নাগরিক কথা

রানা প্লাজা! বিচার আর কতদূর!

রানা প্লাজা! বিচার আর কতদূর!/NeonAloy

দুর্ঘটনা ও হত্যার মাঝখানে একটা মোটা দাগে বিভেদরেখা টানা আছে। কিছু কিছু দুর্ঘটনা এমনভাবে এই রেখা ছুঁই ছুঁই করে যে, সেটাকে হত্যার কাতারে না ফেলা মুশকিল হয়ে যায়।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের যুদ্ধপরবর্তী ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা কিংবা হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। রানা প্লাজা নামের বহুতল একটি ভবন প্রায় ৫০০০ হাজার মানুষ নিয়ে চোখের পলকে ধ্বসে পড়ে। অফিসিয়াল হিসাব অনুযায়ী নিহত হয় ১১২৯ জন, আহত আড়াই সহস্রাধিক, নিখোঁজ ৯৯৬ জন।

একটা পরিত্যক্ত ডোবার উপরে বহুতল ভবন তৈরী করা হয়েছে, যার চারটি তলা নির্মিত হয়েছে রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই। এই দেশে রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক ক্ষমতার কাছাকাছিও যারা বসবাস করেন, তারা এইসব প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন-টনুমোদনের তোয়াক্কাও খুব একটা করেন না। না-ই করতে পারেন, যস্মিন দেশে যদাচার।

২৩ শে এপ্রিল ভবনে বড় একটা ফাটল দেখা যায়। সকল কর্মীদের ভবন ছেড়ে বেরিয়ে যেতে বলা হয়। কিন্তু পরদিন মালিকপক্ষ অনুধাবন করেন, একদিন প্রোডাকশন বন্ধ থাকলে যে পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হবে, সেটা এই কয়জন শ্রমিকের প্রাণ ঝুঁকির চাইতে অনেক বেশি। তাই পরদিনই রানা প্লাজাকে ঝুঁকিমুক্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং শ্রমিকদের কাজে ফিরে আসার নির্দেশ দেয়া হয়।

শ্রমিকেরা কাজে ফিরে আসে। আমাদের দেশের পোশাক শ্রমিকদের জীবনযাপন সম্পর্কে যাদের মোটামুটি জানেন, তারা কিছুটা ধারণা করতে পারেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়েও কেন তাদের কাজ করতে যেতে হয়। গার্মেন্টসে সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর যে নামে মাত্র মজুরী মেলে, তা দিয়ে ঢাকা শহরে কীভাবে দৈনন্দিন চাহিদা গুলো মেটানো যায় সেটা একটা বড় বিস্ময় (২০১৪ সালে গার্মেন্টস শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরী ছিল ৬৫ ইউএস ডলার)। এই সামান্য মজুরী দিয়ে তারা সংসার চালান, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ যোগান, প্রতি ঈদে বাড়ির লোকজনের জন্য উপহার কেনেন। মেশিনে নাক-মুখ গুঁজে তারা স্বপ্ন দেখেন তাদের সন্তানকে যেন জীবিকার জন্য এইখানে আসতে না হয়। খুব বড় স্বপ্ন নয়, কিন্তু স্বপ্ন দেখার জন্য দেয় মূল্যটা বড়।

আর তাদের রক্ত জল করা টাকায় গার্মেন্টস মালিকদের পকেট গরম হয়। পকেট গরম হয় সোহেল রানাদের।
তারপর রানা প্লাজা ধ্বসে পরে। মানুষজন মরে। গার্মেন্টস কর্মীর জীবনের অর্থমূল্য কত সেই হিসাব আমার জানা নাই। কেউ কেউ বেঁচে আছে অর্ধমৃত হয়ে। একজনের কথা শুনেছি যার হাত আটকে পড়েছিল, উপায়ন্তর না দেখে ইট দিয়ে হাত ছেঁচে আলাদা করে তারপর বেরিয়ে এসেছেন।

তারপর তুমুল আন্দোলনের পর গ্রেপ্তার হন গার্মেন্টস মালিকেরা এবং তার সাথে ভবন মালিক সোহেল রানা। গণরোষের তীরটা সবচেয়ে বেশি ছিল সোহেল রানার দিকেই, কারণ ভবন ধ্বসের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ভবনের ক্রুটিপূর্ণ নির্মাণকে। সেই সোহেল রানার সাথে কোন এক রাজনৈতিক দলের ক্ষমতাশালী নেতার অতিশয় সুসম্পর্ক আছে বলে জানা যায়। তারপরও দেশের মানুষ বিচার আশা করে, অপরাধের গ্র্যাভিটি বলতে একটা কথা আছে।

সর্বশেষ খবর পেলাম হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের কারণে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণই শুরু হয়নি এখনও। গুরুত্বপূর্ণ মামলার আসামীদের গ্রেপ্তারের পাঁচ বছর পরেও বিচারকাজ শুরু হয় নাই, সুস্থ্য স্বাভাবিক বিবেচনাবোধ থেকে এটা মেনে নেয়া যায় না। এটর্নী জেনারেল জানিয়েছেন, এই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ আটকে আছে, এই তথ্য তাকে জানানো হয়নি!

সাধারণ মানুষ জানে কম, বোঝে তার থেকেও কম। তবে স্বাভাবিক বিবেকবোধ এটুকু বলে এগারোশোর অধিক মানষের মৃত্যুর জন্য দায়ী যে ব্যক্তি, পাঁচ বছরের মধ্যে তার বিচার হওয়া উচিৎ ছিল। পাঁচ বছর অনেক দীর্ঘ একটা সময়।

ভুক্তভোগীদের এখনও যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেয়া হয় নাই, দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে যাওয়া অনেকের পরিবার এখন অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে, এই কষ্টের কিছুটা উপশম হতো যদি দোষীদের ন্যায়বিচারের আওতায় আনা হতো। কেবল “বিচারের আওতায় এনে”ও অনেক সময় বিচার আশা করা আকাশ কুসুম কল্পনা।

একটি সুস্পষ্ট অপরাধীর বিচারকাজ পাঁচ বছরেও শেষ হয় নি কেন, ক্ষতিগ্রস্থদের ক্ষতিপূরণ কবে নাগাদ প্রদান করা হবে- মানুষের এই প্রশ্নগুলো প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকদের কানে যাবে কি না, কানে গেলেও বিবেক পর্যন্ত পৌঁছাবে কি না, সেই সেই কথা তুলে আর লাভ নেই। আমাদের কান থেকে বিবেকের দূরত্ব দিন দিন বাড়ছে। মাৎস্যন্যায়ের যুগে আমরা প্রশ্নের উত্তর না পেতে পেতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি।

 

[এডিটরস নোটঃ নাগরিক কথা সেকশনে প্রকাশিত এই লেখাটিতে লেখক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তার অভিমত প্রকাশ করেছেন। নিয়ন আলোয় শুধুমাত্র লেখকের মতপ্রকাশের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফরমের ভূমিকা পালন করেছে। কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির সম্মানহানি এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আপনার আশেপাশে ঘটে চলা কোন অসঙ্গতির কথা তুলে ধরতে চান সবার কাছে? আমাদের ইমেইল করুন neonaloymag@gmail.com অ্যাড্রেসে।]

 

Most Popular

To Top