টুকিটাকি

স্বাধীনতা যখন বিপদের কারণ!

স্বাধীনতা যখন বিপদের কারণ!/NeonAloy

হাশেম আলী এক অনুন্নত গ্রাম এলাকায় থাকেন। সহজ সরল জীবনযাপন, দৈনন্দিন যা প্রয়োজন সব হাট বাজার থেকেই কেনা হয়ে যায়, বা খুব বেশি হলে গঞ্জের বাজার। তো আমাদের হাশেম আলী একবার বিশেষ কাজে ঢাকায় এলেন। কাজ শেষে মনে হলো, ছেলে একটা শার্টের বায়না করেছিল, একটা শার্ট কিনে নেয়া যাক। তিনি শার্ট কিনতে গেলেন বঙ্গবাজার।

বঙ্গবাজার গিয়ে তো তার চক্ষুস্থির! গঞ্জে বড়জোর ৪/৫ টা ডিজাইনের শার্ট পাওয়া যায়, ৫ মিনিটের মধ্যে পছন্দ করে কেনাকাটা শেষ করে বাড়ির রাস্তা ধরা যায়, কিন্তু এখানে তো হৈ হৈ রৈ রৈ ব্যাপার। এটা পছন্দ না হলে দোকানদার ঐটা দেখায়, তাও পছন্দ না হলে আরেকটা দেখায়, তার স্টকের শেষ নাই। এক দোকানের কোন শার্টই পছন্দ না হলে রয়েছে সারি সারি দোকান।
শেষ পর্যন্ত হাশেম আলী পছন্দ করে শার্ট কিনলেন। কিন্তু, ফেরার সময় তার মন বারবার খুঁতখুঁত করতে লাগল- ঠকলাম না তো? লালটার চাইতে সবুজটাই বেশি সুন্দর ছিল না তো? নাকি ছেলের চেকের বদলে ফুলতোলা শার্টটাই বেশি পছন্দ হতো?

পাঠক, এবার হাশেম আলির জায়গায় নিজেকে চিন্তা করুন। স্মার্টফোন কিনতে গিয়ে এমন অবস্থার স্বীকার হয়েছেন কখনও? প্রসেসরকে প্রাধান্য দেবেন নাকি ক্যামেরা, ব্যাটারি লাইফ নাকি ডিসপ্লে? এই ফোনের টাচ ভালো তো ওই ফোনের সেন্সর। ট্রেন্ড অনুসরণ করবেন নাকি ব্র্যান্ড ভ্যালু?

আমার নিজের একটা অভিজ্ঞতা বলি। স্মার্টফোন কিনতে গিয়ে উপরের সব ঝড় ঝাপটা সামলে একটা নামকরা ব্র্যান্ডের নির্দিষ্ট একটি মডেল পছন্দ করলাম। এবার পড়লাম আরেক দুশ্চিন্তায়- এই মডেল তো কিনব, কিন্তু কোন আউটলেট থেকে কিনব? একই শপিংমলের একই ফ্লোরের একই ব্র্যান্ডের কয়েকটি আউটলেট রয়েছে, তার এক একটাতে ফোনের সাথে “উপহার” হিসেবে ভিন্ন ভিন্ন বস্তু দিচ্ছে। উপহার নেয়ার সময় যাচাই বাছাই করা বাঞ্চনীয় বা মার্জিত আচরণ নয় অবশ্যই, কিন্তু উদ্দেশ্য যখন বাণিজ্যিক, তখন “When in Rome act like a Roman” নীতি অবলম্বন করাই উত্তম বলে মনে করলাম। প্রত্যেক আউটলেটে ঘুরে ঘুরে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই, এই মডেলের সাথে “উপহার” কী দেবেন? কেউ দিচ্ছে পাওয়ার ব্যাংক+ ব্যাক কাভার + সেলফি স্টিক, কেউ দিচ্ছে ব্যাক কাভার+ সেলফি স্টিক। এর মধ্যেও ঘাপলা। পাওয়ার ব্যাংক কেউ দিচ্ছে অমুক ব্রান্ডের, আবার কেউ তমুক ব্র্যান্ডের। সব মিলিয়ে জটিল অবস্থা। “জটিল হইসে মাম্মা” জাতীয় জটিল না, আক্ষরিক অর্থে জটিল।

যদি আপনি হাশেম আলী কিংবা আমার মতো অবস্থায় পরে থাকেন কখনও, বর্তমান পৃথিবীতে আপনাকে স্বাগতম।
কিছুদিন আগেই, শিল্প ও উৎপাদন প্রযুক্তি যখন সবে হাঁটতে শিখেছে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ও বণ্টন ক্ষমতা ছিল অত্যন্ত সীমিত। তারা চাইলেও তাদের পণ্যে ইচ্ছেমত বৈচিত্র্য নিয়ে আসতে পারত না বা অনেক সময় বৈচিত্র্যের কথা তাদের পরিকল্পনাতেই থাকত না। মূল বক্তব্যে আসার জন্য হয়তো বিষয়টার অতি-সরলীকরণ করতে হয়েছে, তার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। যাই হোক, অটোমেশান প্রযুক্তি আবিষ্কার এবং ডেভেলাপমেন্টের ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা বেড়ে গেল। সময়ের চাপেই বণ্টন ব্যবস্থার উন্নতি সাধিত হল। এবার পণ্যে আসতে লাগল নতুনত্ব, বাড়তে লাগল বৈচিত্র্য। শিল্প ও উৎপাদনের চরম উৎকর্ষের এই যুগে বাড়তে লাগল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, সেই সাথে পাল্লা দিয়ে পণ্য ও পরিসেবার বৈচিত্র্য। এই কোম্পানী যদি বলে- আমাদের পণ্যে আছে অমুক, আরেক কোম্পানী সাথে সাথে তমুক নিয়ে হাজির হয়। ফলত, মানুষের হাতে আসে অপশন, অনেক অনেক অপশন।

এইসময় একটা মজার ব্যাপার ঘটে। মানুষ ভাবতে শুরু করে, ভালোই তো, পয়সা দিয়ে পছন্দ করে যখন কিনব, দেখেশুনে সেরা জিনিসটা বা পরিসেবাটা নেই না কেন? আখেরে ভালো হলো না খারাপ হলো, সেটা নিয়েই এই আলোচনা।

ব্যারি শোয়ার্টজ নামে একজন প্রফেসর এই বিষয়ে আস্ত একখানা বই লিখে ফেলেছেন, নাম “The Paradox of Choice: Why More Is Less”, আমরা মূলত তার উপর ভিত্তি করেই আলোচনা করব। পণ্য ও পরিসেবাকে আমরা আপাতত কেবল “পণ্য” হিসেবে উল্লেখ করব।

পছন্দের বিড়ম্বনা!/NeonAloy

 

 

হাতে বেশি চয়েজ থাকার অর্থ কী? আপনি বেছে বেছে সেরা পণ্য বা পরিসেবাটি কেনার সুযোগ পাবেন, ফলত পছন্দ মতো পণ্য কিনে মানসিক সন্তুষ্টি অর্জন করবেন। তাই তো মনে হচ্ছে আপনার?

যখন আমার হাতে অনেক অনেক অপশন, তখন বেশ কয়েকটা ব্যাপার ঘটতে পারে। একটা হল, পণ্য কেনার পরে “অনুতাপবোধ”। হাশেম আলীর কাছে ফিরে যাই। ইশ, চেক না কিনে ফুলতোলা শার্ট কিনলেই হয়ত বেশি ভালো হত! যদিও তার ছেলের চেকশার্ট পেয়েই খুশি, তবু হাশেম আলীর মনে একটা খুঁতখুঁতানি থেকেই যেতে পারে- হয়ত ওই শার্ট কিনলে আরও ভালো হতো।

এর সাথে সম্পর্কিত আরেকটা ব্যাপার ঘটতে পারে- অনুমিত অনুতাপবোধ। “হায়রে, এই ফোনটা যদি কয়েকদিন পরে নষ্ট হয়ে যায়? এইটা না কিনে ঐটা কেনাই কি ভালো ছিল?”- ব্যাপারটা বোঝা গেল?

আরেকটা সম্ভাব্য ঘটনা “Oppurtunity Cost” সম্পর্কিত। একাধিক অল্টারনেটিভ থেকে পছন্দ মতো একটি নির্বাচন করার পর, অপরগুলো নির্বাচন না করার জন্য প্রতিটি থেকে যে অর্থমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছি, তা-ই অর্থনীতির পরিভাষায় Oppurtunity Cost। ধরুন, একজন লোক ব্যবসার উদ্দেশ্যে ট্রাক আর বাসের মধ্যে নির্বাচন করে বাস কিনল। সেইক্ষেত্রে ট্রাক কিনলে সে তা থেকে যে অর্থ উপার্জন করত, সেটা হচ্ছে তার Oppurtunity Cost। এখন লোকটা যদি বলে “ট্রাক না কিনে বাস কিনলে আরও বেশি টাকা কামাইতাম” আবার কিন্তু অপশন বা চয়েজ সংক্রান্ত ঝামেলাটা এসে পরে!
পরের সমস্যাটা হল “প্রত্যাশা”। যখন আপনার হাতে অনেক চয়েজ, স্বাভাবিকভাবেই আপনার প্রত্যাশা বেড়ে যাবে। বেড়ে যাবে এই অর্থে যে, এত এত রকমের পণ্যের মাঝে এর মধ্যে আপনার প্রত্যাশিত “পারফেক্ট” পণ্য থাকবে বলেই আপনি আশা করবেন। যখন একটা পণ্য কিনে বাড়ি ফিরবেন, পণ্যে সামান্য একটু খুঁত থাকলেই মনে হবে- যাহ, ঠকে গেলাম। আপনার পণ্য যত ভালোই হোক না কেন, আপনি খুঁজবেন পারফেক্ট পণ্য। এই কথা তো আমরা সবাই শুনেছি- প্রত্যাশা যেখানে অল্প, সুখ সেখানে বেশি।

শেষ সমস্যাটা বেশ মজার। সেলফ ব্লেইম বা নিজেকে দোষারোপ করা। একটা সময় যখন পণ্যের বৈচিত্র্য ছিল অল্প, একটা কাপড়ের দোকানে গিয়ে আপনি দুই ডিজাইনের জ্যাকেট থেকে একটা পছন্দ করে কিনলেন। এরপরে যদি আপনার জ্যাকেটে কোন খুঁত ধরা পরে, আপনি দোষটা কাকে দেবেন? দেবেন দোকানকে, কারণ তাদের সংগ্রহে এর বাইরে কোন অপশন নেই, বা অপশন খুবই কম। এই জ্যাকেট না কিনলে আপনার হাতে অপশন প্রায় ছিল না বললেই চলে। কিন্তু, এখন যদি আপনি দোকানে গিয়ে দেখেন ২০/৩০টা ডিজাইনের জ্যাকেট, এখান থেকে একটা পছন্দ করলে একটা বিশ্রী ব্যাপার হবার সম্ভাবনা থাকে। কেনা জ্যাকেটে কোন খুঁত ধরা পড়লে আপনি দোষটা দেবেন নিজেকে, কারণ এতগুলা ডিজাইন থেকে খুঁতহীন একটা জ্যাকেট পছন্দ করতে না পারার দায়টা আপনারই। ফলে, আপনি ছোটখাটো হলেও একটা ডিপ্রেশনে ভুগবেন।

একটা জিনিস আমি নিজেই বাস্তব জীবনে টের পাই। আমাকে যখন বলা হয় নিজের পছন্দমত টপিক নিয়ে আর্টিকেল লিখতে, আমি টপিক নির্বাচন করতে গিয়ে হিমিশিম খেয়ে যাই। অনেকক্ষেত্রে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যায় অথচ লেখাই হয় না, পরে গিয়ে বলতে হয়- ভাই আপনারাই একটা টপিক ঠিক করে দেন!
সুতরাং, আমরা যা দেখতে পাচ্ছি তা খুব একটা সুখকর নয়। আমাদের হাতে বেশি অপশন এসে পরার অর্থ বেশি সন্তুষ্টি অর্জন নয়, বরং ঠিক উল্টো। একেই বলা হয় “Paradox of Choice”।

ব্যারি শোয়ার্টজের একটা পরামর্শ দিয়ে লেখাটা শেষ করি। অনেক অনেক অপশনের মধ্য থেকে “পারফেক্ট” জিনিসটা ছেড়ে দেয়ার ভাবনা ছেড়ে দিন। সেটা বেছে নিন যেটা আপনার দরকার। আপনার কী দরকার, সেটা আগে নিজের সাথে বোঝাপড়া করে নিন।

Most Popular

To Top