টেক

১০টি দুর্ঘটনা, যা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিমান চলাচল হয়েছে আরো নিরাপদ

বিমান দুর্ঘটনা নিয়ন আলোয় neon aloy

বিমান যাতায়াতকে সব থেকে নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা বলা হয়। কিন্তু ১২ মার্চ ২০১৮ তারিখে নেপালের ত্রিভুবন এয়ারপোর্টে অবতরণের সময়কালে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স এর ফ্লাইট ২১১ (একটি বম্বার্ডিয়ার ড্যাশ ৮ কিউ৪০০ মডেলের বিমান) দুর্ঘটনার শিকার হয়, যার ফলে প্রাণ হারান ৫১ জন যাত্রী। এরকম ঘটনা আকাশপথে বিমান ভ্রমণের নিরাপত্তার বিষয়ে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগায়।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বম্বার্ডিয়ার ড্যাশ ৮ কিউ৪০০ মডেলের বিমান নিয়ন আলোয় neon aloy

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বম্বার্ডিয়ার ড্যাশ ৮ কিউ৪০০ মডেলের বিমান

যদি আমরা যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো গত ৭ বছরে সেখানে বড় মাপের যাত্রীবাহী বিমান দুর্ঘটনা ঘটেনি। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন প্রায় ৩০,০০০ সফল ফ্লাইট উঠানামা করছে। তাহলে মনে প্রশ্ন জাগতে পারে আমাদের, কীভাবে তারা এত সফল হতে পেরেছে? তাদের বিমান যাতায়াত দিনকে দিন আরো সফল হওয়ার পেছনে আছে কিছু করুণ ইতিহাস, কিছু দুর্ঘটনা যা তাদের সফল হতে সাহায্য করেছে। চলুন দেখে আসি যুক্তরাষ্ট্রের ১০টি বড় বিমান দুর্ঘটনা এবং সেই ঘটনাগুলোর প্রেক্ষিতে গৃহীত পদক্ষেপ, যা বিমান ভ্রমণ সংক্রান্ত প্রযুক্তিতে আমূল পরিবর্তন এনে সফলতা এনে দিয়েছে।

১। ট্রান্সপন্ডার ও আকাশপথের উন্নত ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাঃ

যুক্তরাষ্ট্রের গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে টিডব্লিউএ ফ্লাইট ২ এবং ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ৭১৮ এই দুইটি বিমান ৩০ জুন ১৯৫৬ সংঘর্ষের শিকার হয়। যার ফলে বিমান ব্যবস্থাতে এ ধরণের সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য প্রযুক্তি এবং আকাশ পথের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রন (Air traffic control) এর জন্য ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করা হয়, যা সে সময়ের হিসাবে বেশ বড় ধরণের খরচ। ফলাফল স্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রে দুইটি উড়ন্ত যাত্রীবাহী বিমানের মধ্যে ৪৭ বছরে কোনো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। ১৯৫৮ সালে ফেডারেল এভিয়েশন এজেন্সি (FAA) প্রতিষ্ঠিত হয় নিরাপদ আকাশ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে।

বিমান দুর্ঘটনা নিয়ন আলোয় neon aloy

টিডব্লিউএ ফ্লাইট ২ এবং ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ৭১৮ (প্রতীকী ছবি)

তাছাড়া ১৯৮৬ সালের ৩১ অগাস্ট একটি ছোট প্রাইভেট বিমান লস এঞ্জলসের টার্মিনাল নিয়ন্ত্রণ এলাকায় একটি এরোমেক্সিকো ডিসি-৯ এর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হলে তা ৮৬ মানুষের প্রাণহানি ঘটায়। এই ঘটনার পর ছোট আকারের বিমানগুলোতে ট্রান্সপন্ডার নামে একটি ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস যুক্ত করা হয় যা বিমানটির অবস্থান নির্দেশ করে এয়ারলাইন্স নিয়ন্ত্রকের কাছে। এবং এরই সাথে বিমানে টিসিএএস II (TCAS II) সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা সাথে রাখতে বলা হয় যা নিকটবর্তী বিমানগুলোর সাথে সংঘর্ষের ব্যাপারে পাইলটদের সতর্ক করে দেওয়ার সাথে সাথে বিমানের উচ্চতা কমিয়ে কিংবা বাড়িয়ে সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়ানোর নির্দেশনাও দেয়।

২। স্মোক ডিটেক্টরঃ

১৯৮৩ সালের ২ জুন একটি ডিসি-৯ বিমান ডালাস থেকে টরন্টো যাওয়ার পথে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৩,০০০ ফুট উপরে থাকা অবস্থায় বিমানের পেছনের টয়লেট থেকে ধোঁয়া বের হতে শুরু করে। এই ধোঁয়া ক্রমশ কালো এবং ঘন হয়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে কেবিনে এবং এর কারণে ভেতরে কিছুই দেখা সম্ভব হচ্ছিলো না। বিমানটি জরুরী অবতরণ করে সিনসিনাটিতে। কিন্তু বিমানের দরজা খোলার পরপরই আগুন ধরে যায় এবং মারা যান ২৩ জন।

বিমান দুর্ঘটনা নিয়ন আলোয় neon aloy

ডালাস থেকে টরন্টোগামী বিধ্বস্ত ডিসি-৯ বিমান

পরবর্তীতে ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন – এফএএ (FAA) স্মোক ডিটেক্টর এবং স্বয়ংক্রিয় অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখা বাধ্যতামূলক করে বিমানের টয়লেটগুলোতে। পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে আগুন সহনশীল সিট এবং মেঝেতে লাইটের ব্যবস্থা করা হয় যা ধোঁয়াতে পথ দেখাতে সাহায্য করে। ১৯৮৮ সালের পরবর্তী বিমানগুলোর ধোঁয়া প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরো উন্নত করা হয়।

৩। ডাউনড্রাফট (Downdraft) সনাক্তকারী রাডারঃ

১৯৮৫ সালের ২ অগাস্ট। ডেল্টা ফ্লাইট ১৯১, একটি লকহিড এল-১০১১ ডালাসের ফোর্ট ওয়ার্থ বিমানবন্দরে অবতরণ করার সময় বজ্রপাত আঘাত হানে রানওয়েতে। বজ্রপাতের ফলে সৃষ্ট মাইক্রোবার্স্ট উইন্ড শিয়ার (microburst wind shear)- এক ধরণের বাতাসের গতিপ্রকৃতি যা সজোরে ভূপৃষ্ঠের দিকে বহমান হয় এবং এর ফলে বিমানটির গতি খুব দ্রুতি ৫৪ নটস কমে যায়। এবং যেহেতু সে সময় বিমানটি অবতরণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো, দ্রুত এই গতিহ্রাসের কারণে বিমানটি রানওয়ে থেকে এক মাইল আগে একটি হাইওয়ে’তে একটি গাড়ির উপর আছড়ে পড়ে। এ দুর্ঘটনায় গাড়ির একজন যাত্রীসহ বিমানের ১৬৩ জনের মধ্যে ১৩৪ জন নিহত হয়।

বিমান দুর্ঘটনা নিয়ন আলোয় neon aloy

এ দুর্ঘটনার পর নাসা এবং এফএএ সাত বছর গবেষণা করে বিমানে সম্মুখমুখী রাডার এবং উইন্ড শিয়ার ডিটেক্টর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে। ১৯৯০ এর দশকের মাঝামাঝি থেকে এই নিয়ম জারি হওয়ার পর এখন পর্যন্ত আর মাত্র একটি বিমান উইন্ড শিয়ারের কারণে বিধ্বস্ত হয়েছে।

৪। ইঞ্জিনের নিরাপত্তা বৃদ্ধিঃ

জুলাই ১৯, ১৯৮৯ সালে ডেনভার থেকে শিকাগো যাওয়ার সময় ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ২৩২, একটি ডিসি-১০ বিমানের লেজে যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে বিমানের গতিরোধক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। নিয়ন্ত্রণ হারানো বিমানের চাকা খুলে যায় এবং আগুন ধরে যায়। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে বড় ধরণের ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে কিন্তু এই ক্ষেত্রে আশ্চর্যজনক ভাবে ২৯৬ জন মানুষের মধ্যে ১৮৫ জন বেঁচে যায়।

বিমান দুর্ঘটনা নিয়ন আলোয় neon aloy

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট সেফটি বোর্ড – এনটিএসবি (NTSB) পরবর্তীতে এই দুর্ঘটনার কারন হিসেবে উল্লেখ করে যে বিমানের ফ্যান ডিস্কে একটি ফাটল শনাক্ত করতে মেকানিক ব্যর্থ হয়, যে ফাটলটি তৈরি হয়েছিল টাইটেনিয়ামের সঙ্কর ধাতুর ব্যবহারের কারণে। এরপর এফএএ বিমানের হাইড্রলিক সিস্টেমে অত্যাধিকভাবে সংস্কারের নির্দেশ দেয় এবং মেইনটেন্যান্সে কড়াকড়ি আরোপ করে। করে যার ফলে এরূপ দুর্ঘটনা থেকে রেহাই পাওয়া যায়।

৫। বিমানক্ষয় পর্যবেক্ষণ জোরদারঃ

এপ্রিল ২৮, ১৯৮৮-তে একটি ১৯ বছর পুরোনো ৭৩৭ বোয়িং হিলো, হাওয়াই থেকে হনুলুলু তে যাওয়ার পথে ভূপৃষ্ঠ থেকে ২৪,০০০ ফুট উপরে থাকাকালে বিমানের বডি’র একাংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং দ্রুত জরুরী অবতরণ করে। এই ঘটনাতেও আশ্চর্যজনক ভাবে একজন যাত্রী বাদে সবাই বেঁচে যায়।

বিমান দুর্ঘটনা নিয়ন আলোয় neon aloy

ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট সেফটি বোর্ড (NTSB) এই ঘটনার জন্য দায়ী করে মাত্রাতিরিক্ত ফ্লাইটের ফলে (প্রায় ৮৯,০০০ ফ্লাইট) সৃষ্ট ধাতুর ক্ষয়কে, যা বিমানের কাঠামো দুর্বল করে। এফএএ ১৯৯১ সালে একটি গবেষনা প্রোগ্রাম করে এবং বিমানের কাঠামোতে এই ক্ষয় হওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করে।

৬। রাডার প্রযুক্তির উন্নয়নঃ

১৯৯৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ইউএস এয়ার ফ্লাইট ৪২৭ (একটি বোয়িং ৭৩৭) পিটসবার্গে যাওয়ার সময় বিমানটির রাডার বামে ঘুরতে শুরু করে এবং ৫০০০ ফুট উপর থেকে ভূপতিত হয়। এর ফলে বিমানের ১৩২ জনই মারা যায়। বিমানের ব্লাক বক্স ( ফ্লাইটের রেকর্ড) থেকে জানা যায় যে রাডার হঠাৎ করেই বামে চলে যায় এবং সেদিকে ঘুরতে থাকে। “কিন্তু কেন?” এই প্রশ্নে ইউএস এয়ার দায়ী করে বিমানকে, আর বিমানের নির্মাতা বোয়িং দায়ী করে বিমানের ক্রু’দের। প্রায় পাঁচ বছর পর এনটিএসবি( NTSB) উদঘাটন করে যে রাডার এর ভাল্ব নষ্ট হওয়ায় রাডার সিস্টেম উল্টে যায়, যার কারনে পাইলট উত্তেজনাবশত যখন রাডারের ডান পেডেলে চাপ প্রয়োগ করে, তখন রাডার বামে চলে যায়।

বিমান দুর্ঘটনা নিয়ন আলোয় neon aloy

ইউএস এয়ারের বিমানবহরের একটি বোয়িং ৭৩৭ (প্রতীকী ছবি)

ফলাফলস্বরূপ, বোয়িং ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করে ২৮০০ টি জেটবিমানের রাডার উন্নয়নের জন্য। তাছাড়া বিমান দুর্ঘটনার জন্য ভুক্তভোগী পরিবারের সাহায্যের জন্য কংগ্রেস একটি আইন পাশ করে।

৭। কার্গোতে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থাঃ

১৯৮৩ সালে এয়ার কানাডার দুর্ঘটনার পর আগুন নিয়ন্ত্রনের জন্য যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল, তা সফলতার মুখ দেখতে পায় না। ১৯৮৮ সালেও কার্গোতে আগুন লাগার পর এনটিএসবি সতর্ক করে দেয়, কেউ তখন কর্ণপাত করেনি। সকলের টনক নড়ে যখন ১৯৯৬ সালে ভ্যালুজেট ফ্লাইট ৫৯২ ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়।

বিমান দুর্ঘটনা নিয়ন আলোয় neon aloy

দুর্ঘটনাস্থলে উদ্ধারকারী দল

ডিসি-৯ এ আগুন লাগার কারণ ছিলো রাসায়নিক অক্সিজেন জেনারেটর। এই জেনারেটরগুলো বিমানে অবৈধভাবে বহন করছিল বিমানটির মেইনটেন্যান্স ঠিকাদার কোম্পানি স্যাবারটেক। বিমানটি ধাক্কা খেলে তাপ সৃষ্টি হয় এবং তা থেকে একটি জেনারেটরে আগুন ধরে যায়। পাইলট আগুনে পোড়া বিমানটি সময়মত অবতরণ করতে পারেনি, যার ফলে বিমানের ১১০ জন যাত্রী মারা যায়। এফএএ ধোঁয়া সনাক্তকারী যন্ত্র এবং স্বয়ংক্রিয় অগ্নি-নির্বাপক যন্ত্র বহনের জন্য জোরারোপ করে এবং সে সাথে বিপজ্জনক কার্গো বহনের ব্যাপারে কড়াকড়ি জারি করে।

৮। বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গের প্রতিরোধঃ

একটি বিমান কোন দৃশ্যমান কারণ ছাড়াই হঠাৎ মাঝ আকাশে ধ্বংস হয়ে গেলে ব্যাপারটা কত ভয়ানক – তা আপনারা যে কেউ বুঝতে পারছেন। ঠিক এমনটি ঘটেছিল জুলাই ১৭, ১৯৯৬ সালে টিডব্লিউএ ৮০০ বিমানটির সাথে। বোয়িং ৭৪৭ জেএফকে বিমানবন্দর থেকে প্যারিস যাওয়ার পথে এই ঘটনার শিকার হয় যা কেড়ে নেয় ২৩০ জন মানুষের প্রাণ।

বিমান দুর্ঘটনা নিয়ন আলোয় neon aloy

তদন্তকারীরা বিধ্বস্ত বিমানের ভেঙে পড়া অসংখ্য টুকরো জোড়া লাগিয়ে দুর্ঘটনার কারণ জানার চেষ্টা করেছেন

এনটিএসবি বিমানটির প্রতিটি ভেঙে পড়া অংশ বিশাল একটি লেগোসেটের মত জোড়া লাগিয়ে তদন্ত করে বুঝতে পারে এটি কোনো সন্ত্রাসী হামলা বা মিসাইল আক্রমন নয়। তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে বিমানের বৈদ্যুতিক তারে সার্কিটের কারণে জ্বালানির গজ সেন্সরে আগুন ধরে যায়, এবং এ আগুন থেকে বিমানের পাখার মধ্যবর্তী ফুয়েল ট্যাংকে বিস্ফোরণ ঘটে।

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এফএএ ত্রুটিযুক্ত তার ব্যবহার থেকে বিরত থাকার জন্য নির্দেশ দেয়। বোয়িং জ্বালানির দাহ্যতা হ্রাস করার প্রযুক্তি উন্নত করে যা জ্বালানির ট্যাঙ্ক এ নাইট্রোজেন গ্যাস প্রবেশ করিয়ে আগুন ধরার প্রবণতা কমিয়ে আনে।

 

৯। রিয়েল-টাইম ট্র্যাকার জিপিএস ব্যবহারঃ

মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্স ৩৭০ এর উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনা পুরো বিশ্বকে অবাক করে দেয়। এটি এখনো এখনো সবার কাছে একটি রহস্য এবং বিমান দুর্ঘটনার ইতিহাসে সবচেয়ে রহস্যময় দুর্ঘটনা। ২৩৯ মানুষ নিয়ে বিমানটি ৮ মার্চ ২০১৪ সালে রহস্যজনকভাবে হারিয়ে যায়। সকলের প্রশ্ন ছিলো, বিমানটির ট্রান্সপন্ডার হঠাৎ করে কেন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল যা তাদের অদৃশ্য করে ফেলে এবং দক্ষিণ দিকে একদম ভিন্ন পথে যাওয়া শুরু করে। কারো মতে এটি অটোপাইলটে ৭ ঘন্টা উড়েছিল এবং জ্বালানি শেষ হওয়ার পর ভারত মহাসাগরে পতিত হয়। একটা বিষয়ে লক্ষণীয় যে, যদি বিমানটিতে রিয়েল-টাইম ট্র্যাকার (Real-time Tracker) জিপিএস যন্ত্রটি থাকতো, তাহলে হয়তো আর এত অনুসন্ধান করতে হতো না।

বিমান দুর্ঘটনা নিয়ন আলোয় neon aloy

মালয়েশিয়ান এয়ারওয়েজের বিমানবহর

এই দুর্ঘটনার পর সব বিমানে রিয়েল-টাইম ট্র্যাকার ব্যবহারের জন্য জোর প্রদান করা হয়। উপরন্তু, বিমানে এমন ব্লাক বক্স ব্যবহার করা হয় এখন যা পানিতে ভাসতে পারে।

১০। বিমানের স্বয়ংক্রিয়তা কমিয়ে পাইলটের হাতে চালানোর সুবিধা প্রদানঃ

২০০৯ সালে ঘটে যায় আরো একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। এয়ার ফ্রান্স ফ্লাইট ৪৪৭, একটি এয়ারবাস এ৩৩০-২০০ বিমান রিও থেকে প্যারিস যাওয়ার পথে একটি বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল। বজ্রপাত এড়াতে বিমানটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৬,০০০ ফুট উপর দিয়ে যাচ্ছিল এবং বায়ুর গতি পরিবর্তনের কারণে বিমানটি হঠাৎ থেমে যায় এবং একসময় নিচে পড়ে আটলান্টিক সাগরে ডুবে যায় ২২৮ জন যাত্রীসহ।

বিমানের ব্ল্যাক বক্স থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তদন্তের পর জানা যায় যে বিমানের গতিনির্দেশক পিটট টিউবটি ঠান্ডায় জমে গিয়েছিল এবং বিমানের কম্পিউটারে ভুল তথ্য পাঠাচ্ছিল। এ কারণে বিমান যখন থেমে যায় মাঝ আকাশে, তখন পাইলট প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হন।

বিমান দুর্ঘটনা নিয়ন আলোয় neon aloy

বিধ্বস্ত এয়ারবাসের একাংশ

আধুনিক যুগে বিমান চালনার সময় পাইলটকে অনেক বেশি যন্ত্রের উপর নির্ভরশীল থাকতে হয় অটোপাইলট মোডে। এর ফলে দুর্ঘটনার সময় অনেকক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয় না। অনেক সময় মেশিন ভুল করতে পারে। সে ক্ষেত্রে পাইলট নিজ হাতে ম্যানুয়ালি বিমান না চালালে বড় ধরণের ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। বোয়িং বিমানে এই স্বাধীনতা দেওয়া হয় পাইলটদের। এয়ার ফ্রান্স এর এই দুর্ঘটনার পর আবারো পাইলটদের স্বাধীনভাবে বিমান চালানোর সুযোগ রাখা হয়।

তবে তারপরেও কিছু না কিছু ঝুঁকি থেকেই যায়। এই যেমন ধরা যাক ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ফ্লাইট বিএস ২১১ এর কথাই। দুর্ভাগা এই ফ্লাইটটি পরিচালিত হচ্ছিল সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিয়েই। বিমানটি চালাচ্ছিলেন অভিজ্ঞ পাইলট ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতান। অভিজ্ঞ পাইলট আবিদ সুলতানের ছিল ৫,০০০ ঘন্টারও বেশি বিমান চালনার রেকর্ড, শুধুমাত্র ঢাকা-কাঠমান্ডু রুটেই ৭০০ ঘনতার বেশি বিমান চালনা এবং ত্রিভুবন বিমানবন্দরে শতাধিক সফল ল্যান্ডিং-এর রেকর্ড। কিন্তু তারপরেও সকল রেকর্ডকে তুচ্ছ করে দুর্ঘটনার মুখে পড়ে বিমানটি, যেখানে এই তালিকার ৫ম উদাহরণের বোয়িং ৭৩৭ বিমানটি মাটি থেকে ২৪,০০০ ফুট উঁচুতে ছিন্নভিন্ন হয়েও মাত্র একজন যাত্রীর প্রাণের বিনিময়ে সফলভাবে ল্যান্ডিং করতে সমর্থ হয়!

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি অত্যাধুনিক বোয়িং ৭৩৭-৮০০

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি অত্যাধুনিক বোয়িং ৭৩৭-৮০০

তবে, সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, অন্যান্য সকল প্রযুক্তির মতই বিমানের প্রযুক্তিও প্রতিদিন উন্নত থেকে উন্নততর করা হচ্ছে যাত্রীদের সুরক্ষার কথা সর্বাগ্রে রেখে। যার প্রমাণ, সকল ধরণের যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যে আকাশপথে যাত্রী চলাচলেই দুর্ঘটনা এবং হতাহতের হার সবচেয়ে কম। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির চালানো এক গবেষণায় এই পরিসংখ্যানের একটি বাস্তব চিত্র ফুটে উঠে। ২০০০-২০০৯ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন পরিবহন মাধ্যমে (গাড়ি, মোটরসাইকেল, বাস, ট্রেন, নৌপথ, বিমান) চলাচল করা সকল যাত্রীর অতিক্রান্ত দূরত্ব বনাম নিহতের সংখ্যা একটি গ্রাফে প্লট করলে দেখা যায় প্রতি এক বিলিয়ন প্যাসেঞ্জার মাইলে যেখানে ২১২ জন মোটরসাইকেল আরোহীর মৃত্যু হচ্ছে, সেখানে বিমানযাত্রীর ক্ষেত্রে সংখ্যাটা ০.০৭। যার মানে, আপনি রাইড শেয়ারিং অ্যাপে
বাইক রাইড নিলে আপনার দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার সম্ভাবনা গাণিতিকভাবে বিমান দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার চাইতে ৩০৩৬ গুণ বেশি!

বিমান দুর্ঘটনা নিয়ন আলোয় neon aloy

এক বিলিয়ন প্যাসেঞ্জার-মাইলে বিভিন্ন পরিবহন মাধ্যমে যাত্রীমৃত্যুর হার

আর বিমান চলাচলকে নিরাপদ করা সম্ভব হয়েছে নিরলসভাবে এর প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, এবং অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার মাধ্যমে। তাই আমাদের প্রত্যাশা থাকবে কিছুদিন আগেই ঘটে যাওয়া ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান দুর্ঘটনার সঠিক তদন্ত হবে সকল পরিস্থিতি এবং তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে। এবং সেই তদন্তের ভিত্তিতেই দেশ এবং বিদেশের সকল সরকারী এবং বেসরকারী বিমান প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবস্থা নিবে যাত্রীদের নিরাপত্তা আরো সুনিশ্চিত করতে।

তথ্যসূত্রঃ
১। পপুলার মেকানিকস
২। সিটি এএম
৩। কালের কন্ঠ

Most Popular

To Top