ইতিহাস

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি – সময়ের আগে জন্মানো এক স্বপ্নদ্রষ্টা

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি নিয়ন আলোয় neon aloy

পৃথিবীতে যুগে যুগে এমন কিছু মানুষ জন্মগ্রহণ করেন, যাদের প্রতিভার থৈ পেতে গেলে বিস্মিত হতে হয়। আমরা যেখানে যেকোন একটি বিষয় নিয়ে কাজ করতে গিয়ে হাবুডুবু খাই, সেখানে তারা অসম্ভব সৃষ্টিশীলতার পরিচয় দিয়ে কাজ করেছেন জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প সাহিত্যের নানা শাখায়। এমনই একজন মানুষ লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভাবান মানুষ।

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি মূলত বিখ্যাত চিত্রশিল্পী হিসেবে, তবে এর বাইরেও তার অনেক পরিচয় রয়েছে। চিত্রশিল্পী ছাড়াও তিনি ছিলেন একাধারে উদ্ভাবক, ভাস্কর, দার্শনিক, স্থাপত্যবিদ, বিজ্ঞানী এবং প্রকৌশলী। এই প্রতিটি ধারাতেই তিনি আশ্চর্যজনক প্রতিভা ও সৃষ্টিশীলতার পরিচয় দিয়েছেন।

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি ১৪৫২ সালের ১৫ই এপ্রিল ইতালির ছোট একটি শহর ভিঞ্চিতে জন্ম নেন। বাসস্থানের নাম অনুসারেই তার নাম রাখা হয় লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি। তিনি ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকতে ভালোবাসতেন। চিত্রশিল্পের প্রতি তার অনুরাগ দেখে তাকে ১৪ বছর বয়সে ভেরোকিও নামের একজন নামকরা শিল্পীর কাছে শিক্ষানবিস হিসেবে কাজ করার জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয়। ভেরোকিও একই ছবিতে তার শিষ্যদের নিয়ে কাজ করতেন, ভিঞ্চির প্রাথমিক শিল্পকর্ম হিসেবে বিবেচিত কয়েকটি ছবি ভেরোকিওর সাথে করা।

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি নিয়ন আলোয় neon aloy

“দা লাস্ট সাপার” সহ ভিঞ্চি’র আরো অনেক শিল্পকর্মে খুঁজে পাওয়া যায় থিওলজি’র ছাপ

ভিঞ্চি চিত্রশিল্পে চমৎকারভাবে উন্নতি করতে থাকেন। ছেলের প্রতিভার বিকাশ দেখে ভিঞ্চির বাবা তাকে নিজস্ব একটি স্টুডিও তৈরী করে দেন। ভিঞ্চির বয়স তখন বাইশ।

ভিঞ্চি নিজেকে উঁচুদরের চিত্রশিল্পী হিসেবে বিবেচনা করতেন না, এবং তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তা-ই মনে করে গেছেন। ত্রিশ বছর বয়সে তিনি যখন মিলানে পাড়ি জমালেন, সেখানকার ডিউকের কাছে লেখা একটি চিঠিতে তিনি একজন প্রকৌশলী হিসেবে নিজের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন এবং বলেন, এর পাশাপাশি তিনি ছবিও আঁকতে পারেন। এর থেকে নিজের সম্পর্কে ভিঞ্চির চিন্তাভাবনার ধারণা পাওয়া যায়।

ভিঞ্চির কাজগুলোর সম্পর্কে একটু আলোকপাত করা যাক। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পকর্ম হচ্ছে মোনালিসা, যা লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা। ভিঞ্চি ১৫০৩ সাল থেকে ১৫০৫ সালের মধ্যে ছবিটি আঁকেন। ১৯১১ সালের ২১শে আগস্ট লুভ্যর মিউজিয়াম থেকে চিত্রকর্মটি চুরি হয়ে যাওয়ার পরে এটা মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। পুনরুদ্ধার হওয়ার পর শিল্পকর্মটি আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা লাভ করে।

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি নিয়ন আলোয় neon aloy

প্রতিবছর কয়েক লক্ষ মানুষ ল্যুভর মিউজিয়ামে ভীড় জমায় লিওনার্দো’র মোনালিসাকে দেখার জন্য।

ভিঞ্চির আরেকটি বিখ্যাত শিল্পকর্ম হচ্ছে “দি লাস্ট সাপার” নামের একটি ম্যুরাল। এই ম্যুরালে ১২ জন শিষ্যসহ যিশুকে দেখানো হয়। এই শিল্পকর্মটি সহ তার আরও বেশ কিছু কাজে ধর্মীয় ঐতিহ্য ও মিথলজির প্রভাব পাওয়া যায়।

ভিঞ্চির বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা ছিল অত্যন্ত প্রবল। তিনি তার চারপাশের পৃথিবী অবলোকন ও বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে প্রকৃতির নানা রহস্য উদঘাটন করতে চাইতেন। ভিঞ্চি অস্ত্রসজ্জিত ট্যাঙ্ক, গাড়ি, পুলি ইত্যাদির নকশা করেন। পাখির উড়ার গতিবিধি ও ধরণ পর্যবেক্ষণ করার মাধ্যমে আকাশে ওড়ার যন্ত্র ডিজাইন করেন। তিনি পানির প্রবাহ বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেন এবং তা নিজ উদ্ভাবিত ড্রাইভিং গিয়ার, সেচযন্ত্র এবং ওয়াটারমিটারে প্রয়োগ করেন। ভিঞ্চিই সর্বপ্রথম কন্ট্যাক্ট লেন্সের প্রস্তাব করেন।

এনাটমিতে ছিল লিওনার্দো’র অপার কৌতূহল। তিনি শবচ্ছেদ করে মানবদেহ কীভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে ধারণা নেয়ার চেষ্টা করতেন। ভিঞ্চি “দ্য ভিট্রুভিয়ান ম্যান” নামের একটি অসাধারণ ছবি অঙ্কন করেন যাতে মানুষের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোর সঠিক অনুপাত তুলে ধরা হয়।

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি নিয়ন আলোয় neon aloy

দ্য ভিট্রুভিয়ান ম্যান

তার বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা ছিল সময়ের চাইতে অনেক এগিয়ে। হেলিকপ্টারের মত অনেক যন্ত্র, যা বিজ্ঞানের আধুনিক যুগের আবিষ্কার, তা তিনিই আজ থেকে পাঁচশত বছর আগে চিন্তা করে গেছেন বা পরিকল্পনা করে গেছেন। তার বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার সমাদর করার মত মানুষ সেই যুগে ভিঞ্চির চারপাশে ছিল না বললেই চলে। তার আবিষ্কারগুলো কোনটি বর্তমান সময়ে এসে মূল্যায়িত হয়েছে, কোনটি হারিয়ে গেছে, আর কোনটির ত্রুটিবিচ্যুতির কারণে ব্যবহারিক প্রয়োগ সম্ভব হয়নি।

তবে তার শিল্পকর্মের জন্য তিনি ছিলেন সর্বজনবিদিত। তার জীবদ্দশাতেই তিনি শিল্পকর্মে অনন্য সৃষ্টিশীলতা ও উৎকর্ষতার জন্য প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তিনি ছবি আঁকার জন্য নানা পদ্ধতির উদ্ভাবন করতেন এবং তা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাতেন। এর ফলে তার বেশ কিছু চিত্রকর্ম সময়ের সাথে সাথে নষ্ট হয়ে যায়।

ভিঞ্চির একটি বিখ্যাত নোটবুক আছে, যা Codex Arundel নামে পরিচিত। ৭,০০০ এর অধিক পৃষ্ঠাসমৃদ্ধ এই নোটবুকে তার পড়াশোনা, পর্যবেক্ষণ ও উদ্ভাবন সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ লেখা রয়েছে। “মিরর রাইটিং” নামে একটি পদ্ধতিতে এটি লেখা, যা আয়নার সামনে ধরলে সোজাভাবে পড়া যায়। ভিঞ্চির জীবনদর্শন, উদ্ভাবন ও কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে বিশ্বকে ধারণা প্রদান করতে এই নোটবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি নিয়ন আলোয় neon aloy

কোডেক্স আরুন্দেলের একটি পাতা…

লিওনার্দো’র লেখা আরেকটি পান্ডুলিপি Codex Leicester বর্তমানে বিল গেটসের সংগ্রহে রয়েছে। বিল গেটস এক নিলামে পান্ডুলিপিটি কিনে নেন প্রায় ৩১ মিলিয়ন ডলারে।

সৃষ্টিশীল ও কর্মোদ্যম এই মানুষটি ১৫১৯ সালের ২ মে ফ্রান্সের এমবোয়াজ শহরে মৃত্যবরণ করেন। আজ তার মৃত্যুবার্ষিকী। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি তার সৃষ্টির মাধ্যমে জয় করেছেন মানুষ এবং সময়কে। এই মহান শিল্পীর সৃষ্টিকর্ম নিঃসন্দেহে আরও বহুদিন মানুষের মাঝে বিস্ময় ও মুগ্ধতা ছড়িয়ে যাবে, এই কথা সহজেই অনুমেয়।

সবশেষে এবার আসুন লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি সম্পর্কে কিছু মজার তথ্য জেনে নেয়া যাক-

  • ভিঞ্চি একই সাথে এক হাতে লিখতে ও এক হাতে ছবি আঁকতে পারতেন।
  • তিনি প্রায়ই বাজার থেকে খাঁচায় বন্দী পশুপাখি কিনতেন তাদের মুক্ত করে দেবার জন্য।
  • ভিঞ্চি এবং সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আরেক শিল্পী একে অন্যকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করতেন।
  • ভিঞ্চি সমকামীতার অভিযোগে অভিযুক্ত হন এবং গ্রেপ্তার এড়ানোর জন্য কিছুদিন পালিয়ে বেড়ান। পরে সাক্ষীর অভাবে এই অভিযোগ বাতিল হয়ে যায়।
  • লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি সৌরশক্তির বহুল ব্যবহার সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন।
  • ভিঞ্চি বিশ্বাস করতেন চাঁদে সমুদ্র রয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ পানির উপস্থিতির কারণেই চাঁদ চমৎকারভাবে আলো প্রতিফলিত করতে পারে।

Most Popular

To Top