ইতিহাস

তুরস্কের হাজার বছরের ইতিহাসের সাক্ষী অনন্যসুন্দর হাজিয়া সোফিয়া!

তুরস্ক হাজিয়া সোফিয়া নিয়ন আলোয় neon aloy

কয়েক দশক আগে প্রায় মাথা নুইয়ে থাকা দুবাইতে হঠাৎ এত লম্বা লম্বা বিল্ডিং মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে কেন সেটা আজকে সবাই জানেন। প্রাকৃতিক সম্পদ তেল দেশটাকে একদম আমূল বদলে দিয়েছে। অথবা চিন্তা করুন যদি ব্রিটিশরা আমাদের এ উপমহাদেশে না আসত তাহলে হয়ত বাংলো ধরনের বিল্ডিং তৈরিই হত না।

আসলে কোন একটা দেশের স্থাপত্য কেমন হবে সেটা অনেকখানি নির্ভর করে সে দেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতির উপর; সেই সাথে আবহাওয়া আর টেকনলজি তো আছেই।

ভূ-রাজনৈতিক কারণে তুরস্কের মত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা খুব কমই আছে। এশিয়া, ইউরোপ আর আফ্রিকা- এই তিন মহাদেশের একদম মাঝে হওয়ায় সব সময় এই অঞ্চলের ক্ষমতা নিয়ে সব সময়ই বিশৃঙ্খলা চলেছে। মূলত এ অঞ্চল দখলে নিতে পারলে এশিয়া আর ইউরোপের মাঝে বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা যায় খুব সহজেই। তাই কখনো আরবীয় আবার কখনো ইউরোপীয় স্থাপত্য রীতির প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে এক অনন্য সাধারণ স্থাপত্যধারা তৈরি হয়েছে এই তুরস্কে।

তুরস্ক হাজিয়া সোফিয়া নিয়ন আলোয় neon aloy

এশিয়া-ইউরোপ-আফ্রিকার মাঝে সংযোগ করেছে টার্কিশ অঞ্চল

তুরস্কের স্থাপত্য আর ‘বিবর্তন’ কথাটি একদম খাপ খেয়ে যায়। কত ধরণের ইতিহাস তুর্কী স্থাপত্যের নানা পরতে পরতে আছে সেটা আজ বলা বেশ মুশকিল। তবে এখন পর্যন্ত জানা মতে এর শুরু হয়েছিল প্রায় দশ-বারো হাজার বছর আগে গোবেকলি টিপ (Gobekli Tepe) নামের এক জায়গা থেকে। কেউ যদি মিশরের পিরামিড দেখে বিস্মিত হয় সে আসলে এটার কথা শুনে আরো অবাক হওয়ার কথা। দশ হাজার খ্রিষ্টপূর্বে, বরফ যুগের পরপরেই কিভাবে এই ধরনের একটা স্থাপনা তৈরি করা সম্ভব হল, তাও আবার এমন কিছু মানুষের হাতে যারা কিনা তখনও শিকার করে আর সংগ্রহ করেই পেটপূজা করতো- তা ভেবে বের করা মুশকিল।

তুরস্ক হাজিয়া সোফিয়া নিয়ন আলোয় neon aloy

বার হাজার বছরের পুরনো ধর্মীয় স্থাপনা (বামে); পাথরে খোঁদাই করা বিভিন্ন প্রানীর প্রতিকৃতি (ডানে)

আসলে স্থাপনাটি আজকের তুলনায় কিছুই নয়, গোল করে করে রাখা কিছু পাথর, মূলত ধর্মীয় কাজেই তৈরি। ধারণা করা হচ্ছে এগুলোই এখন পর্যন্ত তৈরি সবচেয়ে পুরানো ধর্মীয় স্থাপনা। পুরো এলাকায় নানা সময়ের তৈরি প্রায় বিশটির উপরে স্থাপনা আছে। আর কিছু কিছু পাথরে বিভিন্ন প্রানীর এত নিখুঁত কাজ করা আছে যে ভাবতে কষ্ট হয় তারা তখনো কৃষিকাজ শিখছে মাত্র।

গোবেকলি টিপের প্রায় চার হাজার পরে ব্রোঞ্জ যুগের শেষের দিকে ‘হিটাইটস’ নামের এক সভ্যতার পত্তন হয়। যে সভ্যতা কি না স্থায়ী হয়েছিল প্রায় হাজার পাঁচেক বছর। ‘হিটিউসা’ (Ḫattuša) ছিল এ সভ্যতার রাজধানী। ততদিনে এ এলাকার অধিবাসীরা কৃষিকাজে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তাই একটা সুন্দর সমাজ ব্যবস্থা ততদিনে গড়ে উঠছে। যদিও প্রথমদিকে তারা বসতি গড়া শুরু করেছিল পাহাড়ের চূড়ায়। কিন্তু শেষের দিকে তারা সমতলে নেমে আসে।

তুরস্ক হাজিয়া সোফিয়া নিয়ন আলোয় neon aloy

মূল সাইট (বামে-উপরে), সিংহ তোরণ (বামে-নিচে), ষোল দেবতার প্রতিমূর্তি (ডানে ঊপরে), স্ফিংস তোরণ (ডানে নিচে)

সভ্যতা আগে শুরু হলেও রাজধানী হিটিউসার গোড়াপত্তন হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব ১৭০০ অব্দের দিকে, মিসরীয় সভ্যতার সমসাময়িক সময়ে। তাই পুরো স্থাপনায় সে সময়ের ছাপ স্পষ্ট; যেমন স্পিংস এবং লায়ন গেট। আর তুরস্কে পাথরের অভাব না থাকায় বেশিরভাগ স্থাপনা তৈরি হয় পাথর দিয়েই।

এর পরবর্তীতে নানা সময় নানা সভ্যতা আর সেই সাথে নানারকম স্থাপত্যরীতির উদ্ভব হয়েছে। এর মাঝে ‘ট্রয়’কে তো সবাই চেনে। ‘এফেসাস’ নামের যে গ্রিক সিটি পাওয়া যায় তাতে রোমান স্থাপত্যেরও ছোঁয়া পাওয়া যায়। তবে এতসব ইতিহাস আর স্থাপত্যের স্তরের মাঝে সব থেকে বিখ্যাত যে স্থাপনা, সেটা তৈরি হয়েছিল চার্চ হিসেবে; মাঝে কিছু সময় এটি ছিল মসজিদ, আর এখন জাদুঘর। হাজিয়া সোফিয়া নামের এই বিল্ডিং ট্যুরিস্টদের জন্য প্রধান আকর্ষণ, কিন্তু স্থপতিদের জন্য এক বিস্ময়। কেন বিস্ময় সেটা বলার আগে কোন প্রেক্ষিতে ‘হাজিয়া সোফিয়া’ তৈরি হয়েছিল সেটা বলা জরুরি।

তুরস্ক হাজিয়া সোফিয়া নিয়ন আলোয় neon aloy

হাজিয়া সোফিয়া, যার ধ্রুপদী বিন্যাসে বিমোহিত হয় স্থপতিরাও

যীশুখ্রিষ্ট জন্মের প্রায় পাঁচ’শ বছর পরে, তখন খ্রিষ্টধর্ম ছড়িয়ে গেছে বিভিন্ন দিকে। কিন্তু ৬৪ খ্রিষ্টাব্দে রোমান সাম্রাজ্যে আগুন লাগার পর সম্রাট ‘নিরো’ খ্রিষ্টানদের দায়ী করে, আর রোমান সম্রাজ্যে এ ধর্ম নিষিদ্ধ করে। এরপর থেকে রোমান সাম্রাজ্যে প্রায় ২০০ বছর প্রকাশ্যে খ্রিষ্টধর্ম পালন নিষিদ্ধ ছিল। যার ফলে খ্রিষ্টান ধর্মের কোন ধরণের কোন স্থাপনাই সে সময় দেখা যায়নি, না চার্চ, না কোন ক্যথেড্রাল। কিন্তু ৩৩০ অব্দে সম্রাট ‘কন্সটেন্টাইন’ তার রাজ্য রোম থেকে ‘বাইজেন্টাইন’ সরিয়ে নিয়ে আসেন আর নতুন নামকরণ করেন ‘কন্সট্যান্টিনোপল’। খ্রিষ্টান ধর্মকে তার রাজ্যের অফিসিয়াল ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করার ফলে বেশ বড় আকারে চার্চের দরকার পড়ে। কিন্তু আগেকার রোমান যে স্থাপত্যধারা চলে আসছিল এতদিন ধরে, তারা সেটা সরাসরি নিতে চায়নি। তাই রোমান স্থাপত্যরীতির সাথে নতুন প্রযুক্তি মিশিয়ে নতুন যে স্থাপত্যধারা তৈরি হয় সেটাই মূলত ‘বাইজেনটাইন স্থাপত্য’।

তুরস্ক হাজিয়া সোফিয়া নিয়ন আলোয় neon aloy

প্যান্থেননঃ পুরু দেয়াল দিয়ে ধরে রাখা সেই সময়ের সবচেয়ে বড় স্থাপনা

আর এই বাইজেনটাইন স্থাপত্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হল ‘হাজিয়া সোফিয়া’। বাইজেনটাইন স্থাপত্যের হলেও হাজিয়া সোফিয়ার মূল অনুপ্রেরনা ছিল ‘প্যানথেনন’ নামের রোমান মন্দির। সে সময়ে এই মন্দিরে ছিল সবথেকে বড় গম্বুজ। তাই মূলত চমক লাগিয়ে দেয়ার জন্যই সম্রাট চাইলেন তার থেকেও বড় গম্বুজ বানাতে। কিন্তু সমস্যা হল প্যান্থেননে গম্বুজের ওজন নেয়ার জন্য নিচে যত মোটা দেয়াল দেয়া হয়েছিল সেটা সম্রাট দিতে চাইলেন না।

তুরস্ক হাজিয়া সোফিয়া নিয়ন আলোয় neon aloy

হাজিয়া সোফিয়ার ত্রিমাত্রিক প্রতিরূপ (বামে), গম্বুজের ওজন যেভাবে মাত্র চারটি কলাম দিয়ে ধরে রেখেছে (ডানে)

সব থেকে কম দেয়াল দিয়ে কিভাবে সবচেয়ে বড় উচ্চতার স্পেস তৈরি করা যায়- সেটাই ছিল স্থপতিদের চ্যালেঞ্জ। একে তো প্রায় ১০০ ফিট চওড়া গম্বুজ, তার পর আবার তারা সেটাকে ১৮০ ফিট উঁচুতে রাখতে হবে! তাই বাধ্য হয়ে স্থপতিদের নতুন ধরনের প্রযুক্তি তৈরি করতে হল। শুধুমাত্র চারটা কলামের উপর অতবড় একটা গম্বুজ রাখার পর স্বাভাবিক ভাবেই কলাম গুলো পলকা হয়ে গেল। তাই কলামগুলোকে আবার পাশ থেকে ধরে রাখার জন্য স্থপতিরা ছোট অর্ধগম্বুজ ব্যবহার করলেন, সেটাকে ধরার জন্য আবার আরেকটা ছোট অর্ধগম্বুজ। এভাবে গম্বুজ গম্বুজ দিয়ে বিশাল একটা জায়গা বের হয়ে গেল।

তুরস্ক হাজিয়া সোফিয়া নিয়ন আলোয় neon aloy

নান্দনিক ও পরিমিত আলো আর সুউচ্চ কাঠামো তৈরি করে এক ঐশ্বরিক অনুভূতি

অনেকেই ভাবতে পারেন এত কষ্ট করে কেন এত্তগুলা গম্বুজ বানাতে গেল? সোজা একটা স্ল্যাব বানিয়ে ফেললেই তো হত। আসলে তখনো বিল্ডিং মজবুত করার জন্য লোহার রড বানানো শুরু হয় নি। তাই সমস্ত কাঠামো ধরতে হত ইট বা পাথর গেঁথে গেঁথে। তুরস্কে পাথর বেশ সহজলভ্য হলেও গম্বুজের ওজন কমানোর জন্য ইটের বিকল্প ছিল না। তবে ইটের তৈরি হলেও মোজাইকের ব্যবহার ভেতরে অসাধারণ আবহ তৈরি করেছিল।

তুরস্ক হাজিয়া সোফিয়া নিয়ন আলোয় neon aloy

একের পর এক গম্বুজ মিলে তৈরি করেছে বড় উন্মুক্ত জায়গা

অনেক স্থাপনা কোন একটি সময়কে তুলে ধরলেও হাজিয়া সোফিয়া নিজেই বিভিন্ন ইতিহাসের সাক্ষী। অটোমান সাম্রাজ্যের উত্থানের আগ পর্যন্ত অর্থোডোক্স, ক্যাথলিক ক্যাথেড্রাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে ১৪৫৩ সালে এটাকে মসজিদ হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়। তখন বেশ কিছু সংযোজন-বিয়োজন হয়। পাশের মিনার চারটি সে সময় সংযুক্ত করা হয় আর ভেতরের মোজাইকে ‘হিউম্যান মোটিফ’ থাকায় মোজাইক গুলোকে প্লাস্টারে ঢেকে দেয়া হয়। যদিও ১৯৩৫ সালে জাদুঘরে পরিবর্তনের সময় থেকে মোজাইকগুলো পুনরুদ্ধারের চেষ্টা হয়েছে। কিছু কিছু সফলতাও এসেছে। আর কাঠামোর সুরক্ষার জন্য তো কিছু ব্যবস্থা আছেই।

তুরস্ক হাজিয়া সোফিয়া নিয়ন আলোয় neon aloy

ভেতরের মোজাইক

এখন পনেরশত বছর পরেও হাজিয়া সোফিয়া যেভাবে টিকে আছে সেটা একটা বিস্ময়, তার উপর আবার এমন একটা এলাকায় যেটা কি না বেশ ভুমিকম্প প্রবণ। ইউরোপিয়ান প্লেট আর এশিয়ান প্লেটের মাঝে হওয়ায় ইস্তাম্বুলের নিচ দিয়ে কিছু ফল্ট লাইন গেছে। ফলে প্রায়ই এখানে ভুমিকম্প হয়। এমনকি ১৯৯৯ সালে ৭.৫ মাত্রার যে ভুমিকম্প হয়েছিল, তাতে ইস্তামবুল শহরের অনেক স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেলেও হাজিয়া সোফিয়া টিকে গিয়েছিল।

তুরস্ক হাজিয়া সোফিয়া নিয়ন আলোয় neon aloy

আসলে সে সময়ের স্থপতিরা এমন এক বিল্ডিং তৈরি করেছিল যেটা কিনা ছিল সময়ের চেয়েও অনেক এগিয়ে। আজকের দুনিয়ায় খুব কম স্থাপনাই আছে যা এত-এত ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এখনো। দাঁড়িয়ে থাকুক হাজিয়া সোফিয়া আজীবন ‘ধ্রুপদী স্পেসবিন্যাস আর তাকলাগানো ইঞ্জিনিয়ারিং’ এর নিদর্শন হয়ে।

Most Popular

To Top