ইতিহাস

হিটলার কি ১৯৪৫ সালের পরেও বেঁচে ছিলেন?

হিটলার মৃত্যু নিয়ন আলোয় neon aloy

১৯৪৫ সালের ৩০শে এপ্রিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রায় শেষের দিকে। হিটলারের পতন নিশ্চিত। বার্লিনে নিজের Führerbunker এ পায়চারি করেছেন মহানায়ক হিটলার। শেষ পর্যন্ত কি তাকে পরাজয় মেনে নিতে হবে? কিন্তু বিশ্বজয়ের এই মহানায়ক কি পারবে এই পরাজয় মেনে বেঁচে থাকতে? শেষে নিলেন কঠিন এক সিদ্ধান্ত। এই পরাজয় নিজের চোখে দেখার চেয়ে আত্নহত্যা করবেন তিনি। আত্মহত্যার মুহুর্তে তাকে সঙ্গ দিলেন তার স্ত্রী ইভা ব্রাউন। সায়নাইড খেয়ে নিজেই নিজের উপর গুলি করে আত্মহত্যা করলেন। মারা যাওয়ার আগে তার নির্দেশ ছিল তার দেহ যেন পুড়িয়ে ফেলা হয়। তার কথা মত তাও করা হল। ইতিহাসে এক শাসকের নাম মৃতের খাতায় যোগ হয়ে গেল।

এই সব কথা তো আমরা সবাই জানি। হিটলার মারা যাওয়ার ৭৮ বছর হয়ে গেল। কিন্তু যদি এখন আপনি শুনতে পারেন যে হিটলার বেঁচে আছে, তাও আবার বহাল তবিয়তে। হ্যাঁ, শুনতে অবাক লাগলেও অনেকের মতে হিটলার মারা যায়নি এবং বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে। এর পক্ষে অনেক প্রমাণও হাজির করেছেন অনেক সময়। চলুন দেখে নেওয়া যাক সেগুলো কি কি-

মৃত্যুর কারণ নিয়ে সন্দেহ

হিটলার আত্মহত্যা করেছেন, কিন্তু কিভাবে করেছেন তা নিয়ে রয়েছে নানা সংশয়। অনেকের মতে তিনি সায়নাইড খাননি,কিন্তু পিস্তল মুখে ঢুকিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তার স্ত্রী ইভা ব্রাউন সায়নাইড খেয়েছে। আবার অনেকের ধারণা তিনি সায়নাইড খেয়ে মুখে পিস্তল ঢুকিয়ে আত্মহত্যা করেন। কিন্তু আসলে কিভাবে মারা গিয়েছেন সেটা নিয়ে কেউ নিশ্চিত ছিল না। যেহেতু তারা মারা যাওয়ার পর তাদের পুড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ ছিল, তাই পরবর্তীতে বাঙ্কারের ভেতরে ঢুকে দুটো পোড়া মৃতদেহ ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায়নি। তবে এই বিতর্কের অবসান ঘটে ১৯৪৬ সালে যখন একটা কঙ্কালের খুলি পাওয়া যায় যার মাঝে একটি গুলির ফুটা ছিল।

হিটলার মৃত্যু নিয়ন আলোয় neon aloy

কঙ্কালের খুলিটি মহিলার

পিস্তল দিয়ে আত্মহত্যা নাকি সায়নাইড খেয়ে আত্মহত্যা – এই বিতর্কের অবসান ঘটেছিল ১৯৪৬ সালে একটি কঙ্কালের খুলি পাওয়ার পর যার মাঝে ফুটা ছিল। কিন্তু এই বিতর্কের শেষ তখনো পুরোপুরি ঘটেনি। ১৯৪৬ সালে Führerbunker-এ যে খুলিটি পাওয়া যায় তা হিটলারের ভেবে খুলিটি রাশিয়ান আর্কাইভে রাখা হয়। খুলির পাশাপাশি চোয়ালের হাঁড় ও দাঁতের কিছু অংশ পাওয়া যায়। খুলিতে গুলি লাগার চিহ্নও ছিল। ২০০৯ সালে কানেক্টিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু গবেষক খুলিটি নিয়ে পরীক্ষা করেন। পরীক্ষায় পাওয়া যায় যে হিটলারের খুলি হিসেবে যেটি আর্কাইভে রাখা ছিল সেটি হিটলারের নয়, এমনকি কোন পুরুষেরও নয়। বরং ৪০ বছরের চেয়ে কম বয়সী কোন এক মহিলার খুলি ছিল সেটি। যদিও চোয়ালের হাঁড় কিংবা অন্যান্য অংশগুলো কখনো পরীক্ষা করা হয়নি।

হিটলার মৃত্যু নিয়ন আলোয় neon aloy

এফবিআই রিপোর্ট

হিটলারের আত্মহত্যা নিয়ে শুরু থেকেই সকলের মাঝে নানা গুঞ্জন ছিল। পরবর্তীতে সেই গুজবের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে এফবিআই থেকেই একটি পরিপূর্ণ তদন্ত করা হয়। তদন্তটি ১৯৪৫ সালে অক্টোবরে এফবিআই-এর ডিরেক্টর J. Edgar Hoover এর কাছে হস্তান্তর করা হয়। রিপোর্টে কি লেখা ছিল সেটা অবাক করার মতই। রিপোর্টে লেখা ছিল যে হিটলার মারা যাননি বরং পালিয়ে গিয়েছিলেন। হিটলার পালিয়ে আর্জেন্টিনায় চলে যান। এমনকি রিপোর্টে আরো লেখা ছিল তিনি সাবমেরিনে করে কোথায় গিয়ে থেমেছিলেন, কোন রেস্টুরেন্টে খেয়েছেন আর কোথায় থেকেছেন। এ সকল কিছুই রিপোর্টে প্রকাশ করা হয়।

হিটলার মৃত্যু নিয়ন আলোয় neon aloy

জোসেফ স্টালিনের বক্তব্য

যুদ্ধে নাৎসি জার্মানিদের বিপক্ষে রাশিয়ার নেতৃত্ব দেন জোসেফ স্টালিন। বার্লিনে সোভিয়েত ইউনিয়নের আক্রমণই ছিল মূলত হিটলারের আত্মহত্যার কারণ। ১৯৫৬ সালে পটসডামের এক কনফারেন্সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান জোসেফ স্টালিনকে প্রশ্ন করেন হিটলার বেঁচে আছে কিনা। স্টালিন এর উত্তর দেন যে হিটলার মারা যাননি, বেঁচে আছে। স্টালিনের এই কথার উপরে ভিত্তি করে পরবর্তীতে আবার হিটলারের মৃত্যু রহস্য নিয়ে আবার নতুন করে তদন্ত শুরু হয়, যদিও ১৯৫৬ সালের আগ পর্যন্ত হিটলারকে অফিসিয়ালি মৃত হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি।

হিটলার মৃত্যু নিয়ন আলোয় neon aloy

হিটলারের বডি ডাবল

বিখ্যাত অনেক ব্যক্তিরাই শত্রুর চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য নিজের মত দেখতে বডি ডাবল রাখেন। বডি ডাবল রাখার কারণ- যদি কেউ কোন হামলাও করে তবে যেন আসল ব্যক্তির কোন ক্ষতি না হয়। সেরকম হিটলারেরও বেশ কিছু ডাবল ছিল। হিটলার তার নিজের ডাবলদের বেশ পছন্দ করতেন। অনেকে ধারণা করে যে ওইদিনে হিটলার নয়, বরং হিটলারের কোন বডি ডাবল মারা গিয়েছিল। আর এই আত্মহত্যার নাটক সাজিয়ে তিনি সকলের চোখে ধুলো দিতে চেয়েছিলেন। হিটলারের সব ডাবলদের মাঝে তার সবচেয়ে প্রিয় ছিল গুস্তাভ ওয়েলার। ১৯৪৫ সালে গুস্তাভ ওয়েলারকে বার্লিনে মৃত পাওয়া যায়। কিছুদিনের জন্য তাকে সত্যিকারের হিটলার বলেও ভুল করেছিলেন অনেকে।

হিটলার মৃত্যু নিয়ন আলোয় neon aloy

গুস্তাভ ওয়েলারঃ হিটলারের বডি ডাবলদের মধ্যে একজন

নাৎসিদের দেখা আর্জেন্টিনার ইউ-বোট রিফিউজি

বেশ কয়েকজন নাৎসি নেতা যুদ্ধ শেষে ইউ-বোট (জার্মান সাবমেরিন) করে আর্জেন্টিনায় পালিয়ে যান। পালিয়ে যাওয়া নেতাদের মধ্যে রয়েছেন জোসেফ মেঙ্গেলে ও অ্যাডলফ আইখম্যান। পালিয়ে যাওয়ার পরে নেতারা সেখানে অনেক বছর ধরে লুকিয়ে ছিলেন। যদিও নাৎসি বাহিনীর সদস্যদের নিরাপত্তা দেওয়ার ফলে আর্জেন্টিনাকে বেশ চাপের মুখে থাকতে হয়েছিল, কিন্তু আর্জেন্টিনার সরকার কখনোই খোলাখুলিভাবে নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যাপারে কিছু বলেনি। Grey Wolf: The Escape of Adolf Hitler বইয়ের মতে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হুয়ান পেরন ও তার স্ত্রী এভিটা হিটলারকে লুকিয়ে থাকার ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারেন, কারণ তারা নাৎসি বাহিনীর কাছ থেকে অনেক বছর ধরে আর্থিক সহযোগীতা পেয়েছেন।

হিটলার মৃত্যু নিয়ন আলোয় neon aloy

প্রত্যক্ষদর্শীদের চোখে হিটলার

দক্ষিণ আমেরিকায় থাকাকালীন সময়ে অনেক ব্যক্তিই হিটলারকে দেখেছেন কিংবা তাকে চিনতেন বলে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন Grey Wolf: Adolf Hitler Escape To Argentina ডকুমেন্টারিটি বানানোর সময়। ডকুমেন্টারি শেষে সাক্ষ্য দেওয়া ব্যক্তিদের নাম প্রকাশ করা হয়। তাদের মাঝে দুইজন ব্যক্তি মৃত্যুর হুমকিও পান অজানা সূত্র থেকে। সাক্ষ্য দেওয়া ব্যক্তি ও ছোট ছোট নানা তথ্য যোগাড় করে একসাথে জোড়া লাগিয়ে জানা যায় যে ইনালকোতে এক ম্যানশনে হিটলার যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বসবাস করতেন। ১৯৫৪ সালে তার স্ত্রী ইভা ব্রাউনের সাথে তার বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। ইভা তাদের মেয়ে আরসালাকে নিয়ে নিউকেন-এ চলে যান। এবং এই সাক্ষ্য প্রদানকারীদের মতে ১৯৬২ সালে ৭৩ বছর বয়সে হিটলার মারা যান।

Hitler in Brazil – His Life and His Death বইয়ের লেখক Simoni Renee Guerreiro Dias প্যারাগুয়েতে তোলা হিটলারের এই ছবিটি প্রকাশ করে। যদিও ছবিটির বাজে অবস্থার কারণে বোঝা যায় না আদৌ কার ছবি এটি তবুও অনেকে ছবির ব্যক্তিটির সাথে হিটলারের মিল খুঁজে পান।

হিটলার মৃত্যু নিয়ন আলোয় neon aloy

হিটলারের শেষ পরিণতি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও অনেকেই মনে করে হিটলার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেও বেঁচে ছিলেন। আশা করা যায় একদিন এসকল রহস্যের অবসান ঘটবে ও আমরা আসল ঘটনা জানতে পারব।

আরও পড়ুনঃ আপনি কি হিটলার-অনুরাগী?

Most Popular

To Top