গল্প-সল্প

ভবিষ্যতের মানুষ!

ভবিষ্যতের মানুষ!/NeonAloy

আমজাদ সাহেব অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছেন তার মেয়েটা কিছু বলার চেষ্টা করছে , কিন্তু শেষ মুহূর্তে থেমে যাচ্ছে। কি বলতে চাইছে সেটা আন্দাজ করতে পারছেন তিনি, তাই দেখেও না দেখার ভান করছেন। তাড়াতাড়ি খাবার শেষ করে উঠে যেতে পারলে ভালো হতো, বিব্রতকর একটা পরিস্থিতি থেকে রেহাই পাওয়া যেত।
শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই বললেন, “কিছু বলবি মা?”

-“এই মাসে কি মোবাইলটা কিনে দিতে পারবে বাবা? মাসের শেষে ক্লাস পার্টি আছে, মোবাইলটা কিনলে ছবি-টবি তুলতে পারতাম, জানুয়ারির পিকনিকের একটা ছবিও আমার কাছে নাই।“
আমজাদ সাহেব আড়চোখে স্ত্রীর দিকে চাইলেন। আফসানা কিছু শুনতে পাননি এমন একটা ভাব করে ভাত বেড়ে দিচ্ছেন।
-“অবশ্য এখন না কিনলেও চলবে, ফারিহার মোবাইল দিয়ে তুলব।এমন জরুরি কিছু না।“
-“না মা, এই মাসেই কিনে দেব। আসলে কিনব কিনব করে আর কেনা হচ্ছে না। মডেল যে লিখে দিয়েছিলি ওইটা কাগজটা আছে কিনা কে জানে। লিখে দিস তো আবার।“
রিতু “হু” জাতীয় একটা শব্দ করে খেতে লাগল। আমজাদ সাহেবের মনটাই খারাপ হয়ে গেল। মেয়ে কতদিন হল একটা মোবাইলের জন্য আবদার করছে, এ মাসেও বোধহয় কেনা যাবেনা। টাকা-পয়সার টানাটানি চলছে।
ভাত গলা দিয়ে নামতে চাইছো না। মন ভালো না থাকলে আমজাদ সাহেবের খাবারের রুচি নষ্ট হয়ে যায়।

দুপুরবেলায় আমজাদ সাহেবের পরিবারের সবাই ভাত-ঘুমে অভ্যস্ত। শুধু তিনি ঘুমান না। তিনি বসে বসে পুরানো ম্যাগাজিন পড়েন। ম্যাগাজিন পড়তে ইচ্ছা না করলে টিভি ছেড়ে নাটক দেখেন। এই সময়টা যেন কাটতে চায় না। তার পরিবারের কেউ জানেনা তার ইনসমনিয়ার মতো আছে। শুধু দুপুরে না, তিনি রাতেও ঘুমাতে পারেন না। ঘুম আসতে আসতে মাঝরাত হয়ে যায় প্রায়ই। তিনি দীর্ঘদিন ধরে তার এই অসুখটা যত্নের সাথেই লুকিয়ে রাখছেন।

আজকে কিছুই ইচ্ছা করছে না। টাকার কষ্ট বড় কষ্ট। কিছু টাকা হয়তো হাতে থাকতো, কিন্তু কলিগদের খাওয়াতে গিয়ে বেশকিছু টাকা হাত থেকে বেরিয়ে পড়েছে। অফিসের কলিগরা হঠাৎ একদিন ধরল রেস্টুরেন্টে খাওয়ানোর জন্য। তিনিও লজ্জায় না করতে পারলেন না। একটা মোটামুটি ভালো রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেলেন কয়েকজনকে। তারা বোধহয় আশা করেছিল তিনি কোন ফাইভ স্টার হোটেলে নিয়ে যাবেন, মধ্যম মানের হোটেলটায় ঢোকার সময় তাদের মুখে যে হাসিটা তিনি দেখেছেন সেটা বিদ্রুপের তাতে কোন সন্দেহ নেই। খাওয়ার সময় খেল প্রচুর পরিমাণে, কিন্তু তাদের চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল এত বাজে খাবার জীবনে খায় নি। বাজেটের বাইরে কিছু টাকা বেরিয়ে গেল।

এদিকে বাড়িভাড়াও বেড়ে গেছে। তার হিসাব করা টাকা, বাড়তি ভাড়া কোথা থেকে দেবেন সেটাও চিন্তার বিষয়। অন্য কি বাবদে খরচ কমাবেন বুঝতে পারছেন না।
আমজাদ সাহেব দুর্বল চিত্তের মানুষ, টাকার ব্যাপারটা তাকে সহজেই কাবু করে ফেলল। আরও একবার তিনি মধ্যবিত্ত জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা অনুভব করতে লাগলেন।

– “আমজাদ সাহেব !”
তিনি অবাক হয়ে মুখ তুললেন এবং একটা ধাক্কার মতো খেলেন। তার সামনের চেয়ারে অসম্ভব সুপুরুষ একজন মানুষ বসে আছেন। মানুষই বলা যায় নিশ্চয়ই, সন্দেহ যেটুকু থাকে সেটা তার গায়ের রঙের কারণে। গায়ের রঙ সবুজাভ, মানুষের গায়ের রঙ নিশ্চয়ই সবুজাভ হওয়ার কথা নয়।

-“আমজাদ সাহেব !”
-“ আ! আ! আপনি কে? বাসায় ঢুকলেন কি কিভাবে?”
-“শান্ত হয়ে বসুন। আপনার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি। বাসার কাউকে ডাকার চেষ্টা করবেন না, আমি আপনার ক্ষতি করতে আসিনি।“
আমজাদ সাহেব কি করবেন বুঝতে পারছেন না। যে ব্যক্তির গায়ের রং সবুজ তাকে চা-নাস্তা দিয়ে অ্যাপ্যায়ন করার কোন কারণ নেই।
-“আমার গায়ের রঙ নিয়ে ব্যস্ত হবেন না। ব্যাখ্যা করলে ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন। আর আমি আপনার উপকার করতেই এসেছি।“

-“আগে বলুন আপনি কে। আর আমি কখন আপনাকে উপকার করতে বললাম? “
-“আপনি বলেননি, মনে করুন আমি নিজে থেকেই আপনার উপকার করতে এসেছি।
আর আমি কে সেটা বলছি। বিশ্বাস করতে একটু কষ্ট হতে পারে। আমার নাম ম্রিয়ন। আমিও আপনাদের মতোই মানুষ, তবে আপনাদের সময়ের না। আমি এসেছি ভবিষ্যত থেকে। আপনাদের হিসেবে খ্রিষ্টাব্দ ১৩০২১ সাল, খ্রিষ্টাব্দের হিসেব এখন আমাদের সময়ে নেই। আর আমার গায়ের রঙ যেটা দেখছেন সেটা স্বাভাবিক বিবর্তনের মাধ্যমে হয়নি, আমরা কৃত্রিমভাবে অভিযোজিত হয়েছি। আমার সাথে একটি উন্নতমানের অনুবাদকযন্ত্র আছে, আমি আমাদের ভাষায় যা বলছি তা সাথে সাথেই আপনাদের ভাষায় অনূদিত হয়ে যাচ্ছে।

আমজাদ সাহেব ধাঁধাঁয় পড়ে গেলেন। লোকটা কি তার সাথে মশকরা করছে? গায়ের সবুজ রঙ কি কোন ধরনের ভাঁওতাবাজি? কিন্তু বাসায় ঢুকল কি করে? দরজা তো লাগানোই ছিল –

-“মূল কথায় আসি। আমি এসেছি একটা চ্যারিটি সংগঠনের পক্ষ থেকে। আপনাকে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে সাহায্যের জন্য বাছাই করা হয়েছে। আপনার বর্তমান সমস্যার কথা আমরা জানি। তার জন্য একটা সমাধান নিয়ে এসেছি আমি।“
-“কোন সমস্যা?”
– “ আপনার আর্থিক সমস্যার কথা বলছি।”
এই লোকটা তার আর্থিক সমস্যার কথা জানলো কিভাবে? ব্যাপারটা তো জটিল থেকে জটিলতর হয়ে যাচ্ছে।

-“এই যে, আপনার সমস্যার সমাধান।” সবুজ লোকটা একটা ছোট বাক্সমতো জিনিস বের করল।“
-“এটাই সমস্যার সমাধান? কি হবে এই বাক্স দিয়ে?” আমজাদ সাহেব বিরক্তি চেপে রাখতে পারলেন না।
-“বলছি। এটার নাম জেরোক্সজেন এফপি। এটার কাজ – সহজ ভাষায় কপি করা।“
-“কপি করা?”
-“হ্যাঁ, কপি করা। এর ভেতরে কিছু ঢুকিয়ে দেয়া হলে এটা আপনাকে হুবহু একটি রেপ্লিকা বানিয়ে দেবে। টাকা রাখলে টাকা, কিংবা মোবাইল রাখলে মোবাইল, আপনার যা খুশি তাই।“
-“আমার যা খুশি তাই?” অবাক হয়ে জিনিসটা হাতে নিলেন।

-“এটা কিভাবে কাজ করে জানতে চান? বিশেষ জটিল কিছু না, যা ভেতরে ঢোকানো হয়েছে তার অণু-পরমাণুর গঠন ও বিন্যাস রেকর্ড করে। তারপর বস্তুটি বের করে নিলে রেকর্ড অনুযায়ী অণু পরমাণু সাজিয়ে আরেকটি কপি তৈরি করে। আনবিক সংগঠনের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপন্ন করার কার্যকর ব্যবস্থা এর মধ্যেই আছে। আপনি বিজ্ঞানের ছাত্র, বিষয়গুলো আপনার না বোঝার কথা না।“
-“আপনি কি করে জানলেন আমি বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম?” বলেই বুঝতে পারলেন অর্থহীন একটা প্রশ্ন করে ফেলেছেন। এই ব্যক্তি যদি আসলেই ভবিষ্যতের মানুষ হয়ে থাকে তবে এই সামান্য কথা জানা তার জন্য কঠিন কিছু না।

“এখন জিনিসটা কিভাবে কাজ করে দেখাই আপনাকে। খুবই সহজ প্রক্রিয়া। “আশেপাশে তাকালো লোকটি। আমজাদ সাহেব তার দেশলাই এর বাক্সটা এগিয়ে দিলেন। বলা যায়না, দামী জিনিস এক্সপেরিমেন্টের নামে নিয়ে আবার হাপিস করে দেয় কিনা।
লোকটা দেশলাই এর বাক্স যন্ত্রের ভেতর ঢুকিয়ে কয়েকটা সুইচ চাপল। এরপর বাক্সটা বের করে আবার কয়েকটা সুইচ চাপল।
এবং পাঁচ মিনিট পর যন্ত্রটা খুলে হুবহু একইরকম আরেকটা দেশলাই এর বাক্স বের করে আনল।

রাতে রিতু আর আফসানা একসাথে বসে টিভি দেখছিল। আমজাদ সাহেব ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন। টিভিতে একটা নাটক চলছে। নায়কটাকে প্রায়ই পত্রিকায় দেখেন, কিন্তু নাম মনে করতে পারছেন না।
হঠাৎ মনে পড়ে গেল এমন একটা ভাব করে পকেট থেকে একটা খাম বের করলেন আমজাদ সাহেব। আফসানাকে খামটা এগিয়ে দিতে দিতে বললেন, “এইযে তোমার মেয়ের মোবাইল কেনার টাকা। আমি তো মোবাইল টোবাইলের ব্যাপার ভালো বুঝি না, তোমরা মা- মেয়ে মিলে পছন্দ করে কিনে ফেল। বাড়তি কিছু টাকা দিলাম, মোবাইলের ক্যামেরা যাতে ভালো হয়। ইনক্রিমেন্টের কিছু টাকা রাখা ছিল, ভুলেই গিয়েছিলাম ওটার কথা। হা হা হা –“

খামটা খুলে আফসানা আর রিতু অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। রিতু বোধহয় কিছু বলতে চাচ্ছিল, কিন্তু না বলে থেমে গেল। তিনি তাদের আর কোন সুযোগ না দিয়ে নিজের রুমে চলে গেলেন। আফসানার প্রশ্নবান শুরু হলে সামলানো মুশকিল হবে। বেচারারা হঠাৎ করে এই টাকা দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছে। তবে তাদের হতবাক করে দিয়ে পরিবারের কর্তা হিসেবে আমজাদ সাহেব অদ্ভুত এক আত্মশ্লাঘা অনুভব করছেন।
তিনি জানেন, অনেকদিন পর আজ তার ভালো ঘুম হবে।

ভিন্ন একটি ব্যাপার ঘটে যখন আপনি ঘটনাটা দেখবেন আফসানা কিংবা রিতুর দিক থেকে-
হঠাৎ মনে পড়ে গেল এমন একটা ভাব করে পকেট থেকে একটা খাম বের করলেন আমজাদ সাহেব । আফসানাকে খামটা এগিয়ে দিতে দিতে বললেন, “এই যে তোমার মেয়ের মোবাইল কেনার টাকা। আমি তো মোবাইল টোবাইলের ব্যাপার ভাল বুঝি না, তোমরা মা- মেয়ে মিলে পছন্দ করে কিনে ফেল। বাড়তি কিছু টাকা দিলাম, মোবাইলের ক্যামেরা যাতে ভালো হয়। ইনক্রিমেন্টের কিছু টাকা রাখা ছিল, ভুলেই গিয়েছিলাম ওটার কথা। হা হা হা-“

খামটা খুলে আফসানা আর রিতু অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। খামের ভেতর কোন টাকা নেই, শুধু ড্রয়িংরুমে পড়ে থাকা কয়েকটা পুরোনো ভিজিটিং কার্ড। রিতু কিছু বলতে চাচ্ছিল, আফসানা তাকে ইশারায় থামিয়ে দিলেন। সমস্যাটা তিনি কিছুটা আঁচ করতে পেরেছেন।
ভবিষ্যতের মানুষেরা ভবিষ্যতেই থেকে যায়। তবু তারা আসুক মধ্যবিত্তের কল্পনায়, ইচ্ছেপূরণ যন্ত্র একদিন হলেও দেখাক ইচ্ছে পূরণের মরীচিকা।
একদিনের জন্য হলেও তাদের বিছানায় নেমে আসুক প্রশান্তির ঘুম।

Most Popular

To Top