ইতিহাস

পতাকার রঙে নয়, চীনের রাজপথ লাল হয়েছিল হাজারো ছাত্রজনতার রক্তে

পতাকার রঙে নয়, চীনের রাজপথ লাল হয়েছিল হাজারো ছাত্রজনতার রক্তে/ NeonAloy

১৯৭১ সালের পর থেকে দেশে কম আন্দোলন হয়নি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল এরশাদের সামরিক শাসন পতনের আন্দোলন। ১৯৮১ সালে মেজর জিয়া হত্যাকান্ডের পরে বিচারপতি আব্দুস সাত্তার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করলেন। কিন্তু ১৯৮২ সালে এরশাদ সামরিক শাসন জারি করে এবং ৯ বছর শাসন করে। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর এরশাদের সামরিক শাসনের অবসান হয়। এই আন্দোলনে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদেরও একটা বিরাট ভূমিকা ছিল। আন্দোলন সফল হয়েছিল ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে।

কিছুদিন আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখলাম ১৫ এপ্রিল তিয়েনআনমেন স্কয়ার আন্দোলন হয়। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম যে বাংলাদেশের মতো ঠিক একই ধরনের আন্দোলন চীনেও ঘটেছিল। যা সকলের কাছে তিয়েনআনমেন স্কয়ার হত্যাকান্ড নামে পরিচিত। আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৮৯ সালের এপ্রিল মাসের ১৫ তারিখ ও শেষ হয়েছিল জুন মাসের ৪ তারিখ। দীর্ঘ দেড় মাস ধরে চলা এই আন্দোলনে মৃতের সংখ্যা ধারনা করা হয় ১৮০ থেকে ১০,৪৫৪ জন।

পতাকার রঙে নয়, চীনের রাজপথ লাল হয়েছিল হাজারো ছাত্রজনতার রক্তে/ NeonAloy

তিয়েনআনমেন স্কয়ার

আজকে পৃথিবীর বুকে মানবসম্পদের যে চীন আমরা দেখি তা কিন্তু সবসময় এক ছিল না। আর্থ-সামাজিক উন্নত আজকের এই চীন এমন ছিল না। বরং এর চিত্র ছিল ভিন্ন। চীনকে উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৮০ সালে এর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় নানা ধরনের সংস্কার করা হয়। কিন্তু আদতেও তা পুরোপুরি জনগনের পক্ষে ছিল না। এই সংস্কারের ফলে কিছু লোক মাত্র এর সুবিধা পাচ্ছিলো। একপক্ষীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার বৈধতা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক নেতা ও চীনের শিক্ষার্থীদের প্রিয় ব্যক্তিত্ব হু ইয়োয়াংয়ের(Hu Yaobang) মৃত্যু ১৯৮৯ সালের এপ্রিল মাসে, জনসাধারনকে নতুন গণতান্ত্রিক চীনের জন্য বেইজিংয়ের তিয়েনানমেন স্কোয়ারে একত্রিত হতে অনুপ্রাণিত করেছিল। এ সময়ে সাধারণ অভিযোগ গুলো ছিল মুদ্রাস্ফীতি, নতুন অর্থনীতির জন্য স্নাতকদের সীমিত প্রস্তুতি এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের উপর বিধিনিষেধ। ছাত্ররা গণতন্ত্র, অধিকতর জবাবদিহিতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার বেশি সুযোগ দিতে আহবান জানায়।

আন্দোলনের জন্য ছাত্রছাত্রীরা রাজধানী বেইজিং এর তিয়েনআনমেন স্কয়ার বেছে নেয়। ধীরে ধীরে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং প্রায় এক মিলিয়নের মতো মানুষ বিক্ষোভে যোগ দেয়। বিক্ষোভ দমনের জন্য চীনা সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কিন্তু কোনটাই কার্যকরী হয়নি। বরং এতে সরকারে মধ্যকার ব্যর্থতা প্রকাশ পায়। মে মাসের মধ্যে এক ছাত্র হাংগার স্ট্রাইক শুরু করে এর প্রতিবাদে এবং এর সমর্থন জোরদার হয়। আশে পাশের ৪০০টি শহর এই বিক্ষোভে যোগদান করে। এরপরেই চীনের কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষস্থানীয় নেতারা নড়ে চড়ে বসেন। ধারনা করেন যে এই বিক্ষোভ কোন সাধারন ছাত্রছাত্রীর বিক্ষোভ নয় বরং একে রাজনৈতিক হুমকি মনে করেন। এর ফলে কমিউনিস্ট পার্টি ২০ মে দেশে সামরিক শাসন জারি করে ও বেইজিং এ ৩০০,০০০ সেনা মোতায়েন করে এবং বিক্ষোভকারীদের উপর হামলা করার আদেশও দেয়।

পতাকার রঙে নয়, চীনের রাজপথ লাল হয়েছিল হাজারো ছাত্রজনতার রক্তে/ NeonAloy

পুলিশ আর আন্দোলনকারীদের মুখোমুখি অবস্থান

এই ঘটনার ফলে পশ্চিমা বিশ্বের নিন্দার ঝড় বয়ে যায়। পশ্চিমা দেশগুলো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অস্ত্র নিষিদ্ধ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে চীন একে বিপ্লবী দাঙ্গা হিসেবে নিন্দা করে, এবং অন্যান্য দেশের সমালোচনা করে একে সমর্থন করার জন্য। এরপরেই বিক্ষোভে সমর্থনকারীদের ব্যাপক হারে গ্রেফতার করা হয়, পাশাপাশি বিদেশী সংবাদকারীদের বহিষ্কার করা হয়। এর সাথে সাথে অভ্যন্তরীণ সংবাদপত্রে ঘটনা গুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত করা হয়।

বিক্ষোভকারীদের আন্দোলন ঠেকাতে ১০০০ পুলিশের একটি দল গোল হয়ে ৩০০ জন ছাত্র ঘিরে রাখে যারা এই আন্দোলনের সামনে ছিলেন। ছাত্ররা পুলিশের মাঝে আটকা পড়ে গিয়েছিল। কিছু ছাত্র পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে বের হওয়ার চেষ্টা করে, বাকিরা পাথর ও বোতল ছুড়ে মারে। যদিও শুরুতে তাদের উপর হামলা করার নির্দেশ না থাকলেও পরবর্তীতে তা পরির্তন হয়ে যায়। পুলিশ নিজে থেকেই ছাত্রদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাস পাঠায় কিন্তু কিছু ছাত্র-ছাত্রী সেখানেই থাকতে চায়। তাদের বিরোধিতার কারণে পুলিশ তাদের উপর লাঠি চার্জ করে। লাঠি চার্জের অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর অবস্থা অর্ধমৃত হয়ে পরে আর সে অবস্থায় তাদের গ্রেফতার করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ঘটনার পরেই আন্দোলন তীব্র অবস্থা ধারন করে।

এত কিছুর পরেও ছাত্রছাত্রীরা কিন্তু পুলিশ কিংবা নিরাপত্তা বাহিনীর উপর ক্ষেপে যায়নি। বরং আন্দোলনের সময় হাতে হাত মিলিয়ে ছিল। এমনকি তাদের খাবার ও একসাথে ভাগাভাগি করে খেয়েছে। শুনতে অবাক করার মতো হলেও এটাই হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই যে যেসকল পুলিশ কিংবা নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে বিক্ষোভকারীরা খাবার ভাগ করে খেয়েছিল তাদের উপরেই পরদিন হামলা করতে হয়েছিল উপর থেকে নির্দেশ আসার কারণে।

এই আন্দোলনের আরেকটি চরিত্র হল ট্যাংক ম্যান(Tank Man)। কোটা আন্দোলনের সময় একটা ছবি খুব ভাইরাল হয়েছিল। পুরো একটি পুলিশ বাহিনীর সামনে একা একজন দাঁড়িয়ে। তিয়েনআনমেন  স্কয়ারে এরকম একজন ছিল। বিক্ষোভকারীদের উপর হামলার উদ্দেশ্য ট্যাংক পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু একজন বিক্ষোভকারী একাই ওই ট্যাংক গুলোর সামনে দাড়িয়েছিল। বারবার সামনে থেকে জায়গা বদল করছিলো যাতে ট্যাংক গুলো সামনে আগাতে না পারে। কিন্তু তাও ট্যাংক গুলোর সামনে আগানো বন্ধ হয়নি। পরে তিনি ট্যাংক গুলোর সামনে একাই দাঁড়িয়ে যান। যেন যেতে হলে তার উপর দিয়েই যেতে হবে।

পতাকার রঙে নয়, চীনের রাজপথ লাল হয়েছিল হাজারো ছাত্রজনতার রক্তে/ NeonAloy

আন্দোলন দমনে নামানো হয় ট্যাংক

শুধু বেইজিং নয় বরং এর বাইরের শহর গুলোতেও সমান তালে আন্দোলন চলেছে। বেইজিং এর বাইরে ৪০টি শহরে একই সাথে আন্দোলন চলেছে। হংকংয়ের জনগণ আবার বেইজিংয়ের বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষনা করে কালো পোষাক পরা শুরু করেন। সাংহাইতে শ্রমিকরা রাস্তা আটকে আন্দোলন করেছিলেন। রেলপথেও অবরোধ করা হয়। পাবলিক পরিবহন গুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। অনেক স্থানের রেল লাইনের ব্রিজ গুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় ও শ্রমিকদের ফ্যাক্টরিতে ঢুকতে বাঁধা দিয়ে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

পুলিশের অথ্য অনুযায়ী মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, কর্মকর্তা, কর্মী, ক্ষুদ্র বেসরকারি উদ্যোগের কর্মচারী, অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক, উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সহ অনেকে। ৯ বছরের এক শিশুও এর মাঝে অন্তর্ভুক্ত।  অফিশিয়ালি চীনা সরকার মৃতের সংখ্যা ৩০০ ঘোষনা করেছিল। যার মধ্যে ২৩ জন শিক্ষার্থী। পুলিশ আহতের সংখ্যা ৫০০০ এবং সাধারনের সংখ্যা ২০০০ জন। মার্কিন সরকার ২০১৪ সালে এ বিষয়ে তথ্য প্রকাশ করেছে, সেখানে আনুমানিক ১০,৪৫৪ জন নিহত হয়েছে এবং ৪০ হাজার আহত হবার কথা বলা হয়েছে।

এই ঘটনার পর চীনের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পরে। তিয়েনআনমেন স্কোয়ারের বিক্ষোভের প্রভাবে চীনের অর্থনৈতিক দিক পরিবর্তিত হয়েছে। এই ঘটনা গুলো চীনা সরকারের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে, বিশেষ করে অর্থনীতির দিক থেকে তিয়েনআনমেন গণহত্যার পর অবিলম্বে একটি মন্দা দেখা দিলেও ১৯৯০ এর দশকে অর্থনীতি দ্রুত গতিতে ফিরে আসে। এ ঘটনা চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে একটি পুনর্গঠন সৃষ্টি করেছিল।

আরো পড়ুনঃ ইতিহাসের অদ্ভুত সব যুদ্ধ

Most Popular

To Top