বিশেষ

আপনার সততার দাম ঠিক কত টাকা?

আপনার সততার দাম ঠিক কত টাকা?/ NeonAloy

সততা- খুব ভারী একটা শব্দ। অবশ্য সবার কাছে হয়তো তিন অক্ষরের এই শব্দটি সমান ওজন বহন করে না। কারো কাছে এই একটি শব্দই সারা জীবন পার করে দেওয়ার একমাত্র মূলমন্ত্র, আবার কারো কাছে বাজারে আলু-পটলের মত একটি জিনিস, যেটা যেকোন সময় বিক্রি করে দেওয়া যায়।

এখন আপনাকে যদি বলি, “ভাই, আমি আপনার সততা কিনতে চাই। কত টাকা লাগবে আমাকে অ্যামাউন্টটা জানান” – আপনি কি জবাব দিবেন? এখনই বলতে হবে না। ৫ মিনিট সময় নিন, ভেবেচিন্তে বলুন। দাঁড়ান, আপনাকে একটু সাহায্য করি। যদি আপনি ছোটখাটো কেউ হন, ধরেন রেলস্টেশনের কোন কর্মচারী কিংবা ব্ল্যাকে টিকেট বিক্রি করা কেউ- তাহলে আপনার সততার দাম হতে পারে ১০০-১৫০ টাকা। ঈদের মৌসুমে আপনার দাম কিছুটা বাড়তে পারে, হয়তো ২০০-৩০০ টাকা হারে আপনার সততা বিক্রি করতে পারেন আপনি টিকেটপ্রতি, কিন্তু এর বেশি কখনোই হবে না। আবার আপনি যদি অনেক উচ্চপদস্থ কোন সরকারী কিংবা বেসরকারি কর্মকর্তা হন, যার কলমের এক খোঁচায় শত কোটি টাকার প্রজেক্ট পাশ হয়- তাহলে আবার আপনার সততার বাজারমূল্য হবে বেশ চড়া। কয়েক কোটি টাকার নিচে আপনার সাথে কথা-ই বলার সাহস করা যাবে না।

কিন্তু যেহেতু আপনি এই লেখাটি পড়ছেন, সেহেতু ধরে নেওয়া যায় আপনি রেলস্টেশনের ব্ল্যাকার গোত্রের কেউ নন। রেলস্টেশনের ব্ল্যাকারদের সাধারণত এই শিরোনামের লেখা পড়ার সময় কিংবা ধৈর্য্য কোনটাই হয় না। অন্যদিকে, এটাও ধরে নেওয়া যায় যে আপনি সেরকম উচ্চপদস্থ কোন কর্মকর্তাও নন। যদি হয়ে থাকতেন, তাহলেও এই সস্তাদরের লেখা পড়ার কথা না আপনার। কিংবা যেহেতু ধরে নিচ্ছি আপনি একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, সেক্ষেত্রে এই লেখাটির লিংক আপনার ফেসবুক নিউজফীডে আসামাত্র শিরোনাম দেখে মনে মনে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে স্ক্রল ডাউন করে পরের পোস্টে চলে যেতেন।

নিম্নবিত্ত কিংবা উচ্চবিত্ত- দুই স্তরের মানুষ বাদ দিলে বলা যায় আপনি একজন মধ্যবিত্ত ঘরানার মানুষ। এখন বলুন আপনার সততার দাম কত? দেখেন ভাই, ভয় পাবেন না। একটু-আধটু ঘুষ তো সবাই খায়, না? আপনি যদি ভয় পেয়ে কিংবা লজ্জায় অ্যামাউন্টটা না জানান, তাহলে কিন্তু সবাই আপনাকে ভীতু বলে গালমন্দ করবে!

ইফাত তিশা লোকটি সৎ ছিল নিয়ন আলোয় neon aloy

ভয় পাবেন না। তাহলে কিন্তু মানুষজন আপনাকে এভাবে রাস্তাঘাটে লজ্জা দিবে!

জানি, আপনি মনে মনে হয়তো ভাবছেন, “ফাইজলামী করেন মিয়া? আমারে এত সস্তা পাইছেন? টেকা দিয়া অনেক হাতি-ঘোড়া কিনতে পারবেন, কিন্তু আমারে পকেটে ঢুকাইতে পারবেন না।” সেইসাথে আপনার মনে টনটনে হয়ে উঠবে ঘুমিয়ে থাকা মধ্যবিত্ত ইগো। যেই ইগো’র সাথে লড়াই করে নিজের সততার মূল্য নির্ধারণ করা আসলেই অনেক কঠিন। তারপরেও যদি আমি আপনার ব্যাগে ৫ লাখ টাকা ভর্তি মোটা একটা প্যাকেট ঢুকিয়ে দেই, আপনি কিছুক্ষণ গাঁই-গুঁই করে মেনে নিলেও নিতে পারেন। দেখেন ভাই, ভণিতা বাদ দেন। একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যের জন্য ৫ লাখ টাকা অনেক টাকা! এরকম আর দুই-তিনটা খাম পকেটে ঢুকাতে পারলেই আপনি ধুমধাম করে বিয়ে করতে পারবেন আপনার পছন্দের মানুষটিকে। কিংবা পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসাথে ঘুরে আসতে পারবেন থাইল্যান্ড কিংবা মালয়েশিয়া থেকে, যে ট্রিপের স্বপ্ন দেখছেন আপনি অনেকদিন ধরে। কিংবা হয়তো সেকেন্ডহ্যান্ড একটা ভাল গাড়ি কিনে ফেলতে পারেন! এই জ্যাম-ধুলাবালির ঢাকা শহরে বাচ্চাটা তাহলে একটু আরাম করে স্কুলে যেতে পারে। কি, নিবেন না টাকাটা?

যদি না নেন, তাহলেও কিন্তু আমি আপনার পিছু ছাড়ছি না। আফটার অল, আমি নিশ্চয়ই আপনাকে এমনি এমনি টাকাটা দিচ্ছি না। আপনাকে আমি টাকা দিচ্ছি আমার নিজের কোন একটা কাজ কিংবা স্বার্থ উদ্ধারের জন্য। এখন আপনার গোঁয়ার্তুমী’র জন্য নিশ্চয়ই আমার কাজ আমি জলে ভাসিয়ে দিতে পারি না। যেহেতু আপনাকে টাকা দিয়ে কেনা যাচ্ছে না, এবার আমি তাহলে আপনাকে জিজ্ঞেস করবো আপনার কাছে সবচাইতে মূল্যবান জিনিসটি কি? অবশ্যই আপনার আত্মসম্মান। আত্মসম্মানের দোটানা না থাকলে আপনি দ্বিতীয়বার চিন্তা না করে আমার অফার করা টাকাটা পকেটে ভরে ফেলতেন। যেহেতু আপনার আত্মসম্মান টাকা দিয়ে কেনা যাচ্ছে না, এবার তাহলে চেষ্টা করতে হবে অন্য উপায়ে।

আচ্ছা, তাহলে বলুন। আপনার আত্মসম্মান আপনার কাছে বেশি দামী, নাকি পৃথিবীতে আপনার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটি? হয় আপনি আপনার সততা আর আত্মসম্মান ধরে বসে থাকবেন, অথবা আপনার প্রিয় মানুষটি তার জীবন হারাবে আপনার চোখের সামনেই তিলে তিলে কষ্ট পেয়ে। এবার বলুন, আপনি কোনটা বেছে নিবেন?

আপনাকে এই প্রশ্ন করাটা আমার জন্য খুব সহজ। কিন্তু নিজেই যখন কিছুক্ষণ আগে ভাবছিলাম আমি কোনটা বেছে নিবো, আমার কাছে কোন উত্তর ছিল না। হ্যাঁ, প্রত্যেকটা মানুষের জীবনেই টাকাপয়সার প্রয়োজন হয়। কারো কম, কারো বেশি। অনেকেই আছেন যারা খেয়ে-পরে চলার খরচটা রোজগার করেই সুখে আছেন। আবার অনেকের স্বপ্ন থাকে বড়। এর মাঝেই সবাই সৎপথেই আয়-রোজগার করার চেষ্টা করে থাকেন যদি না তার লোভ আকাশচুম্বী হয়ে থাকে। তবে এর মাঝেও যে কখনো কখনো অসৎপথে কিছু বাড়তি টাকা কামানোর সুযোগ আমাদের সামনে আসে না, কিংবা অসৎপথে উপার্জন করতে বাধ্য হই না আমরা- তা কিন্তু না।

জীবনের এরকম একটি জটিল মোড়ে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ কি করতে পারে- তা নিয়েই মাহতাব হোসেনের গল্পে টেলিফিল্ম নির্মাণ করেছেন নির্মাতা মাবরুর রশীদ বান্নাহ। এই গল্পে স্ত্রী-কন্যা নিয়ে ছোটখাটো সংসার আসিফ নামের মানুষটির। কষ্ট করে সীমিত আয়ে টেনেটুনে কোনভাবে চলে যাচ্ছিল তাদের জীবন। তবে আসিফ সাহেবের সমস্যা একটাই- তিনি মিথ্যা বলতে পারেন না, অসৎ হতে পারেন না। আর সে কারণে অফিসের সহকর্মী থেকে শুরু করে বস পর্যন্ত সবাই তার উপ ক্ষ্যাপা। এমনকি যেকোন দিন চাকরিও চলে যেতে পারে- এমন অবস্থা।

এমন সময় আসিফ সাহেবের টেবিলে আসে একটি ফাইল; গ্রামের একটি সেতুর নির্মাণকাজের ফাইল। আসিফ সাহেব জানেন, এই সেতুটি তৈরি করা হচ্ছে নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে। আর এভাবে নির্মাণ করলে সেতুটি ধ্বসে পড়তে পারে যেকোন সময়, সেই সাথে হয়তো মারা যেতে পারে গ্রামের স্কুলগামী বেশকিছু ছেলেমেয়ে! তাই আসিফ সাহেব তার বসের মুখের উপর জানিয়ে দেন এই সেতু নির্মাণের কাজে তিনি অনুমোদন দিতে পারবেন না।

এমন সময় হঠাৎ বেশ অসুস্থ হয়ে পড়ে আসিফ সাহেবের একমাত্র মেয়ে সুহি। তাকে বাঁচাতে খুব শীঘ্রই প্রয়োজন ১২ লক্ষ টাকা। এদিকে অফিসে সেতু নির্মাণের ফাইল অনুমোদন করাতে হামলা করছে ঠিকাদার গ্রুপের লোকজন। এমনকি আসিফ সাহেবের অসুস্থ মেয়ের হাসপাতালে এসে ঘুরে গিয়েছে তারা। শেষ পর্যন্ত কি বাধ্য হবেন আসিফ সাহেব সন্তানের জীবন বাঁচাতে নিজের সততা বিক্রি করে দিতে? তিনি কি এই সত্যটি মেনে নিতে পারবেন যে নিজের সন্তানের জীবনের বিনিময়ে তিনি অসংখ্য শিশুর জীবন হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছেন? নাকি চারিদিকে এত চাপে পাগলই হয়ে যাবেন? না, সব এখানেই বলে দেওয়া যাবে না। তাহলে গল্পের আর বাকি থাকলো কি?

তবে এই টেলিফিল্মে দুইজনের অভিনয়ের কথা না বললে হয়তো কিছুটা অন্যায় হয়ে যায়। একদম প্রথম সিকুয়েন্সেই অভিনেত্রী ইফাত তিশা’র এক্সপ্রেশন, বিশেষ করে আসিফ সাহেবের চরিত্রে অভিনয় করা অপূর্বকে যেভাবে শাঁসালেন, সেটা সত্যিই ভাল বিনোদন দিয়েছে। এবং পরবর্তীতে দেখা গেছে তার এই রাগের মাত্রা একটুও কমেনি। বরং মিনিটখানেক পরেই যখন দেখবেন ইফাত তিশা’র রাগের ঝড়টা শিশুশিল্পী সুহি’র উপর দিয়ে যাচ্ছে, আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে বাধ্য- “এই মহিলা পাষাণ নাকি?” আর এজন্যই হয়তো চরিত্রটা বেশ ভাল ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন এই অভিনেত্রী। আর সে সাথে অপূর্ব’র অভিনয় ছিল সবসময়ের মতই অনবদ্য।

হাতে তো দুইদিনের ছুটি আছেই। সময়, আর মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে দেখে ফেলুন তাহলে “লোকটি সৎ ছিল”, আর ভেবেচিন্তে জানান, আপনার সততার মূল্য ঠিক কত?

Most Popular

To Top