সমাধি ঘুরতে যান জর্জ। মোটামুটি সাথে সাথেই অসুস্থ হয়ে পড়েন, যে অসুখ থেকে সেরে ওঠা আর হয় নি। কয়েক মাস পরে নিউমনিয়ায় মৃত্যু বরণ করেন।

৪.অব্রে হার্বার্টঃ

হার্বার্ট ছিলেন কার্নার্ভান লর্ডের সৎ ভাই। লোকে বলে শুধুমাত্র লর্ডের সাথে রক্ত সম্পর্ক থাকার জন্যই হার্বার্ট অভিশপ্ত হন। হার্বার্ট জন্মগতভাবেই চোখে ত্রুটি নিয়ে জন্মেছিলেন এবং একসময়ে তার দৃষ্টি শক্তি সম্পূর্ণ লোপ পায়। কোন এক ডাক্তার বলেছিলেন যে তার ইনফেক্টেড দাঁত থেকে এর সূত্রপাত। দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবার আশায় হার্বার্ট নিজের সমস্ত দাঁত তুলে ফেলেন। দৃষ্টি ফেরা দূরে থাক উল্টো সৎ ভাইয়ের মৃত্যুর পাঁচ মাসের মাথায় তিনিও মৃত্যু বরণ করেন।

৫.হিউ এভেলিন হোয়াইটঃ

ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ এভেলিন হোয়াইট সম্ভবত তুতেনখামেন এর সমাধিতে খোঁড়াখুঁড়ির কাজে সাহায্য করতেই গিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯২৪ সালের মাঝেই প্রায় দুই ডজন সহকর্মীর অযাচিত মৃত্যু বিরুপ প্রভাব ফেলে তার উপর। গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করার আগে নিজের রক্ত দিয়ে লিখেছিলেন, “আমি অভিশাপের কাছে নতি স্বীকার করলাম, যে অভিশাপ আমায় অদৃশ্য করল।”

৬.অ্যারন এম্বারঃ

আমেরিকান মিশর বিশেষজ্ঞ ছিলেন এম্বার, লর্ড কার্নাভান সহ তুতেনখামেন এর সমাধিতে কর্মরত অনেকের সাথে বন্ধুত্ব ছিল তার। ১৯২৬ সালে বাল্টিমোরে তার নিজের বাড়িতে এক ডিনার পার্টি শেষ করার কিছুক্ষনের মাঝেই এক অগ্নিকান্ড শুরু হয়, এম্বার তাতেই মারা যান। তিনি চাইলে নিজে বাঁচতে পারতেন কিন্তু তিনি ভাবেন তার স্ত্রী তাদের ছেলেকে বাঁচাতে পারবে। এই ভেবে নিজের পরিশ্রমের পান্ডুলিপিটা বাঁচানোর চেষ্টা করেন অ্যারন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে পরিবারের সবাই আগুনে পুড়ে মারা যান। অ্যারনের মৃত্যু হয় হাসপাতালে। পান্ডুলিপির নাম কি ছিল জানেন? “দ্যা ইজিপসিয়ান বুক অভ দ্যা ডেড”

৭.রিচার্ড বেথওয়েলঃ

বেথওয়েল ছিলেন লর্ড কার্নিভার্নের সেক্রেটারি। ১৯২৯ সালে বেশ কিছু ঘটনার পর রিচার্ডের মৃত্যু হয়। একদিন লন্ডনের এলিট জেন্টেলমেন ক্লাবে নিজের রুমে ধোঁয়া দেখতে পান তিনি। এরপর থেকে কিছু অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটতে থেকে তার বাড়িতে, যেখানে কি না তুতেনখামেনের সমাধি থেকে পাওয়া বেশকিছু মূল্যবান সম্পদ ছিল।

আরও পড়ুনঃ জিন ঝুই এর চায়না মমি!

৮.স্যার আর্চিবল্ড ডগল্যাস রেইডঃ

এতক্ষণে এটা স্পষ্ট যে অভিশপ্ত হতে হলে সবাইকে খোঁড়াখুঁড়ি করতে হবে না বা প্রত্নতত্ত্ববিদ হতে হবে না। রেইড ছিলেন রেডিওলজিস্ট। জাদুঘরে দেওয়ার আগে তুতেনখামেনের এক্সরে করেছিলেন। পরদিনই অসুস্থ হয়ে তিন দিনের মাথায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

৯.জেমস হেনরি ব্রিয়াস্টেডঃ

সে সময়ের বিখ্যাত মিশর বিশেষজ্ঞ। সমাধি খোলার সময় কার্টারের সাথে কাজ করছিলেন জেমস। সেখান থেকে ফেরার পর তিনি দেখেন তার পোষা ক্যানারি পাখিটিকে একটা গোখরা সাপ খেয়ে খাঁচার ভেতর বসে আছে। গোখরা সাপ ফেরাওদের প্রতিরক্ষার মিশরীয় প্রতীক। দৃশ্যটির ভয়াবহ ইন্ধন না বুঝতে পারার কিছু নেই। যদিও জেমস ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন, মিশর থেকে ফেরার পরই তার মৃত্যু হয়।

১০.হাওয়ার্ড কার্টারঃ

কার্টারের কখনই কোন অদ্ভুত রোগ হয়নি, এমনকি বাজে ধরনের আগুনে তার ঘরও পুড়ে যায় নি। ৬৪ বছর বয়সে লিম্ফোমা হয়ে মৃত্যু হয় তার। তার স্মৃতিস্তম্ভে লেখা আছে, “আপনার আত্মা শান্তি পাক, বেঁচে থাকুক লক্ষ বছর, আপনিই সে, যে থেবসকে ভালবাসতেন, উত্তরের হাওয়ায় গা এলিয়ে, আপনার চোখে যেন সব সময় সুখ ভাসে।” অভিশাপ থেকে তিনি কিভাবে মুক্তি পেলেন সেটা জানা সম্ভব না। অনেকের মতে নিজে জীবিত থেকে স্বজন ও সহকর্মীদের মর্মান্তিক পরিণতি গুলো প্রত্যক্ষ করাই তার অভিশাপ ছিল।

শুধু এই দশটি অপমৃত্যুই নয়, অনেকে মনে করেন টাইটানিক ডুবে যাওয়ার পিছনেও কাজ করছে মমির অভিশাপ!

আরও পড়ুনঃ তুরস্কের হাজার বছরের ইতিহাসের সাক্ষী অনন্যসুন্দর হাজিয়া সোফিয়া!

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top