বিশেষ

একটি শিরোনামহীন গল্প

শিরোনামহীন নিয়ন আলোয় neon aloy

“প্রতিটি রাস্তায়, প্রতিটি জানালায়
হাসিমুখ হাসিমুখে আনন্দধারা
তুমি চেয়ে আছো তাই, আমি পথে হেঁটে যাই
হেঁটে হেঁটে বহুদুর বহুদুর যেতে চাই”

বাংলাদেশের যেকোন যুবক-যুবতীকে উপরের লাইনগুলো দেখিয়ে যদি জিজ্ঞেস করা হয় কার গান এটা, অধিকাংশই এক নিঃশ্বাসে বলবে “শিরোনামহীনের হাসিমুখ”।
এতোটাই বিখ্যাত বর্তমান সময়ে শিরোনামহীন। যুবক-যুবতী, কিশোর-কিশোরী নির্বিশেষে সকল বয়সেরই মানুষের এতো পছন্দ এই ব্যান্ডটি।

সেই ১৯৯৬ সালে ব্যান্ডটির যাত্রা শুরু হয় তিন বন্ধুর মাধ্যমে। জিয়া, বুলবুল এবং জুয়েল। এখানে জিয়া এবং জুয়েল গিটারে, আর বুলবুল ভোকালে। তিনজনই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর শিক্ষার্থী ছিলেন। ভার্সিটির আড্ডার ছলে গান-বাজনা এবং গিটারে টুংটাং করে করেই তাদের গানের আসর জমতো। তাদের গাওয়া গানগুলো ছিলো নিজেদের লেখা এবং সুর করা। বন্ধুবান্ধব তাদের এই গানের আসরের এতো ভক্ত হয়ে পড়েছিলো যে জিয়ারা যেখানে যেতেন সেখানে গানবাজনা হতোই। এবং তাদের বন্ধুদের অনুপ্রেরণা ও উৎসাহেই তাদের ব্যান্ড খোলার কথা মাথায় আসে এবং ব্যান্ড হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় পারফর্ম করার কথা ভাবেন জিয়া, বুলবুল এবং জুয়েল।

ঠিক তখনই তাদের সামনে একটা সুযোগ দেখা দেয়। জিয়াদের পদাতিক নাট্যচক্র তাদের জন্য একটা গান করতে বলে এবং জিয়ারাও তাদের পুরোটা দিয়ে একটা গান করে দেন সেই নাট্যচক্রকে। ১৯৯৬ সালের এপ্রিল মাসে তাদের সেই গান মঞ্চে শুনে সেখানের দর্শকরা সব মুগ্ধ হয়ে প্রশ্ন করে জিয়াদের উদ্দেশ্য – “নতুন এই দলের নাম কি?” এবং তারা তাৎক্ষণিক উত্তর দিলেন “শিরোনামহীন”। এবং সেই থেকেই তাদের ব্যান্ডটি এখনো “শিরোনামহীন”।

শিরোনামহীন নিয়ন আলোয় neon aloyশিরোনামহীন নিয়ন আলোয় neon aloy

সেকালের শিরোনামহীন [ছবি সৌজন্য ক্যানভাস]

ব্যান্ডের বেজিস্ট জিয়াউর রহমান জিয়ার ভাষ্যমতে তাদের পথচলার শুরুটা ছিলো বেশ এবড়ো-থেবড়ো। একটা গিটার ছিলো শুধু সম্বল হিসেবে তাদের, কিন্তু তবুও দমে যাননি তারা। সামনে এগিয়ে যাবার সাহস এবং অনুপ্রেরণা ছিলো তাদের গান। প্রথমদিকে তারা মাঝে মাঝে নিজেদের গান রেকর্ড করতে চেষ্টা করতেন বিভিন্ন স্টুডিওতে, কিন্তু কখনোই একটা পূর্ণ এলবামের রূপ পেতো না সেসব রেকর্ডগুলো।

দুঃখের বিষয়, সেই প্রথম এলবামের কাজ চলাকালীন সময়েই বুলবুল, জুয়েল, মাহীন ব্যান্ড ছেড়ে দেন বিভিন্ন ব্যাক্তিগত কারনে। ২০০০ সালে ভোকালে আসেন তানজীর চৌধুরী তুহিন। তুহিন বুয়েটের আর্কিটেকচারের ছাত্র ছিলেন এবং তিনি জিয়ার বন্ধুও ছিলেন। ২০০৩ সালে ব্যান্ডে সারোদ ও দোতারায় ফারহান, গিটারে তুষার এবং ড্রামসে আসেন বর্তমান ড্রামার কাজী শাফিন আহমেদ।

এই লাইনআপ নিয়েই ব্যান্ডটি বেনসন এন্ড হেজেস আয়োজিত “2nd Star Search Competition” এর ফাইনাল রাউন্ডে উঠে এবং শ্রোতাদের ফিডব্যাক পেয়ে ব্যান্ড তাদের গানগুলো এলবাম বন্দী করার কথা ভাবে। তাদের তখন ৫০টিরও বেশী গান ছিলো নিজেদের, এর মধ্য থেকে ১০টি গান নিয়ে তারা তাদের “জাহাজী” এলবামটি ২০০৪ সালে বাজারে ছাড়ে।

শিরোনামহীন নিয়ন আলোয় neon aloy

বাঁদিক থেকে জিয়া-শাফিন-দিয়াত-রাসেল-তুহীন

তারপর ২০০৬ সালে বের হওয়া তাদের দ্বিতীয় এলবাম “ইচ্ছেঘুড়ি” এর কাজ শেষ হলে ফারহান ব্যান্ড ছেড়ে দেন এবং ২০০৯ সালে দিয়াত খান আসেন গিটারে। এরপর রাসেল কবীর ২০১০ সালে কিবোর্ডে আসলে ব্যান্ডটির লাইনআপ মোটামুটি লম্বা সময়ের জন্য একটি স্থিতি লাভ করে।

কিন্তু ২০১৭ সালে নিজস্ব কিছু কারণে তানজীর তুহিন ব্যান্ড ছেড়ে দেন। তিনি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে স্ট্যাটাস দিয়ে সবাইকে জানান, তিনি শিরোনামহীন ব্যান্ডে আর থাকছেন না। তুহিনের স্ট্যাটাসটি ছিলো-

“আমি তানযীর তুহিন, ব্যক্তিগত কারণে শিরোনামহীন ব্যান্ড থেকে সরে যাচ্ছি, কিন্তু গান ছাড়ছি না।”

পরবর্তীতে এ নিয়ে নিজের স্ট্যাটাস আপডেটে নিজেদের মতামত জানান ব্যান্ডের অন্যান্য সদস্যরাও।

এরপর ব্যান্ডের ভক্তদের মধ্য একটা অস্থিরতা কাজ করতে শুরু করে যে এখন শিরোনামহীন কি আর আগের মত সব গান করতে পারবে? আর কারো গলায় কি “সেই কবে ছিল উচ্ছাস, কিছু শঙ্কায় ভরা চুম্বন”, “একা পাখি বসে আছে শহুরে দেয়ালে” বা “ইচ্ছে হলে ভালবাসিস, নাহয় থাকিস যেমন থাকে স্নিগ্ধ গাংচিল” লাইনগুলো গাওয়া হলে আগের মতোন একদম মনে গিয়ে বিঁধবে?

আর ভক্তদের এই দোলাচলের মধ্যে ২০১৭ সালেই চট্টগ্রামের ব্যান্ড “একোনাইট” এবং “নোনতা বিস্কুট” এর ভোকাল শেখ ইশতিয়াককে ব্যান্ডের ভোকাল হিসেবে যুক্ত করা হয়।

শিরোনামহীন নিয়ন আলোয় neon aloy

শেখ ইশতিয়াক

কোন এলবাম এখন পর্যন্ত রিলিজ না করলেও বেশ কিছু সিঙ্গেল নোনতা বিস্কুট রিলিজ করেছে, যার সবগুলোই শ্রোতাসমাজে বেশ সমাদৃত হয়েছে।

শিরোনামহীন নিয়ন আলোয় neon aloy

শেখ ইশতিয়াককে নিয়ে শিরোনামহীন

ডিস্কোগ্রাফিঃ

শিরোনামহীন এ পর্যন্ত ৫টি নিজস্ব এলবাম বের করেছে। সেগুলো হলো,

১। জাহাজী(২০০৪)
২। ইচ্ছে ঘুড়ি(২০০৬)
৩। বন্ধ জানালা(২০০৯)
৪। শিরোনামহীন রবীন্দ্রনাথ(২০১০)
৫। শিরোনামহীন শিরোনামহীন (২০১৩)

শিরোনামহীন নিয়ন আলোয় neon aloy

শিরোনামহীনের এলবামগুলোর প্রচ্ছদ

এছাড়া মুঠোফোন, গোধূলি, ট্রেন, প্রান্তর, কফি হাউজ, চিঠি, জাদুকর, বোহেমিয়ান, বারুদ সমুদ্র এবং এ রাতে নামক কয়েকটা সিঙ্গেল সময়ের সাথে তারা রিলিজ করে। এখানে সবগুলো এলবাম এবং অধিকাংশ সিঙ্গেল তুহিনকে নিয়ে রিলিজ করলেও জাদুকর, বোহেমিয়ান, বারুদ সমুদ্র এবং এ রাতে সিঙ্গেল চারটি তারা শেখ ইশতিয়াকের ভোকালে রিলিজ করে।

বিশ্বাস করবেন না জানি, তবে এই গানটির কোরাসে এতবার “নিয়ন আলোয়” এর কথা উঠে আসার ব্যাপারটি সম্পূর্ণ কাকতালীয়!

শিরোনামহীনের কিছু জানা-অজানাঃ

১। ২০০২ সালে যখন তাদের এলবামের কাজ চলছিলো তখন দুই দল সন্ত্রাসীর গোলাগুলির মাঝে পড়ে সনি নামক বুয়েটের এক কৃতি শিক্ষার্থী খুন হন আর তার এই মৃত্যু নিয়ে শুরু হয় নোংরা রাজনীতি। এতে সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা প্রতিবাদ শুরু করলে সাথে যোগ দেয় “শিরোনামহীন”। তাদের বাদ্যযন্ত্রের কাজ আন্দোলনকারীদের আরো প্রাণবন্ত এবং সেই আন্দোলনকে আরো জোরদার করে তোলে।
২। শিরোনামহীন ২০০৮ সালের ৩১শে আগস্ট বামবা(বাংলাদেশ মিউজিকাল ব্যান্ডস এসোসিয়েশন) এর সদস্য হয়।
৩। ২০১০ সালে বের হওয়া শিরোনামহীনের চতুর্থ এলবাম “শিরোনামহীন রবীন্দ্রনাথ”-এ তাদের নিজেদের ধাঁচে গেয়ে রেকর্ড করে বিভিন্ন রবীন্দ্রসঙ্গীত।
৪। তানজীর তুহিন শিরোনামহীন থেকে আলাদা হয়ে নতুন একটি ব্যান্ড শুরু করেন “আভাস” নামে।
৫। ২০১৪ সালে শিরোনামহীন প্লে-স্টোরে “শিরোনামহীন” নামক তাদের একটি অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ বের করে যেখানে ব্যান্ড মেম্বারসদের ডিটেইলস, তাদের গান, লিরিক্স, ছবি এবং আপডেটসহ ব্যান্ডের সব তথ্যাদি পাওয়া যায়।

শেখ ইশতিয়াককে ব্যান্ডের নতুন ভোকাল হিসাবে নেবার পর অনেক ভক্ত এবং শ্রোতাই সেটা মেনে না নিতে পেরে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক গণমাধ্যমগুলোতে তাকে নিয়ে যাচ্ছেতাই বলে যাচ্ছিলো দেখে চট্রগ্রামের বিখ্যাত ব্যান্ড “বে অফ বেঙ্গল” এর ভোকালিস্ট, ফ্লুটিস্ট এবং গিটারিস্ট বখতিয়ার হোসেন একটি স্ট্যাটাসে সেসকল মানুষদের উদ্দেশ্য বলেন,

“একটা প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় ব্যান্ডের কঠিন সময়ে কিছুদিন গেস্ট ভোকাল হিসেবে কাজ করতে গিয়ে নিরপরাধ একটা বাপ মরা ছেলে তার বাপ মা নিয়ে গালি খেয়েই যাচ্ছে।
অসাধারন ফ্যান আমরা। একজনের জন্য বুকভরা ভালবাসা দেখাতে গিয়ে, আরেজনের বুকে পাথর ফেলে দেই।
কেউ কোন ব্যান্ডের পায়ে ধরে বা জোর খাটিয়ে গেস্ট ভোকাল হয়না, ন্যূনতম এই উপলদ্ধিটা যদি আমাদের হতো…”

তানজীর তুহীন ব্যান্ড ছাড়ার পর শেখ ইশতিয়াক একজন ভক্ত হিসেবে একবার অনুরোধ করেছিলেন তুহিনকে সম্ভব হলে সব কলহ সমাধান করে, কলহের কথা ভুলে শিরোনামহীনে থেকে যেতে। কিন্তু তুহীন শেখ ইশতিয়াককে শিরোনামহীনের নতুন ভোকাল হওয়ার জন্য অভিনন্দন জানিয়ে বলেন যে ইশতিয়াকের সেই অনুরোধ রাখা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

এটি নিয়ে শেখ ইশতিয়াক ফেসবুকে একটি পোস্টও দিয়েছিলেন।

একটা ব্যান্ড যদি ভেঙে না যায়, তবে এর লাইনআপ চেঞ্জ হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমাদের শ্রোতা এবং ভক্তদেরও উচিৎ সেটা বুঝে নেয়া যে একটা ব্যান্ডের একজন মেম্বার নিশ্চয়ই বিনা কারণে ব্যান্ড ছেড়ে যান না। তাই কোন মেম্বারের কোনকিছুর কারণে তাকে সমালোচনার জোয়ারে ভাসিয়ে দেওয়ার আগে তাদের অবস্থাটাও বুঝে নেয়া দরকার নয় কি? নতুনজন হয়তো আগের চেয়ে ভালো করতে পারে সুযোগ দিলে- কে জানে! তাই সবকিছু না জেনে না বুঝে কারো পরনিন্দা করাটা নিশ্চয়ই কোন বুদ্ধিমান সঙ্গীতপ্রেমীর পরিচয় নয়।

Most Popular

To Top