গল্প-সল্প

পাঁচ হাজার বছর পরের কোন একদিন!

পাঁচ হাজার বছর পরের কোন একদিন!/NeonAloy

ইনারি প্রান্তরে যতদূর দেখা যাচ্ছে শুধু মানুষ আর মানুষ। পুরো গ্রামের প্রায় সব মানুষ এসে জড়ো হয়েছে এখানে। মানুষের চাপে দম বন্ধ হয়ে যাবার যোগাড়। ছোট ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা পর্যন্ত সবাই চায় ইতিহাসের সাক্ষী হতে।
গ্রামের সবচেয়ে বৃদ্ধ ব্যক্তি আরাহান এসেছে দুইজনের কাঁধে ভর দিয়ে। আরাহানকে দেখে মানুষ পথ ছেড়ে দিচ্ছে, বয়োবৃদ্ধদের সম্মান করা এই গ্রামবাসীর চমৎকার একটি গুণ। অপেক্ষাকৃত কম ভিড়ের উঁচু একজায়গায় তাকে বসিয়ে দেওয়া হল। বসে বসে আরাহান অসীম আগ্রহের সাথে অপেক্ষা করতে লাগল।

আস্তে আস্তে স্বেচ্ছাসেবীদের অক্লান্ত চেষ্টায় কোলাহল কমে আসতে লাগল। মানুষদের একটু সুস্থির করার জন্য সেচ্ছাসেবীদের উপর যেন ঝড় বয়ে গেছে। কোথাও গানের আসর বসেছে। তিরিদোর কন্ঠ শোনা যাচ্ছে। ভাল গায়ক বলে গ্রামে তিরিদোর খুব সুনাম। খুব সুন্দর একটি গান গাচ্ছে সে, চমৎকার সুর। কিন্তু কথাগুলো খুব সরল, একটি ছেলে তার গ্রাম ছেড়ে যাবার পর গ্রামের কথা তার খুব মনে পড়ে। গ্রামের পথ, ফসলের মাঠ, বন্ধু-বান্ধব। সরল অনুভূতির জন্য সরল কথার একটি গান। গ্রামের মানুষ জটিলতা পছন্দ করে না।

আজ মানবসভ্যতার ইতিহাসে বিশেষ একটি দিন। পৃথিবী আর মঙ্গলগ্রহ গত ৫ হাজার বছরের মধ্যে সবচেয়ে কাছাকাছি আসছে আজ। এমনটিই বলছে রেডিওতে। রেডিওকে অবিশ্বাস করার প্রশ্নই আসেনা। শহরের লেখাপড়া জানা মানুষেরা কথা বলে রেডিওতে। পৃথিবী আর মঙ্গলের ব্যবধান হবে ৫৪ হাজার কিলোমিটার। পাঁচ হাজার বছরের মধ্যে এত কাছাকাছি নাকি আর আসেনি এরা। আকাশ পরিষ্কার থাকলে খালিচোখেই দেখা যাবে গ্রহটি। গ্রামের মানুষেরা তাই একসাথে ইতিহাসের সাক্ষী হতে জড়ো হয়েছে ইনারির প্রান্তরে।

জড়ো হয়েছে মাতিন আর তার বন্ধুরা। গ্রামের এদের উৎপাতে সবাই অস্থির। এদের আসার মূল উদ্দেশ্য গ্রহ উপগ্রহ নয়, তারচেয়ে দল বেঁধে আসা মেয়েদের দেখতেই এদের আগ্রহ বেশি।

আর জড়ো হয়েছে কাফিনরা। এদের জীবনে উৎসব আর উত্তেজনা অনুপস্থিত। এরা ফসলের সময় চাষাবাদ করে, আর বছরের বাকি সময় দিনমজুরী করে। অনেকদিন পর তাদের জীবনে উত্তেজনার কিছু ঘটতে যাচ্ছে।
আর দল বেঁধে বাড়ির বউরা। এরা কেউই অলস সময় কাটায় না, হাতের অনেক কাজ ফেলে এসেছে ওরা। এমন দিন তো রোজ রোজ আসে না।

একটু ফাঁকা জায়গায় সোমান দাঁড়িয়ে ছিল। এত ভিড়ের মধ্যে ফাঁকা জায়গা পাওয়া অনেক কঠিন, কিন্ত তার জন্য তেমন কিছু না। মানুষ নিজেই জায়গা ফাঁকা করে দিয়েছে। সে চেষ্টা করছে চেহারায় একটা গাম্ভীর্য ফুটিয়ে তুলতে। সোমান গ্রামের মাতবর শ্রেণীর লোক। আমজনতার মতো উত্তেজনার প্রকাশ তার শোভা পায় না, যদিও ভেতরে ভেতরে সেও ছটফট করছে।

-“হুজুর ভালো আছেন?” বিনয়ে বিগলিত একটা কন্ঠ শোনা গেল।
সোমান কিঞ্চিৎ শংকিত বোধ করছে। তার সামনে ভিজু পাগলা দাঁড়িয়ে আছে। সে প্রসিদ্ধ পাগল, মানী লোকের মান বাঁচানোর তাগিদ তার খুব একটা নেই।

“এইতো, আছি”  বলে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করল সোমান। কিন্তু ভিজু পাগলা পথ আটকে দাঁড়াল।
“কোথায় যাচ্ছেন হুজুর ? অনেকদিন আপনার সাথে আলাপ-সালাপ হয় না।“
সোমান এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। তার সাথে সবসময় দু’ চারজন লোক থাকে, কেবল দরকারের সময় কাউকে পাওয়া যায় না।

-“আজকে কি হয়েছে সবার বলতে পারেন হুজুর? সবাই এখানে আসছে কেন বউ-বাচ্চা নিয়ে?”
পাগলের কথার জবাব দেয়ার কোন মানে হয় না। বিরক্ত মুখে দাঁড়িয়ে রইল সোমান।

ভিজু পাগলা হাল ছাড়ার পাত্র না। “কি হল হুজুর? সবার বাড়িঘর দখল করে নিচ্ছেন নাকি? পাগল হলেও সবই দেখি। গেল বছর তো পাঁচ- দশ ঘর নিয়েছিলেন। এবার কি”
সোমানের বিশ্বস্ত অনুচর অনেজকে এগিয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে। সোমান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

আরাহান ভাবছে শেষ কবে গ্রামে এমন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল? গেল যুদ্ধের সময়? কিন্তু তার সাথে তো আজকের দিনের তুলনা হয় না। আজকের মতো মহাগুরুত্বপূর্ণ একটা দিন!

– “তুমি কি করো, আরাহান”?
আরাহান তাকিয়ে দেখল , তিশা দাঁড়িয়ে আছে। কাফিনের মেয়ে। ৬ কি ৭ বছর বয়স। এ গ্রামের সবাইকে চেনে আরাহান।

-“ কিছু করি নাতো,বসে আছি। তুমি বসবে আমার পাশে?”
-“ আজকে কে আসবে জানো?” সৌজন্যের ধার ধারে না তিশা।
-“না তো ! কে আসবে?” চোখেমুখে কৌতূহল ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে আরাহান। কিন্তু তার বলিরেখাময় মুখে অনুভূতি ফুটিয়ে তোলা কষ্ট।
“ভূত আসবে। ভূত এসে আম্মু আর আব্বুকে নিয়ে যাবে।“
-“তাই?” চোখ বড় বড় করে বলল আরাহান।
-“তোমাকেও নিয়ে যাবে।“ গম্ভীর মুখে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি জানালো তিশা।

-“খুব বিরক্ত করছে ,না?”
আরাহান মুখ ঘুরিয়ে দেখল, তিশার মা দাঁড়িয়ে আছে হাসিমুখে। তিশা তার মার চোখ পেয়েছে। বড় বড় মায়াকাড়া চোখ।
-“নাহ,বিরক্ত করবে কেন? চমৎকার বাচ্চা তোমার।“
– কেমন চমৎকার তা একঘন্টা সাথে থাকলে বুঝবেন।“ অভিযোগের সুরে বলল তিশার মা, নিহি।
-“বাচ্চারা দুষ্টুমি না করলে ওদের আর আমার মধ্যে তফাৎ কি?” হাসল আরাহান।
হাসল তিশার মা-ও। তারপর মৃদু অস্থিরতার সুরে বলল “আজকে কি আকাশ পরিষ্কার হবে না?”
প্রশ্নটা আপনমনেই করা হয়েছে, তাই আরাহান উত্তর দিল না। আবহাওয়া আজ খুব একটা পরিষ্কার না, হালকা একটা ধূলিঝড়ের মতো হয়েছিল। তবে প্রকৃতি এতটা নিষ্ঠুরতা করবে না। প্রকৃতির উপর আরাহানের অগাধ বিশ্বাস।

মানুষ ঘোরলাগা চোখে অপেক্ষা করছে। আকাশ পরিষ্কার হলে দেখা যাবে হাজার বছর আগে ফেলে আসা মানুষের জন্মভূমি পৃথিবীকে। কখনো না দেখা এই পূর্বপুরুষের গ্রহের জন্য যে এত মায়া তা কি তারা আগে জানতো? যার সাথে তাদের সম্পর্ক আজ শুধু ইতিহাসের খাতিরে, তাকে একনজর দেখার জন্য সবার ছুটে আসা কি কেবলই ঝোঁকের বশে?
তিরিদো আরেকটা গান ধরেছে। ফেলে আসা পৃথিবী নিয়ে পুরোনো একটি গান। সন্তানদের হারিয়ে কেমন আছে পৃথিবী? তার কি ইচ্ছে করেনা সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতে? বিষন্ন সুর, আজকের প্রকৃতির সাথে কেমন যেন খাপ খাইয়ে যায়। তিরিদোর কন্ঠে আজ অন্য ভুবনের মায়া।
আকাশ পরিষ্কার হয়ে উঠছে। প্রকৃতি বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। আকাশে আবছামত কিছু একটা দেখা যাচ্ছে কি? নাকি চোখের ভুল?
প্রতীক্ষার প্রহর গুণছে মানুষ!

Most Popular

To Top