বিশেষ

যা দেখছি, যা শুনছি তাই কি ইতিহাস?

বাজিরাও আলাউদ্দীন নিয়ন আলোয় neon aloy

চলমান সপ্তাহের বেশিরভাগ সময়টাই ছিল ছুটি, ঘরে বসে অবসর কাটাতে কাটাতে অনেকেই ইতিমধ্যে হাঁপিয়ে উঠেছেন। এমন টানা বন্ধে কার না ইচ্ছা করে একটা-দুইটা মুভি দেখতে? অনেকে হয়তো লম্বা একটা লিস্ট নিয়ে দেখতে বসেও গেছে। অনেকের মুভির লিস্টে হয়তো সম্প্রতি বের হওয়া “পদ্মাবত” মুভিটাও থাকবে। আচ্ছা, মুভি দেখার আগে কিছু কথা জেনে নেওয়া যাক।

আসুন, মুভি দুইটা দেখার আগে প্রথম একটু মুভিটার “খালিবালি” গানটা দেখে নেই। দেখছেন তো? আচ্ছা, এই গানের ভিডিওটা একটু মিনিমাইজ করে পাশের ট্যাবে আরো একটা গান প্লে করি, সেটা হল ২০১৫ সালে বের হওয়া “বাজিরাও মাস্তানী” মুভির “মালহারি” গানটা। দুইটা গান একটু পাশাপাশি দেখার চেষ্টা করি। দেখলাম তো?

আচ্ছা, এবার কিছু ফ্যাক্ট লক্ষ্য করা যাক। একটা গানের মূল চরিত্রে হিন্দু রাজা “বাজিরাও বাল্লাল”। আরেকটা গানের মূল চরিত্র মুসলিম রাজা “আলাউদ্দীন খিলজী”।

দু’টো গানের দুই চরিত্রেই অভিনয় করেছেন একই অভিনেতা- রনবির সিং। এবং দুটো মুভিই পরিচালনা করেছেন একজন পরিচালকই, সঞ্জয় লীলা বানসালি।
দু’টো গানেরই উদ্দেশ্য হলো এই দুই রাজা কতটা প্রভাবশালী ছিলো, কতটা পরাক্রমশালী ছিলো, কতটা বিক্রমশীল ছিলো, কতটা সাহসী ছিলো- এসব দেখানো।

কিন্তু, এখানে একটা বড় কিন্তু আছে।

কিন্তুটা হলো, একটা গান দেখে রাজা বাজিরাও বাল্লালের জন্য মনে মনে আপনার একটা ভক্তি আসবে।
তার শরীরের ভাষা, নড়াচড়ায় যে রাজকীয় সাহসিকতা, তাতে আপনার মনে হবে ভীষন সাহসী এক রাজাকে দেখছেন আপনি।

বাজিরাও মাস্তানি নিয়ন আলোয় neon aloy

বাজিরাও বাল্লাল চরিত্রে রনবীর সিং

আর আরেকটা গান দেখে আপনার মনে হবে,এই রকম একটা জানোয়ারের মত মানুষ রাজা হয় কেমনে? আপনার এতই বিশ্রী লাগবে যে, আলাউদ্দিন খিলজি’র প্রতি একটা বিতৃষ্ণা চলে আসবে। তার তাকানো, অঙ্গভঙ্গি, চলাফেরা সবকিছুতে যেন হিংস্রতা ঝরে ঝরে পড়ছে!

পদ্মাবত নিয়ন আলোয় neon aloy

পদ্মাবত চলচ্চিত্রে আলাউদ্দীন খিলজি’র চরিত্রে রনবীর সিং

আলাউদ্দীন খিলজি সম্পর্কে আপনার যদি কিছুই জানা না থাকে, তাহলে এই মুভি দেখে মনে মনে আপনি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতে পারেন এই ভয়ংকর রকম জানোয়ারের মত রাজার আমলে আপনার জন্ম হয়নি ভেবে।

আলাউদ্দীন খিলজি ভাল ছিলেন নাকি খারাপ ছিলেন, সে বিতর্কে আমরা না যাই। রাজা বাজিরাও বাল্লাল কেমন ছিলেন- সেটাও এখানে বিষয় না।

রাজা এবং রাজত্ব- এই দুই কখনই তথাকথিত ধর্মের নীতি বা সমাজের নীতিতে চলে না। রাজপ্রাসাদে যে ধর্মটা শুধুমাত্র প্রযোজ্য, তা হল রাজধর্ম। আর সে ধর্মের রীতিনীতি তৈরি করেন রাজা নিজেই। অতএব, প্রচলিত নিয়মকানুনের কাঠগড়ায় রাজার বিচার করে লাভ নেই।

কিন্তু রাজা বাজিরাও আর আলাউদ্দীন খিলজী, এই দুইজনের মধ্যে একটা মিল ছিলো। তা হল এরা দু’জনেই ছিলেন চরম সাহসী। সত্যিকার অর্থে সাহসী বলতে যা বোঝায়, তারা তাই ছিলেন। কেমন সাহসী ছিলেন এরা জানতে চান?

যুদ্ধের ময়দানে বাজিরাও ছিলেন ত্রাসের রাজত্ব। তাঁর বীরত্ব, এবং যুদ্ধের কলাকৌশলের জন্য প্রতিপক্ষের পরাজয় ছিল কিছু সময়ের অপেক্ষা। গোটা জীবনে কখনও কোন যুদ্ধে হারেননি রাজা বাজিরাও বাল্লাল। ব্রিটিশ ফিল্ড মার্শাল মন্টগোমারি’র মতে, ভারতবর্ষে বাজিরাও’র চাইতে উত্তম অশ্বারোহী সেনাপতি কখনও জন্মায়নি।

আর আলাউদ্দিন খিলজির কথা বললে বলতে হয়- তিনি ভারতবর্ষের “আলেকজান্ডার দি গ্রেট”। যে মঙ্গোলিয়দের হাত থেকে বাঁচেনি পারস্য সাম্রাজ্য, রাশিয়ান সাম্রাজ্য; সেই মঙ্গোলিয়ানদের সাথে পাঁচ বার যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন আলাউদ্দিন খিলজি। ভাবছেন, এক মঙ্গোলিয়ানদের সাথে জিতলেই কি সব? হ্যাঁ, বিচার করার আগে জেনে নিন, মঙ্গোলিয়ানরা কেমন জাতি ছিল। মঙ্গোলিয়রা আর বাকি সব জয়ী জাতির মতো ছিল না, তারা কোন রাজ্য জয় করে সে রাজ্যের যে সম্পদ তাদের কাজে লাগবে তা সাথে নিয়ে বাকি সবকিছু নষ্ট করে ফেলত। সভ্যতা, সংস্কৃতি সব ধুলোয় মিশিয়ে দিতো। যখন তারা বাগদাদ আক্রমণ করে, লাইব্রেরির বইয়ের কালিতে নদীর পানি কাল হয়ে গিয়েছিলো, শহর মরুভূমিতে পরিণত হয়েছিলো। ইসলামি শাসনের স্বর্ণযুগের সমাপ্তি তখনই হয়েছিলো। মঙ্গোলিয়দের আক্রমণে রাশিয়ান সভ্যতা ২০০ বছর পিছিয়ে গিয়েছিল। সুতরাং, হাজার বছরের পুরানো এই হিন্দু সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য যদি কারো অবদান থাকে, তবে তার বড় একটা অংশ আলাউদ্দিন খিলজি’রই প্রাপ্য।

অথচ মুভি দু’টোর স্রেফ এই দু’টো গানের ভিডিও কিংবা ট্রেইলার দেখলেই বুঝবেন, একজনের সাহসকে যেখানে রাজকীয়ভাবে দেখানো হয়েছে, আরেকজনের সাহসকে সেখানে দেখানো হয়েছে বন্য, হিংস্র জানোয়ারের মত করে।

মজার বিষয় হচ্ছে, ঐতিহাসিক যেসব ছবি কিংবা পোর্ট্রেট আছে এই দুই রাজার, একটু লক্ষ্য করলেই দেখবেন কেউ কিন্তু কারো চেয়ে কম অভিজাত ছিলেন না।

আলাউদ্দিন খিলজী নিয়ন আলোয় neon aloy

শিল্পীর তুলিতে আলাউদ্দিন খিলজী

হাতে আঁকা বাজিরাও বাল্লালের ছবি।

এখানেই হলো সব কাহিনীর মূল।

মিডিয়া যখন যার দখলে, সে ইতিহাসকে তার মত করেই দেখাবে। এবং যাকে সে দেখতে পারে না, তাকে যত বিশ্রী করে সম্ভব দেখাবে; ইতিহাসে ঘটে আসা সকল অপরাধের জন্য তাকেই দায়ী করবে। আর আমরা বোকাসোকা দর্শকরা বিনোদনের নামে তাই দেখব। কিন্তু ওই যে, সহজ সরল আমরা; যা দেখি, যা শুনি, তা-ই বিশ্বাস করি! আর তাই এইভাবে ভুল, ভ্রান্ত, পক্ষপাতদুষ্ট ইতিহাস আমাদের খাওয়ানো হবে, আমরা সেই ইতিহাস গিলে গিলে খাব। আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ভুল ইতিহাসটা লেগ্যাসির মতো প্রচার হতে থাকবে।

তাই, আসলে বলতে চাচ্ছিলাম, যখন আমরা কোন ইতিহাসের পক্ষ নিতে যাব, তখন শুধু একটা সোর্স বা স্থান থেকে কোন কিছু জেনে বা দেখে সবটা জানি। পক্ষপাতদুষ্ট ফাঁকা বুলি না ছেঁড়ে একটু নিজ থেকে পড়াশুনা করে, গবেষণা করে তারপর সিদ্ধান্ত নিলে ভাল হয়। জেনেশুনে পক্ষপাতিত্ব করলে সেটাই হবে ইতিহাসের সার্থকতা।

আরো পড়ুনঃ

বিমান দুর্ঘটনা নিয়ন আলোয় neon aloy

১০টি দুর্ঘটনা, যা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিমান চলাচল হয়েছে আরো নিরাপদ

Most Popular

To Top