টেক

ইবোলা মহামারী – নিঃশব্দে কি এগিয়ে আসছে ভয়াবহ মৃত্যু?

ইবোলা নিয়ন আলোয় neon aloy

গত ৯ মে কংগোতে চতুর্থবারের মত ইবোলা সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। এতে এখন পর্যন্ত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

পত্রপত্রিকায় হয়তো বছর কয়েক আগে আফ্রিকার কিছু দেশে ইবোলা মহামারীর খবর পড়েছিলেন। কিন্তু পৃথিবীর এ অংশে ইবোলা ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেনি বলে অতটা গা করেননি। তবে এই রোগটি কি আসলেই এড়িয়ে যাওয়ার মত? আজকের এই লেখায় আমরা চেষ্টা করবো এই ভাইরাসের সাথে আপনাদের পরিচিত করে দিতে। এরপর আপনি-ই বুঝবেন এই ভাইরাস নিয়ে সচেতন না থাকা কি বুদ্ধিমানের কাজ কিনা!

একবিংশ শতাব্দীতে ঘাতক ব্যাধি এইডস আর ক্যান্সারের পরে মহামারী হিসেবে পরিচিতি পাওয়া আরেক রোগ হল ইবোলা ভাইরাস ডিজিজ (ইভিডি)। শুধুমাত্র ২০১৪ সালে ইবোলার হাতে মৃত্যু হয় আফ্রিকার পশ্চিমে গিনি, সেনেগাল আর লাইবেরিয়া’র অন্তত ১১,৩১৫ অধিবাসীর। ভাইরাসটির দুটি আলাদা ভার্সন (স্ট্রেইন) থাকলেও ইবোলা-জাইর নামে প্রচলিত ভার্সনটি মানুষের দেহে রোগ সৃষ্টি করে।

ইবোলা ভাইরাসটি আবিষ্কৃত হয় ১৯৭৬ সালে। আফ্রিকার জাইর (বর্তমান কংগো) অঞ্চলে ভাইরাসের প্রথম উপদ্রব। ধারণা করা হয় ফলবাদুড়ের কামড় থেকে একটি ৪ বছরের শিশুর শরীরে প্রবেশ করে ভাইরাসটি। শিশুটিকে নিকটবর্তী মিশনারী হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সেখান থেকে আক্রান্ত হন বেলজিয়ান এক নার্স। আফ্রিকার বাদবাকি অনুন্নত দেশগুলোর মত সেখানেও স্বাস্থ্য সেবায় ঝুঁকিপূর্ণ চর্চা প্রচলিত ছিল। একই সিরিঞ্জ ব্যবহার করে একাধিক রোগী সেখান থেকে শরীরে নিয়ে আসেন ভাইরাস। অন্তত ৩০০ নারী উক্ত হাসপাতাল থেকে মাতৃত্ব সংক্রান্ত সেবা গ্রহণ করতেন। ভাইরাসের সংক্রমণ এতটা ভয়াবহ গতিতে অগ্রসর হয় যে মিশনারী হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা ৬ জন নার্স ও ২ জন ডাক্তারের ভেতর ৪ জন মৃত্যুবরণ করেন। জীবিত স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজেদের একটি বায়োসেফটি কক্ষ তৈরি করে সেখানে বন্দী জীবন শুরু করেন। তাদের মধ্যে সিনিয়র ডাক্তার বেলজিয়ান নার্সের রক্ত বেলজিয়ামের অ্যান্টয়ার্প ইনস্টিটিউট অভ ট্রপিকাল মেডিসিনে পাঠিয়েছিলেন। অজ্ঞাত কারণের অবধারিত মৃত্যুর অপেক্ষায় পার হতে থাকে তাদের দিন।

অ্যান্টয়ার্পে একটি ফ্লাস্কে করে আসে ঘাতক ভাইরাস বহনকারী রক্ত আর একটা চিরকুট। চিরকুটে লেখা “বেলজিয়ামের এক নার্স অভূতপূর্ব রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। আমরা এখনও এর কারণ খুজে বের করতে পারিনি। আপনাদের সহায়তা প্রয়োজন।” রক্তের নমুনা নিয়ে দায়িত্বরত বিশেষজ্ঞ পিটার পায়ট খোঁজ শুরু করেন। প্রথমে ল্যাবে ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপের নিচে রক্তে ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। পিটার ও তার সহকর্মীরা প্রথমে ভাইরাসটিকে মার্বার্গ ভাইরাস মনে করেন। ইতোমধ্যে জাইর থেকে নার্সের মৃত্যুর সংবাদ আসে বেলজিয়ামে। ভাইরাসটি যে নতুন প্রজাতির সেটা নিশ্চিত হয়ে সংক্রমণের সূত্রপাত কোথায় জানার জন্য জাইরের উদ্দেশ্যে রওনা হন পিটার ও তার সহকর্মীদের একটি দল। হাসপাতালে গিয়ে সন্ত্রস্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তার আশ্বাস দেন তারা। বায়োলজিকাল ডিটেক্টিভ ওয়ার্কের মাধ্যমে তারা সকল সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে পান ইয়াম্বুরু মেমরিয়াল হাসপাতালটিকে। এই হাসপাতালেই ভর্তি ছিল ৪ বছরের শিশুটি। জাইরে থাকাকালীন সময়ে তারা ভাইরাসের জীবনবৃত্তান্ত নথিভূক্ত করেন। নার্সটির রক্তে পাওয়া ভাইরাসটিকে দীর্ঘ ৮ মাস গবেষণার পর নাম দেওয়া হয় ইবোলা। নামটি নেওয়া হয়েছে জাইর অঞ্চলের নিকটবর্তী একটি নদীর নামানুসারে।

ইবোলা নিয়ন আলোয় neon aloy

ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপের নিচে ইবোলা ভাইরাস

ইবোলা ভাইরাসের সংক্রমণে রক্তক্ষয়ী এক রোগের সৃষ্টি হয় যার নাম দেওয়া হয় ইভিডি। রোগটির প্রধান উপসর্গ হলঃ

  • অনিয়ন্ত্রিত জ্বর
  • দূর্বলতা
  • পেশীতে ব্যথা
  • ভাঙ্গা কন্ঠস্বর
  • মাথাব্যথা
  • বমি
  • অস্বাভাবিক ডাইরিয়া, এবং
  • অভ্যন্তরীণ/বাহ্যিক রক্তক্ষরণ।

সংক্রমণের ২-২২ দিনের মধ্যে উপসর্গগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে। ইভিডি এর কোন নির্দিষ্ট চিকিৎসা এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। আফ্রিকার সাধারণ বন্য প্রাণী যেমন, বাদুড়, শিম্পাঞ্জী, অ্যান্টিলোপের সাথে সরাসরি সংস্পর্শ বা মাংস ভক্ষণের থেকে ভাইরাসটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। মানুষের শরীরে ভাইরাসটির প্রথম আবাসস্থল ফুসফুসের কোমল পেশির ভেতরে। খুব অল্প সময়ে সেখান থেকে ভাইরাসটি বংশ বিস্তার করে ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত শরীরে। ইবোলায় আক্রান্তদের মৃত্যু হার শতকরা ৮৮-৯০% যার মূল কারণ হল যথাযথ চিকিৎসার অভাব। তবে ভাইরাসটির ভায়াবহতাটি এর সংক্রমণ পদ্ধতিতেই বেশ স্পষ্ট। শরীরের যেকোন তরলের মাধ্যমে ইবোলা সংক্রমিত হয়। আক্রান্তদের মরদেহ স্পর্শেও সংক্রমণের ঝুঁকি আছে। আক্রান্তদের থেকে রক্ত বা অঙ্গ প্রতিস্থাপন বা দৈহিক মিলনে সংক্রমণের ঝুঁকি সব চেয়ে বেশি।

২০১৪ সালে ইবোলার সবচেয়ে বিধ্বংসী সংক্রমণ ঘটে। সেনেগাল, গিনি আর লাইবেরিয়ার মধ্যেই এই মহামারী সীমাবদ্ধ থাকলেও সেখান থেকে আগত মিশনারী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অনেকে এই ভাইরাসটিকে বহন করে নিয়ে আসেন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানী, স্পেন, ফ্রান্স আর নরওয়ের মত উন্নত দেশগুলোতে। সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন আরেকটি সংক্রমণ ঘটনা ঘটে ফিলিপাইনে। ধারণা করা হয় স্প্যানিশ এক নার্স ইউরোপের প্রথম সংক্রমণের শিকার হন। জাইরের পর এই প্রথম ইবোলা মহামারী আকার ধারণ করে। তবে এই সংক্রমণে গবেষকদের চক্ষু চড়ক গাছ হওয়ার উপক্রম হয়। জেনেটিক অনুসন্ধানে জানা যায় ইবোলা-জাইর এর থেকেও বেশি সংক্রমণ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি মিউট্যান্ট স্ট্রেইন এগারো হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর কারণ। নতুন ভাইরাসটি তাদের প্রাকৃতিক পোষকের (বাদুড়) পরিবর্তে মানুষের দেহে সংক্রমণে চৌকষ হয়ে উঠছে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন। আফ্রিকায় আত্মীয় স্বজনদের মরদেহ নিয়ে প্রচলিত প্রথার জের ধরে বিবর্তিত নতুন ভাইরাসের সংক্রমন ঘটতে থাকে ক্ষীপ্রতার সাথে। ২০১৫ সালে এসে ডব্লিউএচও(WHO) আক্রান্ত দেশ গুলো কে মহামারী মুক্ত ঘোষণা করে। রিপোর্ট অনুসারে শেষ সংক্রমণের ৪২ দিন পর আর কোন সংক্রমণের ঘটনা ঘটেনি।

ইবোলা নিয়ন আলোয় neon aloy

২০১৪ সালের ইবোলা মহামারীর বিস্তৃতি

ইবোলা ভাইরাসের প্রকোপে পশ্চিম আফ্রিকার অনুন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা চূড়ান্তে পৌঁছে গেছে। প্রত্যেক পরিবারে একাধিক সদস্যের মৃত্যুর ফলে বাস্তুহারা হয়ে পড়েছে এক বিশাল জনগোষ্ঠী। এতিম শিশুদের সংখ্যা বেড়েছে কয়েক গুণ। ইবোলার ছোবল থেকে যারা মুক্ত হতে পেরেছিলেন তাদের জন্যেও বিষয়টা সহজ হয়নি। ইভিডি থেকে আরোগ্য পাওয়া রোগীদের চোখের অপটিক প্রেশার বেশি থাকতে দেখা যায়। বিশদ পর্যবেক্ষণে বের হয়ে আসে রক্ত সম্পূর্ণ ভাইরাস মুক্ত হলেও চোখের আকুয়াস হিউমারে ভাইরাস দীর্ঘদিন জীবিত থাকতে পারে। শরীরের অন্যান্য তরলের পরিবর্তে অশ্রুর মাধ্যমে সংক্রমণ হতে পারে এধরণের রোগী থেকে। এক্ষেত্রে পেশী আর হাড় ক্ষয় এবং শ্রবণ শক্তি লোপের ঝুঁকিও অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি।

জেনেটিকালি মডিফাইড অর্গানিজম আর ইন্সুলিন কালচারের যুগে এখনও ইবোলা একটি মরণব্যধি। এখন পর্যন্ত দুটি দেশে ইবোলার বিক্রয়যোগ্য ভ্যাক্সিন প্রস্তুত সম্ভব হয়েছে। একটি মার্কিন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানী গ্ল্যাক্সোস্মি ক্লাইনের ল্যাবে (CaD3) এবং অন্যটি কানাডার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তত্বাবধায়নে নিউ লিংক জেনেটিক টেকনোলজির (rVSV) প্রচেষ্টায়। তবে গেল বছর দুই প্রস্তুতকারকই জানিয়েছে তাদের প্রস্তুতকৃত ভ্যাক্সিনের মজুদ শেষ। এমতাবস্থায় ইভিডি এর চিকিৎসা নিয়ে গবেষণায় জোর দিচ্ছে ডব্লিউএচও এবং সিডিসি (Center for Disease Control and Prevention)।

ইবোলা সংক্রমণ নিয়ে বিতর্কিত কিছু ঘটনা ঘটেছে মিডিয়ায় যেগুলোর সত্যতা যাচাই সম্ভব হয়নি। সাইরিল ব্রডেরিক নামের একজন আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মার্কিন অধ্যাপক দাবি করেন যে ইবোলা একটি জেনেটিক্যালি ইঞ্জিনিয়ার্ড মারণাস্ত্র যা মার্কিন সামরিক মন্ত্রণালয়ের (ডিপার্টমেন্ট অফ ডিফেন্স) তত্বাবধায়নে তৈরি করা হয়েছে। তিনি আরো দাবী করেন যে ইবোলার একটি ক্লাস-এ বায়ো ওয়েপন স্যাম্পল প্রস্তুত করেছে ডিওডি এবং তার বিপরীতেই ভ্যাক্সিন তৈরির প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

সাইরিলের মতামত ঠিকমত খোলাশা হওয়ার মধ্যেই গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইনের ইবোলা ভ্যাক্সিন আবিষ্কারকদের মধ্যে একজন চার্লস আর্ন্টজেন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে জেনেটিকালী ইঞ্জিনিয়ার্ড ভাইরাস ব্যবহার করার মতামত ব্যক্ত করেন। ইন্টারনেটে এই মন্তব্য নিয়ে ব্যাপক তোড়জোড়ের সৃষ্টি হয়।

তবে আর দশটি ইন্টারনেট গল্পের মত ইবোলার ঘটনাটিও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

ইবোলার সংক্রমণের ক্ষমতা এই ভাইরাসটিকে মানুষের জন্য ভয়ানক এক শত্রুতে রুপ দিয়েছে। শতকরা ৭৬% মানুষকে আক্রান্ত করার ক্ষমতা রাখে ভাইরাসটি। যেহেতু যেকোন ধরণের সংস্পর্শে সংক্রমণ হতে পারে এই কারণে ডব্লিউএচও এর নির্দেশ মতে ইবোলা ঝুঁকিপূর্ণ দেশে ভ্রমণ বা সেখানের পণ্য/প্রাণী আমদানী বিষয়ে সচেতনতা ও সতর্কতা অত্যাবশ্যক। ইবোলা আক্রান্ত দেশ গুলোর মানুষের সাথে মেলা-মেশার ক্ষেত্রেও সচেতন হওয়া জরুরী। ভাইরাসটির সংক্রমণ ক্ষমতার কারণে এটির ঝুঁকি বিশ্বের সকল প্রান্তেই বিদ্যমান।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশে যদি এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়, তাহলে কি আমরা এ থেকে বাঁচতে পারবো? এ প্রশ্নের উত্তর বেশ জটিল। যার উত্তর দিতে পারেন শুধুমাত্র একজন চিকিৎসক- “আমাদের অসহায় চিকিৎসাহীন মৃত্যু ডেকে আনছি আমরাই!”

পুনশ্চ

মারবার্গ ভাইরাসঃ ১৯৬৭ সালে জার্মানী ও ইয়ুগোস্লাভিয়ায় প্রথম সংক্রমণ হয়। ভাইরাস হিসেবে এটি দানবাকার এবং দেখতে অনেকটা ইবোলা ভাইরাসের মতই। রোগের লক্ষণেও মিল রয়েছে।

মিউট্যান্ট স্ট্রেইনঃ জীনগত তারতম্যের ফলে সৃষ্ট ভিন্ন প্রজাতি। ইবোলার মিউট্যান্ট স্ট্রেইনটি নিজের গ্লাইকো-প্রোটিন খোলসটিকে পোষকের চাহিদা অনুসারে পরিবর্তন করার ক্ষমতা অর্জন করে। ফলে মিউট্যান্টটি ইবোলা-জাইরের থেকেও বেশি ভয়ংকর মহামারীর সূত্রপাত করে।

Cad3: গ্ল্যাক্সো স্মিথের আবিষ্কৃত ভ্যাক্সিনের পেটেন্ট কোড। শিম্পাঞ্জির এ্যাডিনোভাইরাস থেকে এই ভ্যাক্সিনটি তৈরি করা হয়েছে।

rVSV: কানাডার স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় ও নিউ লিংক জেনটেকের আবিষ্কৃত ইবোলা ভ্যাক্সিন। ভেসিকুলার স্ট্রোমাটাইটিস ভাইরাসে রিকম্বিনেশনের মাধম্যে ইবোলার গ্লাইকো-প্রোটিন তৈরি করা হয় ফলে এটি শরীরে ইবোলা ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা কোষ তৈরি করে।

আরো পড়ুনঃ হাজার ওষুধ খেয়েও জীবন বাঁচাতে পারবেন না আর ক’দিন পর!

Most Popular

To Top