টুকিটাকি

বিয়ের জন্য পাত্রী পাবে না ভারত ও চীনের ৭ কোটি পুরুষ!

বিয়ের জন্য পাত্রী পাবে না ভারত ও চীনের ৭ কোটি পুরুষ!/NeonAloy

মানুষ সামাজিক জীব। একা একা মানুষের পক্ষে কখনোই বেঁচে থাকা সম্ভব না। একা একা তো আর সমাজ গঠন করা যায় না। তার জন্য মানুষ লাগে। আর তখনোই বিয়ের প্রয়োজনীয়তা চলে আসে। বিয়ের জন্য অবশ্যই একটা ছেলে আর একটা মেয়ে লাগবে। আর বিয়ের পরেই একটা নতুন পরিবার সেই সাথে একটা সমাজের সূচনা। শুধুই কি সমাজের প্রয়োজনে মানুষ বিয়ে করে? মোটেও নয়। প্রয়োজনের পাশাপাশি মানুষ বিয়ে করে কারো সঙ্গ পাওয়ার জন্য, কারো উপর নির্ভর করার জন্য, দায়িত্ব নেওয়া শিখতে। শুধু বিয়ে করতে চাইলেই হয় না, বরং পারস্পরিক সমঝোতাও হওয়া লাগে।

সৃষ্টির শুরু থেকেই বিয়ের ব্যাপারটা চলে এসেছে। বলা হয়ে থাকে যে প্রত্যেকটি পুরুষের জন্য নির্দিষ্ট একজন নারী আছে। আর এভাবেই নারী পুরুষের সমতা বজায় রয়েছে। পৃথিবী পুরোটাই চলছে সমতার উপর ভিত্তি করে। অর্থাৎ সকল প্রাণীর মাঝেই সমতা বজায় রয়েছে। এর মধ্যে যদি কখনো কোন ধরনের অসমতা চলে আসে তখনই সকল ধরনের ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে শুরু করে। ঠিক তেমনই পৃথিবীতে নারী পুরুষের সমতা বজায় রয়েছে। কিন্তু সম্প্রীতি কিছু দেশে এই বিষয়ে অসামঞ্জ্যসতা চলে এসেছে। এর জন্য মূলত আমরাই দায়ী আর সেই সাথে আমাদের সামাজিক ব্যবস্থাও।

নারী পুরুষের এই অসমতা সমস্যার শুরুর দিকেই রয়েছে চীন ও ইন্ডিয়া। তথ্য-প্রযুক্তি ও সামরিক দিক দিয়ে উন্নত এই দুটি দেশে এই সমস্যা এখন প্রকট আকার ধারন করেছে। যদিও খালি চোখে আমাদের তেমন কিছু ধরা না পরলেও বর্তমানে এই সমস্যা প্রকট। এশিয়া মহাদেশের দেশ গুলোতে সর্বদাই পুরুষের সংখ্যা নারীদের চেয়ে বেশি ছিল কিন্তু অন্য দিক দিয়ে এটি সমতা বজায় রেখেছিল। এশীয় দেশগুলোর একটি প্রাচীন ধারনা হলো ছেলেরাই সৌভাগ্য বয়ে নিয়ে আনবে ও বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মা কে দেখে রাখতে পারবে। এছাড়াও ছেলেরা নিরাপত্তা দিতে পারবে এবং তাদের উপর নির্ভর করা যাবে। এই ধারনার উপর ভিত্তি করেই বেশিরভাগ দম্পত্তি তাদের সন্তান হিসেবে ছেলে চান। অনেকে মেয়ে সন্তান বুঝতে পেরে আবার গর্ভপাতও ঘটান। যার কারণে একটি বিশাল জনগোষ্ঠী এখন ছেলে-মেয়ের অসমতায় ভুগছে।

বর্তমানে পৃথিবীতে একটি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে চীন। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি সামরিক ও তথ্য-প্রযুক্তির দিক থেকেও চীনকে এখন পেছনে ফেলে চলা মুশকিল। কিন্তু উন্নত এই দেশের একটি প্রকট সমস্যা হল মেয়ে সমস্যা। ছেলেদের বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে কিন্তু বিয়ে করার জন্য মেয়ে খুঁজে পাচ্ছে না। চীনের জনসংখ্যা ১.৪ বিলিয়ন যেখানে মোট মেয়ে জনসংখ্যার চেয়ে ৩৪ মিলিয়ন বেশি ছেলে রয়েছে। চীনে এই সমস্যার কারণ হিসেবে one child policy কে দায়ী করা হয়।

বিয়ের জন্য পাত্রী পাবে না ভারত ও চীনের ৭ কোটি পুরুষ!/NeonAloy

দেশের অগ্রগতীর জন্য গ্রহণ করা এই এক সন্তান নীতি এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে

 

১৯৭৯ সালে চীনে বেশ কিছু নিয়ম নীতির সংস্কার করা হয়। তারমাঝে এটিও ছিল। এই পলিসিতে বলা হয়েছিল যে যেকোন দম্পত্তির একটার বেশি সন্তান থাকা যাবে না। যদি কেউ একের অধিক সন্তান নেয় তবে তাকে জরিমানা সহ নানা ধরনের শাস্তি দেওয়া হবে। পলিসি করা হয়েছিল চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য। ২০১৫ সাল পর্যন্ত এটি চালু ছিল। যেহেতু একটাই সন্তান তাই বেশিরভাগ বাবা-মা ছেলে সন্তান চেয়েছেন। আর অনেকে মেয়ে সন্তান জেনেও গর্ভপাত করেছেন। প্রত্যেকেরই ধারনা ছিল যে ছেলে সন্তান নিরাপত্তা দিবে আর বুড়ো বয়সে তাদের দেখাশোনা করবে।

বর্তমানে চীনে প্রতি ১০০ জন মেয়ের জন্য ছেলের সংখ্যার ১২০ জন। এই অবস্থার কারণে অনেক ছেলেরাই বিয়ের জন্য পাত্রী পাচ্ছে না। অনেকে অপেক্ষায় থাকতে থাকতে বুড়ো হয়ে যাচ্ছে। গবেষণা করে দেখা গেছে এই কারণে অনেক ছেলেই ডিপ্রেশনে ভুগছে।

যেহেতু মেয়েদের সংখ্যা কম তাই মেয়েরাও নিজের কথা ভেবে ভাল ছেলের খোঁজ করছে। অনেক মেয়েরাই গ্রাম ছেড়ে কাজের প্রয়োজনে শহরে চলে আসছে কিংবা একজন ভাল ছেলের খোঁজে। বেশিরভাগ চীনা মেয়েরাই এখন জীবনসঙ্গী হিসেবে এমন কাউকে চায় যে পেশাগত ও ব্যক্তিজীবনে সফল। ফলে অনেক মেয়েই এমন ছেলে চায় যার নিজের একটি বাড়ি আছে ও চাহিদা মেটাতে পারবে। এই কারণে সাধারন চীনা ছেলেরাও খানিকটা বিপর্যস্ত। অনেক চীনা ছেলেরেই নিজের বাড়ী নেই ফলে তাদের প্রতি তেমনভাবে কোন মেয়ে আগ্রহী নয়। আবার অনেকেই কাজ করে টাকা জমিয়ে নিজের বাড়ী করছেন যাতে মেয়েরা বিয়ে করতে আগ্রহী হয়। আবার অনেকে নিজের বাড়ী করলেও বিয়ের জন্য মেয়ে পাচ্ছেন না। আর এই সমস্যার আরেকটি সমাধান হিসেবে তারা বিয়ের জন্য অন্য দেশ থেকে মেয়ে আনছেন।

চীনে এর জন্য বেশ কিছু ওয়েবসাইট আছে যারা অন্য দেশ থেকে বিয়ের জন্য মেয়ে এনে দেয়। যদিও এর জন্য চীনা লোকদের  ভাল পরিমাণ টাকা গুণতে হয়। কিন্তু সবসময় এরকম হয় না। অনেক চীনা লোকরাই বাইরে থেকে নানা লোভ দেখিয়ে মেয়ে আনলেও তাদের শর্তপূরণ করে না বরং উল্টো  তাদের আটকে রেখে নির্যাতন করে। অনেক মেয়েরাই এই কারণে পরবর্তীতে পালিয়ে এসেছে চীন থেকে। অনেক লোকরাই আবার নর্থ কোরিয়া থেকে মেয়ে এনে তাদের দিয়ে পতিতাবৃত্তি করায়। দিনে দিনে এই সমস্যা প্রকট হয়ে উঠেছে। অনেক মায়েরা তাদের অবিবাহিত ছেলে দেখাশোনা করতে হয় বলে বিরক্ত। ধারনা করা হয় ভবিষ্যতে চীনে প্রতি ১০০ জন মেয়ের জন্য ছেলের সংখ্যা থাকবে ১৫০-১৬০ জন।

ইন্ডিয়ায় প্রতি ১০০ জন মেয়ের জন্য ছেলের সংখ্যা ১১১ জন। ইন্ডিয়ায় কোন পলিসি নয় বরং এই সমস্যার কারণ হচ্ছে প্রাচীন প্রথা। এশিয়া মহাদেশে ছেলে সন্তানের প্রতি দুর্বলতা আছে আমরা সেটা আগেই দেখেছি। ইন্ডিয়াতে এটা প্রকট। প্রায় সব রাজ্যই মেয়ের চেয়ে ছেলের সংখ্যা বেশি। এর আরেকটু কারণ হল ছেলেদের দেরিতে বিয়ে করা।

ইন্ডিয়াতে বেশিরভাগ মেয়েরাই বিয়ের জন্য সফল মানুষ খুঁজে। মেয়েদের বিয়ের আদর্শ বয়স ১৫-৩০ ধরা হয়। কিন্তু একটা ছেলের নিজের পায়ে ঠিকমত দাড়াতেই ৩৫ বয়স হয়ে যায়। বিয়ের সময় দেখা যায় বয়স বেশি থাকে ছেলের আর মেয়ের কম। এই কারণে তাদের fertility rate কমে যায়। যার কারণে ছেলে সন্তানের আকাঙ্খায় থাকলে ছেলে হলেও আস্তে আস্তে মেয়েদের সংখ্যা কমে যায়। মেয়ে কমে যাওয়ার কারণে নানা ধরনের অপরাধের সংখ্যাও বেড়ে গিয়েছে।

বিভিন্ন ভারতীয় সিনেমায় দেখা যায় যে নায়ক নানা ভাবে নায়িকাকে উত্যক্ত করেও পরবর্তীতে তাদের মাঝে প্রেম হয়। এই ধারনা থেকেই ইন্ডিয়ার বেশিরভাগ ছেলেরা মেয়েদের পথে ঘাটে উত্যক্ত করে। যেহেতু মেয়েদের সংখ্যা কম তাই তাই দেখা যায় এই ঘটনার পরিমাণ অনেক বেশি। যার কারণে মেয়েরা বাড়ির বাইরে বের হতে চায় না। অনেক বাবা-মা এই উত্যক্তের ভয়ে মেয়ে সন্তান বুঝতে পেরে গর্ভপাত ঘটায় যাতে পরবর্তীতে কোন ধরনের সমস্যা না হয়। আবার অনেকে মেয়েদের নির্যাতন করে। ইন্ডিয়াতে পরিবার একটি বিরাট ভূমিকা পালন করে। যাদের পরিবার থাকে না কিংবা ব্যাচেলার তাদের সামাজিক মর্যাদা খুবই কম। এমনকি তাদের মতামতের তেমন কোন মূল্যও দেওয়া হয় না। প্রত্যেকই চায় যে কাজ শেষে বাড়ি ফিরে এসে কেউ তাকে খাবার বেড়ে দিক, কিংবা তার খেয়াল রাখুক। মেয়ের ঘাটতির কারণে তা আর হচ্ছে না।

দিনে দিনে এই সমস্যা এতটাই প্রকট আকার ধারণ করেছে যে সরকার বাধ্য হয়ে এর জন্য নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে, যেন এই সমস্যা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ার আগেই  আমরা আমাদের দেশে আটকাতে পারি।

 

আরো পড়ুনঃ দক্ষিণ এশিয়ায়  চীনের নতুন কৌশল 

Most Popular

To Top