শিল্প ও সংস্কৃতি

একেবারেই অন্যরকম তিনটি সিনেমা

সিনেমা গুলো দেখতে পারেন আপনিও!/NeonAloy

কিছু চলচ্চিত্র ব্যবসা করে। কিছু চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। কিছু আবার মনের কোঠায় জায়গা করে নেয়। তার মধ্যে কিছু চলচ্চিত্র চোখে ভালো লাগার অনুভূতি দেয়। শেষ হলে মনে হয় আরেকটু যদি হতো। এত তাড়াতাড়ি কেনো শেষ হয়ে গেলো!

সেরকমই ৩ টি সিনেমার অল্প রিভিউ খুব কম স্পয়লার নিয়ে এই লেখা।

সবার প্রথমেই আসি “Bekas” সিনেমা নিয়ে।

কুর্দিশ ভাষায় বানানো একটি অনবদ্য আন্ডাররেটেট চলচ্চিত্র “Bekas.” বলতে গেলে আপনি হারিয়ে যাবেন এই চলচ্চিত্রের গল্পের সারল্যে। ভাববেন, এতো সাদাসিধে কি গল্প হয়!

ইরাকি-সুইডিশ নির্মাতা কারজান কাদের এর অনবদ্য নির্মাণশৈলি আপনাকে ঘোরে ফেলে দেবে। যা থেকে বোঝার উপায় নেই এটি এই নির্মাতার দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।

গল্পটা খুবই সরল।
১৯৯০-৯১ সালের প্রেক্ষাপট যখন সাদ্দাম হোসেনের স্বৈরশাসনে ইরাকে অরাজকর অবস্থা। ঠিক তখন কুর্দিস্তান এর প্রত্যন্ত এক ছোট শহরের ছোট ছোট দুই ভাইয়ের গল্প। যাদের বাবা-মা সাদ্দাম বাহিনী দ্বারা নিহত। এটি মূলত সেমি- অটো বায়োগ্রাফিও বলা যায়। কারণ ডিরেক্টর ওই অঞ্চলে ১৯৯০ সালের দিকে তার ভাইয়ের সাথে জীবন যাপন করেছে এবং সেই জীবনযাপনই তিনি চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে উঠানোর চেষ্টা করেছেন।

একেবারেই অন্যরকম তিনটি সিনেমা /NeonAloy

গল্পের প্রেক্ষাপট হচ্ছে এমন, দুই ভাই মুচির কাজ করে জীবন যাপন করে। তখন শহরের একটি সিনেমা হলে ওরা সুপারম্যান চলচ্চিত্রে দেখে সুপারম্যান যে কাউকে বাঁচিয়ে দিতে পারে। তাই সুপারম্যান কে দিয়ে ওদের অভাব অনটন কমানো এবং বাবা-মা কে বাঁচানোর জন্য সুপারম্যান এর কাছে যাওয়ার সিধান্ত নেয়। সুপারম্যান যেহেতু আমেরিকা থাকে তাই তারা আমেরিকা যেতে চায়। যাতে সুপারম্যান ওদের সাহাজ্য করতে পারে।

এরকম প্রেক্ষাপট এ শুরু হয়ে পরে অনবদ্য সারল্য এবং কুর্দি শিশুদের অবস্থান, কুর্দিস্তান এর সমাজ, জীবনযাপন, ওদের কষ্ট, চরাই উতরাই, দুই ভাই এর ভালোবাসা-অভিমানের অনবদ্য গল্পে সিনেমাটি অসাধারণ রুপ লাভ করেছে।

চলচ্চিত্রের আরেকটি নজর কারা বিষয় হচ্ছে, কোনো বড় অভিনেতার নাম নেই এবং পরে যানা যায় বাচ্চা দুইজনের কোনো অভিনয় এর স্কিল ছিলো না। পুরোটাই ডিরেক্টর এবং কলাকৌশলিদের প্যাশন এর রুপ। চলচ্চিত্রটি দুবাই এবং ব্যাঙ্গালোর চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং দুবাই উৎসবে একটি পুরষ্কার পায়।

চলচ্চিত্রটির নামের পাশে তেমন কোনো পুরষ্কার না থাকলেও এটি একটি অনবদ্য আন্ডাররেটেড মনমুগ্ধকর চলচ্চিত্র।
চলচ্চিত্রের গল্প আপনাকে গল্পের সাথে মিশিয়ে নিবে এবং গল্পই আপনাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।

IMDB Ratings: 7.5/10.
Release: 2012.

এরপরের সিনেমা হলো “Omar”.

ফিলিস্তিনি চলচ্চিত্র।
ফিলিস্তিনি চলচ্চিত্র শুনেই মনে হতে পারে ওই সেই একই গল্প, যুদ্ধ। কিন্তু না এটি একটি ড্রামা, রোমান্স, থ্রিল ঘরানার সিনেমা।
নির্মাতা Hany Abu-Assad এর বানানো অস্কার নমিনেশন পাওয়া এবং কান চলচ্চিত্র উৎসব এ পুরস্কার পাওয়া চলচ্চিত্র। আরবি ভাষায় নির্মিত সিনেমা।

প্রথমে গল্পটা খুব সাধারন। ওমর নামে একজন ফিলিস্তিনি যুবক, বেকারী তে কাজ করে। সেই যুবক হাই স্কুল পড়ুয়া এক মেয়েকে ভালোবাসে। যার নাম নাদিয়া। যার সাথে কিনা সে ফিলিস্তিনি West Bank Barrier টপকে দেখা করতে যায়। নাদিয়াও তাকে ভালোবাসে। কিন্তু ওমর মনে প্রানে স্বাধীনতাকামী। তো সেরকম একদিন দেখা করে আসার সময় ধরা পড়ে এবং ইসরাইলি সৈন্য দ্বারা অপদস্থ হয়। এরপরে সে তার বাল্যবন্ধু তারেক এবং আমজাদকে নিয়ে একটি ইসরাইলি চেক পয়েন্ট এ আক্রমণ করে। এখানে নাদিয়া আবার তারেক এর বোন।

এর মাঝেই ইসরাইলি এজেন্ট রামি এর তৎপড়তায় ওমর ধরা পড়ে। রামি চেকপোস্টে আক্রমণকারী বাকিদের নাম জানতে চেয়েও ক্ষান্ত হয়না বরং রামি ওমরকে ফাঁসিয়ে বাধ্য করে তাকে ডাবল এজেন্ট হিসেবে ব্যবহার করে। ওমর ছাড়া পেয়ে এসে জানতে পারে নাদিয়া এর সাথে তার আরেক বন্ধু আমজাদের গোপন প্রেমের কথা। এতে সে কি করবে সেটা নিয়ে অনবদ্য থ্রিল গল্পের উপর দাঁড়ানো চলচ্চিত্রটি।

একেবারেই অন্যরকম তিনটি সিনেমা /NeonAloy

ওমর চরিত্রটা একাধারে রোমান্স, অন্য দিকে স্বাধীনতাকামী মনোভাব। সব মিলিয়ে এক অন্য রকম আবহ দিয়েছে এবং গল্পের টার্ন, গল্পের থ্রিল, বড় ব্যাপার বাস্তব জিনিসগুলো ব্যবহার খুব সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সব মিলিয়ে সিনেমাটি অন্য রকম রুপ দিয়েছেন এর পরিচালক। এক কথায় অসাধারন।

IMDB রেটিংঃ ৭.৬।
রিলিজঃ ২০১৩।

শেষ এবং তিন নং চলচ্চিত্রটি “Brooklyn

এবার একলাফে হলিউডে এসে পড়লাম।
তবে এটি আইরিশ নির্মাতা Jhon Crowley আরেক আইরিশ লেখক-সাংবাদিক Colm Toibin এর “Brooklyn” উপন্যাস এর উপর ভিত্তি করে বানানো সিনেমা।

২০১৬ সালের অস্কার এ শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ ৩ টি বিভাগে নমিনেশন পাওয়া এবং বাফটা এ্যাওয়ার্ড পাওয়া সিনেমাটি একটি ড্রামা এবং রোমান্টিক সিনেমা। ইংরেজি ভাষায় ১৯৫১ সালের প্রেক্ষাপটে নির্মিত সিনেমাটির গল্প এর ধারা এবং উপস্থাপন সত্যিই মনকাড়া।

মূলত সিনেমার গল্পটা প্রধান চরিত্র Eilis Lacey নামে এক আইরিশ তরুনী এর উপর। যে কিনা তার মা এবং ছোটো বোন Rose কে নিয়ে আয়ারল্যান্ডের দক্ষিণ পূর্বের Enniscorthy শহরের বাসিন্দা। Lacey চাকরি খুঁজে বেড়ায় এবং সেখানে সে পার্টটাইম হিসেবে একটি বেকারীর দোকানে কাজ করে। সেই বেকারীর দোকানটি চালায় মিস কেলি নামে একজন মহিলা। Lacey সেই বেকারীর দোকানেই ব্রুকলিন নিবাসী আইরিশ যাজক ফাদার ফ্লড এর সাক্ষাত পান। তখন সে যাজক এর সহায়তায় সে আমেরিকার ব্রুকলিন শহরের একটি ডিপার্টমেন্টাল দোকানে ফুল টাইম চাকরি পায়। সেই সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আয়ারল্যান্ড থেকে নিউইয়র্ক শহরে আসে Lacey। নতুন শহরের স্বাভাবিক ঘটনা আরকি। সেখানে সে প্রথমে মানিয়ে নিতে পারে না। তার পরিবার, দেশ এর কথা মনে পড়ে এবং সে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ে। তখন হঠাৎ করে সেখানে পরিচয় হয় Tony Fiorello নামে ইটালিয়ান আমেরিকান তরুনের সাথে। যে কিনা কাঠের কাজ করে। পরবর্তীতে তার সাথে প্রেম। তার বোনের মৃত্যু এর আবার আয়ারল্যান্ডে ফিরে আসা এবং ফিরে আসার ঠিক আগে গোপনে টনি এর সাথে বিয়ে। তারপর আয়ারল্যান্ডে এসে আর ব্রুকলিন ফিরে না যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ। পরে গল্পের মোড় নিয়ে অবশেষে ব্রুকলিন ফিরে গিয়ে টনি এর সাথে এক অনবদ্য পুনর্মিলন।

একেবারেই অন্যরকম তিনটি সিনেমা /NeonAloy

সব মিলিয়ে এক অনবদ্য গল্প এর ধারা যা কিনা দর্শককে একটানা দেখতে আকর্ষণ করার ক্ষমতা সিনেমাটি রাখে।

সবশেষে এই সিনেমার একটা জিনিস ভালো লেগেছে এই যে নারীর ক্ষমতায়ন। যা কিনা আমাদের দেশে এখনও অতটা সহজ না। ১৯৫১ সালের প্রেক্ষাপট অথচ তখন একজন একা নারী আয়ারল্যান্ড থেকে নিউইয়র্ক এর ব্রুকলিন এ যায় কাজের সূত্রে।

IMDB রেটিংঃ ৭.৫।
রিলিজঃ ২০১৫।

আজ এই ৩ টি থাক। আরেকদিন অন্য চলচ্চিত্র নিয়ে দেখা হবে। ভালো থাকবেন।

Most Popular

To Top