ইতিহাস

আপনি কি হিটলার-অনুরাগী?

হিটলার নিয়ন আলোয় neon aloy

নিতান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও হিটলার নামক এক নরপশু ও রক্তপিপাসু হন্তারককে নিয়ে কিছু কথা বলতে হচ্ছে। এই বঙ্গ দেশ রঙ্গে ভরা। এই দেশে হিটলারের মত ফ্যাসিস্ট, জাতি-ধর্ম-বর্ণ বিদ্বেষী, ও গণহত্যাকারী দানবকে অনেকেই আদর্শ মানেন, আর আরো বিব্রতকর ব্যাপার হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তথাকথিত স্মার্ট শিক্ষার্থীরাও হিটলারকে নিয়ে রোমাঞ্চিত হন। এমনকি অনেকেই মৃত্যুবার্ষিকী নিয়ে দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে স্ট্যাটাস পয়দা করেন এবং বলার চেষ্টা করেন যে হিটলারের ইতিহাস একপাক্ষিকভাবে রচিত হয়েছে। আবার অনেকেই হিটলারের বেশভূষা ধারণ করে হিটলারী করতে মাঠে নেমেছেন। অবশ্য আমাদের দেশে অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যায় মদদ দানকারী পাকবাহিনীর দোসরদের পক্ষেও জয়গান গান। তারা একাত্তরের গণহত্যাকেও বিভিন্ন উদ্ভট যুক্তিতে বৈধতা দিতে চায়। সেই ব্যাপারে পরে আসি।

আবার হিটলারেই ফিরি। আপনারা যারা হিটলারকে আদর্শ মানেন আপনারা যদি মূর্খ না হন তাহলে জানার কথা ‘হলোকাস্ট’ কী। ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত, মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই সময়কালে নাৎসি বাহিনী ও তাদের দোসররা অন্তত ৫ মিলিয়ন বেসামরিক সাধারণ জনতা (ইহুদি ব্যতীত জনগোষ্ঠী) এবং প্রায় ৬ মিলিয়ন ইহুদিকে হত্যা করে (ইউরোপের মোট ইহুদি জনগোষ্ঠীর দুই তৃতীয়াংশ)। এই মানুষগুলোকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প ও এক্সটারমিনেশন ক্যাম্পে নিয়ে পাশবিক নির্যাতন করে এবং গ্যাস চেম্বারে পুড়িয়ে মারা হয়।

তারপরও যারা হিটলারকে আদর্শ মানেন তারা হিটলারের এই গণহত্যাকে বৈধতা দিচ্ছেন, সেইটা জাতিগত বিদ্বেষ থেকে অথবা অন্য কোন কারণ থেকে। এখন যদি আবার বলেন যে ‘না, আমরা অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, আমাদের বাপ-দাদা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক’ তাইলে আমি বলব হয় আপনারা মুক্তিযুদ্ধকে ঠিকঠাকভাবে বুঝেন না কিংবা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন মাত্র। নাহলে মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসররা বাংলায় যে নৃশংস গণহত্যা চালিয়ে গেছে সেইটা চিন্তা করে হলেও হিটলারের গণহত্যাকে সমর্থন করতেন না। তারপরেও যারা বলবে যে ‘দুইটা কি এক হইল নাকি?’ তাদের উদ্দেশ্যে একটাই কথা আপনারা মানসিক বিকারগ্রস্ত, ভালো সাইক্রিয়াটিস্ট দেখান।

এই যে হিটলার এত নৃশংসভাবে মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষকে হত্যা করেছে সেইটাকে ‘এথনিক ক্লিনজিং’ বলে। আবারও বলি আপনারা যারা হিটলারকে আদর্শ মনে করেন এবং সুপারহিরো ভেবে বেশভূষা অনুকরণ করেন আপনাদেরকে যদি ভেবে নিই আপনারা মূর্খ নন যথেষ্ট জ্ঞানীগুণী, বই পড়ুয়া, সমাজ সংস্কারক, তাহলে ‘এথনিক ক্লিনজিং’ কী সেইটা আপনাদের জানা থাকার কথা। আর আপনারা যদি সুষ্ঠ স্বাভাবিক মানুষ হন তাইলে তো কোনভাবেই জাতিগত নিধন সমর্থন করবেন না, অসুস্থ হইলে ভিন্ন কথা। সম্প্রতি মিয়ানমারের অং সাং সুচি জাতিগত নিধনের জন্য যে নৃশংস গণহত্যা চালিয়েছে রোহিঙ্গাদের উপর সেইটাকেও সমর্থন করার কথা না। আমি জানি আপনারা করেন না। তাইলে ভেবে নিলাম আপনারা সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ। কিন্তু ভাই হিটলার আর সুচির মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। এরা একই কাজ করছে। তারপরও হিটলারকে সমর্থন করেন? আদর্শ মানেন? তাহলে কী মনে করে নিব আপনারা পক্ষপাতদুষ্ট? তারপরও যদি বলেন ‘কীসের সাথে কী মিলান?’ তাইলে আপনাদের উদ্দেশ্যে একটাই কথা আপনারা মানসিক বিকারগ্রস্ত এবং পক্ষপাতদুষ্ট, ভালো সাইক্রিয়াটিস্ট দেখান।

আসুন আরো কিছু খোঁড়াখুঁড়ি করি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবার পেছনে কার অবদান সবচেয়ে বেশি ছিল? আপনাদের প্রিয় গুরু হিটলারের। আপনারা শান্তি চান তো নাকি? এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রায় ১৭ মিলিয়ন মানুষকে (যার প্রায় ৬ মিলিয়ন ইহুদি) পৃথিবী থেকে উধাও করে দিয়েছিল। এখন আবার বলবেন যে ‘একা তো হিটলারের দোষ না। অন্য দেশের হর্তাকর্তাদেরও তো দোষ আছে’। আপনাদের জন্য আবারও বলছি হিটলার এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংগঠনে সর্বশ্রেষ্ঠ কলকাঠি নাড়নেওয়ালা। তারপরেও বলবেন ‘আপনারা সব একপাক্ষিক ইতিহাস বলেন। আপনাদের স্বভাবই এমন। হিটলার তো জার্মানের মানুষজনের জন্য এসব করেছেন! আচ্ছা চলেন দেখি আপনাদের গুরু হিটলার কী করেছেন জার্মানবাসীদের জন্য।

১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত পর্যন্ত হিটলার এবং তার নাৎসি বাহিনী প্রায় শ খানেক নিয়মনীতি বানিয়েছিলেন ইহুদিদেরকে তাদের সমাজ থেকে বাতিল করে দেয়ার জন্য। আর এই সব নিয়মনীতি পয়দা করা হয়েছে শুধুমাত্র জাতি বিদ্বেষ, ধর্ম বিদ্বেষ এবং বর্ণ বিদ্বেষ থেকে যা জাতিগত নিধনের সূত্রপাত ছিল।

  • ১ এপ্রিল, ১৯৩৩ সালে হিটলার জাতীয়ভাবে ইহুদিদের ব্যবসা-বাণিজ্য বয়কট করে।
  • ৭ এপ্রিল, ১৯৩৩ সালে ইহুদিদেরকে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের চাকরিচ্যুত করে। এমনকি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইহুদিদের প্রবেশাধিকার সংকুচিত করে ফেলে।
  • ১৯৩৪ সালের দিকে ইহুদি অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মুভিতে কিংবা থিয়েটারে প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়।
  • ১৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৫ সালে নুরেমবার্গ আইন প্রচলনের মাধ্যমে ‘জার্মান রক্ত এবং জার্মান গৌরব’ রক্ষার নামে ইহুদি এবং জার্মানের নাগরিকদের মধ্যে বিবাহ বন্ধনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
  • ১৯৩৮ সালের ৯ ও ১০ নভেম্বর ইহুদি বিরোধী এক দাঙ্গা জার্মানি, অস্ট্রিয়া এবং নেদারল্যান্ডস এর কিছু কিছু অংশে ছড়িয়ে পড়ে এবং নাৎসি বাহিনী ইহুদিদের ঘর-বাড়ি, বিদ্যালয় ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে ফেলে। এই হিংসাত্মক হানাহানিকে ‘Kristallnacht’ (মানে ক্রিস্টাল নাইট কিংবা ভাঙা কাচের রাত) বলে অভিহিত করা হয়। ক্রিস্টাল নাইটে প্রায় ১০০ ইহুদিকে হত্যা করা হয় এবং তার পরবর্তী নাৎসি বাহিনীর নৃশংসতা আরো ভয়াবহ রূপ নেয়। প্রায় ৩০,০০০ ইহুদি পুরুষকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় তাদেরকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়।

এমনকি বিভিন্ন প্রকার প্রোপাগান্ডা চালিয়ে জার্মান স্টুডেন্ট ইউনিয়ন দ্বারা ‘একশন এগেইন্সট দ্য আন-জার্মান স্পিরিট’ নামে প্রায় ২৫,০০০ হাজারের মত ‘আন-জার্মান’ বই পুড়িয়ে ফেলে। হিটলার কি শুধু এইটুকুতেই ক্ষান্ত হন? ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে অসংখ্য সমকামী ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের হত্যা করেছিল।

এই হল আপাদমস্তক এক খুনীর সংক্ষিপ্ত পরিচয়। জানি তারপরেও আপনারা যারা হিটলারকে পছন্দ করেন, আদর্শ মানেন তারা বলবেন ‘তারপরও আমরা হিটলারকে আদর্শ মানি’! এইটাতে অবাক হবার কিছু নাই। সব সময় এমন প্রতিক্রিয়াশীল লোকের অভাব ছিল না। আপনার যা খুশি করেন, খালি কানের কাছে এসে ছাগলের মত ম্যা ম্যা চিৎকার করবেন না, আর মৃত হিটলারের ভূত সেজে ফতোয়া দিবেন না। এমন আদর্শবান, চেতনাবাদী, সমাজ সংস্কারক, গরীবের বন্ধু, মানবদরদী (যদিও হিটলার মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ হত্যার কারিগর) সং এর নাকি মুরিদের অভাব নাই। এই সার্কাস দেখলে আহমদ ছফার ‘একজন আলী কেনানের উত্থান পতন’ উপন্যাসের আলী কেনানের কথা মনে পড়ে। নব্য হিটলারদের উত্থান যেহেতু হয়েছে পতনও নিশ্চয় আসবে। এমন একজন নরপশু, খুনীর পিছনে এত সময় নষ্ট করলাম ভাবতেই কষ্ট লাগছে।

হিটলারের আত্মহত্যাদিবস গতকাল গেল। একটাই চাওয়া এমন নরপশু যাতে পৃথিবীতে আর জন্ম না নেয়।

তার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে একটাই স্লোগান – ‘হেইট হিটলার, ব্লাডি কিলার’।

লেখকঃ খোইরোম কামেশ্বর

Most Popular

To Top