বিশেষ

মেনা ট্রটঃ ব্লগকে আমজনতার কাতারে নামিয়ে আনার পিছনের কারিগর…

আজকালকার খুব পরিচিত কিছু মাধ্যমের মাঝে তরুণ প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি মাধ্যম ব্লগ। ব্যক্তিগত মতামত থেকে শুরু করে সংবাদ প্রকাশ পর্যন্ত সবকিছুতেই সমানভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে ব্লগের। শুরুতে এতোটা জনপ্রিয় না হলেও আস্তে আস্তে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং সহজে ব্লগ ব্যবহার করা যায় বলে বর্তমানে মাধ্যম হিসেবে খুবই জনপ্রিয়। কিন্তু শুরুতে ব্লগ এমন ছিল না, বরঞ্চ তা ছিল জনসাধারণের আয়ত্ত্বের বাইরে।

এখন প্রায় অনেক মানুষই ব্লগ লিখেন এবং পড়েন। এছাড়া আয় রোজগারও সম্ভব হচ্ছে ব্লগের মাধ্যমে। যে কয়েকজন মানুষ ব্লগের এই পরিবর্তনটুকুর মাধ্যমে আমাদের সামনে সহজবোধ্য এক রূপে হাজির করেছেন, তার মাঝে মেনা ট্রট অন্যতম। পুরো নাম মেনা গ্রবোস্কি ট্রট।

প্রথম জীবনে ডিজাইনার হিসেবে কাজ শুরু করলেও এটা নিয়ে কোনভাবেই সুখী ছিলেন না মেনা ট্রট। ১৯৭৭ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ট্রটের জন্ম। তার মা ছিলেন কিউবান বংশোদ্ভূত। ইংলিশের ছাত্রী ট্রটের লেখালেখির প্রতি ছিল দুর্নিবার আকর্ষণ। তাই ডিজাইনার হবার পরেও লেখালেখির জগতটা তাকে প্রচন্ড হাতছানি দিতে থাকে।

একসময় সেই হাতছানিই তাকে ব্লগের দিকে ঠেলে দেয়। তাছাড়া মাথায় ছিল “আমি কিছু করে সেরা হতে চাই” এই ভাবনা। তিনি সবসময় ভাবতেন অনেক কিছু করার চেয়ে কিছু একটা করে সেরা হওয়াটা ভালো। সেজন্য মানুষ যেটা বেশি ভালো পারে সেটা নিয়েই সামনে যাওয়া উচিত। ট্রটের শক্তিশালী দিক ছিল তার লেখার জগত। লেখাকে সামনে তুলতে পারলে আমি হয়তো সেরা হতে পারব- এই চিন্তাধারা থেকেই মেনা’র ব্লগ লেখা শুরু।

মেনা ট্রট নিয়ন আলোয় neon aloy

জীবন এবং ব্লগিংকে যেভাবে দেখেন মেনা ট্রট [ছবি কৃতজ্ঞতা: এজেডকোটস]

ব্লগ সম্পর্কে আমাদের বিভিন্নজনের বিভিন্নরকম ধারণা রয়েছে। একসময় শুধু খবর প্রকাশ করাকেই ব্লগ বলে অভিহিত করা হত। সেখানে নিয়ত ভয়ংকর সংবাদের প্রাধান্য বেশি ছিল। সুতরাং ব্লগের মানেই তখন ছিল ভীতিকর কিছু। কিন্তু ক্রমান্বয়ে এই ধারণার পরিধি পরিবর্তন হয়েছে। জরুরী অবস্থায় খবরাখবর পৌছানোর দ্রততম মাধ্যম হিসেবেও হয়েছে জনপ্রিয়। এছাড়াও মানুষকে জানানোর জন্য বিভিন্ন কাজে ব্লগ হয়েছে প্রধান হাতিয়ার। খবর ছাড়াও আমাদের চারপাশের জগতকেও ব্লগের মাধ্যমে তুলে ধরা যাচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের কাছেও হয়েছে সমান জনপ্রিয়। খবরাখবর ছাড়াও দৈনন্দিন জীবনও ঠাঁই পেয়েছে এখানে। এবং সেটাও সম্ভব হয়েছে ট্রটের হাত ধরে। মূলত এখন আমরা ব্লগকে যে রূপে দেখি তার পেছনে ট্রটের অবদান অনেকখানি। বলা যায়, ব্লগ বিপ্লব শুরুই হয়েছে ট্রটের হাত ধরে।

২০০১ সালে ২৩ বছর বয়সে মেনা ট্রটের ব্লগিং এর ক্যারিয়ার শুরু হয়। যেহেতু তিনি লেখালেখির জগত বেশি ভালোবাসতেন তাই ছোট ছোট গল্পকেই ব্লগে স্থান দিলেন। একসময় এই ছোট গল্পগুলোই মানুষকে উৎসাহ দিল। এগার বছর বয়সের একটি ক্রিশ্চিয়ান ক্যাম্প অভিজ্ঞতার ইলাস্ট্রেশন দিয়ে তার প্রথম ব্লগ। এরপরে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে তার ব্যক্তি জীবনের কথা উঠে এসেছে তার ব্লগে। সংবাদের উপস্থাপনের বাইরেও যে ব্লগকে ব্যবহার করা যায় সেটা ট্রটের কাছ থেকেই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। ব্যক্তিগত জীবনধারাও যে উপস্থাপনের বিষয় হতে পারে মেনা সেটিকেই বিভিন্ন আঙ্গিকে দেখিয়েছেন। আমি সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে জনপ্রিয় না হতে পারলেও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মাঝে জনপ্রিয় হতে পারি, এই ধারণাকে কেন্দ্র করে তার ব্লগিং এর জীবন শুরু হয়। যেহেতু ইন্টারনেট আমাদের জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে এবং আমরা সহজেই একে অপরের সাথে কানেক্টেড থাকতে পারি সেখানে অতি দ্রুতই মেনার ধারণা জনপ্রিয়তা পায়। এবং দেখা যায় ব্যক্তি জীবনের গল্প শেয়ার করার পরে কিছু মানুষও পাওয়া যায় যারা পরিবারেরও অংশ হয়ে দেখা দেয়।

শুরু থেকেই মেনা ট্রট একটা স্বপ্ন দেখেছিলেন দ্য সাউথ এ্যাওয়ার্ড এর, যেটা সাউথ ইস্ট উইব্লগ থেকে দেয়া হয়। ব্লগিং এর নতুন জীবন শুরু করার আগে পর্যন্ত তার তেমন কোন এ্যাওয়ার্ড ছিল না। এবং যেহেতু তিনি তার লেখালেখির মাধ্যমে পরিচিত হতে চেয়েছিলেন ব্লগিং তাকে সেই সাহায্যই করেছিল। তার জনপ্রিয়তা অবশেষে তাকে এ্যাওয়ার্ডটি এনে দিয়েছিল। এছাড়া ২০০৪ সালে পিসি ম্যাগাজিনেও এসেছিলেন ট্রট এবং ৩৫ বছরের নিচে সেরা শত আবিষ্কারকের তালিকায় তার নাম ছিল একই বছর।

মেনা ট্রট নিয়ন আলোয় neon aloy

জীবনসঙ্গী এবং সহকর্মী বেনজামিন ট্রটের সাথে মেনা।

মেনা ট্রট The Sew Weekly পরিচালনা করতেন। এর প্রধান লক্ষ্য ছিল “প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটি কাপড় সেলাই করুন” এই ধারণাকে ছড়িয়ে দেয়া। এই ধারণার মাঝে তার মায়ের জন্য কাপড় ( সেলিব্রেটিং মাদার’স) এবং গোলাপী ফেব্রিকের কাপড়ও সমান জনপ্রিয়। এভাবে প্রতি সপ্তাহে মেনা চেষ্টা করতেন নতুন ধারণাকে তুলে ধরার। যদিও এই ব্লগ প্রজেক্টটি ২০১২ সালে শেষ হয়।

প্রতিদিন প্রায় দশ হাজারের মত মানুষ মেনা ট্রটের ব্লগ পড়ে থাকেন। সর্বদা হাসিখুশি ট্রট সাধারনত ব্যক্তিগত জীবন কিংবা তার সাথে সম্পর্কিত বিষয়াদি নিয়ে ব্লগ লিখতে তিনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এই তালিকায় তার পরিবার পরিজন, আত্মীয়স্বজন, ছোটবেলার বন্ধু এমনকি পোষা পাখিও ছিল। মূলত এসব বিষয়ের জন্যই ট্রট ব্যক্তিগত ভাবেও সমান জনপ্রিয়।

ব্যক্তিগত জীবনে মেনা ট্রট বিবাহিতা, স্বামী বেনজামিন ট্রট। দুইজন মিলে পরে সিক্স এ্যাপার্ট নামক একটি প্রতিষ্ঠানের সূচনা করেন। সিক্স এ্যাপার্ট নামের কারন তারা ছয়দিন আগে পরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ট্রট ছিলেন এই কোম্পানীর প্রেসিডেন্ট। অবশ্য তারা মুভেবল টাইপ এবং টাইপ্যাড নামক সফটওয়্যারেরও প্রতিষ্ঠাতা। এর মাঝে মুভেবল টাইপ ২০০১ সালে তৈরী হয় এবং পরে একে সিক্স এ্যাপার্টের কাজে লাগানো হয়। এছড়াও এসেনশিয়াল ব্লগিং নামে মেনা ট্রটের একটি বইও রয়েছে।

Most Popular

To Top