টেক

কেয়ামতের ঘড়ি – ডুমসডে ক্লক!

ডুমসডে ক্লক নিয়ন আলোয় neon aloy

২০০৪ সালের দিকে বাংলাদেশে একটা গুজব ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল- আগামী অমুক তারিখ কেয়ামত হবে। গুজবটা মানুষের মাঝে এতটাই আতংক ছড়িয়েছিল যে, কেয়ামতের ভয়ে একজনের আত্মহত্যার খবরও পত্রিকায় আসে।

প্রাচীন মায়ানরা একটা দিনপঞ্জি বানিয়েছিল, সম্ভবত আগামী কয়েক হাজার বছরের হিসাব-নিকাশ করার জন্য। এই ক্যালেন্ডার থেকে একটা মিথের সূত্রপাত হয়, ২০১২ সালে নাকি পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। এই মিথ ছড়ানোর কারণ হল মায়ানদের দিনপঞ্জি তৈরিই হয়েছিল খৃস্টাব্দ ২০১২ সাল পর্যন্ত। সেটা যে কারণেই হোক না কেন, রহস্যপ্রিয় মানুষ সেটাকে কেয়ামতের আলামত হিসেবেই ধরে নিয়েছে।

এই যে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার গুজবগুলো এত প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়, এর পেছনে কিন্তু একটা কারণ আছে। ধর্ম এবং বিজ্ঞান- উভয়েই পৃথকভাবে মানবসভ্যতার সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ভবিষ্যতবাণী দেয়। সেটা কবে হবে, কীভাবে হবে সে সম্পর্কে নানা মুনির নানা মত থাকবে পারে, কিন্তু ধ্বংস যে অবশ্যম্ভাবী সে সম্পর্কে কারও দ্বিমত আছে বলে মনে হয় না।

এতক্ষণ যে কথাগুলো বললাম সেটা মূলত প্রসঙ্গে আসার জন্য, এখন মনে হয় আর ভূমিকা না টেনে আসল কথায় চলে আসাই ভালো।

ডুমসডে ক্লক

মানবজাতি কবে নাগাদ ধ্বংস হতে পারে, সেটা হিসাব করার জন্য বিজ্ঞানীরা একটা ঘড়ি আবিষ্কার করেছেন। ঘড়ির নাম “Doomsday Clock”, বা কেয়ামতের ঘড়ি। এই ঘড়িতে ঠিক রাত বারোটা বাজলেই তামাম মানুষজন ধ্বংস হয়ে যাবে- এই হল ব্যবস্থা। এই মুহূর্তে ডুমসডে ক্লকটাতে বাজে রাত ১১ টা বেজে ৫৮ মিনিট, মানে আপনি যখন এই লেখা পড়ছেন, তখন রোজ কেয়ামতের আর মাত্র দুই মিনিট বাকি!

এতটুকু পড়ে লেখককে পাগল ঠাউরালে দোষের কিছু নাই- তবে জিনিটার আরেকটু ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে। গোড়া থেকে বলি।

শুরুর কথাঃ বুলেটিন অফ দ্য এটমিক সায়েন্টিস্টস

১৯৪৭ সালের ঘটনা। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলার পর ম্যানহাটন প্রজেক্টের সাবেক বিজ্ঞানীরা “Bulletin of the Atomic Scientists” নামে একটি ম্যাগাজিন প্রকাশনা শুরু করে, যার একেবারে প্রথম থেকে সর্বশেষ পর্যন্ত প্রতিটি সংস্করণের প্রচ্ছদে একটি ঘড়ির ছবি আঁকা। “টেইলর এন্ড ফ্রান্সিস” এর প্রকাশনায় এটি ছাপা হয় এবং এটির মূল বিষয়বস্তু হল বৈশ্বিক নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন পাবলিক পলিসি ইস্যু। চলমান বিশ্বের বর্তমান প্রেক্ষাপটে পারমানবিক বোমা, জলবায়ু পরিবর্তন, ধ্বংসাত্বক অস্ত্রাদি, জীববৈজ্ঞানিক দুর্যোগ, প্রযুক্তিগত জটিলতা এবং অন্যান্য জটিলতার কারনে আমরা দিন দিন যে হুমকির সম্মুখীন হচ্ছি তা নিয়েই ম্যাগাজিনটি কথাবার্তা বলে। এটি আজও পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত বিজ্ঞান বিষয়ক ম্যাগাজিনগুলোর মাঝে একটি।

ডুমসডে ক্লক নিয়ন আলোয় neon aloy

১৯৪৭ সালের জুন মাস, বুলেটিন অফ দা এটমিক সায়েন্টিস্টস এর প্রথম ইস্যু’র প্রচ্ছদ।

ঘড়ি কাহিনী

এবার প্রচ্ছদের ঘড়িটা সম্পর্কে একটু বলি। এই ঘড়ির নামই ডুমসডে ক্লক। মূলত পৃথিবী কতটা ঝুঁকির মধ্যে আছে, ডুমসডে ক্লক সেটাই নির্দেশ করে। এই “ঝুঁকি”র মধ্যে প্রাধান্য দেয়া হয় পারমাণবিক ঝুঁকিকে।

পূর্বের যেকোন সময়ের চেয়ে বর্তমানে মানুষ বেশি ঝুঁকিতে বসবাস করছে। এই সময়টাকে বলা হচ্ছে “নিউক্লিয়ার যুগ”। এখন ভালো-মন্দ দুই ধরনের উদ্দেশ্যেই বাড়ছে নিউক্লিয়ার এনার্জির ব্যবহার। একদিকে তৈরী হচ্ছে পারমাণবিক পাওয়ারপ্ল্যান্ট, অপরদিকে তৈরী হচ্ছে পারমাণবিক অস্ত্র। দুই-ই কিন্তু বেকায়দায় পৃথিবী ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে। পারমাণবিক ঝুঁকি ছাড়াও বিবেচনা করা হয় জলবায়ু পরিবর্তন, বিশ্ব রাজনীতি, যুদ্ধ-বিগ্রহ ইত্যাদিকে।

ঘড়িতে মধ্যরাত ১২টা হল মানবসভ্যতা ধ্বংসের নির্দেশক (আমার প্রজেক্টের বারোটা বেজে গেছে- ১২টা বাজা কোথা থেকে এল ধরতে পারছেন?)। ঘড়ির কাঁটা ১২টার যত কাছে, মানুষ ধ্বংস থেকে সেই অনুপাতে দূরত্বে। ডুমসডে ক্লকে কিন্তু টাইম ম্যানিপুলেট করা যায়, অর্থাৎ সময় আগানো-পেছানো যায়। যদি কোনভাবে পৃথিবীর অবস্থার উন্নতি হয়, ঘড়ির কাঁটা পিছনে ঘুরে যাবে। ১৯৪৭ সালে যখন এই ঘড়ির ধারণার সূত্রপাত হয়, তখন এতে বারোটা বাজতে ৭মিনিট বাকি। ডুমসডে ক্লকে এই পর্যন্ত ২২ বার সময় পরিবর্তন করা হয়েছে। এর ইতিহাসে রাত বারোটার নিকটতম সময় ছিল ১১টা বেজে ৫৮ মিনিট, দুইবার। প্রথমবার ১৯৫৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত রাশিয়া হাইড্রোজেন বোমা পরীক্ষা শুরু করলে এবং আরেকবার এখন, ২০১৮ সালে, নিউক্লিয়ার অস্ত্র এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বিবেচনা করে।

ডুমস ডে ক্লকের উদ্দেশ্য হল পৃথিবীর মানুষদের সতর্ক করা। প্রতিটি মুহূর্তে মনে করিয়ে দেওয়া যে তারা ধ্বংসের কতখানি দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। আর কতটুকু তে আমাদের থামা উচিত, কখন থেকে আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত। ডুমস ডে ক্লক আমাদের নিউটনের তৃতীয় সূত্রের কথা মনে করিয়ে দেয়। যে ব্যবহার আমরা “মাদার আর্থ” এর সাথে করছি, তার সর্বশেষ পরিণামের ঠিক কতখানি কাছে আমরা পৌঁছে গেছি। ভয়ানক, না?

ডুমস ডে ক্লকে এখন পর্যন্ত পৃথিবীর পার করা বেস্ট টাইম বা সবচেয়ে ভালো সময় হল রাত ১১.৪৩ মিনিট, অর্থাৎ ১২ টা বাজতে ১৭ মিনিট বাকি। এটি ছিল ১৯৯১ সালে। অর্থাৎ একটা কাল্পনিক ঘড়ির সময় থেকে আমরা সেই সময়ে পৃথিবীর সামরিক ও জলবায়ুর যে স্থিতিশীলতা তা বুঝতে পারছি। আর পৃথিবীর পার করা সবচেয়ে খারাপ সময় হল এখন, ২০১৮ সাল। ঘড়িতে বাজছে ১১.৫৮। আমরা ধ্বংস থেকে মাত্র দুই মিনিট দূরে। কেন, তা আমাদের যাদের চোখ কান খোলা আছে, নিশ্চয়ই কম বেশি জানি।

ডুমস ডে ক্লকের সাথে আপনারা অনেকেই অনেক আগে থেকে পরিচিত যা হয়তো আপনারা নিজেরাও আগে খেয়াল করেননি। লিনকিন পার্কের “মিনিটস টু মিডনাইট” গানের শিরোনাম ডুমসডে ক্লক থেকেই অনুপ্রাণিত। আর আয়রন মেইডেনের “২ মিনিটস টু মিডনাইট” গানটির কথা তো ডুমসডে ক্লকের উদ্দেশ্যের সাথেই মিলে যায়। যারা যারা “ওয়াচম্যান” মুভিটি দেখেছেন, তারা নিশ্চয়ই আগে থেকেই এই ক্লকের সাথে পরিচিত।

যাক, এই ডুমস ডে ক্লকে রাত ১২ টা বাজার ভয়েও যদি আমরা সব কিছুতে একটু স্থিতিশীলতা পাই।
ভালো থাকবেন।

Most Popular

To Top