ইতিহাস

ভারতীয় উপমহাদেশের যত আবিষ্কার!

ভারতীয় উপমহাদেশের যত আবিষ্কার!/ NeonAloy

ভারত পুরো বিশ্বে তার বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির জন্য বেশ আলোচিত এবং আগ্রহের স্থান। অনেকে ভেবে থাকতে পারেন ব্রিটিশরা না আসলে হয়তো আমরা “সভ্য” হতে পারতাম না। কিন্তু আপনারা কি জানেন আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহার্য অনেক বস্তু সামগ্রী আছে যা এই ভারত এবং ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে আবিষ্কৃত এবং সেগুলো সারা বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। আপনার শার্টের বোতাম, শাওয়ারের শ্যাম্পু, দাবা খেলা এগুলো সব ভারতের আবিষ্কার।

চলুন দেখে আসি এই উপমহাদেশের এমন কিছু  আবিষ্কার যা সারাবিশ্বে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছে।

১। শূন্য

মানুষ অনেক আদিকাল থেকে চিন্তা করতো এমন একটি চিহ্নের প্রয়োজন যা “ফাঁকা যায়গা”, “কোনো কিছু নেই” নির্দেশ করবে। সেই চিন্তার অবসান ঘটান খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতকে ভারতের গণিতবিদ আর্যভট্ট। তিনি তার “মহাসিদ্ধান্ত” গ্রন্থে শূন্য সম্পর্কে বলেছেন, এমন একটি সংখ্যা যার সাথে কোনো কিছু যোগ করলে তা পরিবর্তিত থাকে এবং গুন করলে তা শূন্য হবে। ভারতের গোয়ালিয়র মন্দিরে এই প্রাচীন শূন্য অঙ্কন করা আছে। তাছাড়া ভারতীয় গণিতবিদরা দুই ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতি ব্যবহার করতো যা বর্তমান মোর্স কোডের মতো। আপনারা যদি গণিতের ভক্ত না হয়ে থাকেন, তবে জেনে নিন যে এই দুই ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতিই হচ্ছে কম্পিউটারের ভিত্তি। শূন্য ছাড়া তাই কম্পিউটারও কল্পনা করা যায়না! শূন্য আবিষ্কার নিঃসন্দেহে এক বিরাট আবিষ্কার পুরো বিশ্বের জন্য।

২। রুলার বা স্কেল

স্কুল কলেজে আমরা কত না রুলার ভেঙে ফেলেছি। এমনকি শিক্ষকরাও আমাদের পিঠে কত রুলার ভেঙেছেন তার হিসেব নেই। রুলার আমাদের একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন মাপজোকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ তে প্রাচীন ইন্দাস ভেলীর সভ্যতা মহেঞ্জোদারোও এই রুলার আবিষ্কৃত হয়। গজদন্তের নির্মিত এই রুলারগুলো প্রত্নতাত্ত্বিক খননের সময় পাকিস্তানে আবিষ্কৃত হয়। এই রুলার গুলোর কল্যাণে ভারতের নিখুঁত মাপের স্থাপত্যশৈলী গুলো তৈরিতে অপরিসীম ভুমিকা পালন করেছিল।

ভারতীয় উপমহাদেশের যত আবিষ্কার!/ NeonAloy

 

 

৩। দাবা ও সাপ-লুডু

আমাদের অনেকের পছন্দের একটি খেলা হচ্ছে দাবা এবং সাপ-লুডু। দাবার আবিষ্কারও হয়েছিল ভারতে গুপ্ত সাম্রাজ্যের যুগে ৬০০ খ্রিস্টাব্দে, যার নাম ছিলো চতুরঙ্গ। দাবার মতোই এই খেলার ছিলো বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন গুটি এবং একটি রাজা গুটি যার মাধ্যমেই এই খেলার হার-জিত নির্ধারণ করা হতো। আরো একটি জনপ্রিয় বোর্ড খেলা সাপ-লুডুও ভারতীয় আবিষ্কার যা মোক্ষপট নামে পরিচিত ছিলো। ১৩০০ খিস্টাব্দের দিকে কবি এবং সন্ন্যাসী জ্ঞানদেব এই খেলার প্রচলন ঘটান। খেলার সাপ ছিলো অপূন্য আর মই ছিলো পূন্যের প্রতীক। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সময় এই খেলা ব্রিটেন এবং আমেরিকাতে প্রচলন ঘটে ভারত থেকে।

 

ভারতীয় উপমহাদেশের যত আবিষ্কার!/ NeonAloy

 

 

৪। প্লাস্টিক সার্জারি

কি অবাক হলেন এবার? ভাবছেন, প্লাস্টিক সার্জারি তাও আবার প্রাচীন ভারতে! খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ তে ভারতীয় চিকিৎসক সুশ্রুত চিকিৎসাশাস্ত্রের উপর বই লেখেন যেখানে নাকের প্লাস্টিক সার্জারি কীভাবে করা যায় তার পদ্ধতি বর্ণনা করা আছে। কপালের থেকে চামড়া নিয়ে নাকের আঁকার প্রদান করার পদ্ধতি এখনো ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ভারতে সুশ্রুতকে সার্জারির জনক হিসেবে গন্য করা হয়। তার বইয়ে ভেষজ গাছপালা দিয়ে চিকিৎসা পদ্ধতি বর্ণনা করা আছে যা চিকিৎসাশাস্ত্রের জন্য দিক-নির্দেশক হিসেবে কাজ করেছে।

৫। চোখের ছানির সার্জারি

সুশ্রুত শুধুমাত্র প্লাস্টিক সার্জারির উদ্ভাবক ছিলেন না, চোখের ছানিরও প্রথম উদ্ভাবক ছিলেন। তিনি বাঁকানো সুঁই ব্যবহার করে আক্রান্ত চোখের লেন্স সরিয়ে নিতে পারতেন। তার এই চিকিৎসা পদ্ধতি ভারতের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে এবং তার কাছে দীক্ষা নিতে আসে। সুশ্রুত কখনো কাউকে শিখানো জন্য নিরাশ করেননি এবং এভাবেই ভারতীয় চিকিৎসাশাস্ত্র বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সুশ্রুতের আয়ুর্বেদিক শিক্ষার গুরু ছিলেন ধন্বন্তরী।

৬। তারবিহীন/ওয়্যারলেস যোগাযোগ

তারবিহীন/ওয়্যারলেস যোগাযোগের কথা বললেই আমরা রেডিও এর কথা বলে থাকি । রেডিও এর আবিষ্কারক হিসেবে আমরা মার্কোনীকে চিনে থাকি যে পরবর্তীতে ১৯০৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পান। কিন্তু মজার বিষয় হলো ভারতীয় উপমহাদেশের পদার্থবিদ স্যার জগদীশ চন্দ্রবসু ১৮৯৫ সালে জনসম্মুখে তার রেডিও আবিষ্কার উপস্থাপন করেন। তাঁর আদি বাড়ি বাংলাদেশে। তিনি তড়িৎ চৌম্বক তরঙ্গ ব্যবহার করে কলকাতার টাউন হল থেকে ৭৫ ফুট দূরে দেয়াল ভেদ করে ঘন্টা বাজাতে এবং গান পাউডার জ্বলাতে সক্ষম হন। মার্কোনী স্যার জগদীশের এই আবিষ্কারকে ব্যবহার করে তার পরীক্ষামূলক রেডিওটি তৈরি করেছিলেন। স্যার জগদীশ কখনো তার আবিষ্কার পেটেন্ট করেননি তাই আবিষ্কারক হিসেবে মার্কোনীর নামই উচ্চারিত হয়ে থাকে সবসময়।

৭। ইউএসবি (USB)

ইউএসবি এখন কে না চিনে! আমাদের কম্পিউটার সহ আরো শত শত যন্ত্র আছে যেখানে এখন ইউএসবি বা ইউনিভার্সাল সিরিয়াল বাস ব্যবহার করা হয়। ভারতীয় আমেরিকান অজয় ভট্ট ইউএসবি এর আবিষ্কারক। তিনি ইন্টেল এর একজন ইঞ্জিনিয়ার, ১৯৯০ এর দশকে সকলের জন্য ব্যবহার্য পোর্টের ধারণা নিয়ে আসেন যার ফলাফল ছিল এই ইউএসবি ডিভাইস। এটি ১০ বিলিয়নের বেশি যন্ত্রাংশে ব্যবহার করা হচ্ছে বর্তমানে! তিনি কখনো এই আবিষ্কারের জন্য কোনো অর্থ অথবা সম্মাননা চাননি, তিনি সবসময় তার দলকে কৃতিত্ব দিয়ে এসেছেন।

৮। যোগব্যায়াম

ইতিবাচক চেতনা বিকাশে যোগব্যায়াম অনন্য ভূমিকা পালন করে থাকে। সারাবিশ্ব ব্যাপী যোগব্যায়াম এখন সমাদৃত এবং এই যোগব্যায়ামের উৎপত্তিও ভারতে। উত্তর ভারতের মানুষ প্রায় ৫০০০ বছর ধরে এই যোগব্যায়াম করে আসছে এবং এই যোগের আদি গুরু হলো শিব। সনাতন ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ বেদ-এ যোগব্যায়ামের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ব্রাহ্মণরা এই যোগের উন্নয়ন সাধন করেন এবং তাদের অভিজ্ঞতা গুলো প্রায় ২০০ নথিতে অন্তর্ভুক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২১ জুন কে বিশ্ব যোগ দিবস হিসেবে পালনের ধারণা নিয়ে আসেন এবং এখন এটি বিশ্বব্যাপি পালন করা হয়।

৯। সুতি কাপড়

আমাদের এই মোলায়েম কাপড়, এই তীব্র গরমে যখন আমাদের কষ্ট লাঘব করে তখন আমাদের ভারতের সেসকল আবিষ্কারকদের কথা স্মরণ করতেই হয়। তাদের এই আবিষ্কার ছাড়া আমরা এখন কোন ধরণের কাপড় পড়তাম তা ধারণা করা যায়না। গ্রীকদের পশুর চামড়ার কাপড় সকল দেশের জন্য উপযোগী ছিলনা। তাই সুতি কাপড়ের অবদান পোষাক শিল্পে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ-৫ম শতকে ভারতে সুতার উৎপাদন শুরু হয়েছিল পরে তা ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় বিখ্যাত হয়ে পড়ে। ভারতের কাশ্মীরের উলের কাপড় বেশ উন্নত এবং জগৎ বিখ্যাত। তাছাড়া পাটের সুতার বিভিন্ন পোশাক এবং পণ্য সামগ্রী বেশ খ্যাতি অর্জন করে সারা বিশ্বে।

১০। পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থা

আধুনিক শহরে যেরকম টয়লেট এবং এর সাথে যে জটিল নিষ্কাশন ব্যবস্থা থাকে তা ৫০০০ বছর আগে ভারতের ইন্দাস ভেলীর মহেঞ্জোদারো সভ্যতায় আবিষ্কৃত হয়েছিল। নানা চমকপ্রদ আবিষ্কারের মাঝে মহেঞ্জোদারোর এর সুয়েজ বা নিষ্কাশন ব্যবস্থা অন্যতম। এই সভ্যতাতে পাবলিক টয়লেট এবং উন্নত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা দেখতে পাওয়া যায়।

 

ভারতীয় উপমহাদেশের যত আবিষ্কার!/ NeonAloy

 

 

১১। শ্যাম্পু

চুলের যত্নে শ্যাম্পু ছাড়া কি ভাবা যায়? শ্যাম্পু শব্দের উৎপত্তি হয়েছে ভারতীয় শব্দ সাম্পু থেকে যার অর্থ ম্যাসাজ বা পিষা। ১৭৬২ সালে ভারতে মাথার ম্যাসাজের জন্য শ্যাম্পু ব্যবহার শুরু হয় যা ছিল তেল এবং ভেষজ উদ্ভিদের সংমিশ্রণ। ব্রিটিশ উপনিবেশ সময়কালে ব্রিটিশরা এই শ্যাম্পু এর ধারণাটি পছন্দ করে এবং নিজেদের দেশে এই শ্যাম্পু এর আরো পরিমার্জন করে বর্তমান সময়কালের শ্যাম্পুর উদ্ভাবন করে ধাপে ধাপে। তা যা হোক আপনার মাথার চুলের রক্ষার জন্য শ্যাম্পুর পাশাপাশি ভারতের সেসকল আবিষ্কারকরা ধন্যবাদ পেতেই পারে।

১২। বোতাম

আমাদের এই তালিকার সর্বশেষ আবিষ্কারটি হচ্ছে বোতাম! বোতাম জিনিসটি ছোট হলেও এই আবিষ্কার ছিলো পোশাক শিল্পে অত্যন্ত যুগান্তকারী। প্রায় ৫০০০ বছর পূর্বে মহেঞ্জোদারোতে সাগরের শামুকের খোল দিয়ে বোতাম তৈরি হতো। মহেঞ্জোদারোতে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে এ ধরণের বোতাম পাওয়া যায়। এই বোতামগুলোর মাঝেও ফুটো ছিলো যা বর্তমানের বোতামেও আছে। কিন্তু বোতামগুলো অলঙ্কার হিসেবে ব্যবহৃত হতো, কাপড় আটকানোর জন্য নয়।

ভারতীয় উপমহাদেশের যত আবিষ্কার!/ NeonAloy

 

 

সকল আবিষ্কার মানেই যে ইউরোপ কেন্দ্রিক তা কিন্তু নয় বরং এই উপমহাদেশ অনেক আবিষ্কারের জন্য বিখ্যাত। এগুলো অবহেলায় এবং না জানার কারণে আরো বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তাই এই ভারতীয় উপমহাদেশ সম্পর্কে আমাদের আরো আগ্রহী হয়ে এর সম্পর্কে জানা উচিত এবং পাশাপাশি নিজ দেশের ঐতিহ্য সম্পর্কে আরো সচেতন হতে হবে না হলে কালের বিবর্তনে আমরা আমাদের ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করার মতো কোনো কিছু খুঁজে পাবো না।

 

আরো পড়ুনঃ পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় কোথায় ছিলো 

Most Popular

To Top