টুকিটাকি

যে শিশুটি বদলে দিল ক্রিসমাসের তারিখ

যে শিশুটি বদলে দিল ক্রিসমাসের তারিখ/NeonAloy

অক্টোবর মাসের ২৪ তারিখ। ক্রিসমাস আসতে তখনও ঠায় দুই মাস বাকি। কিন্তু কানাডার অন্টারিও প্রদেশের সেন্ট জর্জ নামক শহরে তখন চলছে ক্রিসমাসের আমেজ। সব বাসা, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত সাজানো হয়েছে বড়দিনের সাজে; রাস্তাঘাট, গাছপালায় জ্বলছে হরেক রকমের বিজলী বাতি। শহরে ক্রিসমাস প্যারেডও হয়ে গেলো, পুরো প্যারেডের সময়টা সান্তা ক্লজের কোলে বসে নিজের মতো উপভোগ করে নিল সাত বছর বয়সী একটি ছেলে। হ্যাঁ, এই ছেলেটার কারণেই সেদিন সেন্ট জর্জ শহরে ক্রিসমাস পালন করলো তিন হাজারের বেশি মানুষ, ২০১৫ সালের জন্য তাঁদের ক্রিসমাসের তারিখটা বদলে গেলো।

বলছিলাম ইভান লেগারসাগের কথা। আর দশটা মানুষের মতো তাঁর বেড়ে ওঠা হয় নি। তিন ভাইয়ের মেজ ইভান। বয়স যখন দু বছর বয়স, তখনই ধরা পরে ব্রেন টিউমার। ছোট্ট ইভানের ব্রেনে চিকিৎসা করা সম্ভব ছিল না। ডাক্তাররা পরামর্শ দেন ঔষধ এবং চেকাপ চালিয়ে যেতে, আর বয়স হলে চিকিৎসা করানোর জন্য।

সেভাবেই চলছিল কেমো থেরাপি এবং রেডিয়েশন ট্রিটমেন্ট, কিন্তু নাছোড়বান্দা টিউমার নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ছড়িয়ে পরে পুরো মস্তিস্কে। ডাক্তাররা বুঝে ফেলেন, সম্ভব নয় আর। ডাক্তারদের মুখ দেখে ইভানের মাও বুঝে ফেলেন আর বেশি দিন বাকি নেই। সবার ব্যবহারে সব কিছু বুঝে নিতে সময় লাগেনি ইভানেরও। কিন্তু মুখ থেকে কখনও হাসি সরেনি। হাসিমুখে মায়ের কাছে ছোট একটা চিরকুটে লিখে নিয়ে গেছে তাঁর ছোটছোট কয়েকটা আবদার। অসুস্থ ইভানের পরিবারে ক্রিসমাস উদযাপনটা ঠিক মতো কখনই হয়ে ওঠেনি, সাধারণত থাকতে হতো হাসপাতালে, নয়তো বাসায় অসুস্থ ইভানের সেবা করতে করতেই মায়ের ক্রিসমাস কাটতো। সবাই মিলে সুন্দরভাবে একটা ক্রিসমাস উদযাপন করবে, এটাই ছিল প্রথম আবদার। ছোট্ট ইভানের দিকে মা তাকান, আর গোপনে চোখের পানি ফেলেন। কারণ ডাক্তার বলেই দিয়েছেন, আসন্ন ক্রিসমাস দেখা হবে না ইভানের। তালিকায় আরও ছিল, একদিন সবাই মিলে বাইরে একসাথে মজা করে খেতে যাওয়া, বন্ধুদের সাথে একদিন মুভি দেখতে যাওয়া, নায়েগ্রা জলপ্রপাত দেখতে যাওয়া, কানাডার বিখ্যাত আইস হকি টুর্নামেন্ট দেখতে যাওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। অসহায় মা দেখতেন আর কাঁদতেন, কি করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না।

এগিয়ে এলো ইভানের কাজিনরা। ‘ওয়ান লাস্ট ক্রিসমাস’ নামে পেজ খুললো ‘গোফান্ডমি’তে। সাধারণ মানুষ সাড়াও দিলো। মাত্র চার দিনের মাথায় জমা হল ১২,০০০ কানাডিয়ান ডলার যা প্রায় ৮০০০ ইউরোর সমতুল্য। আশেপাশের মানুষ এগিয়ে আসে। চিকিৎসার খরচ বহন করতে করতে ধুঁকতে থাকা ইভানের পরিবারের পাশে এসে দাঁড়ায়। ইভানের চিকিৎসার খরচ কাঁধে তুলে নেয় অনেকে, অনেকে আবার ইভানের বাকি দুই ভাই লোগান এবং টাইসনের শিক্ষার ভার কাঁধে তুলে নেন। উৎসাহ পেয়ে কাজিনরা ইভানের শেষ ইচ্ছা গুলোও ফেসবুকে দেয়, ‘লাইটস অন ফর ইভান’ নামে একটি ইভেন্টও খোলে। যোগ দেয় সেন্ট জর্জের ৩০০০ হাজারের অধিক নাগরিক। ইভানের জন্য আগাম ক্রিসমাসের ব্যবস্থা করার দাবী জানিয়ে ‘লাইটস অন ফর ইভান’ হ্যাসট্যাগ দিয়ে পোস্ট করেন। বাদ যাননি উঠতি প্রজন্মের জনপ্রিয় কানাডিয়ান গায়ক জাস্টিন বিবারের বাবা, জেরমি বিবারও। তিনিও আগাম ক্রিসমাসের অনুরোধ জানিয়ে ‘লাইটস অন ফর ইভান’ ট্যাগ দিয়ে পোস্ট করেন।

যে শিশুটি বদলে দিল ক্রিসমাসের তারিখ/NeonAloy

ইভানের জন্য খোলা ইভেন্ট

 

সবার অনুপ্রেরণা, উৎসাহে সেন্ট জর্জে ইভানের জন্য দুই মাস আগেই সাজানো হল ক্রিসমাসের সাঁজ। ইভানদের বাসা সাজানো হল নতুন ভাবে, লাল-নীল বাতি দিয়ে। ইভান হাসপাতালের কক্ষের জানালা থেকে যে উঠানটা দেখত, সেটাও সাজানো হল ক্রিসমাসের সাঁজে। লাগান হল ক্রিসমাস ট্রি। ছোট ইভান অবাক হয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করলো, সবাই এমন করছে কেন? মা হেসে বলল, পুরো শহরের মানুষ তোমাকে ভালবাসে।

যে শিশুটি বদলে দিল ক্রিসমাসের তারিখ/NeonAloy

ইভানের শেষ ইচ্ছা পূরণে মেতেছিলো পুরো শহর

 

অক্টোবরের ২৪ তারিখ খুব ভাবগাম্ভীর্যের সাথেই সেন্ট জর্জে উদযাপিত হল ক্রিসমাস। ইভানের হাসপাতাল থেকে বাসা পর্যন্ত হল ক্রিসমাস প্যারেড। পুরো সময় সান্তা ক্লজের কোলে চড়ে শহরের রঙ দেখতে দেখতে, মানুষের ভালোবাসায় শিক্ত হয়ে, হাত নাড়তে নাড়তে বাসায় গেলো ইভান। চমকের শেষ কিন্তু এখানেই নয়। প্যারেড শেষে মায়ের সাথে ইভান খেলাও দেখতে গেলো এয়ার কানাডা সেন্টারে, টরেন্টো ম্যাপল লিফস আর ডালাস স্টারসের মধ্যকার খেলা দেখতে। খেলা শেষে পুরো পরিবার একটা রেস্টুরেন্টে ডিনার করতে গেলো, সেরাতে রেস্টুরেন্টটা শুধু ইভানদের পরিবারের জন্যই খোলা ছিল। ক্রিসমাস শেষে একদিন বন্ধুদের সাথে মুভিও দেখা হল। মায়ের সাথে একবার নায়েগ্রা জলপ্রপাত দেখেও মুগ্ধ হল ছোট্ট ইভান।

যে শিশুটি বদলে দিল ক্রিসমাসের তারিখ/NeonAloy

ছোট্ট জীবনের শেষ ইচ্ছা পূরণ

 

ছোট্ট চিরকুটের সব চাওয়াই যখন পূর্ণ হল, একদিন হাসিমুখেই মায়ের কোলে চিরতরে ঘুমিয়ে পড়লো ইভান। দিনটা ছিল ডিসেম্বরের ৬ তারিখ। অসংখ্য মানুষকে কাঁদিয়ে বিদায় নিল ইভান। ইভানের শোকে বিষণ্ণ ছিলো সেদিন সেন্ট জর্জের প্রকৃতিও, অশ্রু বিসর্জন করেছিলো আকাশও। ইভানের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য ব্রেন টিউমারে আক্রান্তদের সাহায্যের জন্য একটি ফান্ড খোলা হয়। ইভান বেঁচে থাকবে আমাদের মাঝে ছোট্ট সুপারহিরো হয়ে।

Most Popular

To Top