ইতিহাস

আধুনিক যুগের যে সব প্রযুক্তি হাজার বছর আগেও ছিল(পর্ব-২)

আধুনিক যুগের যে সব প্রযুক্তি হাজার বছর আগেও ছিল(পর্ব-২)/NeonAloy

মানুষ অসম্ভব উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন এক প্রাণি। মানুষ টিকে থাকার জন্য, পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়ে নিজের বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে অনেক আবিষ্কার করেছে। রেনেসাঁ যুগকে আমরা ভেবে থাকি মুক্তবুদ্ধি চর্চা এবং নব্য আবিষ্কার এর যুগ হিসেবে। শিল্প বিপ্লবের সময় আবিষ্কৃত হয় অনেক উদ্ভাবনী যন্ত্র এবং আবিষ্কার যা আমাদের “আধুনিক” সমাজ গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। কিন্তু বহুকাল আগে, আদি ঐতিহাসিক যুগে মানুষ কীভাবে টিকে থাকতো বিরুদ্ধ পরিবেশে এই কথা যদি চিন্তা করি, তাহলে আমাদের কপালে কি একটু চিন্তার ভাজ পরে না? সাধারণভাবে কাউকে যদি বলা হয় আদিম সভ্যতা বলতে একজন কি বোঝে, তাহলে সে বলবে পাথর এর হাতিয়ার, আগুনের ব্যবহার, শিকার করে জীবন যাপন এসবের কথা। কিন্তু আপনি জানলে অবাক হবেন যে, আমরা এ যুগে যে সব প্রযুক্তি ব্যবহার করি তাঁর অনেক কিছুই হাজার হাজার বছর আগেও ছিলো!

চলুন এ পর্বে জেনে নেই এমন ৬টি আবিষ্কার যা আমরা বর্তমানে ব্যবহার করে থাকি এবং ভেবে থাকি এগুলো খুব সাম্প্রতিক কিন্তু এর আবিষ্কার বা ব্যবহার ছিলো সেই আদি ঐতিহাসিক যুগ থেকেই।

 

১. রোবটঃ  যদি এখন বলি ৩২৩ খ্রিষ্টপূর্বে রোবট এর মতো প্রযুক্তির ব্যবহার ছিলো মিশরে তাহলে চোখ কপালে তুলবেন নাতো? জ্বী সত্যি বলছি, ৩২৩ খ্রিষ্টপূর্বে মিশরের ফারোস দ্বীপে বাতিঘড় আছে যা তখনকার সময়ে গীজা পিরামিডের পর সবচেয়ে উঁচু ভবন ছিলো। এটির ছাদে দুটি নারী প্রতিরূপের মূর্তি ছিলো। যা স্বয়ংক্রিয় ভাবে নির্দিষ্ট সময়ে ঘন্টা বাজাতো সমুদ্রে ভ্রমণকারীদের সমুদ্রের শ্রোত সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়ার জন্য। খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ শতকের দিকে গ্রীক গণিতবিদ আরকিটাস যান্ত্রিক তাপীয় শক্তিতে চালিত একটি কৃত্রিম পাখি তৈরি করেন যার নাম ছিল “দ্যা পিজিওন” পরবর্তীতে আরো  অনেক গ্রীক গণিতবিদ বায়ুর চাপ, তাপ এবং পানির সাহায্যে এসকল সয়ংক্রিয় যন্ত্র তৈরি করে যার কতগুলো ছিলো মানুষের আদলে আবার কতগুলো ছিলো পশু-পাখির আদলে। চীনের প্রকৌশলীদেরও বিভিন্ন রকম সয়ংক্রিয় যন্ত্র তৈরি করতে দেখা যায়। ১৪৯৫ তে আমাদের সুপরিচিত লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি রোবট এর নকশা তৈরি করেন যা ১৯৫০ এর দিকে তার নোটবুক উদ্ধার করলে এই তথ্য পাওয়া যায়। ১৭০০-১৮০০ দশকে ইউরোপে টমেটন মেশিন ব্যবহার দেখা যেতো যা ঘড়ির কাঁটার দিকে কাজ করতে পারতো। সাধারনত এগুলো ছিলো তখন ধনীদের জন্য নিছক বিনোদনের উৎস। ১৯৪২ সালে বিখ্যাত কল্পকাহিনীর লেখক আইজ্যাক এসিমভ রোবটের তিনটি সুত্র দেন যা আধুনিক রোবট তৈরিতে যুগান্তকারী ভুমিকা পালন করে।

 

২.স্বয়ংক্রিয় দরজাঃ চোখের সামনে যখন আমরা দেখি স্বয়ংক্রিয় ভাবে দরজা খুলে যায় তখন ভাবি বিজ্ঞান কতো এগিয়ে গিয়েছে। কিন্তু অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি খ্রিষ্টাব্দের ১ম শতকে প্রাচীন গ্রীসের মন্দির গুলোতে স্বয়ংক্রিয় দরজার প্রযুক্তি দেখা যেত যা মূলত মন্দিরকে মানুষের কাছে রহস্যময় করে তুলে ধরার জন্য ব্যবহার করা হতো। মন্দিরের ভেতরে আগুনের ব্যবস্থা থাকতো যা মাটির নিচে একটি পানির আধারের সাথে যুক্ত ছিলো। এটি মূলত তাপীয় ইঞ্জিনের মতো কাজ করতো। আগুন জ্বলার সময় এটির নিচে রাখা পানির আধারটির পানির মধ্যে যেয়ে বিকিরন ঘটায় এবং পানির আধারের পাশে আর একটি আধার থাকে যেখানে প্রথম আধারটি থেকে দ্বিতীয় আধারটিতে পানি যায়। এই দ্বিতীয় পানির আধারটির সাথে ঘূর্ণন রশি যুক্ত থাকে যা দরজা খুলতে ভুমিকা পালন করে। দ্বিতীয় পাত্রটি পানি দ্বারা ভরতে থাকলে রশির ঘূর্ণন হয় এবং দরজাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যায়। সাম্প্রতিক কালে ২০ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে পুনরায় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় যা এখন এটি আরো উন্নত থেকে উন্নতর হচ্ছে।

 

আধুনিক যুগের যে সব প্রযুক্তি হাজার বছর আগেও ছিল/ NeonAloy

 

 

৩. ভেন্ডিং মেশিনঃ বাংলাদেশে ভেন্ডিং মেশিন (vending machine) এর ব্যবহার কম হলেও অনেক দেশে এর বহুল প্রচলন আছে। কয়েন প্রদান করে বা টাকা দিয়ে মেশিন থেকে স্বয়ংক্রিয় ভাবে বিভিন্ন পণ্য কেনা হয় দোকানদার ছাড়াই। খ্রিষ্টাব্দের প্রথম শতকে হিরো অফ আলেকজান্দ্রিয়া ( Hero of Alexandria) নামক গ্রীক প্রকৌশলী এবং গণিতবিদ প্রাচীন ভেন্ডিং মেশিন তৈরি করেন। মেশিনটির কাজ ছিলো এমন যে এর মধ্যে কয়েন প্রদান করলে এটি লিভারে গিয়ে পরে যা মেশিনটির একটি মুখ খুলে দিতো এবং পবিত্র জল ( holy water) বের হতো। ১৮০০ শতকে ইউরোপে ভেন্ডিং মেশিন ব্যবহার শুরু হয় নতুনভাবে। তখন পোস্টকার্ড এবং খাম নেয়ার জন্য পোস্টঅফিসে এই মেশিন ব্যবহার করা হতো। পরবর্তীতে এটি আরো উন্নত হয় এবং নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় পন্য সামগ্রী মানুষ সহজে পেতে শুরু করে।

৪. দূরত্ব মাপক যন্ত্রঃ আপনারা কি ধারণা করতে পারেন ওডোমিটার বা দূরত্ব মাপক যন্ত্র প্রথম কবে আবিষ্কৃত হয়েছিল? ১ম শতকে আর্কিমিডিস একটি দূরত্ব মাপার যন্ত্র আবিষ্কার করেন যা ছিলো কাঠের চাকার কাঠামোর যানবাহনের মতো একটি যন্ত্র। চাকার ঘূর্ণনের মাধ্যমে পরিমাপ করা হতো কতটুক দূরত্ব অতিক্রম করা হচ্ছে এবং তা একটি মিটারে প্রদর্শন করতো যা যন্ত্রের সাথে যুক্ত থাকতো। চীনের প্রকৌশলী জেং হেং প্রায় একই রকম প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই ওডোমিটার আবিষ্কার করেছিলেন। ১৯২৫ সালে এসে এই ওডোমিটার গাড়ির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি যন্ত্র হয়ে ওঠে।

৫. সাইজমস্কোপঃ চীনের জেং হেং আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছিলেন ১৩২ খ্রিষ্টাব্দে যা হলো প্রাচীন সাইজমস্কোপ(Seismoscopes)। এই সাইজমস্কোপের কাঠামোতে ছিলো উপরে ড্রাগন এবং এর মুখে বল এবং নিচে একটি ব্যাঙ এর কাঠামো । যন্ত্রটির সাড়া গায়েই সব দিকে এই ড্রাগন এবং ব্যাঙ ছিলো। এই প্রাচীন সাইজমস্কোপের মাধ্যমে কোনদিক হতে ভূমিকম্প হয়েছিলো তা জানা যায় কিন্তু ভূমিকম্পের তীব্রতা সম্পর্কে জানা যায় না। ১৯৩৫ সালে চার্লস রিখটার একটি প্রযুক্তি আবিষ্কার করেন যা ভূমিকম্পের মাত্রা বের করতে সক্ষম হয় এবং এটিকে বলা হয় রিখটার স্কেল। আমাদের দেশে মাঝে মধ্যেই ভূমিকম্প হয় এবং তখন ই আমরা মিডিয়াতে জানতে পারি কত মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। প্রাচীন চীনে মানুষ মাত্রা না জানলেও কোথা থেকে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে তা বের করতে সক্ষম হয়েছিল।

আধুনিক যুগের যে সব প্রযুক্তি হাজার বছর আগেও ছিল/NeonAloy

 

 

৬.সানগ্লাসঃ এবার সর্বশেষ যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলবো তা হলো ফ্যাশন প্রিয় মানুষদের অন্যতম পছন্দের সামগ্রী, সানগ্লাস। ১০ম শতাব্দীতে উত্তর আমেরিকার ইনুইত সমাজের মধ্যে এক প্রকার কাঠের সানগ্লাস দেখা যায় যা তুষারান্ত্র ( snow blindness) থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ব্যবহার হতো। মজার ব্যাপার হলো, এই কাঠের চশমাতে কোনো গ্লাস ব্যবহার করা হয় নাই। গ্লাসের চশমার ব্যবহার প্রথমে শুরু করে চীনের আদালতে ১২শ শতকে বিচারকরা। সাক্ষীদের জেরা করার সময় সানগ্লাস দিয়ে চোখের অভিব্যক্তি ঢেকে রাখতে এটি ব্যবহার করতেন তাঁরা। তাছাড়া এ সকল সানগ্লাস মানুষ সৌন্দর্য বর্ধনেই বিশেষভাবে ব্যবহার করতো। ১৯২৯ সালে জেমস ফস্টার সমুদ্র সৈকতে সানগ্লাসের উপকারিতার ধারণা নিয়ে আসেন এবং এরপর থেকে সানগ্লাস মানুষের সৌন্দর্য বর্ধনের পাশাপাশি চোখের বিভিন্ন রকম প্রতিকুলতা থেকে রক্ষার জন্য ব্যবহার করা হয়ে আসছে।

আধুনিক যুগের যে সব প্রযুক্তি হাজার বছর আগেও ছিল/NeonAloy

 

 

এগুলো হলো কতগুলো আবিষ্কার যা আমাদের কাছে খুব সাম্প্রতিক মনে হলেও তা অতি প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন স্থানে ব্যবহার করা হতো। মানুষ তার মেধা দিয়ে সকল যুগেই সভ্যতাকে প্রগতির পথে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছে।

মানুষের সৃষ্টিশীল চেতনা যে অনেক প্রাচীন তা আমরা এই আবিষ্কার বা প্রযুক্তির মাধ্যমে খুব সহজেই বুঝতে পারি। প্রাচীন মানেই যে শুধু প্রকৃতি নির্ভর জীবন যাপন, সেই ধারণা এই নমুনা গুলোর মাধ্যমে নাকচ হয়ে যায়। এরই সাথে অনেক ভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়ানো হয় মানুষদের মাঝে নিছক মজা কিংবা মানুষের মনোযোগ পাবার জন্য। এগুলো থেকেও আমাদের সচেতন হতে হবে এবং সঠিক তথ্যের জন্য আমাদের সব সময় অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে হবে।

 

আরো পড়ুনঃ আজবে ভরা দুনিয়া 

Most Popular

To Top