নাগরিক কথা

সবকিছু নষ্ট হবার আগে…

jahanara imam

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী হল এর নামকরণ শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নামে করার বিরোধিতা করে রাস্তায় আন্দোলনে নামে সিলেটের তৌহীদি জনতা’র মুখোশে জামাত ও তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবির। আন্দোলনে-সংঘর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়টা বন্ধ রাখতে হয়েছিল ক’মাস। কিন্তু কেন এমনকি মৃত জাহানারা ইমামকে এত ভয়, তার প্রতি এত ক্ষোভ ছিল জামাত-শিবিরের?

১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর গোলাম আযমকে জামায়াতে ইসলামী তাদের দলের আমীর ঘোষণা করলে বাংলাদেশে জনবিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। বিক্ষোভের অংশ হিসাবে ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি ১০১ সদস্যবিশিষ্ট একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয় জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে। তিনি হন এর আহ্বায়ক। এর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ, ১৪টি ছাত্র সংগঠন, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক জোট, শ্রমিক-কৃষক-নারী এবং সাংস্কৃতিক জোটসহ ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে পরবর্তীতে ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ গঠিত হয়। সর্বসম্মতিক্রমে এর আহ্বায়ক নির্বাচিত হন জাহানারা ইমাম। এই কমিটি ১৯৯২ সালে ২৬ মার্চ ’গণআদালত’ এর মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একাত্তরের নরঘাতক গোলাম আযমের ঐতিহাসিক বিচার অনুষ্ঠান করে। গণআদালাতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে দশটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত হয়। ১২ জন বিচারক সমন্বয়ে গঠিত গণআদালতের চেয়ারম্যান জাহানারা ইমাম গোলাম আযমের ১০টি অপরাধ মৃত্যুদন্ডযোগ্য বলে ঘোষণা করেন।

জাহানারা ইমাম গণআদালতের রায় কার্যকর করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান। এটা মাথায় রাখতে হবে তখন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি নামক একটি রাজনৈতিক দলের সরকার, যেই দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ৭১ এর রাজাকারদের গণহারে কারাগার থেকে মুক্তি, ভালো চাকুরি দিয়ে পুনর্বাসন, তাদের জাতীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি, এমনকি চিহ্নিত রাজাকার শর্ষীনার পীর মাওলানা আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়। গণআদালত অনুষ্ঠিত হবার পর সেই জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বিএনপি সরকার ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিসহ জাহানারা ইমামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে অ-জামিনযোগ্য মামলা দায়ের করে।

পরবর্তীতে হাইকোর্ট ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির জামিন মঞ্জুর করেন। এরপর লাখো জনতার পদযাত্রার মাধ্যমে জাহানারা ইমাম ১২ এপ্রিল ১৯৯২ সালে গণআদালতের রায় কার্যকর করার দাবিসংবলিত স্মারকলিপি নিয়ে জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পীকার, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার কাছে পেশ করেন। ১০০ জন সাংসদ গণআদালতের রায়ের পক্ষে সমর্থন ঘোষণা করেন। জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দেশব্যাপি গণস্বাক্ষর, গণসমাবেশ, মানববন্ধন, সংসদ যাত্রা, অবস্থান ধর্মঘট, মহাসমাবেশ ইত্যাদি কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে আন্দোলন আরো বেগবান হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমনকি বিদেশেও গঠিত হয় নির্মূল কমিটি এবং শুরু হয় ব্যাপক আন্দোলন। পত্র-পত্রিকায় সংবাদ শিরোনাম হয়ে উঠলে আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেন জাহানারা ইমাম। গোলাম আযমসহ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবির আন্দোলনকে সমর্থন দেয় ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে।

২৬ মার্চ ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা দিবসে গণআদালত বার্ষিকীতে জাহানারা ইমামের নেত্রত্বে গণতদন্ত কমিটি ঘোষিত হয় এবং আরো আটজন যুদ্ধাপরাধীর নাম ঘোষণা করা হয়। এই ঘৃণ্য আটজন যুদ্ধাপরাধীর নামঃ আব্বাস আলী খান, মতিউর রহমান নিজামী, মোঃ কামরুজ্জামান, আবদুল আলীম, দেলোয়ার হোসেন সাঈদী, মওলানা আবদুল মান্নান, আনোয়ার জাহিদ এবং আব্দুল কাদের মোল্লা

নামগুলো চেনা চেনা লাগছে?

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধীতাকারী যুদ্ধপরাধী এইসব চিহ্নিত রাজাকারদের দলই হচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্রসংগঠন হচ্ছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির যাদের পুর্বসুরী হচ্ছে দেশের জন্মলগ্নে শত বুদ্ধিজীবি হত্যার কারিগর আল-বদর ও আল-শামস।

শাবিপ্রবি, তথা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের বহুদিনের প্রাণের দাবি ছিল ক্যাম্পাসে মূল চত্বরে একটি মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য। সেই দাবি বাস্তবায়নে ভাস্কর্যের ডিজাইন করা হলো- শহীদ জননী, তার পা ছুঁয়ে সালাম করতে থাকা মুক্তিযোদ্ধাকে আশীর্বাদ করছেন। ভাস্কর্যের বেইস স্থাপন হলো। তারপর পর ই যথারীতি যেখানে যাদের গাত্রদাহ শুরু হবার শুরু হলো। সংগ্রামী “তৌহিদী জনতা” উসখুস করতে লাগতো। মূর্তি স্থাপন অনৈসলামিক দাবি করে ঘোষণা দিল এই ভাস্কর্য তারা হতে দেবে না। এমনকি দিনক্ষণ ঘোষণা করে দলে দলে এসে ক্যাম্পাসের অপর ভাস্কর্য- ”চেতনা ৭১” ভেঙ্গে দেয়ার কথা প্রচার করল। তারপর শুরু করলো মসজিদে মসজিদে প্রচারণা। অথচ, সিলেট শহরে কিন্তু মৎসকুমারীর সগৌরব ভাস্কর্য আছে। আছে দোকানে দোকানে ম্যানিকুইন। আছে মাজার পূজা, সেলুকাস! মাইকে প্রচারকৃত হামলার নির্ধারিত দিনে সব ছাত্রছাত্রীরা যখন সাত সকালে দলে দলে ক্যাম্পাসে গিয়ে ভাস্কর্য ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল তা রক্ষা করবার জন্য, শত শত “তৌহিদী জনতা”র বিক্ষুব্ধ কুৎসিত বহরটাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৩০০ গজ দূরে পুলিশ কোনমতে থামিয়ে রাখে। তার কিছুদিন পরই অর্থমন্ত্রী জনাব আবুল মাল আবদুল মুহিত ঘোষণা দেন- শাবিপ্রবিতে জাহানারা ইমামের ভাস্কর্য নাকি আর হবে না!

হায় আওয়ামী লীগ, আর তাদের ভোটের রাজনীতি!

শাবিপ্রবিতে পড়ার সুবাদে সিলেটে থাকতে হয়েছে সুদীর্ঘ সময়। আমার বাসার পাশেই ছিল মসজিদ। সেই মসজিদে, এবং আমি জানি আরো অনেক মসজিদেই প্রতি জুম্মার বয়ানে করা হতো খিস্তিখেউর। জুম্মার ইমামের মুখে হরহামেশাই শহীদ জননীকে জাহান্নামের ইমাম বলা আমার নিজ কানে শোনা! আমরা সব সময়েই দেখেছি মৃত জাহানারা ইমামকেও জামাত-শিবির যমের মতনই ভয় পায়। তিনি একজন শহীদ জননী; একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জাহানারা ইমামের ছেলে মুক্তিযোদ্ধা শফি ইমাম রুমী শহীদ হন। এছাড়া যুদ্ধের সময় তাঁর স্বামী শরীফ ইমাম ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের বিশেষ সহযোগী। তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের বিরোধীতাকারী খুনী-ধর্ষক রাজাকারদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের পথিকৃৎ। তাই যখনই একজন ব্যক্তি জাহানারা ইমাম কিংবা তার আদর্শ যুদ্ধপরাধীদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, ও রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের সামনে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তখনই তারা জাহানারা ইমামকে নানা মিথ্যে অজুহাতে জনবিচ্ছিন্ন করবার চেষ্টা করেছেন।
জাহানারা ইমামের প্রতি কারা, কোন মহল প্রতিক্রিয়াশীল, কারা তার নামকে ভয় পায়, কারা তার জড় একটি ভাস্কর্যকে ভয় পায় এটি এই দেশে জন্ম নেয়া বয়ঃপ্রাপ্ত কাউকে বলে দেবার প্রয়োজন থাকা উচিত নয়। যদি দিতে হয়, তা আমাদের নিজেদের জন্যই অত্যন্ত লজ্জাজনক একটি ব্যাপার। তবু, লজ্জা, অপমান কাটিয়ে উঠিয়েই আরো বেশি করে আমাদের জানাতে হবে জাহানারা ইমামের পরিচয়। তার থেকেও বেশি করে জানাতে হবে তার কাজ, তার স্বপ্নের কথা আর তার পেছনের ইতিহাস।

শুভ জন্মদিন আম্মা!

“অবশ্যই, জয় আমাদের হবেই।”

জাহানারা ইমামের উইকিপিডিয়া পেইজ

জাহানারা ইমামের নামে হলের নামকরণ বিরোধী আন্দোলনে সংঘর্ষে ছাত্রশিবির ক্যাডার আব্দুল মুনিম বেলাল নিহত হয়। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির প্রতি বছর ২৫শে ডিসেম্বর শহীদ আখ্যা দিয়ে এই ক্যাডারের মৃত্যুবার্ষিকী ঘটা করে উদযাপন করে। তারা দাবি করে বেলালের আত্মত্যাগ ছিল ছিল সত্য, ন্যায়, সুন্দর ও ইসলামের পক্ষে। আপনারা যত রাজনীতি আর ইতিহাস অসচেতন হবেন, এই বেলালেরা একটু একটু করে নায়ক হবে। আপনাদের নীরবতায় একদিন সত্য, ন্যায় ও সুন্দরের ইতিহাস লিখবে বেলালেরাই।

লেখকঃ তানভীর হোসাইন।

[কভারে ব্যবহৃত ইমেজটি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত। মূল ফটোগ্রাফারের পরিচয় খুঁজে পাইনি আমরা। অনুরোধ থাকবে ফটোগ্রাফারের চোখে পড়ামাত্র আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে, আমরা আপনার পরিচয় তুলে ধরবো।]

Most Popular

To Top