ইতিহাস

ইতিহাসের অদ্ভুত যত যুদ্ধ!

ইতিহাসের অদ্ভুত যত যুদ্ধ!/NeonAloy

ক্ষমতার দ্বন্দ, অর্থের লোভ আর শ্রেষ্ঠত্বের অহমিকায় অন্ধ হয়ে মানুষ স্মরণকালের শুরু থেকে অসংখ্য যুদ্ধের জন্ম দিয়েছে, কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অনেক ধ্বংস ও মৃত্যুর। এক একটা যুদ্ধ বদলে দিয়েছে ইতিহাসের গতিপথ। আজ আমরা অদ্ভুত কয়েকটা যুদ্ধ নিয়ে কথা বলবো। যুদ্ধ গুলো বিভিন্ন কারণে ইতিহাসের পাতায় “বিচিত্র” হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।

১০। কানাডা-ক্রোয়েশিয়া

এই যুদ্ধে কানাডা ক্রোয়েশিয়ার ৩ ভাগের মাত্র ১ ভাগ সৈন্য নিয়ে লড়াই করে জয়ী হয়, কোন গুরুতর ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই!
১৯৯১ সালে যুগোস্লোভিয়ার পতনের পর নিউ ক্রোয়েশিয়া এবং সার্বিয়ান সরকারের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে জাতিসংঘ থেকে ৯০০ কানাডিয় সৈন্যকে শান্তিরক্ষী হিসেবে প্রেরণ করা হয়।

সার্বিয়ান সরকারের সাথে সংঘাতের এক মুহূর্তে নিউ ক্রোয়েশিয়ার ২৫০০ সৈন্যের একটি দল কানাডিয় বাহিনীকে আক্রমন করে। কানাডিয় সৈন্যরা ছিল অত্যন্ত সুপ্রশিক্ষিত ও দক্ষ, তার উপর আধুনিক অস্ত্র সজ্জিত। তারা খুব সহজের ক্রোয়েশিয়ানদের হারিয়ে দিল। ক্রোয়েশিয়দের ২৭ জন নিহত হয় এবং ৮৭ জন আহত হয়। অপরদিকে, কানাডিয় সৈন্যদের ক্ষেত্রে কোন হতাহতের ঘটনা নেই বললেই চলে!
কানাডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জন ক্রিটিন ঘটনাটি প্রকাশ করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারী করে। ধারণা করা হয়, তার প্রশাসনের শান্তিপ্রিয় ভাবমূর্তি বজায় রাখতে এই নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়। ঘটনার ৯ বছর পর এটা সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

৯।ব্রিটেন–জানজিবার

এংলো-জানজিবার যুদ্ধ। বলাহয় ইতিহাসের সবচেয়ে কম সময় ধরে চলা যুদ্ধ, স্থায়িত্বকাল মাত্র ৩৮ মিনিট। প্রসঙ্গত জানজিবার হলো আফ্রিকার পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত তানজানিয়ান দ্বীপপুঞ্জ।
১৮৯৬ সালের এই যুদ্ধ শুরু হয় আগস্ট ২৫ তারিখে, যখন তৎকালীন সুলতান হামাদ বিন থুয়াইনি-র মৃত্যু ঘটে। খালিদ বিন বার্ঘাস নতুন সুলতান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। কিন্তু ব্রিটিশরা তো অন্য উত্তরাধিকারী বেছে রেখেছিল। তারা সুলতানকে ২৭ তারিখ সকাল ৯টা পর্যন্ত সময় দিয়েছিল, এমনকি পাঁচটি যুদ্ধজাহাজ প্রস্তুত রেখেছিল, যদি তাদের আদেশ অমান্য করা হয় তবে ব্যবহারের জন্য।
এবং তা-ই ঘটল, সুলতান আদেশ প্রত্যাখ্যান করলেন এবং ব্রিটিশরা তার প্রসাদ ধ্বংস করতে শুরু করে, মাত্র ৩৮ মিনিটে ৫০০ এর বেশি জানজিবারি মারা যায়। খালিদ ততোক্ষণে পূর্ব আফ্রিকার উদ্দেশ্যে পলায়ন করেছেন।

৮। আমেরিকা – ভ্যান জ্যান্ট

আমেরিকার একটি ছোট্ট বিভাগ ভ্যান জ্যান্ট, গৃহযুদ্ধ শেষ হবার পর আমেরিকান মানুষেরা মিলে USA গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, কিন্তু ভ্যান জ্যান্ট USA থেকে সরে নিজের রাষ্ট্র গঠন করতে উৎসাহী ছিলো। এমনকি তারা নিজের স্বাধীনতাপত্র তৈরি করেছিলো। তারা আমেরিকার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে। আমেরিকান-রা এতে ক্রুদ্ধ হয় এবং কিছু সৈন্য পাঠায়। কিন্তু ভ্যান জ্যান্ট এর ঘন জঙ্গলের পরিবেশে আমেরিকান সৈন্য কিছু করে উঠতে পারে নি। ভ্যান জ্যান্ট সে লড়াই জিতে যায়।
তবে তাদের সবচেয়ে বড় ভুল ছিলো যে তারা লড়াইয়ের পর জয় উদযাপন করতে শুরু করে। এই সুযোগে আরো আমেরিকান সৈন্যরা এসে তাদের গ্রেফতার করে নিয়ে যায়।

৭। জাপান – রাশিয়া

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রায় শেষের দিকে রাশিয়া হঠাৎ করে জাপানের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে। চীনে তাদের দখলকৃত এলাকা থেকে একসাথে তিন জায়গায় আক্রমণ করে রাশিয়া। তারিখ ছিলো আগস্ট এর ৮। হঠাৎ এই আক্রমণে জাপানিরা আঁতকে ওঠে।
চীনের আশেপাশের জাপানিদের তাড়িয়ে দেয় রাশিয়ান সৈন্য। কিন্তু তারা থেমে থাকে নি, কোরিয়ার পাশে জাপানি ভূমিতেও আক্রমণ চালায় স্ট্যালিনের সৈন্য। স্ট্যালিন চেয়েছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে যত বেশি সম্ভব ভূমি দখল করা।

তিন সপ্তাহের এই যুদ্ধে ১২,০০০ এর বেশি জাপানি সৈন্য নিহত হয়। এদিকে আমেরিকার পারমাণবিক বোমা হামলায় জাপান এমনিতেই দুর্বল। অবশেষে তারা আত্মসমর্পণ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়, কিন্তু এই যুদ্ধ আড়ালে পড়ে যায়। তবু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন জাপানের আত্মসমর্পণের পেছনে রাশিয়ার পরোক্ষ অবদান রয়েছে।

৬। নেদারল্যান্ডস – আইলস অব সিলি

ইংল্যান্ড এর দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলে কিছু দ্বীপপুঞ্জকে আইলস অব সিলি বলা হয়। অলিভার কর্ণওয়েল, ইংলিশ গৃহযুদ্ধ প্রায় জিতে যাচ্ছেন। অলিভারের পার্লামেন্টেরিয়ান-রা, ব্রিটিশ রয়ালিস্টদের তাড়িয়ে ১৬ বর্গকিলোমিটারের এই দ্বীপপুঞ্জে আশ্রয় নিতে বাধ্য করে। রয়ালিস্টদের সাথে নেদারল্যান্ডস এর সংহতি থাকার কারণে তারা আইলস অব সিলিতে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
ডাচ নেভি সিলিতে পৌছে তাদের সম্পদ চায়। কিন্তু কোনো উত্তর না পেয়ে এবং বুঝতে পারে যে তারা হারবে, ডাচ নেভি ফিরে যায়। পরে নেদারল্যান্ডস এ বিষয় ভুলে যায়। কিন্তু ১৯৮৬ সালে এক সিলিয় ঐতিহাসিক তুলে ধরেন যে নিয়মানুযায়ী নেদারল্যান্ডস এখনো সিলির সাথে যুদ্ধে আছে, তবে এই খবর পাওয়ামাত্র নেদারল্যান্ডস শান্তিচুক্তি প্রেরণ করে।
নিয়মানুযায়ী এই যুদ্ধ ৩৩৫ বছর ধরে চলছিল।

৫। সুইজারল্যান্ড – সুইজারল্যান্ড

অদ্ভুত এক যুদ্ধ, একই দেশ নিজের সাথেই কিভাবে যুদ্ধে লাগতে পারে? তার উপর এমন এক শান্তিপূর্ণ দেশ যেকিনা ১৮১৫ থেকে অন্য কোনো দেশের সাথে কোনো যুদ্ধে যায় নি। কিন্তু ব্যাপারটা ভিন্ন।
উনিশ শতকে সুইজারল্যান্ড একটি দেশ নয়, বরং অনেকগুলো সংযুক্ত এলাকায় বিভক্ত ছিল। এই সব এলাকা এক হয়ে সুইজারল্যান্ড গঠনে ইচ্ছুক হলে, ৭ টি ক্যাথলিক এলাকা এতে অসম্মতি প্রকাশ করে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, তারা নিজেই একটা রাষ্ট্র গঠনে লেগে যায়। সন্ডোরবন্ড নামের এই নতুন রাষ্ট্র গঠন হয় ১৮৪৭ সালে।
কিন্তু বাকি সুইজারল্যান্ড এই নতুন ক্যাথলিক রাষ্ট্র মেনে নেয় নি, তাই তারা যুদ্ধ ঘোষণা করে। সুইজারল্যান্ড যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারে এটা ভাবে নি সন্ডোরবন্ড, তাই তারা অস্ট্রিয়া এবং ফ্রান্সের কাছে সাহায্য চায়। কিন্তু কোনো সাহায্য পায় না।
২০,০০০ সৈন্য নিয়ে সুইস বাহিনী, সন্ডোরবন্ডকে পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য করে।

৪। আমেরিকা – মোরমন

মোরমনেরা হচ্ছে একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী, যারা শান্তিপূর্ণ এবং সুব্যবহারের জন্য নামকরা। তবে তারা একসময় এতটাই আক্রমনাত্মক ছিলো যে তারা US আর্মির সাথেও দ্বন্দে লিপ্ত হয়েছিলো। তাদের পলিগ্যামাস জীবনযাপন USA এর সাথে মিল হয় না দেখে তারা নিজের এলাকা গঠন করে, যা বর্তমানে ঊথা নামে পরিচিত।

সরকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে মোরমন লিডার ব্রিঘাম ইয়ং, সকল কর্মকর্তাদের বিতাড়িত করতে থাকেন। কিন্তু বিতাড়িত কর্মচারীরা আমেরিকা গিয়ে গুজব ছড়াতে লাগে যে মোরমন সমাজ, আমেরিকার সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট জেমস বুক্যানেন ৫৫,০০০ সৈন্য নিয়ে এই সম্ভাব্য আক্রমনের প্রস্তুতি নেন। কিছু ছোটখাটো লড়াই এর পর, এক মোরমন সৈন্য একটি সিভিলিয়ান ট্রেইনে আক্রমণ করে। ১২৬ নিরপরাধ মানুষ এবং শিশু মারা যায় এই হত্যাকান্ডে। অবশেষে বুক্যানেন এবং ইয়ং যুদ্ধে সমাপ্তি টানেন। বর্তমানে ঊথা আমেরিকার একটি অঙ্গরাজ্য।

৩। খ্রিস্টান – প্যাগান

ক্যাথলিক চার্চ জেরুজালেম দখলের জন্য প্রায়ই অভিজান চালাত। “নর্দার্ন ক্রুসেড” বা “ওয়েন্ডিশ ক্রুসেড” নামে পরিচিত একটি অভিজান যা ইউরোপ থেকে প্যাগানিজম মুছে দেওয়ার জন্য।
ক্রুসেডিং আর্মি ১১৪৭ এ উত্তর জার্মানিতে ঢুকে পড়ে, প্যাগানদের মারতে থাকে অথবা জোর করে ধর্ম পরিবর্তন করাতে থাকে। গ্রীষ্মের শেষের দিকে, সবচেয়ে বড় প্যাগান সৈন্য, দ্য ওয়েন্ডস-দের ইউরোপের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায় খ্রিস্টান সৈন্য।
ওয়েন্ডিশ লিডার নিকলোট, আত্মসমর্পণের নিদর্শন হিসেবে তার এবং তার সৈন্যদের ধর্ম পরিবর্তন করেন।

২। মল্ডোভা – ট্রান্সিস্ট্রিয়া

সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠিত হবার পর মল্ডোভার এক তৃতীয়াংশ চেয়েছিল যে তারা রাশিয়া এবং ইউক্রেনের সাথে থাকবে, বাকি অংশ চেয়েছিলো রোমানিয়া এবং পশ্চিমাদের সাথে সুসম্পর্ক রাখতে। রাশিয়ানদের অংশ, মল্ডোভার পূর্বপাশে ট্রান্সিস্ট্রিয়া নামের তাদের নিজস্ব রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চায়।

১৯৯২ সালে মল্ডোভা এবং ট্রান্সিস্ট্রিয়ার মাঝে যুদ্ধ লেগে যায়, যদিও তা চার মাসের একটু বেশি সময় ধরে ছিলো, তবু প্রচুর প্রাণহানি ঘটে। ৩২৪ মল্ডোভিয়ান এবং ৯০০ এরও বেশি ট্রান্সিস্ট্রিয়ানের মৃত্যু ঘটে এই যুদ্ধে।
এই যুদ্ধের অদ্ভুত দিক ছিলো যে সৈন্যরা, যুদ্ধের কারণে নিজেদের সামাজিক জীবন নষ্ট হতে দেয়নি। উভয় দল রাতের যুদ্ধ বিরতিতে “নো ম্যানস্‌ ল্যান্ড”-এ যেত, এবং একসাথে খোশগল্প এবং মদ্যপান করতো। এমনকি কেউ কেউ প্রতিজ্ঞা করতো যে যুদ্ধে দেখা হলে একে অপরকে হত্যা করবে না। এই দিনে দুশমনি, রাতে বন্ধুত্ব ভাবের জন্য একে “মাতাল যুদ্ধ”ও বলা হয়ে থাকে।

১। প্যারাগুয়ে – তিনটি দেশ

নিজের প্রিয় ব্যক্তিত্বকে অনুসরণ করে তিন তিনটি দেশের সাথে যুদ্ধ? এ কেমন কথা?
প্রেসিডেন্ট সোলানো লোপেজ উনিশ শতকের মধ্যভাগে প্যারাগুয়ে শাসন করেছিলেন। তিনি নেপলিওয়নের ভক্ত ছিলেন বললে ভুল হবে, বরং তিনি নিজেকে নেপলিয়নের মতো প্রমাণ করতে গিয়ে ১৮৬৪ সালে একই সাথে ব্রাজিল, উরুগুয়ে, এবং আর্জেন্টিনার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে বসেন।
একদিকে ৪ লাখ ৫০ হাজার প্যারাগুয়ের নাগরিক, অপরদিকে সব মিলিয়ে এক কোটি দশ লক্ষ মানুষ। কিন্তু প্যারাগুয়ানরা এত সহজে হার মানে নি, তারা তাদের জেনারেল এর আদেশের প্রতি অটুট। তাদের সেনাবাহিনীর পতনের পরও তার গেরিলা পদ্ধতিতে আক্রমণ চালিয়ে যায়। শতকরা নব্বই ভাগ প্যারাগুয়ান নাগরিকের মৃত্যুর পর অবশেষে বাকিরা আত্মসমর্পণ করে।

 

আরো পড়ুনঃ  ইতিহাস বিখ্যাত পার্ল হারবার আক্রমণ

Most Popular

To Top