নাগরিক কথা

জ্বি হ্যাঁ, ভুল খবর বাতাসের আগে ছড়ায়!

সত্যজিৎ গুজব নিয়ন আলোয় neon aloy

ফেসবুকের কল্যাণে অনেকেই হয়তো ইতোমধ্যে জেনে গিয়েছেন আজ প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের জন্মবার্ষিকী। আজ থেকে দশ বছর আগে হয়তো প্রয়াত ব্যক্তিবর্গের জন্ম কিংবা মৃত্যুবার্ষিকী মনে রাখাটা বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল। সকালে নাশতার টেবিলে পত্রিকা হাতে নিয়ে চোখ বুলাতে বুলাতে অজস্র বিজ্ঞাপনের ভীড়ে বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকীর এক কলামের ছোট খবরটা খুব সহজেই চোখ এড়িয়ে যেত।

তবে ফেসবুকের কল্যাণে এই অবহেলা-অনাদরের প্রকোপ অনেকটাই কমে এসেছে বলা যায়। বিখ্যাত-অখ্যাত, এমনকি লাইক-কমেন্টের জমানার কুখ্যাত ফেসবুক সেলেব্রিটিদেরও বিশেষ বার্ষিকীগুলো সহজেই আমাদের চোখের সামনে চলে আসছে। সেই সাথে আছে বিষয়ভিত্তিক ফেসবুক গ্রুপগুলো। হাজার-লাখ সদস্যের গ্রুপগুলোতে মেম্বারদের অ্যাক্টিভিটি-ই আপনাকে মনে করিয়ে দিবে এই বিশেষ বার্ষিকীগুলোর কথা।

আর তার ব্যতিক্রম হয়নি এ বছর বিখ্যাত চিত্রপরিচালক সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিনেও। একটা কথা মোটামুটি বিনাতর্কেই সবাই স্বীকার করে নিবেন যে সত্যজিৎ রায়ের মত প্রতিভাবান এবং গুণী চিত্রপরিচালক বাংলা চলচ্চিত্রাঙ্গনে এসেছেন হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র। আর এই হাতেগোনা কয়জনের মধ্যেও সত্যজিৎ রায় নামটা জ্বলজ্বল করবে বাকি সবার চাইতে বেশি; সেটা দর্শকপ্রিয়তার মাপকাঠিতে হোক কিংবা সমালোচকদের দৃষ্টিতে। আর তাই এই মানুষটির জন্মবার্ষিকীতে তাকে নিয়ে মাতামাতিটাও হবে বেশি দুই বাংলার চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্যে- এটাই স্বাভাবিক।

আর এই মাতামাতি থেকেই খেলার ছলে প্রকটভাবে আবারো বেরিয়ে পড়লো সোশ্যাল মিডিয়ার অনেকগুলো কদর্য চেহারার একটি।

পশ্চিমবঙ্গের ছেলে কৌশিক মজুমদার। তার ফেসবুক প্রোফাইলে দুই মিনিট স্ক্রল করে যা বুঝলাম, তিনি সত্যজিৎ রায়ের বেশ ভাল রকমের ভক্ত। আর সে কারণেই হয়তো প্রিয় মানুষটির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে তার প্রোফাইলে শেয়ার হয়েছে একাধিক কনটেন্ট। এর মধ্যে যেমন আছে সত্যজিৎ-এর শৈশবের কিছু দুর্লভ ছবি, তেমনি আছে তাঁর নিজের হাতে বানানো শব্দজব্দ।

তবে এর মাঝে সবচেয়ে মজার পোস্টটি নিয়েই ঘটনার সূত্রপাত। মজার ছলেই কৌশিক ফটোশপে একটি ছবি এডিট করলেন, একটি টেলিগ্রামের ছবি। আর এই টেলিগ্রামে দেখা যাচ্ছে সত্যজিৎ রায়ের পিতা সুকুমার রায় তাঁর সন্তান ভূমিষ্ঠ হবার খবর জানাচ্ছেন জনৈক অরুণ নাথ চক্রবর্তীকে।

এখন এই টেলিগ্রাম কি সত্য? হ্যাঁ, এর একটি রেফারেন্স দিচ্ছেন কৌশিক মজুমদার নিজেই, কল্যাণী কার্লেকারের জবানীতে। এই কল্যাণী কার্লেকার হলেন আলোচ্য টেলিগ্রামের প্রাপক অরুণ নাথের কন্যা। ঘটনা তো তাহলে সত্য। কিন্তু টেলিগ্রামের যে ছবিটা ঘুরে বেড়াচ্ছে- সেটা যে সত্য না তা তো শুরুতেই বলে নিয়েছি। আর একবার ভাল করে চোখ বুলালে খুব সহজেই ধরা পড়ে এডিটটি। কাগজের অন্যান্য অংশে পুরনো কাগজের ছোপছোপ দাগ থাকলেও বার্তা লেখা অংশটুকু একেবারে পরিষ্কার! যেন রাবার দিয়ে ঘষে সব ময়লা উঠিয়ে তারপর বার্তাটি লেখা হয়েছে এবং বিগত ৯৭ বছরেও সেখানে আর এক ফোঁটা দাগ পড়েনি! অবিশ্বাস্য না?

কৌশিক মজুমদার যখন ঠাট্টার ছলেই ফটোশপে গুঁতোগুঁতি করছিলেন, তখন তিনি নিজেও হয়তো ভাবেননি এই টেলিগ্রামটি ভাইরাল হয়ে যাবে। ভাবলে হয়তো এডিটে আরো মনোযোগী হতেন। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে কৌশিক লক্ষ্য করলেন এই ফটোশপড ছবিটি অনেক মানুষই সত্যিকারের টেলিগ্রাম ভেবে শেয়ার দিচ্ছেন! শুধু যে শেয়ার দিচ্ছেন তা না, ডাউনলোড করে নিজের মনের মাধুরী মেশানো ক্যাপশন দিয়ে সেটা নিজেদের টাইমলাইনে পোষ্টও করছে! তাতেও ঘটনা শেষ ভাবছেন? না। এই ভাইরাসের প্রকোপ শুধু ফেসবুকে সীমাবদ্ধ থাকেনি, ছড়িয়ে পড়েছে হোয়াটসঅ্যাপেও! এমনকি কৌশিকের হোয়াটসঅ্যাপ ইনবক্সেই চলে এসেছে এই ছবি ঘুরেফিরে! অভিজ্ঞতাটা শুনুন কৌশিকের মুখেই!

“সকালে উঠেই দুষ্টুবুদ্ধি চাপল মাথায়। কল্যাণী কার্লেকরের এই লেখাটা মাথায় ছিল। ভাবলাম এপ্রিল ফুলের মত মে ফুল বানানো যাক না কেন!!আর তাই ফটোশপে বানিয়ে ফেললাম পুরোনো এক টেলিগ্রাম। কিছু ক্লু অবশ্য ছিল। বুঝ লোকে যে জান সন্ধান…
ভেবেছিলাম শুরুতেই সবাই ধরে ফেলবে!!কিন্তু লাইক আর শেয়ারের বন্যায় দেখলাম সবাই মাতোয়ারা। যশোধরাদি সন্দেহ করায় তাকেও দলে নিয়ে নিলাম…
তবে সবাই যে নির্বিচারে মেনেছেন তা না। তাদের স্যালুট।কিন্তু এখন দেখছি গ্রুপে গ্রুপে এ ছবি পোস্ট হচ্চে। WHATSAPP এ আমার কাছেই চলে এসেচে!! এবার এটা বন্ধ হওয়া উচিত।
নিঃশর্ত ক্ষমা তাঁদের কাছে,যারা একে সত্যি ভেবে লাইক কমেন্ট শেয়ার করলেন
মানিক নামের ম্যাজিক হয়তো এখানেই…”
– কৌশিক মজুমদার।

নির্দোষ মজাকে মজা হিসেবেই নিচ্ছি। কৌশিক মজুমদারকে ধন্যবাদ তার এই প্রচেষ্টার জন্য। গৎবাঁধা “ভালবাসি সত্যজিৎ, ভাল থাকবেন সত্যজিৎ” ধরণের ক্লিশে শুভেচ্ছার ভিড়ে আপনার কাজটা আসলেই ভিন্নধর্মী ছিল এবং নিঃসন্দেহে আপনি এর জন্য সাধুবাদের দাবীদার।

কিন্তু আমাদের ভয়টা উঁকি দিচ্ছে অন্য জায়গায়। ধরে নিতে পারেন ঘরপোঁড়া গরু আমরা, সিঁদুরে মেঘ দেখলেও আমাদের ভয় পেতে হয়। কিন্তু ভয়টা কোথায়?

পুরো বিশ্বেই ফেসবুক-টুইটার সহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর অপব্যবহার হচ্ছে প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর কাজে। কোথাও সংখ্যালঘু প্যাঁদাতে হবে? খুব সহজ। সেখানকার গোবেচারা কারো নামে একটা ফেইক প্রোফাইল খুলে সংখ্যাগুরু ধর্মবিদ্বেষী কিছু একটা পোস্ট করে দাও। বাকিটা ধর্মপ্রাণ আমজনতাই করে নিবে, আর আমজনতার পালে হাওয়া দেওয়ার কাজটা কিভাবে করে দিবে সোশ্যাল মিডিয়ার “স্মার্ট” অ্যালগরিদমগুলো- সেটা কদিন আগেই বিস্তারিত লিখেছিলাম। পার্থক্য একটাই। সংখ্যালঘু ভারতীয় মুসলিম হলে তার নামে লাভ জিহাদ কিংবা গরু খাওয়ার গুজব ছড়াতে হবে; আর সংখ্যালঘু যদি বাংলাদেশের হিন্দু হয়, তবে আল্লাহ-রাসূল-কোরআন অবমাননার ধোঁয়া তুলাই যথেষ্ঠ! আশেপাশের এলাকা ভেঙে সবাই লুঙ্গী-ধুতি কাছা মেরে চলে আসবে ধর্মরক্ষা করতে, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে মনের আগুন নেভাতে, মানুষ মেরে ধর্ম বাঁচাতে। কিন্তু কারোই মাথায় খেলবে না যেই ফেসবুক পোস্টের কারণে এতকিছু- সেটার ভ্যালিডিটি কতটুকু?

পুরো বিষয়টার বেশ সুন্দরভাবে তুলে এনেছিল প্রজন্ম টকিজ, তাদের গতবছরের একটি শর্টফিল্মে।

আর একই আশঙ্কা ভিন্নরূপে উপস্থাপিত হলো কৌশিক মজুমদারের নির্দোষ তামাশায়।

অল্পতেই অযথা আতঙ্কিত হচ্ছি ভাবছেন? ভাবতেই পারেন! আমার কথা সহজ। গুজব-প্রপাগান্ডা ছড়ানো যেখানে এতই সহজ, এবং একই ফরম্যাট ব্যবহার করে বছরের পর বছর কার্যসিদ্ধি করে নিচ্ছে দুর্বৃত্তরা, সেখানে আমরা সুস্থভাবে বেঁচে আছি কিভাবে? আরো ভেঙে বললে দাঁড়ায়- ফেলুদা’র চ্যালারাই যেখানে আসল-নকলের পার্থক্য ধরতে পারে না, সেখানে অর্ধশিক্ষিত-অশিক্ষিতদের হাতে ফেসবুকের মত একটা অস্ত্র তুলে দিয়ে আপনি শান্তিতে ঘুমান কিভাবে ভায়া?

Most Popular

To Top