নাগরিক কথা

যে দেশে নারী হয়ে জন্ম নেয়া পাপ!

যে দেশে নারী হয়ে জন্ম নেয়া পাপ!/ NeonAloy

কবি আবুল হাসানের একটা কবিতা আমার মনে পড়ে, “অতটুকু চায়নি বালিকা! অত হৈ রৈ লোক, অত ভীড়, অত সমাগম! চেয়েছিলো আরো কিছু কম!”

তারপর আমার একজন বালিকার কথা মনে পড়ে। বালিকার নাম বিউটি। আমি চিন্তা করি, বিউটি কী চেয়েছিল জীবনের কাছে? চৌদ্দ বছর বয়সী এক গ্রাম্য বালিকা খুব বেশি কীই বা চাইতে পারে?
পত্র-পত্রিকা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে অনেকেই হয়তো ইতোমধ্যে চিনে ফেলেছেন বিউটিকে। মাঠের উপর পড়ে থাকা একটি রক্তাক্ত কিশোরীর মৃতদেহ অনেকদিন দাপিয়ে বেরিয়েছে ফেসবুকের টাইমলাইন থেকে টাইমলাইনে। তবে বিষয়টি খুব সম্ভবত আরও আলোচনায় আসে মেয়ের বাবা আদালতে হত্যার দায় স্বীকারের পর।

ধর্ষণের খবর ইদানিং এতটাই ডালভাত হয়ে গেছে যে, প্রতিদিন পত্রিকায় একাধিক ধর্ষণের খবর না পাওয়াটাই অস্বাভাবিক মনে হয়। দেশে এমন পরিস্থিতি আগে কখনও এসেছে বলে আমার মনে হয় না। কয়েক মাসের শিশুও রক্ষা পাচ্ছে না ধর্ষণের কবল থেকে। এর মধ্যে, এতদিন পর্যন্ত যততটুকু জানা গেছে , বিউটির ঘটনা আরও মর্মান্তিক।
আদালতে দেয়া জবানবন্দীর উপর ভিত্তি করে ঘটনাটা একটু সংক্ষেপে বলে নেই।

কলাচান এবং আসমা বেগম ইউপি চেয়ারম্যান পদে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী। নির্বাচনে জিতলেন কলাচান। আসমা বেগমের স্বামী ময়না মিয়া স্ত্রীর পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ খুঁজতে লাগলেন।
এমন সময় ঘটল প্রথম দুর্ঘটনা। কলাচানের পুত্র বাবুল, বিউটিকে অপহরণ করে দুই সপ্তাহ আটকে রেখে ধর্ষণ করে।
এইখানে এসে লিখতে আমার হাত কাঁপে। আমি অনুভব করার চেষ্টা করি, কী নিদারুণ ভয়, কষ্ট আর আতঙ্কে চৌদ্দ বছরের এক মেয়ে দুইটা সপ্তাহ পার করেছে।

কাহিনীতে ফিরে যাই। দুই সপ্তাহ পরে বিউটিকে কৌশলে রেখে আসা হল বাসায়। বিউটির বাবা মামলা চাইতে থানায় গেলেন, কিন্তু পুলিশের কোন ভাবান্তর হল না (পরবর্তীতে দায়িত্বপ্রাপ্ত এসআই কে প্রত্যাহার করা হয়)।
তারপর আবার নিখোঁজ হল বিউটি। একদিন পর তার লাশ পাওয়া গেল। পুলিশ গ্রেপ্তার করে ধর্ষক বাবুলকে। সাক্ষী দেয় বিউটির বাবা সায়েদ আলী। সাক্ষীতে গড়মিল পাওয়ায় পুলিশের জেরার মুখে তিনি স্বীকার করেন, বিউটিকে খুন করেছেন তিনি নিজেই। সেই অনুযায়ী তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিও দেন।

হত্যার কারণ হিসেবে তিনি যা বলেন, এর চেয়ে মর্মান্তিক কাহিনী আমি জীবনে খুব বেশি শুনেছি বলে মনে পড়ে না।
বাবুল বিউটিকে ফিরিয়ে দিয়ে যাওয়ার পর ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচনে হেরে যাওয়া প্রার্থী আসমা বেগমের স্বামী ময়না মিয়া আসে বিউটির বাবার কাছে। বলে, বিউটি “নষ্ট” হয়ে গিয়েছে। এই মেয়ে ঘরে থাকলে তার অন্য দুই মেয়ের ভালো বিয়ে হবে না কখনও। আবার, পুলিশের কাছে এর বিচারও মিলবে না। তাহলে কী করা?
সুন্দর সমাধান দিলেন ময়না মিয়া। বিউটিকে হত্যা করতে হবে। হত্যা করে দায় চাপিয়ে দিতে হবে বাবুলের কাঁধে। দুই মেয়ের বিয়েও আটকাবে না, বাবুলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধও নেয়া হবে।

আমি জানি না, বিউটির বাবা এই প্রস্তাবে কীভাবে রাজী হলেন। আমি তার দিক থেকে চিন্তা করার চেষ্টা করি। মেয়ের ধর্ষণের বিচার না পাওয়া অক্ষম পিতার প্রতিশোধ স্পৃহা? বাকী দুই মেয়ের বিয়ে দেয়া যাবে না- এই আশঙ্কা থেকে বিবেকবুদ্ধি লোপ পেয়ে যাওয়া?

বিউটির বাবা, ময়না মিয়া এবং দশ হাজার টাকা দিয়ে ভাড়া করা একজন খুনী- তিনজনে মিলে খুন করে বিউটিকে।
মোটামুটি এই হল ঘটনা, আদালতে দেয়া বিউটির বাবা এবং চাচার জবানবন্দী অনুযায়ী। প্রতিদিন অনেক খুন-জখন-ধর্ষণের ঘটনা আমরা বেমালুম হজম করে ফেলি, কিন্তু এই ঘটনাটা কেন যেন মন থেকে মোছা যাচ্ছে না। একটা মেয়েকে দুই সপ্তাহ ধরে আটকে রেখে ধর্ষণ করা হল, তারপর ধর্ষকের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তাকে হত্যা করে নিজের জন্মদাতা বাবা! যদি জবানবন্দী মিথ্যা না হয়, যদি এর পেছনে কোন ষড়যন্ত্র না থাকে, তবে অসম্ভব অস্বস্তিকর একটি কাহিনী। ষড়যন্ত্রের কথা বলছি কারণ, এখনও অনেক কিছু প্রমাণ করা বাকি, আর এই রঙ্গেভরা বঙ্গদেশে কিছুই অসম্ভব নয়।

এই নির্মম ঘটনার দোষ কার?
ধর্ষক বাবুলের। একই সাথে, দোষ তাদের, যারা দিনের পর দিন ধরে ধর্ষণের সাথে পোশাক ও পর্দাকে যুক্ত করে ধর্ষণকে পরোক্ষভাবে সমর্থন করে যাচ্ছে।
ধর্ষনের মামলা করার পর যে পুলিশ সদস্যরা তাকে গ্রেফতার করতে গাফিলতি করেছে, দোষ তাদেরও। পুলিশ ও প্রশাসনের ওপর নজরদারী করা যাদের দায়িত্ব, দায় কি তাদের ওপরও বর্তায় না? দায়িত্বে অবহেলার এমন উদাহরণ তো নতুন কিছু নয়।
দোষ ময়না মিয়ার। ক্ষমতার লোভ যে মানুষকে কতদূর নিচে নামিয়ে আনতে পারে, মানুষ যে কতটা বিবেকহীন হয়ে উঠতে পারে, তার চূড়ান্ত রূপ দেখিয়েছে এই ময়না মিয়া।
বিউটির বাবার ব্যাপারে আর কিছু বলতে ইচ্ছা করছে না, কিংবা কি বলব বুঝতে পারছি না।
কি সহজেই মানুষ সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় কার বেঁচে থাকা প্রয়োজন কার প্রয়োজন নেই, কার বেঁচে থাকা লাভজনক আর কার মৃত্যু। আর আমরা নির্বাক চেয়ে দেখি, অক্ষম আক্রোশে ঠোঁট কামড়াই।
আর এদেশে নারী হয়ে জন্ম নেয়ার পাপের ফল প্রতিনিয়ত ভোগ করে করে বিউটিরা!

আরো পড়ুনঃ ধর্ষনের মানসিকতা বনাম পোশাক 

 

[এডিটরস নোটঃ নাগরিক কথা সেকশনে প্রকাশিত এই লেখাটিতে লেখক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তার অভিমত প্রকাশ করেছেন। নিয়ন আলোয় শুধুমাত্র লেখকের মতপ্রকাশের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফরমের ভূমিকা পালন করেছে। কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির সম্মানহানি এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আপনার আশেপাশে ঘটে চলা কোন অসঙ্গতির কথা তুলে ধরতে চান সবার কাছে? আমাদের ইমেইল করুন neonaloymag@gmail.com অ্যাড্রেসে।]

 

Most Popular

To Top