ফ্লাডলাইট

অভিষেক টেস্টের আইরিশ স্কোয়াডঃ সাদা পোশাকের স্বপ্ন যখন বাস্তব!

আইরিশ টেস্ট স্কোয়াড নিয়ন আলোয় neon aloy

ঐতিহাসিক অভিষেক টেস্টের জন্য ১৪ সদস্যের স্কোয়াড ঘোষনা করেছে ক্রিকেট আয়ারল্যান্ড। উইলিয়াম পোর্টারফিল্ড হতে যাচ্ছেন প্রথম আইরিশ টেস্ট অধিনায়ক।

এই সেই আয়ারল্যান্ড যেখানে সত্তর বছর ক্রিকেট খেলা নিষিদ্ধ ছিলো কেবল ব্রিটিশ খেলা হবার কারনে। “Anglophile” বা ব্রিটিশপন্থী হিসেবে ক্রিকেটাররা ছিলেন সমাজে অপমানিত। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, যখন এড জয়েস ক্রিকেট ব্যাট ব্যাগের ভেতর লুকিয়ে লোকাল ট্রেনের সীটের নীচে লুকিয়ে রাখতেন, অন্য শহরে যেয়ে ক্রিকেট অনুশীলন করতেন।

সময় পাল্টেছে, আইরিশ ক্রিকেটাররা এখন আর “Anglophile” নন, বরং সুনামের সাথে ইংল্যান্ডে কাউন্টি ক্রিকেট খেলেন। পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে কাউন্টি ক্রিকেটে আইরিশদের রয়েছে শক্ত অবস্থান।

আইরিশ টেস্ট স্কোয়াড নিয়ন আলোয় neon aloy

আয়ারল্যান্ডের ১৪ সদস্যের স্কোয়াডের নামগুলো একবার পড়ুন, প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটার হিসেবে প্রায় সবাই প্রতিষ্ঠিত। কাউন্টির নিয়মিত মুখ। আয়ারল্যান্ড তাদের সর্বোচ্চ সেরা দল ঘোষনা করেছে।

একসময় টেস্ট খেলার স্বপ্ন নিয়ে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমিয়েছিলেন ওয়েন মরগান, এড জয়েস, বয়েড রেংকিনরা। টেস্ট খেলার স্বাদ না নিয়েই অবসরে গিয়েছেন অনেক আইরিশ তারকা। কিন্তু যারা দীর্ঘদিন আইরিশ ক্রিকেটের চেনামুখ হয়ে রয়েছেন সেই কেভিন ব্রাদার্স, গ্যারি উইলসন, এন্ডি বালবার্নিরা পাচ্ছেন টেস্ট ক্রিকেটারের সম্মান।

পাশের দেশ ইংল্যান্ড, সেখানের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যোগ্যতার সাথে পারফর্ম করলেও নিজ দেশের হয়ে টেস্ট না খেলতে পারার এবার ফুরাচ্ছে।

ওয়েন মরগান না ফিরলেও ফিরেছিলেন এড জয়েস আর বয়েড রেনকিন। ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপ খেলা হলেও জয়েসের খেলা হয়নি টেস্ট ক্রিকেট। কয়দিন আগেই বলেছিলেন জীবনে আর একটাই স্বপ্ন দেখেন, আয়ারল্যান্ডের হয়ে টেস্ট খেলার। আইরিশ স্কোয়াডের একমাত্র ব্যতিক্রম বয়েড রেনকিন। ইংল্যান্ডের হয়ে টেস্ট অভিষেক হয়েছিলো এশেজ সিরিজে। অবশ্য খেলেছেন মাত্র একটি টেস্টেই।

টেস্ট অভিষেক হচ্ছে মালাহাইড ক্রিকেট ক্লাব গ্রাউন্ডের, ১ মিলিয়ন ইউরো খরচ করে টেস্ট ভেন্যু হিসেবে যেসব সুবিধা দরকার সেসব সাময়িক উপায়ে গড়ে তোলা হয়েছে।

আইরিশ টেস্ট স্কোয়াড নিয়ন আলোয় neon aloy

দল হিসেবে যদিও আয়ারল্যান্ডের অভিষেক টেস্ট তবে ব্যক্তিগতভাবে প্রতিটা প্লেয়ারের রয়েছে প্রচুর প্রথম শ্রেনীর অভিজ্ঞতা। এই টেস্টে অবশ্যই পাকিস্তান ফেভারিট হিসেবেই মাঠে নামবে কিন্তু আয়ারল্যান্ড কখনোই সহজ প্রতিপক্ষ হবেনা। এমনকি সিমিং আইরিশ কন্ডিশনে পাকিস্তানকে পড়তে হতে পারে চরম পরীক্ষার সামনে। কেন্টের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে মাত্র ১৬৮ রানে গুটিয়ে গিয়েছিলো পাকিস্তানের ইনিংস।

আয়ারল্যান্ড অবশ্য কন্ডিশনের সর্বোচ্চ সুবিধা নিতে প্রত্যাশিত পথেই হেঁটেছে, বয়েড রেনকিন, টিম মুরতাঘ, স্টুয়ার্ট থম্পসন, টাইরন কেনের পাশাপাশি সিমার হিসেবে আছেন কেভিন ও’ব্রেইন। যারা কাউন্টি ফলো করেন তারা নিশ্চয় জানেন টিম মুরতাঘ এই মুহুর্তে কাউন্টির অন্যতম সেরা সিমার। পাকিস্তানকে বিব্রত করতে মালাহাইডে হয়তো থাকবে সবুজ পিচ।

আইরিশ স্কোয়াডের সবার উপরেই থাকবে আলাদা নজর, দেশের অভিষেক টেস্টে বিশেষ কিছু করার তাড়না প্রতিটা ক্রিকেটারের থাকে। তবে একজন আছেন যার উপর নজর থাকবে সবচেয়ে বেশি। তিনি এড জয়েস।

আয়ারল্যান্ড ক্রিকেটের পোস্টার বয় এই জয়েস পরিবার। নয় ভাইবোনের পাঁচজনই আইরিশদের হয়ে জাতীয় দলে খেলেছেন। এড জয়েস, গাস জয়েস আর ডোমিনিক জয়েস তিন ভাই পুরুষদের জাতীয় দলে আর জমজ বোন ইসাবেল জয়েস এবং সেসেলিয়া জয়েস খেলেছেন নারী দলে।

ক্রিকেট অন্তঃপ্রাণ জয়েস পরিবার।

১৯৯৯ সালে এড জয়েস যখন কাউন্টি ক্রিকেটে মিডিলসেক্সের হয়ে খেলতে যান তখন আইরিশ ক্রিকেটারদের কাছে সেটা স্বপ্নের মতো বিশেষ কিছু। ১৯৯৯ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত নিয়মিত ছিলেন মিডিলসেক্সে। হয়েছিলেন অধিনায়ক। এরই ভেতর খেলেন ইংল্যান্ড জাতীয় দলে।

২০০৯ সালে দল বদল করে সাসেক্সে নাম লেখান। সাসেক্সের হয়ে সর্বোচ্চ রান করেন ওই বছর তবে অনেকটা অবাক করে দিয়েই ঘোষনা করেন আয়ারল্যান্ডের হয়ে আবার জাতীয় দলের জার্সিতে মাঠে ফিরবেন।

কারন হিসেবে বলেছিলেন কাউন্টিতে ইংলিশ প্লেয়ার হিসেবে খেলার চেয়ে আয়ারল্যান্ডের ছোট ছোট ক্লাবে খেলবেন তাহলে তাকে অনুসরন করে স্থানীয় তরুনরা হয়তো ইংল্যান্ডে ক্যারিয়ার না গড়ে নিজ দেশেই থেকে যাবেন।

কাউন্টির সেরা ব্যাটসম্যান এবং ইংল্যান্ড ক্যারিয়ার ছেড়ে আয়ারল্যান্ডে ফিরে আসাটা সহজ ছিলোনা, কিন্তু এড জয়েস সেটাই করেছিলেন।

অভিষেক টেস্টে জয়েসের ব্যাট থেকে বড় কিছুর প্রত্যাশা করাই যায়।

টেস্ট ক্রিকেটের নতুন দুই দেশ আফগানিস্তান এবং আয়ারল্যান্ড দুই দলকেই পছন্দ করি। আফগানিস্তানকে করি কারন যুদ্ধ-বিদ্ধস্ত একটা দেশের ক্রিকেটে এতো দ্রুত উন্নতি প্রশংসা না করে উপায় কি?

আইরিশ টেস্ট স্কোয়াড নিয়ন আলোয় neon aloy

তবে একটু বেশি পছন্দ করি আয়ারল্যান্ডকে। ২০০৭ বিশ্বকাপের পর থেকেই ফ্যান হয়ে গিয়েছিলাম “জায়ান্ট-কিলার” দলটার। পাশাপাশি যেরকম বিরুদ্ধ পরিবেশ থেকে সত্তর বছরের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে, সামাজিক প্রতিকূলতা জয় করে আয়ারল্যান্ড উঠে এসেছে সেটা সত্যি অতুলনীয়। ক্রিকেটের প্রতি কিছু মানুষের প্রচন্ড রকমের ভালোবাসা আর আবেগ না থাকলে এটা অসম্ভব!

আমার দৃঢ় বিশ্বাস আয়ারল্যান্ডের টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া উচিৎ ছিলো ২০১১ বিশ্বকাপের আগেই। তখন আয়ারল্যান্ডের সেরা ক্রিকেটাররা দলে ছিলেন। অনেকটা সময় তখনই নষ্ট করেছে আইসিসি। কিন্তু দেরিতে হলেও টেস্ট অভিষেক হচ্ছে আয়ারল্যান্ডের।

অনেকদিন ধরে অপেক্ষায় ছিলাম এই দিনের।

আয়ারল্যান্ডের জন্য শুভকামনা। একদিন আয়ারল্যান্ড প্রতিবেশী দেশ ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী টেস্ট টিমে পরিনত হবে এতে কোন সন্দেহ নেই!

Most Popular

To Top