ফ্লাডলাইট

পিটার বোরেন, ডাচ মহানায়কের অবসর!

পিটার বোরেন, ডাচ মহানায়কের অবসর!/ NeonAloy

“মহানায়ক” শব্দটা হয়তো পিটার বোরেনের সাথে ঠিক মানাবে না, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কত শত বড় বড় ক্রিকেটারদের ভীড়ে পিটার বোরেন খুব ছোট একটি নাম। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে নেই কোন সেঞ্চুরী, ক্যারিয়ারে বল হাতে কখনো দেখা পাননি পাঁচ উইকেটের। আর সবচেয়ে বড় কথা হাই প্রোফাইল ক্রিকেটের ব্যস্ত সূচীতে সহযোগী দেশের অধিনায়কের কথা কয়জন মনে রাখে!

তবু পিটার বোরেন মহানায়ক আখ্যা পাচ্ছেন, গতকাল অবসরের ঘোষনা দেয়ার পরেই নেদারল্যান্ডস ক্রিকেটে বাজছে হারানোর সুর। রায়ান টেন ডেস্কাটের মতো বড় নাম ছিলেন না বটে তবে ছিলেন একজন অভিভাবক, যিনি নিজ দেশ ছেড়ে এসে ভালোবাসার বাঁধনে নিজেকে বেঁধেছিলেন কমলা জার্সির মায়ায়।

বোরেনের জন্ম ও বেড়ে ওঠা নিউজিল্যান্ডের ক্রিস্টচার্চে। ক্যান্টেরবুরি অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে খেলার সময়েই নজর কেড়েছিলেন কিউই নির্বাচকদের। ফলে জায়গা পেতে কষ্ট হয়নি ২০০২ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের কিউই দলে। রস টেলর, জেসি রাইডার, নিল ব্রুম, রব নিকোলদের সাথে খেলেছেন একই একাদশে।

অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ শেষে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলতে পাড়ি জমিয়েছিলেন নেদারল্যান্ডসে। হয়তো প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন দেশটার তাই আর ফিরে যাননি নিউজিল্যান্ডে। আইসিসির নির্দেশনা মেনে চার বছরের অভিবাসন প্রক্রিয়া শেষে ২০০৬ সালেই অভিষেক হয় ডাচদের কমলা জার্সিতে। প্রতিপক্ষ ছিলো শ্রীলংকা।

প্রায় ১২ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের নেদারল্যান্ডসের হয়ে সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার গৌরব অর্জন করেছেন। ৫৮ টি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ এবং ৪৩ টি-টুয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন ক্যারিয়ারে।

২০০৯ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের উদ্ভোধনী ম্যাচে লর্ডসে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ক্রিকেটে নিজেদের প্রথম বড় জয় পায় নেদারল্যান্ডস। সেই ম্যাচে টম ডি গ্রুথের সাথে ৫০ রানের ম্যাচ জেতানো জুটি গড়ার পথে বোরেন ২৫ বলে ৩০ রানের গুরুত্বপুর্ন ইনিংস খেলেন।

২০১০ সালের জুলাই মাসে অধিনায়কত্ব পান পিটার বোরেন। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে কেনিয়ার কাছে পরাজিত হয়ে বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন শেষ হয়ে যায় নেদারল্যান্ডসের। একই সাথে হারায় ODI মর্যাদা। অবনমিত হয় ডিভিশন ২ পর্যায়ে। ফলাফল আইসিসি থেকে পাওয়া আর্থিক অনুদান কমে যায়, এবং নেদারল্যান্ডস ক্রিকেট বোর্ড চুক্তিবদ্ধ ক্রিকেটারদের ছাটাই করতে বাধ্য হয় আর্থিক দৈন্যতায়।

এইরকম অবস্থায় যখন নেদারল্যান্ডসের ক্রিকেট ভবিষ্যৎ শঙ্কার মুখে ঠিক তখনই দক্ষ মাঝির ন্যায় দলকে পথ দেখান পিটার বোরেন। ক্রিকেটারদের মানসিকতার ভেতর বিরাট পরিবর্তন নিয়ে আসেন। আক্রমনাত্বক ক্রিকেটের পথ বেছে নেয় ডাচ দল।

মাত্র ছয় সপ্তাহ পরে ২০১৪ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে, চট্টগ্রামে ইংল্যান্ডকে পরাজিত করে ৪৫ রানে। হারায় জিম্বাবুয়েকে। তবে সবচেয়ে বড় জয় আসে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে। সুপার টেন বা শেষ দশে স্থান করে নিতে হলে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ১৪.২ ওভারে ১৯০ করতে হতো নেদারল্যান্ডসকে। নেদারল্যান্ডস সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলো। চমক হিসেবে ওপেন করতে নেমে পিটার বোরেন ১৫ বলে ৩১ রান করে যেই ছন্দের সূচনা করেছিলেন সেটাই শেষ পর্যন্ত ধরে রাখে ডাচরা।

বোরেনের দক্ষ অধিনায়কত্বে ২০১৫ সালের ডিভিশন ২ চ্যাম্পিয়ন হয় নেদারল্যান্ডস। ২০১৬ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের যৌথ চ্যাম্পিয়ন হয় স্কটল্যান্ডের সাথে ট্রফি শেয়ার করে।

সর্বশেষ World Cricket League (WCL) চ্যাম্পিয়ন হবার মাধ্যমে ওয়ানডে ক্রিকেট লীগের ১৩ তম দল নির্বাচিত হয় একই সাথে ফিরে পায় ওয়ানডে মর্যাদা। আইসিসি ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপে আফগানিস্তান এবং আয়ারল্যান্ডের পর তৃতীয় স্থানে ছিলো ডাচরা। যেহেতু প্রথম দুই দল টেস্ট মর্যাদা পেয়ে গিয়েছে সুতরাং সহযোগী দেশসমূহের ভেতর নেদারল্যান্ডসের অবস্থান সবচেয়ে উপরে।

২০২০-২০২২ পর্যন্ত নেদারল্যান্ডস ওয়ানডে লীগের আট দলের সাথে অন্তত ২৪ টি ওয়ানডে খেলার সুযোগ পাবে, সেখানে বড় দলগুলার বিপক্ষে কয়েকটা জয় তাদের সামনে টেস্ট স্ট্যাটাসের পক্ষে দাবি তোলার সুযোগ করে দিতে পারে।

২০১৪-২০১৭ এই তিন বছরে দূর্দান্তভাবে ঘুরে দাড়ায় নেদারল্যান্ডস, যার পেছনে রয়েছে পিটার বোরেনের চমৎকার অধিনায়কত্ব।

আর তাই টেন ডেস্কাটের মতো বড় মাপের ক্রিকেটার না হলেও বোরেনের অবস্থান ডাচ ক্রিকেটে মহানায়কের চেয়ে কম নয়! হয়তো পরিসংখ্যান সেটা কখনো বুঝাতে পারবে না, কিন্তু যারা নেদারল্যান্ডসের ক্রিকেটের ইতিহাসের সাক্ষী তারা নিশ্চয়ই জানাবেন বোরেন নামের মানুষটার কি ভূমিকা ছিলো ডাচ ক্রিকেটের জন্য। সেটা মাঠেই হোক আর গ্লোবাল টুর্নামেন্টের সংবাদ সম্মেলনে।

পিটার বোরেনের অবসরের সিদ্ধান্ত এসেছে সমঝোতার মাধ্যমে। জিম্বাবুয়েতে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ৬ ইনিংসে মাত্র ৫২ রান করেন বোরেন। বিশ্বকাপে অংশ না নিতে পারলেও সামনে নেদারল্যান্ডস প্রচুর ক্রিকেট খেলবে। ২০২০ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ এবং ২০২৩ বিশ্বকাপের ভবিষ্যৎ দল মাথায় রেখেই এই সমঝোতায় এসেছেন পিটার বোরেন এবং ডাচ নির্বাচকরা।

৩৫ বছর বয়সী বোরেন বর্তমানে সবচেয়ে লম্বা সময় ধরে নিজ দলের অধিনায়কত্ব করা তিনজন অধিনায়কের একজন ছিলেন, বাকি দুইজন হলেন আয়ারল্যান্ডের উইলিয়াম পোর্টারফিল্ড অন্যজন নেপালের পরশ খাড়কা।

অবসরের সময় নেদারল্যান্ডসের হয়ে মাত্র চতুর্থ ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজের নামের পাশে ১০০০ ওয়ানডে রান নিয়ে যাচ্ছেন বোরেন। ওয়ানডেতে নেদারল্যান্ডসের হয়ে তৃতীয় সর্বোচ্চ উইকেটের মালিক বোরেন। টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটেও ডাচদের হয়ে তৃতীয় সর্বোচ্চ রান পিটার বোরেনের।

সহযোগী দেশসমূহের অন্যতম প্রধান মূখপাত্র ছিলেন বোরেন। সহযোগী দেশসমূহের প্রতি আইসিসির বৈষম্য নিয়ে বরাবরই খোলামেলা সমালোচনা করতেন আইসিসির।

নেদারল্যান্ডস ক্রিকেটের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে পিটার বোরেনের নাম। যিনি ছেড়ে এসেছিলেন নিজের মাতৃভূমি, আপন করে নিয়েছিলেন কমলা জার্সিকে। যিনি শুধু একজন দক্ষ অধিনায়কই শুধু নন, এখন পর্যন্ত ডাচদের ক্রিকেটে অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার।

পিটার বোরেনের ওয়ানডে ক্যারিয়ারঃ

ম্যাচঃ ৫৮
ইনিংসঃ ৫০
রানঃ ১০০৪
গড়ঃ ২২.৩১
ফিফটিঃ ৫
সর্বোচ্চঃ ৯৬
স্ট্রাইক-রেটঃ ৮৫.৩৭
উইকেটঃ ৪৬
ইকনোমি রেটঃ ৪.৯১
সেরাঃ ৩২/৪

টি-টুয়েন্টি ক্যারিয়ারঃ

ম্যাচঃ ৪৩
ইনিংসঃ ৩৮
রানঃ ৬৩৮
গড়ঃ ১৯.৩৩
ফিফটিঃ ১
সর্বোচ্চঃ ৫৭
স্ট্রাইক-রেটঃ ১২১.৭৫
উইকেটঃ ১৮
ইকনোমি রেটঃ ৬.৮৭
সেরাঃ ১৯/২

এছাড়া তিনি নিজ দেশ নিউজিল্যান্ডের ফোর্ড ট্রফিতে সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিকসের হয়ে খেলতেন।

 

আরো পড়ুনঃ রোনালদোর প্রেমিকারা

Most Popular

To Top